একাত্তরের ঐতিহাসিক বিজয়কে বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয় হিসেবে অবহিত করা যেতে পারে। এ রূপ পূর্ণ স্বাধীনতা এর আগে জাতি হিসেবে বাঙালিরা কখনো ভোগ করেনি। গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে বাঙালি জাতিসত্তার উদ্ভব ও বিস্তৃতির বয়স তিন হাজার বছরেরও বেশি। নানা ধর্মবর্ণ, জাতির বিভিন্নতা সত্ত্বেও বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি-কৃষ্টি ও আচার-আচরণভিত্তিক জাতিসত্তা এক সুদীর্ঘ সমন্বিত সাংস্কৃতিক বিকাশের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বাঙালির বিকাশ। এ জাতিসত্তা শুধু এখানকার সনাতন আদিবাসীদের নিয়ে গড়ে ওঠেনি। বরং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, বিশ্বের অনেক সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর বিভিন্নতা সত্ত্বেও বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার বিকাশ ক্রমান্বয়ে ঘটে চলেছে। বাঙালি বলতে যে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে বোঝায়, সে ভাষা একই ধারায় ক্রমবিকাশের পথে অগ্রসরমান। গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের উর্বর মাটিতে গড়ে ওঠা এ ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ বিশ্ববাসীকে হতবাক করেছে। বিশেষ করে ১৯৭১ সালে এ জাতিসত্তার এমন পূর্ণ বিকাশ ঘটে যে, তা জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পূর্ণ করতে সমর্থ হয়। বাংলাদেশের মুসলমানরাই দ্বিজাতিতত্ত্বের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে স্বতঃপ্রণোদিত ভোটদানের মাধ্যমে পাকিস্তান সৃষ্টি করে। আর সেই পাকিস্তানে বাঙালি মুসলমানরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক এবং হিন্দুরা ভারতের চর হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাজনের মধ্য দিয়ে বাঙালিকে ইংরেজ শাসনের কবল থেকে মুক্ত করলেও নতুন করে পাকিস্তানের আধা ঔপনিবেশিক শাসনের নিগড়ে আবদ্ধ করে। পূর্ব পাকিস্তানের যে অঞ্চলে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে বাঙালি বসবাস করত তাদের সম্পদ ২৩ বছর ধরে পশ্চিমাঞ্চলের শাসক ও শোষকরা শোষণ করেছে। বাংলার সম্পদে গড়ে উঠেছে পাকিস্তানের তিনটি রাজধানী। বাঙালি প্রতিবাদ জানিয়েছে, প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছে বার বার। কিন্তু ভাষার ওপর '৫২ সালে যে আগ্রাসন চালানো হয় তা বাঙালিকে এক নতুন উপলব্ধির স্তরে পেঁৗছে দেয়। বাঙালি জাতিসত্তাকে সম্পূর্ণভাবে বিস্তৃতির অতল গভীরে তলিয়ে দেয়ার প্রত্যক্ষ উদ্দেশ্য নিয়েই ভাষার ওপর আগ্রাসন চালানো হয়। লক্ষ্য ছিল বাঙালির পাকিস্তানিকরণ প্রক্রিয়া সফল করা। কিন্তু পাকিস্তানি নির্বোধ শাসকরা কখনো এটা বোঝার চেষ্টা করেনি যে, প্রায় ১ হাজার মাইল দূরে অবস্থিত একটা ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও আচরণের অধিকারী একটা জনগোষ্ঠীকে আর একটা জনগোষ্ঠীতে একীভূত করা সম্ভব নয়। তাই ভাষার ওপর আগ্রাসনের সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালি তাদের বুকের রক্ত দিয়ে বাংলাকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। কিন্তু সেখানেই ওই আন্দোলন থেমে থাকে না। ভাষা আন্দোলনই রূপান্তর ঘটে স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার আন্দোলনে।
'৫২ থেকে '৭১ পর্যন্ত '৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, '৫৮-এর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, '৬২-এর শিক্ষা কমিশন আন্দোলন, '৬৪-এর আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, '৬৬-এর ছয় দফা ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও '৭০-এর নির্বাচন_ এসব পর্যায়ক্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমেই জাতীয়তাবাদী চেতনা ও জাতিসত্তা ক্রমান্বয়ে বিকাশ ঘটে। ছয় দফা আন্দোলন বিশেষভাবে বাঙালিকে রাষ্ট্রসচেতন করে তোলে। এ স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তারাই ছয় দফার পরিবর্তে এক দফা দাবি জানায়। যে মহান নেতার নেতৃত্বে এ গণতান্ত্রিক বিপ্লবী প্রক্রিয়া সম্পর্ণ হয় তিনি হচ্ছেন বাঙালি জাতির ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ নায়ক শেখ মুজিব। খোকা থেকে শেখ মুজিব। শেখ মুজিব থেকে মুজিব ভাই। মুজিব ভাই থেকে বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির জনক এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে তিনি বাংলাদেশের জনগণ ও বিশ্ববাসীর কাছে সমাদৃত হন। তাই বাঙালির স্বাধীনতা শুধু একটা জাতির অনুভূতির কল্পনাবিলাস নয়, এটা ছিল এক জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। আমাদের জাতিসত্তা পাকিস্তানে হারিয়ে যেতে পারে না, আমরা একটা স্বাধীন সক্রিয় বৈশিষ্ট্যম-িত জনগোষ্ঠী, আমাদের জাতির জনক তা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন। আর তিনি তা করতে পেরেছিলেন বলেই আজ আমরা স্বাধীন। স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম থেকেই, স্বাধীনতা আন্দোলন কেন পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই বাংলাদেশের জনগণ দুই ভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে? এক পক্ষ পাকিস্তান আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ধর্মরাষ্ট্র পাকিস্তান রক্ষার জন্য উন্মুখ, অন্য পক্ষ প্রকৃত জাতিসত্তা রক্ষার জন্য প্রতিবাদমুখর। এ দ্বন্দ্বই স্বাধীনতাযুদ্ধে বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করে। সাবেক মুসলিম লীগ, অন্যান্য দল ও গোষ্ঠী যারা ধর্মভিত্তিক জাতিসত্তায় বিশ্বাসী এমনকি বাঙালি মুসলমানরাও পাকিস্তানি শাসকদের পক্ষাবলম্বন করে। অন্যদিকে বাঙালি জাতিসত্তায় আস্থাশীল প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক গোষ্ঠী বাংলাদেশকে স্বাধীন করার উদ্দেশ্যে ক্রমাগত আন্দোলন চালিয়ে যায়। প্রথম দিকে এ আন্দোলন ছিল স্বায়ত্তশাসনকেন্দ্রিক। তারপর এ আন্দোলনই ক্রমবিকাশের ধারায় ১৯৭০-এর নির্বাচনে ছয় দফার ওপর ম্যান্ডেট নিয়ে বঙ্গবন্ধু একচ্ছত্রভাবে বিজয়ী হয়ে (১৬৯টি আসনের মধ্য ১৬৭টিতে) বাঙালি জাতির একমাত্র মুখপাত্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
পাকিস্তানি শাসকদের ধারণা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে শেখ মুজিব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্বের বিনিময়ে ছয় দফার প্রশ্নে আপস করবেন। কিন্তু আলোচনার টেবিলে বঙ্গবন্ধু স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন ছয় দফার প্রশ্নে বাংলার মানুষ যে ম্যান্ডেট দিয়েছে, তা থেকে এক চুল পরিমাণ তার পক্ষে সরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। এর ফলেই ২৫ মার্চ নিরীহ বাঙালির ওপর সশস্ত্র আক্রমণের মুখে বঙ্গবন্ধু স্বাধীতা ঘোষণা দেন। নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধ। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বরে বিজয় লাভ।
পাকিস্তানি শাসকরা যখন জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডেকেও তা বাতিল করল, সুকৌশলী শেখ মুজিব তখন অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে জানাতে সক্ষম হলেন যে বাংলাদেশ স্বাধীন। পাকিস্তানি শাসকদের বাংলাদেশ শাসন করার কোনো নৈতিক বা আইনগত অধিকার নেই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে বিশ্ববিবেকবান শাসকরা সমর্থন জানান। সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা আসে পাশের রাষ্ট্র ভারত থেকে। বিশেষ করে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছ থেকে।
২৩ বছরের সংগ্রামের ফসল স্বাধীনতা বাঙালি বেশি দিন ভোগ করতে পারেনি। সর্বাত্মক অর্থেই স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় প্রতিবিপ্লব ঘটিয়ে জাতির জনককে নৃশংসভাবে প্রায় সপরিবারে হত্যা করে স্বাধীনতার সপক্ষের বৃহত্তম দলকে ক্ষমতাচ্যুত করে। সুদীর্ঘ ২১ বছর পর্যায়ক্রমে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের নামে যে গণবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি দেশ শাসন করেছে তাদের লক্ষ্যই ছিল মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত সব কিছু বিসর্জন দিয়ে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ভাবধারায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। এ কারণেই সংবিধানের ওপর হস্তক্ষেপ। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও জয় বাংলার প্রত্যাখ্যান। সংবিধানের ধর্মীয়করণ ও সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয়দানের মতো ঘটনা ঘটে। প্রতিবিপ্লবের নায়ক কখনো পর্দার অন্তরালে কখনো সম্মুখে থেকে ক্ষমতা দখল করে স্বাধীনতার শত্রুদের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করে, যাতে করে স্বাধীনতা প্রকৃত অর্থেই অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিক্রিয়াশীলতার দুর্গ হিসেবে তিনি এমন একটি দল গঠন করেন এবং যাদের নিয়ে দল গঠন করা হয় তারা আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে গ্রহণ করতে রাজি নয়। কখনো আন্দোলনের দোহাই দিয়ে, কখনো গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে জেনারেল জিয়া সৃষ্ট এ দলটি স্বাধীনতার শত্রুদের সঙ্গে নিয়ে এমন অবস্থার সৃষ্টি করে চলেছে যে গণতন্ত্রের ক্রমবিকাশ মাঝেমধ্যে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতার শত্রুদের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদী তৎপরতার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু আশার আলো সঞ্চার হয় তখনই যখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা প্রতিষ্ঠিত হন। তিনি সঠিকভাবে 'গণতন্ত্রহীনতাকে' মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথে প্রথম প্রতিবন্ধকতা সঠিকভাবে চিহ্নিত করেন এবং জনগণের ভোটের অধিকার দ্বারা সে প্রতিবন্ধকতা অপাসরণ করতে ব্রতী হন।
বঙ্গবন্ধু যেমন ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন শেখ হাসিনাও অনুরূপ জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে বাংলাদেশের মানুষকে আসন্ন বিপর্যয় থেকে মুক্ত করার জন্য অঙ্গীকার করেছিলেন এবং সে অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তিনি এখন ব্রতী আছেন। পাকিস্তান আমলে স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তির শত্রু ছিল চিহ্নিত এবং একক। আর আজ স্বাধীন বাংলাদেশে চার দশক পর শত্রু বিভিন্নমুখী ও অনেকটা আন্তর্জাতিক। আদর্শের বিরোধীরা তো আছেই। কিন্তু তার থেকে বড় সংকট ষড়যন্ত্র।
বার বার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শেখ হাসিনা অসাধ্য সাধন করে চলেছেন। এখন যে সংগ্রামে তিনি রত তা হচ্ছে বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করা। যারা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমে বিশ্বাসী নয় তাদের মূল উৎপাটন। কখনো নির্বাচনের মাধ্যমে, কখনো কঠোর প্রশাসনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে তিনি সফলতার সঙ্গে এ কাজটি করে চলেছেন। আজকে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি বলতে যা বোঝায় বিশেষ করে যুবশক্তি অত্যন্ত সুকৌশলে শেখ হাসিনা তাদের স্বাধীনতার সপক্ষে আনতে সক্ষম হয়েছেন। এটাই তার রাজনৈতিক সফলতা। এ কারণেই উন্নয়নের গতি দ্রুত অগ্রসরমান। স্বাধীনতাকে অর্থপূর্ণ করার এবং শোষিত-বঞ্চিত মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে তার পিতা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি তা-ই বাস্তবায়ন করতে চান। তিনি এক লৌহমানবী। বিশ্বে কোনো শক্তি তার চলার পথ রুদ্ধ করতে পারবে না। শুধু জাতীয় পর্যায় নয়, বিশ্বের অনেক পরাশক্তি আজ তার সহযোগী। এক পক্ষের চোখ রাঙানিতে কোনো কাজ হবে না। বাংলাদেশ আজ আর একা নয়। বাংলাদেশের সুদক্ষ পররাষ্ট্রনীতি এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করেছে, যে বাংলাদেশকে রক্তচক্ষু দেখিয়ে লাভ নেই। এ কারণেই অভ্যন্তরীণ দিক দিয়ে সংকট সৃষ্টির ষড়যন্ত্র চলছে। শেখ হাসিনার জীবনের ওপর তাই হুমকি অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। জনগণের যত বেশি সমর্থন আদায় করতে পারবেন ততই তিনি নিরাপদ, শুধু তিনি নন, তার সঙ্গে দেশ ও জাতিও।
ডা. এসএ মালেক:রাজনীতিক ও কলাম লেখক
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জানুয়ারি, ২০১৬ সকাল ১০:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




