দুবাই এয়ারপোর্টে বোর্ডিং পাস ক্লিয়ার করে এক্সেলেটরে পা রাখলাম। আমার সামনে ছিল এক ইন্ডিয়ান। সে আমাকে উপরে উঠতে দেখে নিচের দিকে ইশারা করল। আমি নিচের দিকে তাকালাম। হ্যা ঐ দিকেও প্লেনে ওঠার রাস্তা। তবে সেটা আমার রাস্তা নয়। আমার টিকেট বিজনেস ক্লাসের।
আমিরাতস এয়ারলাইন্সের সব থেকে বড় এই বিমানটির সুবিধা হল এটি টু-স্টোরেড। উপরে বিজনেস ক্লাস আর নিচে ইকোনোমি ক্লাস। আমার সামনের ইন্ডিয়ানটি একজন বিজনেস ক্লাসের যাত্রী। আমাকে দেখেই তার মনে হয়েছে আমি বাঙালী হয়ে কিভাবে বিজনেজ ক্লাসের প্যাসেঞ্জার হতে পারি? মেজাজটা খিচড়ে গেল। দ্যা হেল অফ ইন্ডিয়ান আমাদেরকে ভাবেটা কি???
প্রচন্ড রাগ চাপলেও কিছু বললাম না। গাম্ভীর্যের মুখোশ পরে প্লেনে নিজের সিটে এসে বসলাম। প্লেন চলতে শুরু করলো। আপ্যায়নের শুরুতে এয়ারহোস্টেস বিভিন্ন ধরনের ড্রিংস নিয়ে আসল। সফট ড্রিংস, কোল্ড ড্রিংস, হার্ড ড্রিংস ইত্যাদি। আমার পাশে বসা আমার এক বাঙালী ভাইটিকে দেখলাম একটু কনফিউজড। তার হয়তো শখ হচ্ছিল একটু ওয়াইন টোয়াইন চেখে দেখবে। কিন্তু চক্ষু লজ্জায় পড়ে গেছে মনে হয়। শেষে অর্ডার করলো ম্যাংগো জুস। আমার হার্ডের ওপর তেমন কোন দূর্বলতা নেই। নিলাম পাইনঅ্যাপেল। পাশের ভাইটি আবারও কনফিউজড হল। ভাবলো ম্যাংগোর থেকে পাইনঅ্যাপেল বোধ হয় ভালো হবে। সে এয়ার হোস্টেসের কে বললো ম্যাংগো না পাইনঅ্যাপেল চাই তার।
মিষ্টি একটা কন্ঠে শুনলাম, " স্যার য়্যু হ্যাব অর্ডারড ফর ম্যাংগো"। ডাইরেক্ট রিফিউজড? আমি থ। একজন বিজনেস ক্লাসের প্যাসেঞ্জার একবার ম্যাংগো একবার পাইনঅ্যাপেল চাইবে মন চাইলে তরমুজও চাইবে তাই বলে এইভাবে প্রত্যাখ্যান ???? নাহ ! ব্যাপারটা ঠিক দুইবার চাওয়াই না। ব্যাপারটা রঙে। কোন আমেরিকান যদি বলত তবে আরবীয় হোস্টেস গার্লটি তার কোলে দশ মিনিট বসেও থাকতো আমি সিওর। ম্যাংগো তো বহুত সিম্পল কি বাত !! বুঝলাম রঙে ঢঙে আমরা যত ফেয়ারই হই না কেন আমরা ডার্ক, সাদা নয়।
সবচেয়ে অবাক হলাম হিথরো এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনে। আমি বিজনেস ক্লাস ট্রাভেল করার সুবিধা হিসেবে একটা ফার্স্ট ট্রাক কুপন পেয়েছিলাম। যেটার সাহায্যে আমি ভি আই পি হিসেবে গন্য হয়ে ছোট্ট লাইনের মাধ্যমে ইমিগ্রেশন পার হতে পারবো। নতুবা আমাকে গিয়ে দাড়াতে হবে দুই তিনশ লোকের পেছনে।
আমি যখন ফার্স্ট ট্রাকের লাইনে দাড়িয়ে ছিলাম আমার সামনে আর মাত্র তিন জন ছিল। আমি লক্ষ্য করছিলাম ভলেন্ডিয়ার গোছের একটা লোক আমাকে লক্ষ্য করছে। লোকটা একজন ইমিগ্রেশন সিকিউরিটি। ভালো করে দেখে বুঝলাম লোকটা ইন্ডিয়ান। হয়তো পার্সি। গায়ের রঙ অনেকটা গোরাদের মতো। আমার হাতে আমার বাংলাদেশী নীল পাসপোর্ট। আমার কেন জানি মনে হল লোকটি কিছু না কিছু গোলমাল পাকাবে। আমার আশংকা সত্যি করে দিয়ে লোকটা আমার কাছে আসল। লোকটার সরাসরি প্রশ্ন, ' তুমি ফার্স্ট ট্রাক লাইনে কেন?
আমার মনে হল কইস্যা একটা চড় লাগাই। কিন্তু সেটা করা যায় না। তাকে আমার বিজনেস ক্লাসের টিকেট দেখালাম। তা স্বত্তেও লোকটি আমাকে লাইন থেকে আলাদা করে নিয়ে গেল। তার বক্তব্য হল যেহেতু আমি সীম্যান সেহেতু ফার্স্ট ট্রাকের সুবিধা আমার জন্য প্রযোজ্য নয়। কিন্তু আমি সিওর ছিলাম এরকম কোন নিয়ম হতে পারে না। কিন্তু বিদেশী এয়ারপোর্ট বিশেষ করে ইমিগ্রেশন জায়গাটা আমাদের জন্য বেশ সেন্সেটিভ। তা না হলে নির্ঘাত শালা ইন্ডিয়ানের সবগুলো দাঁত ফেলে দিতাম।
মাঝে মাঝে ভাবি কেন এভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেবৈষম্যের শিকার হচ্ছি আমরা? এ দায় কার? আমার জন্মের? বাঙালী হয়ে জন্ম নেয়াটা কি আমার অপরাধ ছিল? নাকি যারা বিদেশে আমার দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে পারিনা এটাই আমার অপরাধ? ইন্ডিয়ানের পা চাটা কুত্তা হয়ে থাকাটা কি আমার জন্য গর্বের নাকি এই গর্বকে জুতার তলে পিষে ফেলার চেতনাটা আমার অহংকার ???

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




