somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মানসিক রোগ মানেই পাগল নয়। লেখাটি পড়ে অনেক ভাল লাগল আপনারাও পড়তে পারেন।

২৬ শে এপ্রিল, ২০১৭ সকাল ১১:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মহিলা ৯১১ কল রেখে নিজের স্বামীকে ফোন দিলেন। স্ত্রীর ফোন রিসিভ করে শোনেন তিনি বলছেন, "তোমাকে এখুনি বাড়ি ফিরে আসতে হবে। এখুনি।" ভদ্রলোক কোন কথা বাড়ালেন না। বুঝলেন কোন একটা সমস্যা হয়েছে। তিনি বাড়ির দিকে রওনা হলেন।
বাড়ি এসে দেখেন তাঁর পুরো বাড়ি পুলিশ, মেডিক্যাল ডাক্তার এবং সরকারী লোকজনে গিজগিজ করছে। পুলিশ জানালো তাঁর স্ত্রী তাঁর পাঁচ সন্তানকে মেরে ফেলেছে!!
ভদ্রলোক শোকের ধাক্কা সামলাতে সামলাতেই দেখেন তাঁর স্ত্রীকে হাতকড়া পরিয়ে পুলিশ বাড়ি থেকে বের করে এনে গাড়িতে উঠাচ্ছে। মহিলার চেহারায় কোন অভিব্যক্তি নেই। তিনি হাউমাউ কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।
পুরো অ্যামেরিকা ফুঁসে উঠলো। তাঁরা সবাই পাঁচ সন্তান হত্যাকারী মায়ের সর্বোচ্চ শাস্তি চায়। পুলিশ অফিসার সাক্ষ্য দিতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন।
"প্রথমে আমার মনে হয়েছিল মেঝেতে পুতুল পড়ে আছে। গায়ে হাত দিয়ে দেখি এটা মানব শিশু! নিথর! নিষ্পলক আমার দিকেই যেন তাকিয়ে আছে। তারপর আসামী আমাকে দেখালো আরও চারজন বিছানায় শুয়ে আছে। একটা তিনবছরের ছেলের কোলে ছয়মাস বয়সী একটি বাচ্চা মেয়েকে দেখলাম। সবাই মৃত। আমার ক্যারিয়ারে এত কঠিন সময় আমাকে কখনই দেখতে হয়নি।"
অদ্ভূত শোনালেও সত্য, মহিলার পাশে এসে দাঁড়ালেন তাঁর স্বামী। তিনি বারবার মিডিয়াকে এবং আদালতকে বলতে থাকলেন,
"আমার স্ত্রী মানসিকভাবে অসুস্থ। সে তাঁর সন্তানদের অত্যন্ত ভালবাসতো। তাঁর মতন মা হয় না। সে একজন চমৎকার স্ত্রী। সে সুস্থ মাথায় এই হত্যাকান্ড কিছুতেই করতে পারেনা।"
মিডিয়া তার স্বভাবমতন রসিয়ে রসিয়ে ঘটনাটাকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করলো এমনভাবে যে আসলে ভদ্রলোক নিজেই খুনি। নাহলে পাঁচ সন্তান হারাবার পর একজন বাবা কিভাবে মিডিয়ার সামনে হাসিমুখে কথা বলতে পারেন? কেন তিনি নিজের খুনি স্ত্রীকে বাঁচাবার চেষ্টা করছেন? কেন? কেন?? কেন???
সত্য ঘটনা হচ্ছে আন্দ্রিয়া ইয়েটস আসলেই একজন মানসিক রোগী ছিলেন। সাইকোলজিতে একে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বলে। শিশু জন্মের পরে প্রায় সব মায়েরই এমনটা হয়ে থাকে। অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ঘটনা। শরীরে ম্যাসিভ হরমোনাল চেঞ্জের জন্য এমনটা ঘটে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ লোকই যা জানেনা।
এই সময়ে মায়েরা স্বামীদের খুন করে ফেলতে চায়, অথবা আত্মহত্যা করতে চায়। অথবা এমন কিছু করতে চায় যা সুস্থ মাথার মানুষ কল্পনাও করতে পারেনা। বিদেশে এই রোগের ভাল চিকিৎসা আছে। এরা সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যায়, কাউন্সেলিং করে, ওষুধ খায় - সুস্থ্যও হয়ে যায়।
আমাদের দেশে প্রথমেই মেয়েকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। শ্বাশুড়ি ননদরা মুখ বাঁকিয়ে বলবেন, "আমরা আর মা হই নাই। সবই ঢং আর ফুটানি!" মেয়ের মা ও বোন বলবেন, "মানিয়ে নে মা.....মানিয়ে নে।" স্বামিতো কিছুই শুনতে চাইবে না, বুঝাতো বহুদূর। "দ্যাখো, নানান টেনশনে এমনিতেই আমার মাথা গরম থাকে। তোমার এইসব ফালতু ঢং শুনতে ইচ্ছা করছে না।"
গৃহিনী আন্দ্রিয়া ইয়েটসের তৃতীয় সন্তান জন্মের পর থেকেই তাঁর মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে থাকে। তিনি পাগলের মতই সন্তানদের ভালবাসতেন। কিন্তু একই সাথে তাঁর পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন তাঁকে খেয়ে ফেলছিল। নিজের সন্তানদের যাতে ক্ষতি না করতে পারেন, সেজন্য তিনি আত্মহত্যা করতে চাইলেন দুইবার - দুইবারই তিনি ব্যর্থ হলেন। ডাক্তার তাঁকে এন্টি ডিপ্রেশন ওষুধ দিলেন। তিনি কিছুদিন খেলেন। তারপর সুস্থ হয়ে গেছেন ভাবে খাওয়া বন্ধ করে
দিলেন। স্বামী ভাবলেন আরেকটা সন্তান আসলে
হয়তো স্ত্রী সুস্থ হয়ে উঠবেন।
উল্টোটা ঘটলো। চার সন্তাদের পর অবস্থা আরও বাজে হলো। এরমধ্যে ডিপ্রেশনের ওষুধ
মাঝ পথে বন্ধ করে আবার শুরু করায় ব্রেনও এলোমেলো হয়ে গেল। পঞ্চম সন্তানের জন্ম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুললো।
ডাক্তারের কাউন্সেলিং, হাই ডোজের ওষুধ বা পরিবারের সাহচার্জ্য, কিছুই কাজে এলো না। তিনি একে একে পাঁচটা বাচ্চাকেই বাথটাবের পানিতে চুবিয়ে মারলেন।
ছোট চার বাচ্চা কিছুই বুঝেনি, তারা চুপচাপ মরে গেছে। বড় ছেলেটা ভেবেছিল মা হয়তো তাঁকে কোন দুষ্টামির জন্য শাস্তি দিচ্ছেন। বাথটাবের পানিতে চুবানি খেতে খেতে সে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, "I'll be good. I'll be good."
বাঙালি বাচ্চা হলে যে বলতো, "আমি আর
করবো না মা, আর করবো না।" মাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় কাজগুলো তুমি কেন করলে? তিনি বলেন, "আমার এক ছেলে বড় হয়ে সিরিয়াল কিলার হতো, আরেকটা ড্রাগ অ্যাডিক্ট। আর মেয়ে হতো বেশ্যা।"
"তোমাকে এই কথা কে বলেছে?"
"শয়তান।"
"শয়তান তোমাকে নিজে বলেছে?"
"হু।"
রাস্টি ইয়েটস ট্রায়ালের শেষ দিন পর্যন্ত স্ত্রীর পক্ষে ছিলেন। অ্যামেরিকান আদালত আন্দ্রিয়াকে সন্তান হত্যার দায় থেকে মুক্ত ঘোষণা করলো। তবে তাঁকে মানসিক রোগের চিকিৎসার নির্দেশ দিল। মহিলা এখনও মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হয়তো আজীবন তাই
থাকবেন।
রাস্টির সাথে তাঁর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। রাস্টি আবার বিয়ে করে এখন নতুনভাবে জীবন শুরু করেছে। তাঁর নতুন সংসারে এখন একটি শিশু। তবে এখনও সে প্রায়ই আন্দ্রিয়ার খোঁজ নিতে
হাসপাতালে যায়।
হিউস্টনের একটি কবরস্থানে বিরাট একটা ফলকে লেখা আছে "ইয়েটস," এবং তার নিচেই নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে পাঁচ ভাইবোন।
হিউস্টনের ঘটনাটা কী আমাদের দেশে ঘটেনা? প্রায়ই দেখা যাচ্ছে মায়ের হাতে সন্তান খুন। স্ত্রীর হাতে স্বামী খুন। প্রেমিকের সাথে পালিয়ে গেছে
নবজাতকের মা। কিংবা, মায়ের আত্মহত্যা। আমরা তখন কী করি? কথা ছাড়া মেয়ের দোষ দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলি।
এই এক ঘটনার পর পুরো অ্যামেরিকা নড়েচড়ে বসেছিল। পোস্টপার্টেম ডিপ্রেশনকে এরা হাইয়েস্ট প্রায়োরিটি দিয়ে চিকিৎসা করে। এরা শিক্ষিত জাতি। এরা বুঝে যে মানসিক রোগ মানেই পাগল নয়। সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো মানেই উন্মাদ নয়।
**পাগল হলেই কেবল কাউন্সেলিং করতে হয়না। বরং রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা করানোই বুদ্ধিমানের কাজ।

কালেক্টেড
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে এপ্রিল, ২০১৭ সকাল ১১:৫৫
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মার্কিন সেনা কর্মকর্তা কর্মকর্তার মেজর নিদাল্ল হাসানের মৃত্যুদণ্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



নিদাল হাসান (পুরো নাম: নিদাল মালিক হাসান) হলেন মার্কিন সামরিক বাহিনীর একজন সাবেক মেজর এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (Psychiatrist)।

২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে সংগঠিত এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার ফিরে আসার পদ্ধতি কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আপা কেন ভারতে বেড়াতে গেলেন সেটা সবাই জানে। আগামী ডিসেম্বরে আপা দেশে ফিরে আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সেটাও সবাই জানে। আপা কিভাবে দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

শরিয়াতন্ত্রের নিষ্ঠুরতা, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও নৈতিক দেউলিয়াপনা

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৪৭


পৃথিবীজুড়ে মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা বাড়ছে। এই বিদ্বেষ শুধু ইসরায়েল বা তার পৃষ্ঠপোষক ডানপন্থী দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কানাডার মতো তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী এবং ফিলিস্তিনের প্রতি জোরালো রাজনৈতিক সমর্থন থাকা আয়ারল্যান্ডের মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×