
(সুত্রঃ সম্পাদকীয়, দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ, ২৫ মে ২০১৮, শুক্রবার, চট্টগ্রাম।)
পবিত্র মাস মাহে রমজানের আজ সপ্তম রোজা। ইতোমধ্যে মুসলমান সম্প্রদায়ের অনেকেই আসন্ন ঈদ উদযাপন উলক্ষ্যে শুরু করেছেনে কেনাকাটা। আর কিছুদিন পরেই শুরু হবে সকল মহলে ঈদের ছুটির পরিকল্পনা। শহরাঞ্চলসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে নাড়ীর টানে মানুষ ছুটে যাবে মাতৃভুমি, মা-বাবা, সন্তান-সন্তুতি বা আত্মীয় স্বজনদের কাছে। সড়কপথ, রেলপথ ও নদীপথে শুরু হবে যাত্রীর হিড়িক। ফাঁকা হতে শুরু করবে যান্ত্রিক নগরীগুলো। ধারণা করা হচ্ছে প্রতিবারের তুলনায় এবার ঈদ উপলক্ষ্যে অন্যান্য পরিবহন মাধ্যমের চেয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে রেলপথের উপর চাপ পড়বে অসহনীয় রকমের। অন্তত বিগত কয়েকমাসের অভিজ্ঞতা ত-ই বলে।
সড়ক পথে গত কয়েক মাস ধরে ঢাক-চট্টগ্রাম রুটে যাত্রীদের পেতে হয়েছে দূর্বিষহ ভোগান্তি। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে সড়কপথে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লেগেছে গড়ে ১৫ থেকে ২০ ঘন্টা যেখানে সাধরণ যাত্রা পথ হচ্ছে ৫ থেকে ৬ ঘন্টার। এর প্রধান কারণ যানজট। জানা গেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কপথে ফেনীর ফতেহপুর রেল ক্রসিং, কুমিল্লার দাউদকান্দি, মেঘনা ব্রীজ এবং কাঁচপুরব্রীজ সংলগ্ন এলাকায় চলমান সংস্কার কাজের ফলে সৃষ্ট মাত্রাতিরিক্ত যানজটের কারণে যাত্রীদের পোহাতে হচ্ছে অসহনীয় দূর্ভোগ। যানজটে অসহনীয় হয়ে উঠেছে মানুষের জীবন। দেশের সর্বত্র শহর ও নগরের অভ্যন্তরে এবং আঞ্চলিক সড়ক পথে যানজটে অচল হয়ে পড়ছে দেশ। তথ্যমতে, সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে শুধু ঢাকায় যানজটে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে ৫০ লাখ কর্মঘন্টা। এর ফলে বছরে গড়ে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। গত এক বছর ধরে চট্টগ্রাম শহরের সান্ধ্যকালীন সৃষ্ট অভূতপূর্ব যানজটে গাড়ির গতিবেগ নেমে এসেছে আনুমানিক ১০ কিলোমিটারে।
নগরের বিভিন্ন এলাকা বিশেষ করে আগ্রাবাদস্থ এক্সেস রোড়, পোর্ট কানেক্টিং রোড়, হালিশহর রোড় এবং নাসিরাবাদ বালক উচ্চ বিদ্যালয় সামনে থেকে দুই নম্বর মোড় হয়ে মুরাদপুর রোড় চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে দীর্ঘদিন ধরে চলা নানাবিধ সংস্কার কাজে। কখনও সিডিএ, কখনোবা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন আবার কখনও চট্টগ্রাম ওয়াসা বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তাদের সংস্কার কাজ করে যাচ্ছে। ফলে সৃষ্ট খানা-খন্দে চরমে উঠেছে নাগরিক দূর্ভোগ এবং সামান্য বৃষ্টিতে নগরবাসির হয় নাকাল অবস্থা। তাছাড়া নগরীর সর্বত্র সৃষ্ট হওয়া সকাল-সন্ধ্যা অসহনীয় ট্রাফিক জ্যাম এখন তার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। হেঁটে চলারও কোন উপায় নেই। তেমন একটা ফুটপাত তো এখন এই নগরীতে নে-ই। কিছু কিছু এলাকায় রাস্তার পাশে নালার উপর সিটি কর্পোরেশনের ইট-বালু-সিমেন্টের স্ল্যাব বা ঢাকনা দিয়ে তৈরি করা ফুটপাত আবার হকার বা স্থানীয় এলাকাবাসীর বসানো দোকানপাটির জন্য হাঁটা চলার অনুপোযুক্ত। ঈদে বাড়ি ফিরা আপনজনকে এই নগরী কতোটুকু আনন্দ দিতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে বৈকি।
যাইহোক, উপরোল্লিখিত প্রারম্ভিক আলোচনার আলোকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে যাত্রীদের পছন্দের প্রধান বাহন হয়ে দাঁড়িয়েছে রেল। একারণে রেলেও রয়েছে যাত্রীদের প্রচন্ড চাপ। অতিরিক্ত যাত্রী বহনে এখনই আলাদা বগি সংযোজন করতে হচ্ছে রেল কতৃপক্ষকে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, গত ১২ মে ২০১৮ সকাল ৭ টায় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া সূর্বণ ট্রেনটিতে আলাদা দুটো শীতাতপ নিয়ন্ত্রীত বগি সংযোজন করতে হয়েছে যাত্রী চাপ সামাল দিতে। যা এখন নিত্য ঘটনা। ট্রেনটির মূল বগি সংখ্যা ১৭ টি। যার মধ্যে ৫৫ আসন বিশিষ্ট এসি বগি ৯ টি এবং ৬০ আসন বিশিষ্ট নন-এসি বগি ৮ টি। বলা বাহুল্য যে, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বর্তমানে বাংলাদেশে দুটি বিরতিহীণ রেল রয়েছে। এর একটি সূবর্ণ এক্সপ্রেস এবং অন্যটি সোনার বাংলা। বাংলাদেশের প্রথম বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেন সূবর্ণ এক্সপ্রেস চলাচল শুরু করে ১৯৯৮ সালের ১৪ এপ্রিল। সূবর্ণ এক্সপ্রেস সাপ্তাহিক ছুটি সোমবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৭ টায় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আবার বিকেল ৩ টায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। যাত্রী সেবায় এর গতি বাড়িয়ে যাত্রা ঘন্টা কমিয়ে ৬ ঘন্টা ৩০ মিনিটে আনা হয়েছে ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৬ সাল থেকে। সোনার বাংলা ২৬ জুন ২০১৮ সাল থেকে সাপ্তাহিক ছুটির দিন মঙ্গলবার ছাড়া প্রতিদিন বিকাল ৫ টায় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা এবং সকাল ৭ টায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছাড়ে।
প্রশ্ন হচ্ছে এই যাত্রা পথে যাত্রীরা কতোটুকু সন্তুষ্ট ও নিরাপদ। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রেলওয়ের এই দু’টি ট্রেনের টিকিট মূল্য তুলনামূলক অনেক বেশী। টিকিট প্রাপ্তি নিয়ে সব সময়ই যাত্রীদের হয়রানি হতে হয়। চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল হওয়াতে কাউন্টারে গেলে সবসময়ই টিকিট সংকটের কথা শুনা যায়। ব্ল্যাকারদের কাছ থেকে দিগুণ দামে কিনতে হয় টিকিট। শর্ত অনুযাযী অনলাইনে ১০ শতাংশ টিকিট পাওয়ার কথা। কিন্তু খুব দ্রুতই সে টিকিট গায়েব হয়ে যায়। সংঘবদ্ধ চক্র তা লুফে নিয়ে বেশী দামে বাজারে বিক্রি করে। ৭২৫ টাকার এসি টিকিট কিনতে হয় প্রায় ১১০০ টাকায়। রেল কর্মকর্তারাও এই চক্রে জড়িত। বর্তমানে ১৯ টি বছর যাত্রী সেবা সম্পন্ন করেছে চলেছে ট্রেনটি। এখন এর বগির অবস্থা অনেক লক্কর-জক্কর ধরনের। আসনগুলো পুরোনো, ময়লা ও সরু প্রকৃতির। রয়েছে বগির ভিতরকার পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে প্রশ্ন। ঠিক মতো এসি চলে না, চললেও তাপমাত্রা ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তীব্র এই গরমের দিনও যাত্রীদের অনিয়ন্ত্রীত ঠান্ডায় কাঁপুনি ধরে যায়। সিলিং ফ্যানগুলো কোন রকম চলে তো চলে না অবস্থা। কোন রকম দূর্ঘটনায় রেলের অভ্যন্তরে নেই কোন জরুরী নির্গমণ পথ। অগ্নি নির্বাপণে ফায়ার এক্সটিঙ্গুইসারের পরিমাণ অপর্যাপ্ত। আর যা আছে সেগুলোর বেশীর ভাগই মেয়াদ উত্তীর্ণ। ১৫ মে ২০১৮ তারিখ সূবর্ণ এক্সপ্রেসের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাত্রায় ‘গ’ বগির ভিতরের দুই দরজার পাশে রাখা ফায়ার এক্সটিঙ্গুইসারগুলোর মেয়াদ উত্তীর্ণ তারিখ ছিল ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮। তথ্যমতে, ২০১৩ সালের ৭ই মে স্টেশনে অপেক্ষারত যাত্রীশূন্য সূবর্ণ এক্সপ্রেসের ৫ টি বগিতে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। সৌভাগ্যক্রমে এতে হতাহতের কোন ঘটনা ঘটেনি। বগির ভিতর যাত্রীদের সুবিধার্থে যেসব খাবার বিক্রি করা হয় তা বাজারের বিক্রিত মূল্যের চেয়ে অধিক চড়া দামে বিক্রি করা হয় যার মান প্রশ্ন বিদ্ধ। সোনার বাংলা ট্রেনের চড়া দামের টিকিটের (এসি আসন ১০০০ টাকা, নন-এসি আসন ৬০০ টাকা) সাথে যুক্ত থাকে বাধ্যতামূলক নাস্তার দাম। যদিও এর ক্যাটারিং সুবিধা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ রেলওয়ের সাথে সরাসরি জড়িত হয়েছেন। তবুও প্রশ্ন থেকে যায় ৭৪৬ আসন বিশিষ্ট এই রেলটি দৈনিক সকাল-বিকাল ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে দুবার চলাচলে এতো হাজার হাজার লোকের জন্য প্রস্তুতকৃত এই খাবার কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত। রেলগুলোতে যাত্রীসেবায় কারও কোন অভিযোগ বা সুপারিশ করার সুবিধার্থে যোগাযোগ করার জন্য কোন নাম্বার প্রদর্শিত নেই এবং কোন অভিযোগ বক্সও নেই। একমাত্র সূবর্ণ এক্সপ্রেসের এসি বগিতে দু’দিকে দুটো টিভি থাকে। কিছু কিছু বগিতে যার আবার দু-একটা অচল। মনিটরগুলোতো যাত্রী বিনোদনের জন্য কয়েকটা নাটক ও বাণিজ্যিকরণের জন্য বিজ্ঞাপন সম্প্রচার করা হয় সারাক্ষণ এবং মাঝে মাঝে রেলের নিরাপত্তায় কিছু সতর্কীকরণ বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। কিন্তু অভিযোগ বা সুপারিশনামার জন্য কোন ব্যাক্তি, মাধ্যম বা প্রতিষ্ঠানের নাম বা ফোন নাম্বার প্রচারিত হয় না। প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশী বিভিন্ন বেসরকারি চ্যানেলের মাধ্যমে যাত্রী সুবিধার্থে খবর অথবা সিএনএন ও বিবিসি এর মতো চ্যানেল প্রচার করা যেতে পারে। সোনার বাংলা ট্রেনে কর্তৃপক্ষ এখনও কোন টিভি বা মনিটর স্থাপন করেননি। অধিক ভাড়ায় যাত্রীসেবায় তাই এখনও তা শুভঙ্করের ফাঁকির নামান্তর। জনসার্থে সকলের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে রেলের বগির মেঝের উচ্চতার সাথে স্টেশন প্লাটফর্মের উচ্চতা থাকে সমতলে। কিন্তু আমাদের দেশে স্টেশনগুলোর প্লাটফর্মের সাথে যেকোন রেলের বগিতে উঠার উচ্চতা অনেক বেশি। তাই যাত্রীসাধারণের প্লাটফর্ম থেকে রেলের সিঁড়ি বেয়ে বগিতে উঠা-নামাতে অনেক বেশি বেগ পেতে হয়; বিশেষ করে শিশু, মহিলা ও বৃদ্ধ যাত্রীদের। একটু অসাবধানতায় তড়িঘড়ি করে চলন্ত বা অপেক্ষারত রেলে উঠা-নামায় ঘটে যেত পারে যে কোন দূর্ঘটনা। হাত-পা হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হতে পারে যে কোন সময় এমনকি হতে পারে মুত্যুও।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ রেলওয়ে বাংলাদেশের সরকারি রেল পরিবহন সংস্থা। এর সদর দপ্তর ঢাকায় অবস্থিত। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে এই সংস্থা নব্য প্রতিষ্ঠিত রেল মন্ত্রণালয়ের অধীন নিজের কার্যক্রম পরিচালনা করে। বাংলাদেশ রেলওয়েকে মূলত দুইটি অংশে ভাগ করা হয়, একটি অংশ যমুনা নদীর পূর্ব পাশে এবং অপরটি পশ্চিম পাশে। বাংলাদেশে বর্তমানে দুই ধরণের রেলপথ চালু আছে: ব্রডগেজ এবং মিটারগেজ। বাংলাদেশ রেলওয়ে দেশের পরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। বাংলাদেশ রেলওয়ে ১৯৮৫ সালে আন্তঃনগর রেল সেবা চালু করে। বর্তমানে দেশে মোট ৭৯টি আন্তঃনগর ট্রেন চালু আছে। মোট যাত্রীর প্রায় ৩৮.৫ শতাংশই আন্তঃনগর ট্রেনের মাধ্যমে যাত্রা করে এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের মোট আয়ের প্রায় ৭৩.৩ শতাংশই আসে আন্তঃনগর রেল সেবা থেকে।
ঈদে বাড়ি ফিরা চট্টগ্রামবাসীর জন্য সুখবর হচ্ছে, আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হবে আগামী ২ জুন থেকে। ফিরতি টিকিট বিক্রি হবে ৯ জুন থেকে। সম্প্রতি ঈদের অগ্রিম টিকিটসংক্রান্ত এক জরুরি বৈঠকে রেলওয়ে কতৃপক্ষ কর্তৃক এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এবারও ২৫ শতাংশ টিকিট অনলাইনে, ৫ শতাংশ ভিআইপি কোটা ও ৫ শতাংশ রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বরাদ্ধ থাকছে। তাই আনন্দদায়ক হোক সবার যাত্রা, নিরাপদে হোক ঈদে বাড়ি ফিরা।
লেখকঃ কলামিষ্ট

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।
