এলাকায় বিএনপি-জামায়াতের অবস্থান সুসংহত করার প্রতিযোগিতার কারণেই বাঁশখালী হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর সঙ্গে ছিল আওয়ামী লীগের অতি উৎসাহী একটি পক্ষ। আর এতে ‘আগুনে ঘি ঢালা’র মতো পরিস্থিতি তৈরি করে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন নিয়ে পাল্টাপাল্টি প্রস্তুতি। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার গণ্ডামারায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে-বিপক্ষে কিংবা ভূমিহারাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া না দেওয়ার গুজব, উসকানি ও দ্রোহের নেপথ্যে এসব কারণই রয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ৬০০ একর জমির ওপর ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রাক্কলিত এ বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য অনেক আগে থেকেই এস আলম গ্রুপ জমি কিনতে থাকে। শুরু থেকেই বিবাদ তেমন দৃশ্যমান না হলেও ইউপি নির্বাচন ঘনিয়ে আসতেই ক্রমে এলাকার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। এর নেপথ্যে সরকারি ও বিরোধী দলের দুই পক্ষেরই দুটি অংশ জড়িত বলে স্থানীয়দের অনেকের অভিযোগে উঠে এসেছে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানেও বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য।
গণ্ডামারায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিপক্ষে স্থানীয়দের প্রকাশ্যেই সংঘবদ্ধ করে সমাবেশের উদ্যোক্তা ছিলেন বিএনপি নেতা সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী। ঘটনার পর দায়ের করা তিন মামলার একটিতে তাঁকেই প্রধান আসামি করা হয়।
জেলা প্রশাসক মেসবাহ উদ্দিন বলেন, আসন্ন ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষ মাঠ বাজিমাত করতে চেষ্টা করছে। এ ব্যাপারে প্রশাসন সতর্ক অবস্থায় থাকবে। আর কোনো ঘটনা ঘটতে দেওয়া হবে না।
বাঁশখালীর সাবেক এমপি ও চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীও বলেন, ইউপি নির্বাচনকে ঘিরে কথিত আন্দোলনকারী বিএনপি নেতা লিয়াকত আলী এলাকায় নিজের অবস্থান সুসংহত করতে বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিষয়টি এজেন্ডা হিসেবে নিয়েছেন। গত রাতে মাহমুদুল ইসলাম জানান, কথিত আন্দোলনকারী ‘একলা চলো’ নীতিতে কোনো কমিটি ছাড়াই আন্দোলনের নামে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে চেয়েছেন। গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে এলাকাবাসী গণ্ডামারা বাঁচানোর লক্ষ্যে কমিটি করতে চাইলে ওই বিএনপি নেতা বাধা দেন। অবশ্য গতকাল রবিবার গণ্ডামারা বাঁচাও আন্দোলন নামে এলাকাবাসী একটি কমিটি গঠন করেছে বলে জানান সাবেক এই এমপি।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দাপ্তরিক ছাড়পত্রসহ প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। সরকারি নিয়ম মেনেই এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এদিকে এলাকাজুড়ে সরকারবিরোধী একটি পক্ষের জোর অবস্থানের বিপরীতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একাংশের পাল্টা অবস্থানের প্রয়োজনীয়তা আদৌ ছিল কি না কিংবা এমন পাল্টাপাল্টি অবস্থান পুলিশ প্রশাসনকে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ করেছে কি না, তা নিয়েও নানা প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে বিএনপি সমর্থিত স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের একটি অংশ এলাকায় এবং ফেসবুকে এ নিয়ে ব্যাপক সক্রিয় ছিল। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ওসিসহ দায়িত্বশীলরা প্রায় এক ঘণ্টা বিক্ষুব্ধদের ঘেরাওয়ে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে পুলিশ এই জিম্মিকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কঠোর হতে বাধ্য হয় বলে ঘটনার দিনই জানান বাঁশখালী থানার ওসি স্বপন কুমার মজুমদার। ঘটনাটির সঙ্গে আসন্ন ইউপি নির্বাচনী যোগসূত্র থাকার কথাও স্বীকার করেন ওসি।
বিএনপির পক্ষ থেকে অবশ্য ইউপি নির্বাচনের প্রস্তুতির সঙ্গে এই হতাহতের ঘটনার সম্পৃক্ততার অভিযোগ নাকচ করা হয়েছে। বাঁশখালী থেকে ইতিপূর্বে একাধিকবার নির্বাচিত এমপি এবং সাবেক বন ও পরিবেশবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘ঘটনাটির সঙ্গে কোনো দলীয় রাজনৈতিক বিরোধিতার যোগসূত্র নেই।’
স্থানীয়রা জানায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপন বিষয়ে ওই বিএনপি নেতার সঙ্গে একটি পক্ষের এক কোটি ৩০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে বলে একটি লিফলেটও প্রায় এক মাস আগে থেকেই বিলি হয় এলাকায়।
অভিযুক্ত বিএনপি নেতা লিয়াকত আলী অবশ্য বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক বা নির্বাচনী উদ্দেশ্য নয়, জনগণের ন্যায্য আন্দোলনে শরিক হয়েছি।’

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


