অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে দেশে জামায়াত নেই; কোনো বক্তৃতা-বিবৃতি, মিছিল-সভা-সমাবেশ তাদের নেই। ২০১২-১৩ সালে ঠিক উল্টো অবস্থা ছিল। জামায়াত-শিবিরের আতঙ্ক তখন পুলিশ তথা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যেও ছিল, সাধারণ মানুষের মধ্যে তো ছিলই। তখন থানা-পুলিশ দেখলেই শিবিরকর্মীরা হামলা চালাত, সরকারি প্রতিষ্ঠানে আক্রমণ করত। পেট্রলবোমা নিক্ষেপ, গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হেন কোনো নৃশংস কাজ নেই যা তখন জামায়াত শিবিরের কর্মীরা করেনি। শিবিরকর্মীরা তখন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিল- হয় ট্রাইব্যুনাল বন্ধ করা হবে, নতুবা দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হবে। সেই হুমকির বিষয়টি প্রকাশ্যেই ছিল। ২০১৩-১৪ সালে নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে জামায়াত-শিবির দেশকে কিভাবে অচল করার কাজে লিপ্ত হয়েছিল সেটি সবারই জানা। নির্বাচনে কী ধরনের ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল- তাও সবার মনে থাকার কথা। তবে নির্বাচন বানচাল করতে সফল হলে জামায়াত-শিবির-বিএনপির মিলিত শক্তিতে দেশে যে তাণ্ডব সৃষ্টি হতো সেটি সৌভাগ্যক্রমে আমাদের দেখতে হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে জামায়াত-শিবির এবং বিএনপি ধরে নিয়েছিল যে ৫ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে সরকার ব্যর্থ হবে, জামায়াত-বিএনপি জোট সফল হবে। সফল হলে তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী পরবর্তী সব কিছু হতো। কী হতো আমরা জানি না। তবে অনুমান করতে পারি, তখন জামায়াত-শিবির-বিএনপি সফল হলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি অন্যরকম হতো, তাদের তাণ্ডব ২০০১ সালকেও ছাড়িয়ে যেত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এসবই বঙ্গোপসাগরে চিরতরে ভাসিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হতো। ২০১৪ সালে তা করা সম্ভব না হলেও এটি বোধহয় এই জোটের রাজনীতির ঝুড়িতে জমা রয়েছে, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসতে পারলে তারা কিছুতেই প্রতিশোধ নিতে ছাড়বে না, তাদের লক্ষ্য-আদর্শ থেকে এক চুলও তারা সরে দাঁড়াবে বা চ্যুত হবে না।
যে বিষয়টি উল্লেখ করা প্রয়োজন তা হচ্ছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে জামায়াত-শিবির বন্ধ করতে পারেনি, তাদের শীর্ষ নেতাদের বেশ ক’জনের বিচারের রায় কার্যকর হয়েছে। তাতে তাদের প্রতিক্রিয়া তেমন জোরালোভাবে শোনা যায়নি, দেখা যায়নি। অনেকেই মনে করছেন জামায়াত-শিবির দুর্বল হয়ে গেছে, তাদের সেই শক্তি এখন আর নেই। বাহ্যিকভাবে সেটি দেখা যাচ্ছে। তবে জামায়াত-শিবির ভয় পেয়ে থেমে গেছে, সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে দিয়েছে, না, মোটেও তা ঠিক নয়। জামায়াত-শিবির রাজনৈতিকভাবে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। হিসাব-নিকাশ মেলাতে পারছে না এটি সত্য। জামায়াত-শিবির তাদের রাজনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন এনেছে এটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ২০১২-১৫ সাল পর্যন্ত সরকার প্রতিহত করার যে কৌশল নিয়েছিল সেটি তাদের অতি আত্মবিশ্বাসী অবস্থানের ফসল হতে পারে। জামায়াত ভেবেছিল তাদের দুর্ধর্ষ ক্যাডার বাহিনীকে মোকাবেলা করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনীর নেই, অন্যদিকে জামায়াতের সীমাহীন বিত্ত ও অর্থও তাদের অতি আত্মবিশ্বাসী করেছিল। প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছিল মামলাকে প্রতিহত করার জন্য, একইভাবে বিদেশি গণমাধ্যমকে ব্যবহার, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে কাজে লাগানোর জন্যও বিপুল অর্থ ও বিত্ত খরচ করা হয়েছিল। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য এবং বড় কয়েকটি দেশের অবস্থান তাদেরকে তখন আশাবাদী হতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু সব কিছুই উল্টে যাওয়ায় জামায়াত নেতৃত্ব হতবাক হয়েছে, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েছে। জামায়াতের অর্থবিত্ত ও ক্যাডারের আধিক্য জামায়াতের জন্য এ ক্ষেত্রে সুফল বয়ে আনেনি। বিষয়টি জামায়াত নেতৃত্ব বুঝতে কিছুটা দেরি করে ফেলেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, যুদ্ধাপরাধীদের দল হিসেবে দলের শত শত প্রতিষ্ঠানকে বাজেয়াপ্ত করা, ব্যাংক-বিমাসহ সব প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের হাতে নেয়া। এমন বাস্তবতায় দলের নেতৃত্ব কৌশল পরিবর্তন করেছেন এমনটি লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কী সেই পরিবর্তিত কৌশল?
এর উত্তরে বলা যায়, জামায়াত এখন সরবে কিছু করছে না, নিজ নামেও কিছু করছে না। তাতে সবার কাছে মনে হবে জামায়াত তল্পিতল্পা গোটাচ্ছে হয়তো। হতে পারে, জামায়াতের নেতারা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দলের সম্পদ কোথায় কী আছে, কিভাবে আছে সেগুলোকে কিভাবে রক্ষা করা সম্ভব হবে, কী নামে সেগুলোকে নেয়া গেলে রক্ষা করা যাবে- সেসব পরিকল্পনায় হয়তো দলটির নেতারা সচেষ্ট রয়েছেন। কিন্তু এরই মধ্যে শহরে, গ্রামগঞ্জে বিভিন্ন জায়গায় নতুন নতুন সংগঠনের নামে নানা ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সেই সব সংগঠনের নামের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের দূরবর্তী সম্পর্কও রাখা হয় না। কিছু নতুন নতুন ব্যক্তিকে সম্মুখে এনে বিজয় দিবস, ২১ ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়, যেখানে সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলা বা অন্য কোনো পেশার সম্মানিত ব্যক্তিদের অতিথি, বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। ওইসব ব্যক্তি আদতে জানতেই পারেন না এর আসল উদ্যোক্তা কারা, কে এর অর্থদাতা। এ ধরনের বেশ কটি সংগঠনের আলোচনা সভায় আমার খুব পরিচিত কিছু ব্যক্তি আমন্ত্রিত হয়েছেন- যারা জানতেই পারেননি এর নেপথ্যে জামায়াত জড়িত ছিল। শুধু তাই নয়, সাংবাদিকতা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণদানের নাম করেও এরা এখন বিভিন্ন সংগঠনের নামে সংগঠিত হচ্ছে। গ্রামগঞ্জে চলছে নতুন নতুন নামে নানা ধরনের প্রচার-প্রচারণার কাজ। এ ধরনের আয়োজন চলছে ব্যাপকভাবে।
ঈদের পরদিন। আমি জায়গার নামটি উল্লেখ করছি না। তবে এ ধরনের একটি উদ্যোগের কথা বলতে পারি। একটি কম্পিউটার হাউস গ্রামের একটি বাজারে ব্যবসা করছে। তারা ফ্রি-লেন্সিংয়ের ওপর দিনব্যাপী প্রশিক্ষণের আয়োজন করছে। আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে গ্রামের কয়েকটি স্কুল এবং মাদ্রাসায় পড়–য়া ছাত্রছাত্রীদের, কিছু উঠতি তরুণ ব্যবসায়ী, পেশাজীবীদের। আলোচক হিসেবে স্কুল, কলেজের শিক্ষক এবং অপরিচিত কিছু ব্যক্তি যাদের এই এলাকার তরুণরা চেনে না। অংশ নেয়া ছাত্রীদের প্রত্যেককে একটি করে কালো বোরখা উপহার দেয়া হলো। প্রশিক্ষণ হলেও বাস্তবে সেখানে দেশি এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে তাদের মতো করে বক্তব্য দেয়া হয়। স্থানীয় সরকারি ও বেসরকারি স্কুল-কলেজ এবং মাদ্রাসার কিছু কিছু শিক্ষক এগুলোতে অংশ নিয়েছেন। ও্ই সব তরুণ-তরুণী ফ্রিলেন্সিং কী তাই কি জানে? অথচ তাদের এনে দিনব্যাপী প্রশিক্ষণের নামে মগজ ধোলায়ের কাজটি তো ভালোভাবে করা হলো।
গ্রামগঞ্জে এই মুহ‚র্তে অসংখ্য কিন্ডারগার্টেন স্কুল হচ্ছে। এগুলোর সঙ্গে জামায়াত জড়িত। একটু অবস্থাপন্ন বাবা-মা তাদের সন্তানকে নিকটবর্তী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে নিয়ে ওইসব কেজি স্কুলে ভর্তি করাচ্ছেন। সেই সব কেজি স্কুলের বই-পুস্তক, শিক্ষক, প্রতিষ্ঠাতা সবই জামায়াতের ব্যক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং পরিচালিত। গ্রাম্য বাজার, স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠানেই সক্রিয় রয়েছে স্থানীয় জামায়াত, জামায়াতপন্থী শিক্ষকরা- এসব প্রতিষ্ঠানে নতুন নতুন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। বলতে দ্বিধা নেই গ্রামাঞ্চলে বা শহরাঞ্চলে খুব কম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই রয়েছে যেখানে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে যুক্ত থাকা ব্যক্তি শিক্ষক বা কর্মচারী হয়নি। ফলে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুব স্বাভাবিকভাবেই জামায়াত-শিবিরের ভাবাদর্শ থেকে মুক্ত থাকতে পারছে না, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তাদের কার্যক্রম গোপনে চলছেই। এরাই নিকটবর্তী কোনো এলাকায় নানা সাংগঠনিক নামে এখন কাজ শুরু করেছে।
দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হলো, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সংগঠন ও ব্যক্তিদের তেমন কোনো কার্যক্রম সহজে চোখে পড়ে না। স্থানীয় নেতাকর্মীরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত আছেন, আয়-উপার্জন করছেন। তারা জামায়াত-শিবিরের এসব কার্যক্রম সম্পর্কে সামান্যই খোঁজখবর রাখেন। আওয়ামী লীগের অনেক স্থানীয় নেতার ছেলেমেয়েরা জামায়াত পরিচালিত কেজি স্কুল, ক্যাডেট মাদ্রাসা, মহিলা মাদ্রাসা ইত্যাদিতে পড়াশোনা করছে, ওই সব ছেলেমেয়ের অনেকেই পিতার করা সংগঠন সম্পর্কে বিদ্বেষ পোষণ করে, সেভাবেই তারা বড় হচ্ছে। দেশে জঙ্গি নিয়ে এত তোলপাড় হচ্ছে। খোঁজখবর নিলে দেখা যাবে, অনেকেই এসব নিয়ে খুব বেশি কথা বলে না, নানা বিভ্রান্তিতে রয়েছে।
এর কারণ হচ্ছে, দেশে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম গ্রামাঞ্চলে খুব একটা নেই। দেশে সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ ইত্যাদি নিয়ে কোনো সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম চোখে পড়ে না, নেতাকর্মীদের এ নিয়ে প্রশিক্ষণ নেই, পড়াশোনা নেই। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে জঙ্গিবাদবিরোধী রাজনীতিকে যথাযথভাবে নিয়ে যাওয়ার ন্যূনতম কোনো উদ্যোগ নেই, এমনকি শেখ হাসিনা দেশ এবং জনগণের জীবনে যে সব পরিবর্তন নিয়ে এসেছেন এবং আনার পরিকল্পনা নিয়েছেন- তা নিয়েও কোনো প্রচার-প্রচারণায় তৃণমূলের সংগঠন, নেতাকর্মীরা নেই। অধিকন্তু তাদের মধ্যে দলাদলি, গ্রুপিং, বিভাজন দিন দিন বেড়েই চলছে। ফলে কোথাও সাংগঠনিক কোনো কার্যক্রম কেউ নিতে পারছে না, করছেও না। এলাকায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ইত্যাদি পরিচয়ে নেতা যারা আছেন, তারা গ্রামগঞ্জে শোডাউনও করছেন। কিন্তু জামায়াত-শিবিরের পরিবর্তিত তৎপরতা সম্পর্কে কমই খোঁজখবর রাখছেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সুযোগ নিচ্ছে জামায়াত-শিবির যারা দলীয় নির্দেশ গোপনে পায়, সেভাবেই উদ্যোগ নেয়, গ্রামগঞ্জে কোথায় কী নামে, কী এজেন্ডা নিয়ে নামতে হবে- তা তারা যথাসময়ে যথাযথভাবে নিতে খুব একটা দেরি করছে না। এর ফলে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বিস্তৃত হচ্ছে বাড়ি থেকে বাড়ি হয়ে গ্রামগঞ্জে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে নেই আওয়ামী লীগ। বিষয়টি নিয়ে সচেতন মহল কতটা ভাবছেন জানি না।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ সকাল ১০:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



