somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের গুরুত্ব

০৪ ঠা এপ্রিল, ২০১৭ সকাল ১০:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশের কিছু মানুষ ও সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ থেকে মনে হয়, ভারতের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি ছাড়া আমাদের আর কিছুই এ মুহূর্তে চাওয়ার নেই। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি এবারও স্বাক্ষর না হওয়ার সম্ভাবনায় অনেকেই তাই প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরকে একধরনের ব্যর্থ সফর বলে আগাম ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন। যাঁরা এমন ধরনের প্রচার কিংবা অপপ্রচার করে বেড়াচ্ছেন তাঁদের জন্য করুণা হয় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুই দেশের আরো অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন দুই দেশের মধ্যে সর্বাগ্রে আস্থার সম্পর্কটুকু মজবুত করা। এই সফরকে আমি তাই দেখছি এ লক্ষ্যে একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে।
ভারতের সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনা হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময় ১৯৭২ সালে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির মধ্য দিয়ে। সে সময় দুই দেশের মধ্যে ২৫ বছরমেয়াদি মৈত্রী চুক্তির পথ ধরে ১৯৭৪ সালে দ্বিতীয় ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির অধীনে স্থলসীমান্ত বিনিময়সংক্রান্ত চুক্তি হলেও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কার্যত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একধরনের ইতি ঘটে। পরে জিয়াউর রহমান, এইচ এম এরশাদ ও খালেদা জিয়ার দেশ পরিচালনাকালীন আমরা গঙ্গার পানি ণ্টন, সীমান্ত সমস্যা, বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা, স্থলসীমান্তসংক্রান্ত সমস্যার সমাধানসহ কোনো বিষয়েই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটতে দেখিনি। উপরন্তু ভারত কর্তৃক একতরফাভাবে অভিন্ন নদীর পানি প্রত্যাহার, ভারতীয় পণ্যে বাংলাদেশের বাজার সয়লাব হয়ে যাওয়াসহ বাংলাদেশের পার্বত্য সমস্যার নেপথ্যে তাদের ইন্ধনের আলামত স্পষ্ট ছিল। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করার পরও ১৯৭২ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও খোদ খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে ভারত গঙ্গার পানির ন্যায্য হিসসা দিচ্ছে না বলে অভিযোগ করা হয় এবং সেই সময় একপর্যায়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তাঁর বক্তব্যেও এ কথা উচ্চারণ করেন তিনি। এর ফলে এই সমস্যার কোনো সমাধান তো দূরে থাক, এ লক্ষ্যে কোনো ধরনের সফল কূটনৈতিক প্রচেষ্টা গ্রহণ করতেও সক্ষম হয়নি সে সময়ের সরকার। অবাক করার বিষয় হচ্ছে, ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ সে সময় তাদের দেওয়া ঘোষণা অনুযায়ী সরকার গঠনের মাত্র ছয় মাসের মাথায় ভারতের সঙ্গে ৩০ বছরমেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি করে, যা ২০২৬ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
২০০১ সালে আওয়ামী লীগের শাসনকাল অবসানের পর ভারতের সঙ্গে আমাদের অনিষ্পন্ন বিষয়গুলোর নিষ্পত্তিতে কোনো ধরনের কর্মপ্রচেষ্টা গৃহীত হয়নি। বর্তমান সরকার আবার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু ঐতিহাসিক সমস্যার জট খুলতে শুরু করে। ২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফরে এলে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি শেষ মুহূর্তে স্বাক্ষরিত না হলেও এ নিয়ে আমাদের দাবি জোরালো হতে থাকে। শেষতক নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর দীর্ঘ ৬৮ বছরের ছিটমহল সমস্যার সমাধান নিঃসন্দেহে এযাবৎকালের মধ্যে দুই দেশের সম্পর্ককে সবচেয়ে বড় উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি অপরাপর সমস্যা সমাধানের একটি ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা করে। নরেন্দ্র মোদির সফরের পর দুই বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও তাদের তরফ থেকে বারবার বাংলাদেশকে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির ব্যাপারে আশ্বস্ত করা হয়। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরেও বে অব বেঙ্গল ইনিসিয়েটিভ ফর মাল্টি সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (বিমসটেক), বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া, মিয়ানমার ইকোনমিক কো-অপারেশন (বিসিআইএম-ইসি) ও বাংলাদেশ, ভুটান, ইন্ডিয়া, নেপাল (বিবিআইএন) ইত্যাদি আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে একধরনের পরস্পর নির্ভরশীলতা আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য শর্ত হিসেবে কাজ করছে। বিদ্যমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় অনেক ক্ষুদ্র শক্তির রাষ্ট্র হলেও ভূ-কৌশলগত অবস্থান বিবেচনায় বিশেষ সমীহের দাবি রাখে। সর্বোপরি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্কের বর্তমান অচলাবস্থায় এ অঞ্চলের ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আমাদের একটি বিষয় বুঝতে হবে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও শুধু এই চুক্তির মধ্য দিয়েই রাতারাতি আমাদের সব কিছু অর্জিত হয়ে যাওয়ার নয়। বরং আঞ্চলিক শক্তি ভারতকে আস্থায় নিয়ে চলতে পারলে সময়ের ধারাবাহিকতায় এই চুক্তি বাস্তবায়ন যেমন সম্ভব, তেমনি বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দুই দেশের একত্র পথচলার মধ্য দিয়ে আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করাও সম্ভব।
সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরে ভারতের প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করা নিয়ে। বিষয়টি নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি কিছু রাজনীতি বিশ্লেষক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করলেও বাস্তবতা হচ্ছে, ভারতের সঙ্গে কোনো ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তি কোনোভাবেই আমাদের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার সম্প্রতি চীন থেকে দুটি সাবমেরিন ক্রয় করার মধ্য দিয়ে আমাদের সার্বভৌমত্বের বিষয়ে এর মধ্যেই আপসহীন নীতির প্রকাশ ঘটিয়েছে। এর আগে রাশিয়া সরকারের সঙ্গে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ক্রয় চুক্তি করেছে, সেটাও আমাদের জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে। সুতরাং ভারতের সঙ্গে যদি এ ধরনের কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তবে আমাদের সার্বভৌমত্ব এর ফলে বাধাগ্রস্ত হবে—এটি অত্যন্ত হাস্যকর যুক্তি। তার চেয়ে বরং আমাদের এমনটা ভাবা উচিত, এই অঞ্চলের দুই শক্তিধর দেশ ভারত ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি রক্ষার মাধ্যমে সরকার কার্যত তার সক্ষমতারই পরিচয় দিচ্ছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০১৭ সকাল ১০:৪১
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"বহু দিন পর বন্ধু"

লিখেছেন সনজিত, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৮


বহু বছর পর হঠাৎ তোর সঙ্গে দেখা।
প্রথমে চিনতেই পারিনি।
তারপর একচিলতে হাসি-
মনে হলো,
সময় আমাদের চেহারা বদলেছে,
কিন্তু শৈশবের মুখটা এখনো একই রয়ে গেছে।

চোখের কোণে ক্লান্তির রেখা,
চুল অর্ধেকটা সাদা রং,
কাঁধে সংসার,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাংসের ভুলচুক

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:০৬


বারে কুত্তার চোখ রঙিন
স্বপ্ন দেখে তাই ঘিন ঘিন
তাই দেখে হাড্ডি হাসে
পিন পিন, নাকের পুহান ঘুম
রক্ত হবে সুরেশ এই চুম;
ঐ গুরুজনে কইছে কথা
কুত্তার পেটে ঘি করে ব্যথা
স্বপ্ন তো দেখবেই ভুক... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিচারিতার এক অদ্ভুত মহাকাব্য

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:২৩



দ্বিচারিতার এক অদ্ভুত মহাকাব্য

যতদিন যাচ্ছে, ততই মনে হচ্ছ -এই দেশের তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশকে নিয়ে আশাবাদী হওয়াটা রীতিমতো বিলাসিতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সেদিন দেখলাম, এক ছাত্রশিবির নেতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

×