somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অর্থনীতিতে নতুন সংযোজন

২৩ শে অক্টোবর, ২০১৬ সকাল ১০:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জনশক্তি রপ্তানি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাত। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তারা তাদের শ্রমলব্ধ অর্থ দেশে পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা আরো গতিশীল করছে। বলতে গেলে, জনশক্তি রপ্তানি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ সর্বকালের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে এখন ৩১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। যাতে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের অবদানই বেশি। এ অবস্থায় বিদেশে নিত্যনতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করে ব্যাপক হারে আরো জনশক্তি রপ্তানির পথ উন্মুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করার পথ সুগম করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষকে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।
সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেই বাংলাদেশের শ্রমবাজার সবচেয়ে বেশি সম্প্রসারিত। সেখানে চিকিৎসক ও নার্সের ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সেখানে ডাক্তার ও নার্স পাঠাতে পারছে না বাংলাদেশ। প্রবাসে যেসব শ্রমিক কাজ করছে, তাদের ৯৮ শতাংশই অদক্ষ। সরকার বর্তমানে বছরে ১১ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাচ্ছে জনশক্তি রপ্তানি খাত থেকে। এই অঙ্ক কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব, যদি দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করা যায়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ডাক্তার ও নার্সের যে চাহিদা রয়েছে, সে চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ থেকে ডাক্তার ও নার্স পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারলে জনশক্তি রপ্তানির আয় সহজেই বাড়ানো যায়।
বিদেশের বাজারটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। যেসব দেশ জনশক্তি রপ্তানি করে, তারা শুধু দক্ষ জনশক্তি তৈরিই করে না, তাদের কিভাবে বিদেশে পাঠানো যায়, সে ব্যাপারেও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু আমাদের দেশে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এ ব্যাপারে তেমন কোনো তৎপরতা নেই বললেই চলে। এ কারণে দক্ষ জনশক্তির শ্রমবাজার প্রায় হারাতে বসেছে বাংলাদেশ।
বর্তমানে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, ওমান, কুয়েত, ইরাক, লিবিয়ায় ডাক্তার-নার্সদের কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিককালে সৌদি সরকার সে দেশের স্বাস্থ্য সেক্টরে ব্যাপক বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করছে। ফলে চিকিৎসক-নার্স ও অন্যান্য দক্ষ জনশক্তির ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ওমান, লিবিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ দেশ ডাক্তার-নার্স নেওয়ার জন্য ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, নেপালের মতো দেশের দিকে ঝুঁকছে। অথচ এ ক্ষেত্রে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হলে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় এই দক্ষ জনশক্তির বাজার ধরতে পারত।
মধ্যপ্রাচ্যে দক্ষ জনশক্তির যে বাজার সৃষ্টি হয়েছে, সে সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য অবশ্যই তৎপরতা চালাতে হবে। সরকার দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির জন্য সারা দেশে ট্রেনিং সেন্টার গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে দেশে ৩০টি সরকারি ও ৬৪টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে। এসব মেডিক্যাল কলেজ থেকে বছরে কম করে হলেও পাঁচ হাজার ডাক্তার বের হচ্ছে। বের হচ্ছে নতুন নার্সও। দেশে প্রায় ১০ হাজার নার্স বেকার রয়েছে। এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে জরুরি ভিত্তিতে ডাক্তার-নার্সদের কর্মসংস্থানে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এ ছাড়া অভিবাসন ব্যয় কমানোর জন্যও পদক্ষেপ নিতে হবে। শ্রমিকদের কাছ থেকে বেশি টাকা নেওয়া, দালাল কর্তৃক প্রতারিত হওয়া, চুক্তি অনুযায়ী যথাযথভাবে কাজ না দেওয়া, কাজ দিলেও প্রত্যাশিত মজুরি না দেওয়া ইত্যাকার সমস্যা সমাধানেও নজর দিতে হবে। দালালচক্র বা মধ্যস্বত্ব্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। দালালের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ হলে অভিবাসন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। এতে একজন শ্রমিক বিদেশ যেতে তিন থেকে চার লাখ টাকা খরচ করে। এই টাকা উঠাতেই তাদের কয়েক বছর লেগে যায়। তারপর প্রতারণার ফাঁদ তো রয়েছেই।
সভ্যতার ইতিহাস অভিবাসনের ইতিহাস। এ জন্য মানুষ যেখানে অন্ন ও বাসস্থানের জন্য অনুকূল পরিবেশ পেয়েছে, সেখানেই তার আবাস গেড়েছে। দেখা যায়, প্রায়ই বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন অবৈধ পথে শ্রমিকরা বিদেশ যাওয়ার সময় ধরা পড়ে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব মানুষ দুই পয়সা আয় করার জন্য বিদেশ-বিভুঁইয়ে পাড়ি জমায়। অর্থাৎ বিদেশে শ্রমিকের প্রচুর চাহিদা থাকলেও সরকার সেই বাজার ধরতে পারছে না। কিংবা দালাল ও অসাধু জনশক্তি রপ্তানিকারকদের দৌরাত্ম্যের কারণে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সেসব জায়গায় শ্রমিক পাঠানো সম্ভব হয় না। সে জন্য অবৈধভাবে অনেকেই বিদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেন। এই চেষ্টা বন্ধ করতে হলে জনশক্তি রপ্তানি ব্যয় কমাতে হবে। বন্ধ করতে হবে অসাধু দালালচক্রের অপতৎপরতাও।
অন্যদিকে বিদেশে শ্রমিকরা গিয়ে অনেক সময় অনেক সমস্যার মধ্যে পড়ে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোকে সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় শ্রমিকরা বিপদে পড়েও দূতাবাস কর্মকর্তাদের কোনো রকম সহায়তা পান না। এতে যে ওই শ্রমিক ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু তা-ই নয়, দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ব্যাপারটি অবশ্যই মাথায় রেখে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। এ ছাড়া বিদেশে গিয়ে অনেকেই ইচ্ছা-অনিচ্ছায় নানা রকম অপরাধকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এতে ওই সব দেশে শ্রমবাজার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ জন্য এ ব্যাপারেও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এর সঙ্গে দেশের সুনামের বিষয়টিও জড়িত। যাঁরা দেশের বাইরে যান, তাঁরা কিন্তু নানাভাবে বাংলাদেশকেই তুলে ধরেন। কাজেই তাঁরা যাতে কোনোভাবে বিপদে না পড়েন কিংবা বিপথগামী না হন, সেটি নিশ্চিত করতে হবে সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস কর্মকর্তাদের।
এ ছাড়া জঙ্গিবাদ এখন এক নতুন সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সিঙ্গাপুর থেকে কয়েক দফায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের ফেরত পাঠানো হয়েছে। এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। জঙ্গিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এ রকম কেউ যেন বিদেশ যেতে না পারে, সেটি দেখতে হবে। বিদেশে গিয়েও কেউ যাতে উগ্রপন্থা বা জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়াতে না পারে, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে প্রয়োজনে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, জনশক্তি রপ্তানিতে গতি আনতে হলে নতুন নতুন শ্রমবাজার যেমন খুঁজে বের করতে হবে, তেমনি বাজার ধরে রাখার জন্যও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আর জোর দিতে হবে দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর দিকে। এ জন্য প্রয়োজনে দক্ষ শ্রমিক সৃষ্টির জন্য সরকারি-বেসরকারিভাবে আরো জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এই খাত যাতে কিছুতেই কোনো রকম হুমকির মুখে না পড়ে, সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
বিদেশে চাকরিপ্রার্থী কেউ যাতে দালাল বা অসাধু চক্র কিংবা সরকারি কোনো কর্মী দ্বারা কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। যেখানে চাকরিপ্রার্থী, সেখানেই অবৈধ অর্থের লেনদেন—প্রচলিত এই কুসংস্কৃতির বেড়াজাল থেকে আমাদের অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। জনশক্তি রপ্তানির যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পাশাপাশি তাই দুর্নীতি মাথাচাড়া দেওয়ার সব ফাঁকফোকরও বন্ধ করতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে কোনো শৈথিল্য, অব্যবস্থা, অসাধুতা ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে তাত্ক্ষণিকভাবে তার বা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনিব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। জনশক্তি রপ্তানি খাত দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে আরো ভূমিকা রাখুক—এটিই কাম্য।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে অক্টোবর, ২০১৬ সকাল ১০:৩৮
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন লা-মাযহাবিকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার কারণ কী ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৩২


আজকে নতুন চারটি মুখ মন্ত্রিসভায় যুক্ত হলো। এর মধ্যে একজনকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে । বলছি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকনের কথা। তিনি একজন লা মাযহাবি বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেবীপ্রসাদ যাত্রা

লিখেছেন জ্যোতির্ময় ধর, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:২১


আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। চট্টগ্রামের মোমিন রোডের রুচিশীল বই বিপণি কথাকলির বুকশেলফে চোখ বুলাচ্ছিলাম । হঠাৎ একখানি বইয়ের ওপর এসে থমকে গেল আমার চোখ । "ক্ষুদে... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুর্ভিক্ষের আওয়াজ কি আমরা বাংলাদেশিরা শুনতে পাচ্ছি?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৪৩

মুচলেকা দিয়ে, গোপন সমঝোতা করে মীর জাফর কিংবা মীর কাসিমের মতো “কথিত ক্ষমতার” সিংহাসনে বসা যায় ঠিকই কিন্তু বসে বসে জনগণের সর্বনাশ দেখা ছাড়া তাদের বিশেষ কিছু করার থাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সম্ভাবনার বন্দি

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:১৮



বান্দরবান জেলা কারাগারের চারপাশে পনেরো ফুট উঁচু পাথর ও কংক্রিটের নিরেট প্রাচীর। তারও ওপরে পেঁচানো ধারালো কাঁটাতারের জাল।

বর্ষার কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে ৩ নম্বর ব্লকের সংকীর্ণ সেলে শান্ত হয়ে বসে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাবিতে "মব সায়েন্স" পড়তে হলে কী কী যোগ্যতা লাগে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:১৮



- রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তৌহিদী জনতার ব্যবহার করা জানতে হবে।

- রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও মবকে থামাতে না পারলে সেটাকে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা না বলে "জনতার শক্তি" বলতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×