somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুক্তিযুদ্ধের দার্শনিক ভিত্তি ও আজকের প্রত্যাশা

২০ শে ডিসেম্বর, ২০১৬ সকাল ১১:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বিজয়ের ৪৫ বছরে আমাদের প্রাপ্তি কোনো অংশে কম নয়। তবে প্রত্যাশা আমাদের অনেক। প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তি কিছুটা হলেও কম। এই দীর্ঘ পথ চলায় নানা চড়াই-উতরাই আমাদের পেরোতে হয়েছে। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বাংলাদেশের অর্জন আরো বেগবান করতে আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নজর দিতে হবে। প্রায় সাড়ে চার দশকে রাজনৈতিকভাবে আমাদের আরো ভালো করা উচিত ছিল। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তেমন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হয়নি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচকগুলো খুবই সক্রিয়। শুধু আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় থাকলে দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ বেগবান হবে। কিন্তু আমাদের এই দেশ সত্যিকার অর্থে অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা নিয়ে স্বাধীন হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলা গড়ার। কিন্তু এই সোনার বাংলা ডলারের হিসাবে চিন্তা করেননি বঙ্গবন্ধু। তাঁর স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলা এমন হবে, যেখানে মানুষের কোনো অভাব থাকবে না। একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হবে। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও মুসলমানসহ সব ধর্মের মানুষ পারস্পরিক সহ-অবস্থান থাকবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় থাকবে। ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান থাকবে না। আমাদের কৃষ্টি-কালচারগত বৈচিত্র্য আমরা রক্ষা করব। এসব বিবেচনায় আমাদের এখনো অনেক কাজ করা বাকি আছে। সাম্প্রতিককালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর ও গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের ওপর হামলার ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কাজ। আমাদের মাথাপিছু আয় পাঁচ হাজার ডলার হতে সময় লাগুক, কিন্তু আমরা সবাই মিলে এগিয়ে যাব। আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়ে যাচ্ছে, কিন্তু ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমছে না। কিন্তু বলা হচ্ছে, একসময় তা সহনীয় পর্যায়ে আসবে। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য এর মধ্যেই নানা সমস্যার সৃষ্টি করছে। আমরা এখন চরম বৈষম্যের একটি দেশের দিকে চলে যাওয়ার আশঙ্কার পর্যায়ে আছি। এসব বিষয়ে আমাদের অতিদ্রুত নজর দিতে হবে। আয়ের বৈষম্য দূর করা জরুরি। আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যে মেলবন্ধন রয়েছে, তা সুদৃঢ় করেই সোনার বাংলা গড়তে হবে। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি কাজের দর্শন ছিল। তিনি দার্শনিক পথে অগ্রসর হতেন।
বর্তমানে আমাদের এখানে বড় সমস্যা হচ্ছে জঙ্গিবাদ। যদিও জঙ্গিবাদ আমরা নানাভাবে মোকাবিলা করছি। এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জঙ্গিবাদ রুখতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে জঙ্গিবাদ এভাবে শেষ হবে না। এটা হয় তো সাময়িক সময়ের জন্য। কিন্তু জঙ্গিবাদ দমনে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পথে অগ্রসর হতে হবে। একই সঙ্গে আদর্শিক লড়াইও চালাতে হবে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরে এসে রেসকোর্স ময়দানে প্রথম বক্তব্য রাখেন তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বাঙালি, আমি মুসলমান, আমি মানুষ।’ তাঁর এই বক্তব্য আমরা যদি একটি দার্শনিক মতবাদ হিসেবে গ্রহণ করি, তাহলে ধর্মীয় উন্মাদনা অনেকাংশেই কমে যাবে। আমরা মুসলমান, কিন্তু ১২০৫ সাল পর্যন্ত আমরা মুসলমান ছিলাম না। এই অঞ্চলে মুসলমানদের আগমন শুরু হয় ১২০৫ সালের পর। আফগানিস্তান, তুর্কিসহ মধ্যপ্রাচ্য থেকে এখানে লোকজন এসেছে। ১২০৫ থেকে ১৬৭৫ সাল পর্যন্ত মানুষ মুসলমান হয়। এখানে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে বড় বড় আলেম-ওলামা আসেননি। এসেছিলেন সুফি সাধক শাহ জালাল, খানজাহান আলী, বায়েজিদ বোস্তামী। তাঁরা পীর, ফকির, উদার মনমানসিকতার মানুষ ছিলেন। তাঁরা ইসলামের একেবারেই কট্টর কথাবার্তা বলেননি। কাপড় কোথায় পরতে হবে, কার সঙ্গে কী সম্পর্ক হবে—এসব কথাবার্তা তাঁরা বলেননি। তাঁরা বলেছেন, ‘তোমরা যেভাবে আছ, সেভাবেই থাকো। আল্লাহ এক, নামাজ-রোজা করো, বিচার করো, চুরি কোরো না।’ এমনি কিছু কথা।
‘মানুষ, বাঙালি, মুসলমান’—এই তিনটি শব্দ দিয়েই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানীকৃত সালাফি মতবাদ মোকাবিলা করা সম্ভব। কেবল র্যাাব, সোয়াত, কোবরা দিয়ে এসব দমন করা যাবে না। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সাম্যবাদ কায়েম করার নামে আমাদের এখানে লোকজনকে হত্যা করা হয়েছে। চরম অবৈজ্ঞানিক লোকদের দ্বারা হাজার হাজার তরুণের জীবন শেষ হতে দেখেছি। শেষ পর্যন্ত কোনোটিই টেকেনি। এখনো ভারতের ঝাড়খণ্ডে নকশাল কিংবা মাওবাদী বাহিনী একই কাজ করে যাচ্ছে। নকশাল ও মাওবাদীদের সঙ্গে আইএস জঙ্গিদের পার্থক্য কোথায়? নকশাল ও মাওবাদীরা বলে ধর্ম বলতে কিছু নেই। আর আইএস জঙ্গি বলে ধর্মই সব। কাজেই মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা সব সময়ই ব্যর্থ হয়েছে এবং এখনো হবে। কাজেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্পরতার পাশাপাশি আমাদের মনমানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। আমরা বাঙালি, আমরা মানুষ—এই দর্শনে বিশ্বাসী হতে হবে। আমরা যদি বাঙালি চালচলন, আচার-বিশ্বাস ধারণ করি, তাহলে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব আমাদের মধ্যে আসতে পারবে না। আমাদের এই অঞ্চলে শিয়া ও সুন্নির বিভেদ কোনো দিনই ছিল না। আমরা কোনো দিন এই বিভেদ চিন্তা করিনি। কাজেই আমরা আবার যদি বাঙালির কৃষ্টি-কালচারে ফিরে যাই, তাহলে আমরা সোনার বাংলা গড়তে পারব। আমাদের টেকসই উন্নয়ন হবে তখনই, যখন ডলারের হিসাবের সঙ্গে মনমানসিকতার উন্নয়ন হবে। গুণগত শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরিমূলক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া দরকার। আয় যেভাবে বাড়ছে, তাতে সুষম আয়ের দিকে গুরুত্বারোপ করা জরুরি। মানুষ যখন বঞ্চনার শিকার তখন বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি হবেই। কাজেই আজকে আমাদের সেই দর্শনে পৌঁছতে হবে, যাতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের দ্বন্দ্ব, সংঘাত, হানাহানিসহ ধর্মীয় সন্ত্রাস মোকাবিলা করতে পারি। যাতে আমরা সবাই একসঙ্গে থাকতে পারি।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে ডিসেম্বর, ২০১৬ সকাল ১১:১৮
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×