somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রতিবন্ধীদের জন্য বড় সুযোগ

২৮ শে মে, ২০১৭ সকাল ১১:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সম্প্রতি একটি দৈনিকে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার ধামনপাড়া গ্রামের প্রতিবন্ধী প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নানা সমস্যায় জর্জরিত। স্কুলটি এখন পর্যন্ত সরকারি স্বীকৃতি না পেলেও উপজেলার একমাত্র প্রতিবন্ধী স্কুল হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে অভিভাবকরা তাদের প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা অর্জনের জন্য প্রতিদিনই এই স্কুলে নিয়ে আসছেন। এসব শিশুকে আনা-নেওয়ার জন্য নেই কোনো প্রতিবন্ধীবান্ধব যানবাহন। শিক্ষকরাও স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এখানে নিয়মিত পাঠদান করে যাচ্ছেন।
প্রয়োজনের তুলনায় বেঞ্চ না থাকায় প্রতিবন্ধী শিশুদের মেঝেতে বসে পড়তে হচ্ছে। স্কুলটিতে বিদ্যুত্ না থাকায় গরমে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। এই স্কুলে পড়া প্রতিবন্ধী শিহাব, সাদিয়া, তামিম ও রাফিয়ার বয়স ৭ থেকে ১১ বছর। এদের কেউ শারীরিক আবার কেউবা বাক-প্রতিবন্ধী। স্কুলে এলে তারা তাদের প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি ভুলে যায়। পড়ালেখা করে আনন্দ নিয়ে। তবে কষ্ট পায় স্কুলে যাতায়াতের রাস্তাটি কাঁচা এবং স্কুলে বিদ্যুত্, নলকূপ ও বাথরুম না থাকার কারণে। এদের অনেকে ৫ থেকে ৭ কিলোমিটার দূর থেকে আসে। অথচ সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের একটু নজরদারিতে এই শিশুগুলো যথেষ্ট ভালোভাবে লেখাপড়া করতে পারে।
ধামনপাড়া গ্রামের প্রতিবন্ধী মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থী সাত বছরের তামিমের মা ফরিদা পারভিন জানান, তিনি প্রায় ৭ কিলোমিটার দূর নলডাঙ্গা উপজেলা সদর থেকে আসেন। স্কুলের কোনো বাহন না থাকায় নিজেরাই ভ্যান-রিকশা ভাড়া করে স্কুলে আসেন। কষ্ট হলেও স্কুলে ভর্তি করার পর তামিমের লেখাপড়ার আগ্রহ বেড়েছে। একদিন স্কুলে আনতে না পারলে সে বাড়িতে বিরক্ত করে। ১১ বছরের শিহাবকে তার মা শরিফা বেগম প্রতিদিন তিন কিলোমিটার দূরে বারোঘরিয়া গ্রাম থেকে নিয়ে আসেন। তিনি জানান, তার বিশ্বাস তার ছেলে প্রতিবন্ধী হলেও লেখাপড়া শিখে একদিন বড় হবে আর নিজেই উপার্জন করবে। শিহাব, সাদিয়া, তামিম ও রাফিয়া জানায়, শিক্ষা অর্জন করে তারা দেশের হয়ে ভালো কাজ করতে চায়, সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে চায়। সুযোগ-সুবিধাসহ সহায়তার হাত বাড়ানোর দাবি এসব প্রতিবন্ধী শিশু ও তাদের অভিভাবকদের।
যতদূর জানা যায়, ২০১৪ সালে এলাকাবাসীর সহায়তায় নলডাঙ্গা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে ধামনপাড়া এলাকায় প্রতিবন্ধী প্রাথমিক বিদ্যালয়টি স্থাপন করা হয়। প্রথমদিকে ভাড়া বাসায় স্কুলের কার্যক্রম শুরু করা হলেও বর্তমানে নিজস্ব জমির ওপর টিনের চালাঘরে চালানো হচ্ছে স্কুলের কার্যক্রম। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সালমা খাতুন জানান, বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৭৪ জন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী থাকলেও নিয়মিত স্কুলে আসে ৪০ থেকে ৪৫ জন। ১২ জন শিক্ষক ও তিনজন কর্মচারী এই প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত রয়েছেন। তিনিসহ অন্য কোনো শিক্ষকই বেতন নেন না। শিক্ষকদের মধ্যে ১০ জনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ রয়েছে। এছাড়া নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়ে তারা পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে আশার কথা হলো, নলডাঙ্গা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ইদ্রিস আলী এ বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। তিনি জানিয়েছেন, সরকার প্রতিবন্ধীদের বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক বলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এসব শিশুর ঝরে পড়া রোধে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় প্রতিটি উপজেলায় একটি করে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সে বিষয়টি মাথায় রেখে স্কুলটির সংকট নিরসনের কথা ভাবা হচ্ছে। এক্ষেত্রে যত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে প্রতিবন্ধী শিশুগুলো ততই উপকৃত হবে। তাতে করে তাদের পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ আরো বাড়বে। সেইসঙ্গে প্রতিবন্ধীদের বিষয়ে সরকারের আন্তরিকতার চিত্রটিও আরও স্পষ্ট হবে।
প্রতিবন্ধীদের জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের উদ্যোগ ও পদক্ষেপ বরাবরই সাধুবাদ পেয়েছে। বাংলাদেশে একসময় প্রতিবন্ধীদের বোঝা মনে করা হলেও সময়ের পরিক্রমায় প্রতিবন্ধীরা এখন সমাজের মূলধারায় চলে আসতে শুরু করেছে। এজন্য বর্তমান সরকার ও অটিজম বিশেষজ্ঞ বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের অবদান অনস্বীকার্য। প্রতিবন্ধীদের জন্য আইন তৈরিসহ নানা উদ্যোগের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার যেভাবে এগিয়ে এসেছে তা এদেশে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। প্রতিবন্ধীদের সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে বিশেষায়িত স্কুলের পাশাপাশি সাধারণ স্কুলে লেখাপড়ার সুযোগ দানের ক্ষেত্রটি তৈরি হয়েছে বর্তমান সরকারের বিশেষ পরিকল্পনা ও উদ্যোগের ফলেই। বর্তমানে প্রতিবন্ধীরা যেমন রাষ্ট্রীয়ভাবে মর্যাদা পাচ্ছে তেমনি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসছে। সরকারের সদিচ্ছার কারণে আজ প্রতিবন্ধী সন্তানের লেখাপড়ার ক্ষেত্রেও বাবা-মা বা পরিবারের সদস্যদের ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ করা যায়।
তবে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা মাঝে-মধ্যে শোনা যায়। সেটা হয়তো উদ্যোগ গ্রহণে সংশ্লিষ্টদের ধীরগতি বা প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি যথাযথ স্থানে সময়মতো না পৌঁছানোর কারণে হতে পারে। অথচ এসব ক্ষেত্রে দ্রুততার সঙ্গে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হলে পিছিয়ে পড়া শিশুগুলো অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারবে। অটিজমে আক্রান্তদের নিয়ে বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, এদের মধ্যে সুপ্ত প্রতিভা আছে। সেটাই বিকশিত করে দেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে, যেন মেধা বিকাশের মাধ্যমে তারাও সমাজকে কিছু উপহার দিতে পারে। অটিজমে আক্রান্ত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন, চার্লস ডারউইন, আইজ্যাক নিউটনের নাম উল্লে¬খ করে তিনি বলেছিলেন, অটিস্টিক শিশুরা যেন অবহেলায় হারিয়ে না যায় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। তারাও মানুষ। তারাও আমাদের সমাজের অংশ, তাদের জন্যও আমাদের কাজ করতে হবে। একটা দেশকে উন্নত করতে হলে সবাইকে নিয়ে করতে হবে, কাউকে অবহেলা করে না।
প্রতিবন্ধীরা সমাজের মূলধারায় কাজ করছে এমন দৃষ্টান্ত অনেক রয়েছে। আমি যে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছি সেই প্রতিষ্ঠান থেকে একই পরিবারের দুই ভাই বিবিএ পাস করে দুজনই একটি বেসরকারি ব্যাংকে অফিসার পদে কর্মরত আছেন। প্রতিদিন তাদের মা দুই ছেলেকে সাথে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করতেন। একই প্রতিষ্ঠান থেকে আরও একজন প্রতিবন্ধী মেয়ে বিবিএ শেষ করে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে নিজেকে স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। তাই প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুরা আজ আর পিছিয়ে নেই। তাদেরকে মূলধারায় নিয়ে আসতে একটু সচেতনতাই যথেষ্ট। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে যার যার অবস্থান থেকে অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
সরকারের সদিচ্ছা ও আহ্বানকে বাস্তবায়ন করতে হলে সমাজের সকল স্তরের মানুষের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন জেলা ও গ্রাম পর্যায়ে বিশেষ শিশুদের জন্য বিশেষায়িত বিদ্যালয় স্থাপনসহ যে বিদ্যালয়গুলো ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেসব বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আরও দায়িত্ব নিয়ে এদের লেখাপড়ার সুযোগ বাড়ানোসহ শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি অভিভাবক ও সমাজের সচেতনতা প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে তাদের মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে সমাজের মূল স্রোতে সম্পৃক্ত করতে পারলে বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা আরো বেগবান হবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মে, ২০১৭ সকাল ১১:১৩
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×