somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং ইন্দিরা গান্ধী

১৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৬ সকাল ১১:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ব্যতীত বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির আর কোনো এজেন্ডা ছিল না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ভূমিকার একটি চূড়ান্ত পরিণতি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগেই তিনি খবর পেয়েছিলেন, নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হবেন কিন্তু তাকে ক্ষমতা দেয়া হবে না। তবুও বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়া খানকে নির্বাচন দিতে বাধ্য করেছিলেন। ইয়াহিয়া খানের লিগ্যাল ফ্রেম ওয়ার্ক মেনে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি তাঁর কাছের লোকদের বলেছিলেন, ‘নির্বাচনে জিতে আমি ইয়াহিয়া খানের সব শর্ত ছিঁড়ে ড্রেনে ফেলে দেব।’ আরো বলেছিলেন, ‘সামনে যে যুদ্ধ আসছে তার নেতৃত্ব কে দেবে তা নির্বাচনের মাধ্যমে ঠিক হওয়া দরকার।’
অনেকে নানান অজুহাতে ১৯৭০ সালের নির্বাচন বানচাল করতে চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘ভোটের আগে ভাত চাই।’ এটা ছিল পাকিস্তান রক্ষার প্রতিধ্বনি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনই আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তি। বিশ্বের দেশগুলোর কাছে মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বলতেন, ‘১৯৭০ সালের নির্বাচনে আমরা নিরঙ্কুশ বিজয়ী হয়েছিলাম, আমাদের ক্ষমতায় বসার কথা, সেখানে আমাদের বুকে চালানো হলো গুলি। এখন যুদ্ধ করে দেশ স¦াধীন করা ছাড়া আমাদের আর পিছু হটার পথ নেই।’
বিচারপতি চৌধুরীর এই বক্তব্য বিশ্ব বিবেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর কাছে ভারতের বাঙালি রাষ্ট্রদূত শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জির মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন, বাংলাদেশের স¦াধীনতা ঘোষণা করা হলে ভারত যেন আমাদের অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করে। এই প্রস্তাবে সম্মত হননি পণ্ডিতজী। মি. ব্যানার্জিকে তিনি বলেছিলেন, ‘মুজিবকে বলবেন, ব্যক্তিগতভাবে কারো অনুরোধে অস্ত্র সহযোগিতা দেয়া যায় না। তিনি যেন এমন রাজনীতি করেন যাতে প্রত্যেক বাঙালি বলে যে আমরা পাকিস্তানে থাকব না, স্বাধীন হব।’
বঙ্গবন্ধু সেভাবেই রাজনীতি করেছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে তিনি স্বাধীনতার দ¦ারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর তিনি ৬ দফার প্রশ্নে অটল থাকেন। ষাটের দশকে এক গোপন আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু কমরেড মনি সিংহ ও খোকা রায়কে বলেছিলেন, ‘যত দফাই দেন না কেন পাকিস্তানিরা বাঙালির দাবি মানবে না। স্বাধীনতা ছাড়া বাঙালিদের কোনো গতি নেই।’ বঙ্গবন্ধুর সেই চিন্তা কঠিনতম বাস্তবে রূপ পেল ১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খানের ঘোষণায়। বলেছিলেন তিনি, অনির্দিষ্ট কালের জন্য পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করা হলো। মূলত সেই দিন থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। সেই দিনই প্রকাশ্যে স্বাধীনতার ¯েøাগান উঠেছে, স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তৈরি হয়েছে। স্বাধীনতার ইশতেহার তৈরি হয়েছে। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু গেরিলা যুদ্ধের কৌশল ঘোষণা করেছেন। ২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এর আগে প্রায় ২৪ দিনের অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বাংলার মাটি থেকে পাকিস্তানের অস্তিত্ব মুছে ফেলেন। ড. বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর বলেছেন, ‘অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে শেখ মুজিব ৩৫টি নির্দেশ জারি করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র কায়েম করেছিলেন।’
বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণ ও অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে মানসিকভাবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। সেটাই কাজে লেগেছিল। ২৬ মার্চ চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ১৯ মার্চ জয়দেবপুরে জেনারেল শফিউল্লাহর নেতৃত্বে বাঙালিরা সশস্ত্র খান সেনাদের মোকাবেলা করে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে। সেখানে বাঙালির রক্ত ঝরে, বাঙালিরা জীবন উৎসর্গ করে। আর চট্টগ্রামে ‘সোয়াত’ জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসের বিরুদ্ধে যে লড়াই করেছে বাঙালিরা তার বীরত্বপূর্ণ ঘটনা লিখে রেখেছেন সত্যেন সেন তার ‘প্রতিরোধ সংগ্রামে বাংলাদেশ’ বইতে। বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন মেজর রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম। মেজর জিয়াউর রহমান তার উপরের র্যারঙ্কের অফিসার হওয়ার সুবাদে বারবার বাধা দিয়েছেন পাক সেনাদের বিরুদ্ধে আগাম আক্রমণ করতে। ওই হুকুম অমান্য করেই মেজর রফিক ২৫ মার্চ রাতে চট্টগ্রামে পাক সেনাদের ওপর আক্রমণ করেন এবং তাদের আটক করেন। তখন জিয়া যাচ্ছিলেন সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করতে তার বস পাক সেনা অফিসার জানজুয়ার নির্দেশে।
বাংলাদেশের ১ কোটি শরণার্থী ভারতের মাটিতে আশ্রয় নিয়েছিল। মেজর জিয়া ও মওলানা ভাসানীও ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। দেশ স্বাধীনের পর তারা দু’জনই ভারতবিরোধী রাজনীতি করেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর অবদান অসামান্য। বঙ্গবিবেক আবুল ফজল বলেছেন, ‘আমাদের স্বাধীনতার জন্য আমরা বাংলাদেশের বাইরে কারো কাছে যদি এককভাবে ঋণী হয়ে থাকি, তাহলে তিনি হচ্ছেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এ দুঃসাহসী ও দূরদর্শিনী মহিলার সার্বিক সহযোগিতা ও হস্তক্ষেপ না থাকলে আমাদের স্বাধীনতা শুধু যে বিলম্বিত হতো তা নয়, বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-দুর্গতিরও সীমা থাকত না। মাত্র ন’ মাসে যে আমরা স্বাধীন হতে পেরেছি তার প্রধান কারণ ভারতের হস্তক্ষেপ। সে হস্তক্ষেপ মানে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। এ যুগের বিশ্ব-ইতিহাসের এক অসামান্য নারী।’ (শেখ মুজিব : তাঁকে যেমন দেখেছি, আগামী-সংস্করণ, ১৯৯৭,পৃ. ১০)।
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ তার এক কলামে ইন্দিরা গান্ধীর অবদান নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ৬/১২/১৬ তারিখে দৈনিক সমকালে তার কলামটি প্রকাশ পেয়েছে। নাম ‘বাংলাদেশের স্বীকৃতি ও মার্কিন বিরোধিতা’। ১৯৭১ সালের ৪ নভেম্বর শ্রীমতি গান্ধী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে নিক্সন প্রশাসনের নোংরা আচরণের মুখোমুখি হয়েছিলেন। ড. অধ্যাপক আবু সাইয়িদ উল্লেখ করেছেন, ‘ওই দিন তিনি নৈশভোজে বলেন, সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে তিনি ৩৬ হাজার মাইল ভ্রমণ করেছেন। ৩৭৫টি মিটিং করেছেন এবং বিভিন্ন দেশে সাড়ে তিন লাখ সম্মানিত নাগরিকের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। তিনি এখানে এসেছেন শান্তির প্রত্যাশায়।’ এরপর ড. সাইয়িদ বলেছেন, নিক্সন শ্রীমতি গান্ধীকে ‘ডাইনি’ বলে গালি দিয়েছেন। তার মেধা, বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্যশীলতা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে কাজে লেগেছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও শ্রীমতি গান্ধী তার শুভ বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে নির্দিষ্ট সময়ের আগে বাংলাদেশ থেকে তার সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এমন একজন মহীয়সী নারীকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর জঘন্য ভাষায় অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। তিনি এখনো বাংলাদেশে যথার্থ স্বীকৃতি পেয়ে ওঠেননি। অনেক বিবেক খরচ করে তিনি ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশেকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তিনি ওই উত্তেজিত মুহ‚র্তেও পা গুনে গুনে চলেছেন। সংযত ভাষায় কথা বলেছেন, মার্জিত আচরণ করেছেন। এটা তার অত্যাশ্চর্য কৌশল যে তিনি ভারতকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আগাম আক্রমণের উস্কানি দেননি। পাকিস্তানই আগে ভারত আক্রমণ করেছিল। পাকিস্তানি শাসকদের আস্ফালনের জবাবে ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘আমাদের দুঃখ এই যে, পাকিস্তান চূড়ান্ত মূঢ়তা প্রকাশ না করে ছাড়ল না, এবং দুঃখ এই যে, উপমহাদেশে যখন সবচেয়ে বেশি দরকার উন্নয়নের, তখন ভারত এবং পাকিস্তানের জনগণকে যুদ্ধের ভেতর ঠেলে দেয়া হলো। আমরা প্রতিবেশীর মতো বসবাস করতে পারতাম কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের কখনো এ কথা বলারও সুযোগ হয়নি।’
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৬ সকাল ১১:২৪
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

যাদের স্বপ্নের দেশ আমেরিকা: তাদের জন্যে আজকের পোস্ট

লিখেছেন অপলক , ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:১৮



এমন এক সময় ছিল, ছেলে বা মেয়ে ডিভি লটারীতে স্বপ্নের দেশে গেছে, বাপ মায়ের পাড়া প্রতিবেশী গর্বে কথা বলাই মুশকিল। সেখানে গিয়ে OC(Office Cleaner) নাকি DC(Dish Cleaner) হবে তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

”আমার রাজনীতির রূপরেখা” -- জিয়াউর রহমান

লিখেছেন প্রামানিক, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
আমি তখন দৈনিক দেশ পত্রিকায় চাকরি করি। এটা আমার দ্বিতীয় চাকরি। প্রথম চাকরি নিয়েছিলাম ব্রিটিশ আমলের প্রকাশিত দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। আজাদ পত্রিকাটি ব্রিটিশ আমলে মুসলমানের পক্ষের একমাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

শহীদ জিয়া ২৭ মার্চের ভাষণে 'জয় বাংলা' বলেছিলেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১১





সূত্রঃ আমার রাজনীতির রূপরেখা
লেখকঃ জিয়াউর রহমান
পৃষ্ঠাঃ ১৭৭

...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

মেধা নয়, রাজনৈতিক পরিচয়ই কি আমাদের রাষ্ট্রে যোগ্যতার মাপকাঠি?

লিখেছেন raselabe, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৬:২৯

বিসিএসসহ বিভিন্ন সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিচয় বা ভেরিফিকেশনের কারণে প্রার্থীদের বাদ পড়ার অভিযোগ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে নতুন কোনো ঘটনা নয়। রাজনৈতিক দলগুলো ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে নিজেদের ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রম চালু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×