somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

মৃদুল শ্রাবন
আমি সেই নাবিকঃ হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা

সিঙ্গাপুর ভ্রমণ ও বিড়ম্বনা

২৪ শে জুন, ২০১৪ সকাল ১১:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

//// জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো// এমন করে আকুল হয়ে আমায় তুমি ডাকো// তোমার কথায় হাসতে পারি//তোমার কথায় কাঁদতে পারি মরতে পারি ///

এত ভালো একটা গান তবু আমরা কেন বছরে দু একবার শুনি? তাহলে কি গানের কথাগুলো ফেইক? এই প্রশ্ন যদি আজ কোন বাঙালিকে করা হয় তবে সে যদি টেলিভিশনের টকসোতে উপস্থিত না থাকে তবে হান্ড্রেড পার্সেন্ট বলবে হ্যা ফেইক। বলবে ব্যঙালি হয়ে জন্ম নেয়াটা আমাদের ধন্য করেনি। একমাত্র স্বার্থপরতার ভরা রাজনীতির কারনে স্বাধীনতার তিতাল্লিশ বছরেও আমরা মাথা তুলে দাড়াতে পারিনা।

বাঙালি হয়ে জন্ম নেয়াটা পাপ সে পাপের ওপর আরো পাপ বাঙালি মেরিনার হওয়া। প্রতিটা পদে পদে আমাদেরকে দেখিয়ে দেয়া হয় তুমি বাঙালি, তুমি সন্দেহভাজন , তুমি ঘৃন্য।

সিঙ্গাপুর খুব ব্যস্ত একটা ট্রানজিট। যে কোন জাহাজে উঠলে ধরে নেয়া যায় একবার না একবার সিঙ্গাপুর টাচ করবেই। কিন্তু সিঙ্গাপুরের পোর্টে যাওয়ার ভাগ্য খুব কম জাহাজের হয়। আর যে জাহাজের হয় তাও বেশীর ভাগ কন্টেইনার জাহাজ। কয়েক ঘন্টা থাকে। কিন্তু আমাদের সিঙ্গাপুর পোর্টেই সাত আটদিন থাকার একটা সিডিউল দেয়া হল।

সময়টা যদি ২০০০ সালের দিকে হতো তবে কিছুই লাগতো না। শুধু মাত্র সীম্যান পাশ নিয়ে চলে যাওয়া যেত।কিন্তু এখন সময় বদলেছে। আমাদের বাঙালিদের জন্য সিঙ্গাপুরের পোর্টে কোন সোর্লিভ নেই। যদি বাইরে যাইতে চাও তো ভিসা করে যাও।

অনেক কাঠখড়ি পুড়িয়ে আমরা শুধুমাত্র সোর লিভের জন্য সিঙ্গাপুরের ভিসা এরেঞ্জ করলাম। এক মাস ধরে প্রসেসিং চলেছে। জাহাজ থেকে ২৫ জন ক্রুর সকল ডকুমেন্টস ভিসার কাগজপত্র জাহাজ থেকে পাঠানো বেশ ঝামেলার ব্যাপার্। তবু আমরা অত্যন্ত উৎসাহের সাথে কাজ গুলো করলাম। cz সিঙ্গাপুর বেডাতে হবে।

পোর্টে আসার পরের দিন আমারা ভিসা হাতে পাইলাম। চার্জ ধরা হইছে ইউএস পঞ্চাশ ডলার। যদিও ভিসা ফি সিং ত্রিশ ডলার। ওকে নেভার মাইন্ড। সীম্যানের টাকার ওপর সবার হক আছে। কিন্তু আফসুসের কথা ভিসা হইছে ডাবল জার্নি। মাত্র দুইবার বাইরে যাওন যাইবো। মেয়াদ আট সপ্তাহ। এর আগে আমরা এক বছরের মাল্টিপুল জার্নি ভিসা পাইতাম।

যাইহোক পরদিন সকালের ঘুম হারাম করে দশটায় উঠলাম। আজ কোন ডিউটি নেই। সারাদিন ঘুরে রাত দশটার দিকে জাহাজে ফিরুম। মজা রে মজা। কিন্তু কেবিন থেকে বাইর হইয়া ব্যাড নিউজ শুনলাম। সকালে এক গ্রুপ বাইরে যেতে গিয়ে ফেরত আসছে। গেটে আমাদের বাইরে যাবার জন্য ইমিগ্রেশনের কোন লেটার নেই। ক্যাপ্টেন এজেন্টের সাথে যোগাযোগ কইরা কইলো এক ঘন্টা পরে সব ক্লিয়ার হয়ে যাবে। আমি চীফ ইঞ্জিনিয়ার সহ আগের গ্রুপ আবার বের হলাম এক ঘন্টা পরে।

মনে হয় কারো বদ দোয়া লাগছে। গেটে আমাদের পাসপোর্ট নিয়ে বেশ কিছুক্ষন ঘাটাঘটি করে জানালো আমরা বাইরে যেতে পারুম না।কারণ আমাদের জন্য ইস্যুকৃত ইমিগ্রেশনের লেটার ঠিকই এসেছে কিন্তু লেটারে বোল্ড হরফে লেখা আছে অনবোর্ড ক্লিয়ারেন্সের পরে আমরা বাইরে যেতে পারবো। জানানো হলো একজন ইমিগ্রেশন অফিসার জাহাজে গিয়ে আমাদের পাসপোর্টএ চাপ্পা মেরে আসবে। বুঝাইতে চেষ্টা করলাম তারে আর কষ্ট কইরা জাহাজে যাওনের দরকার কি। আমরাই তো পাসপোর্ট নিয়া হাজির। একটা চাপ্পা মেরে বাইরে পাঠিয়ে দিলেই তো চলে। কিন্তু বুঝলো না। আবার জাহাজে চলে আসলাম।

কুফারে কুফা। রাত নয়টা দশটা পার হয়ে গেল কেউ এলো না আমাদের ক্লিয়ার করতে। বাইরে তো যেতেই পারলাম না উপরন্তু অপেক্ষার চক্করে পড়ে সীম্যান ক্লাবে গিয়ে স্কাইপিতে বউয়ের লগে ভিডিও চ্যটিংটা গেল।

দুইদিন পার হয়ে গেল। এদিকে আবহাওয়া খুব ভালো। বৃষ্টি না হইলে আট দিনের জায়গায় চার দিনে সেইল হয়ে যাবে। আজকে আমার টার্ণ ছিল। কালকে আর আমি যাইতে পারুম না। চীফ অফিসার জুম্মার নামাজের জন্য আগেই বুকিং দিয়া রাখছে। তাইলে আমি বাইরে যামু কখন? এত কাঠখড়ির ভিসা নিয়া কি লাভ হইল? এই জন্যই গুরুজনে কয় এমনি যা পাও হাত পেতে নাও। বাইপাস করতে যেও না।

এই যে এত সব ঘটনা আমি একজন বাঙালি বলে। বাঙালি মানে বাংলাদেশী। ইন্ডিয়ান দের কোন সমস্যা নেই। তাদের বাইরে যেতে কিছুই লাগে না। লাগে না ফিলিপিনোদের। লাগে না অন্য ন্যাশন্যালিটির মেরিনারদের। আমাদের এই স্পেশালিটির জন্য আসলেই আমরা ধন্য।

_________________________________

ফাইনালি আমরা সিঙ্গাপুর ভ্রমণ করেছি। আর সিঙ্গাপুর ভ্রমণ মানে শপিং আর শপিং। মোস্তফা প্লাজাতে একবার ঢুকলে বের হওয়া খুব কঠিন। এতবড় মার্কেট সিঙ্গাপুরে আর দুইটা নেই। এত্ত এত্ত ক্যাশ কাউন্টার তবু সন্ধ্যার পরে বিল দিতে গেলে মিনিমাম আধা ঘন্টা লাইনে দাড়িয়ে থাকা লাগে। আর সব থেকে মজার কথা চর্তুদিকে এমন ভাবে বাংলায় কথা শোনা যায় যে বাংলাদেশে আছি বলেই ভুল হয়। সেরাঙ্গুন এলাকাটা বাঙালি অধ্যুষিত। রুপালি ব্যাংক প্রাইম ব্যাংক থেকে শুরু করে তরিতরকারি দোকানে বাংলায় সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। এমন কি ওখান থেকে বিকাশে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থাও আছে দেখলাম।

আমরা সারাদিন ঘোরাঘুরি আর শপিং করে ধানসিঁড়ি রেষ্টুরেন্টে নান রুটি আর পায়া খেলাম। হোটেলে কিছু লোক খুব আগ্রহ নিয়ে বিটিভির দুপুর দুইটার সংবাদ দেখছিল। যে বিটিভিকে ভালোবাসে সে নির্ঘাত দেশকে অনেক ভালোবাসে। দেশের প্রতি এদের ভালোবাসা দেখে মোহিত হলাম।

সন্ধ্যার পরে আমরা মোস্তফা প্লাজার বাইরে মসজিদ সংলগ্ন মাঠে গিয়ে জুতা মোজা খুলে হাটলাম। অনেক দিন পরে ঘাসের চাদরে পা রেখে অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছিল। এই মাঠে এক কোনায় একটা তেতুল গাছ আছে। আমি জানি এই তেতুল গাছটি একটি কোড।সিঙ্গাপুরে যশোর এলাকার যত লোক আছে তারা ঐ তেতুল গাছের নিচে এসে জমা হয়। কিন্তু আমি ঐ দিকে না গিয়ে শিশিরে ভেজা ঘাসের ওপর হাটতে থাকি। জাহজের লোহার পাতাটনের স্বাদ বদলিয়ে মাটির এ স্পর্শ আমার কাছে বিদেশ বিভূইয়ে এসে এলাকার লোকের সাথে দেখা হওয়ার থেকে বেশী উপভোগের।
১০টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে ট্রাম্প চাচা ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৫


সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ভোট দিয়ে এসে অনেকক্ষণ ধরেই অপক্ষো করছিলাম কখন সন্ধ্যা হবে সে প্রত্যাশায়। সন্ধ্যার পর মোটামুটি বসে গিয়েছিলাম ফলাফলের উপর টেলিভিশনে বিশেষ আলোচনা দেখার জন্য।... ...বাকিটুকু পড়ুন

"বন্ধ দুয়ার"

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৪


"বন্ধ দুয়ার"

ক্লান্ত এ সপ্তাহে শুনি, আজ কারো কাজ নাই,
বন্ধ কারখানায় তালা, কোথা যাব তবে ভাই?
ছুটা বুয়া হয়ে খাটা, সে সুযোগও মেলা ভার,
তরুণী দেখিয়া মোরে, কেহ খোলে না যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যালটের চিঠি: মাননীয় ট্রাম্প, আপনার বাকি বন্ধ

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩

ব্যালটের চিঠি: মাননীয় ট্রাম্প, আপনার বাকি বন্ধ

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

"আমেরিকাকে আবার মহান করব" বলে এসে যিনি দুনিয়ার সবাইকে বিরক্ত করলেন, ভোটাররা তাঁকে জানিয়ে দিলেন: হুমকি ধমকি আর উম্মাতাল আঁতলামির... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×