বর্তমানে শিপিং বিজনেসের বেহাল দশার কারনে আমরা মংলা থ্যাইকা সিঙ্গাপুর পর্যন্ত মাথা মোড়ানো গরুর মতো আইলাম। গরুকে বাজারে নেয়ার সময় যেমন চোখ বাইন্ধা রাখা হয় আমরাও তেমনি কই যাইতাছি কিছুই কইতে পারি না। আন্ধার মতো চইল্যাও সাড়ে তিন দিনের মাথায় মালাক্কা স্ট্রেইটের মুখে আইস্যা পডছি। শেষে স্ট্রেইটে ঢুকুম কি ঢুকুম না করতে করতে সিঙ্গাপুর পার।
হর্সবার্গ লাইট হাউজ পার হইয়া ব্রিজে ক্যাপ্টেন সহ প্লান করতাছি এখন কি করুম। হেডিং কি নর্থে নাকি সাউথে দিমু? নাকি ইঞ্জিন বন্ধ কইরা খাড়ায় থাকুম? ক্যাপ্টেন কইলো চলো মালয়েশিয়ার OPL এ এ্যংকর করি। কইলাম চলেন। তয় একটু কোষ্টের কাছাকাছি করিয়েন। আমার কাছে মালয়েশিয়ার একটা সিম আছে কিনা
ম্যানুওভারিং এর জন্য ইঞ্জিন রুমে ওয়ান আউয়ার নোটিশ প্রায় দিমু দিমু করতাছি এমন সময় ভয়েজ ইন্সাকশান(Voyage Instruction) আইস্যা পড়লো। টাস্কি খাইলাম। কি পারফেক্ট টাইমিং বাব্বা।
কিন্তু আমার জন্য আরো বড় টাস্কি অপেক্ষা করতেছিল। তন্ন তন্ন করে খুইজ্যাও গালফ অফ থাইল্যান্ডের কোন চার্ট পাইলাম না। বাংলাদেশি জাহাজ অথচ থাইল্যান্ডের ইষ্ট কোষ্টের কোন চার্ট থাকবে না বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্চিল। কিন্তু আমি কষ্ট পাইলে তো আর লাভ নাই। কষ্ট পাইতে হইবো কাপ্তান সাহেবকে।
কিন্তু কাপ্তান সাহেব কোন কষ্টই পাইলেন না। ল্যাপটপ খুইল্যা আমারে জিগালো তুমি কদ্দুর যাইতে পারবা। কইলাম, আট ডিগ্রি নর্থ। তাও ক্যানসিল চার্ট।
ভাগ্যিস OpenCPN প্রোগ্রামটা আছিল। যদিও ২০১১ 'র পরে কোন আপডেট নাই তবু আমি আর ক্যাপ্টেন দুজনে মিল্যা একটা আন্ধা প্লান করলাম। ক্যাপ্টেন কইলো একটু চোখ কান খোলা রাইখ্যা যাইতে হইবো।
আমরা চোখ কান খোলা রাইখ্যাই জাহাজ চালাইলাম। কিন্তু যখন ঘুমে থাকি তখন তো আর চোখ কান খোলা রাখতে পারি না। আর সেই সুযোগে আমার ষষ্ট ইন্দ্রিয় আমাকে আজব আজব স্বপ্ন দেখানো শুরু করলো। দেখি সামনে বিশাল একটা ব্রিজ। আমি ব্রিজের তলা দিয়া যাইবার পথ খুঁজতাছি কিন্তু কোন পথ নাই। পরপর কয়েকটা জাহাজ ধাক্কা ধাক্কি কইরা আমার রাস্তা আগলায়া খাড়ায় আছে।
বুঝলাম না হ্যাগো এই বেহাল দশা হইলো ক্যামতে। আমি না হয় আন্ধা প্লানে জাহাজ চালাইত্যাছি কিন্তু ওরা এইভাবে একটার পিছে আর একটা লাগায় দিল কেন???
আমার হাতে পায়ে কোন ব্রেক নাই। আমিও লাগাইয়া দিলাম। ধাক্কা খাইয়া আমার জাহাজের মাথা উঠে গেল আর একটার পিছে। আমি ব্রিজ ফালাইয়া দৌড় দিলাম। এক লাফে সামনের জাহাজটিতে নেমে যেই না আমার জাহাজের বাল্বাজ বাউ(জাহাজের সামনের অংশ) ধরছি ধাক্কা দিমু অমনি ক্রিং ক্রিং। ধড়মড় করে উঠে দেখি পৌনে বারোটা।
ব্রীজে আইস্যাই ক্যাপ্টেনকে ফোন দিলাম। ব্যাচারা ঘুমায় গেছিল। কইল, কি হইচে সেকেন্ড?
- স্যার অফিসে ফোন দিয়া বলেন স্কান(scan) চার্ট পাঠাইতে।
- বলছি। কিন্তু মনে হয় লাভ নাই। চোখ কান খোলা রাখ।
আমি আর কি করুম। ফার্স্ট এইড বক্স থেকে একটা বদ হজমের ট্যাবলেট নিয়ে মুখে দিলাম। শুনেছি পেঁটে গ্যাস হইলে মানুষ আজে বাজে স্বপ্ন দ্যাখে। তারপর ডিউটি এবি রে কইলাম চোখ কান খোলা রাখেন। আর আমার নিজের কানের ওপরে যে চুলগুলো শোভাবর্ধন করে সবসময় সেইগুলাকেও গুজে দিলাম কানের নিচে।
গুনিজনে যে কয় সব স্বপ্ন সত্যি হয় না। মনে হয় কথাটা ঠিক। কারণ আমরা সহি সালামতে থাথং পৌছালাম।
থাথং এ্যংকরেজে লোডিং চলছে। জিপসাম। আমি ডিউটি শেষ করে ইদানিং বোর্ট ডেকে বসি। কেবিনে ভালো নেটওয়ার্ক পায় না।
হঠাৎ একটা শিশুর কান্নার আওয়াজ কানে এল। অবাক হলাম। জাহাজে কারো ফ্যামিলি অনবোর্ড নেই। সো বাচ্চা থাকার তো কথা না।
লোডিং গ্যাং আছে কিছু পুরুষ মহিলা। কিন্তু এই কয় দিনে তাদের কারো বাচ্চা আছে বলেও দেখি নি। এদিকে কান্না ক্রমাগত বাড়ছে। কারো আবার বাচ্চা টাচ্চা হয়ে গেল নাতো??? ধুর তা কি সম্ভব??
কেউ কি কেবিনে ফুল ভলিউমে মুভি দেখছে?? কিন্তু লোহার বদ্ধ কেবিনে যেখানে নেটওয়ার্ক ঢুকে না সেখানে এত জোরে বাইরে আওয়াজ আসার কথা না। তাছাড়া সিনেমার বাচ্চারা এভাবে কাঁদে না। এটা কোন চিমটি দেয়া কান্না নয়।
একটু পরে উঁকি ঝুকি দিয়া কান্নার উৎস খুজে পেলাম। কান্না আসছে বার্জ থেকে। বার্জ মানে যে সমস্ত ছোট ছোট লাইটার বোর্টে করে এ্যংকরে থাকা জাহাজে গুলোতে কার্গো আনা হয়।
এই একটা ব্যাপার আমি এখানে খেয়াল করেছি। থাইল্যান্ডে এরকম কয়েক হাজার লাইটার বার্জ আছে। আছে সেগুলোকে টেনে আনার জন্য টাগবোর্ট। এরকম এক একটা বোর্ট বা বার্জ চালনা বা রক্ষনাবেক্ষনের জন্য আছে এক একটা ফ্যামিলি। তারা এখানেই খায় এখনেই ঘুমায় এখানেই চাকরি করে আবার এখানেই বাচ্চা জন্ম দেয় আবার বাচ্চা লালন পালন ও করে।
আমার মনে হতে লাগলো তাদের এই ভ্রাম্যমান সংসার জীবন কি আমাদের থেকে ভালো নয়?? জলের ওপর তাদের চাকরি আর আমাদেরও। কিন্তু তারা এই জলের চাকরিটাকে একটা ফ্যামিলিতে কনভার্ট করেছে। কিন্তু আমরা এভাবে ফ্যামিলি ছাড়া একাকি জীবন বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি। হায় যদি বউকে নিয়ে এরকম কোন বার্জেও চাকরি করতে পারতাম তবে জীবনটা হয়তো আরো মধুর হতো।
--------------------------------------------------------
কিছু জাহাজী শব্দের অজাহাজী অর্থঃ
হর্সবার্গ লাইট হাউজঃ সাউথ চায়না সী থেকে সিঙ্গাপুর স্ট্রেইটে ঢোকার দিক নির্দেশনা কারী।
OPL: Out of port limit. (যেখানে জাহাজ এ্যংকর করে থাকলে কাউকে ভাড়া দেয়া লাগে না)।
ম্যানুওভারিংঃ গভীর সমূদ্রে পূর্ণ গতিতে চলমান অবস্থা থেকে গতি নিয়ন্ত্রন অবস্থায় পরিবর্তন।
ওয়ান আউয়ার নোটিশঃ 1 hour notice.
ভয়েজ ইন্সাকশানঃ পণ্য পরিবহনের জন্য কোন তৃতীয় পক্ষের কাছে জাহাজ ভাড়া হবার চুক্তি তথা ঐ পক্ষের প্রয়োজনীয় শর্তাবলি।
ক্যানসিল চার্টঃ যে ম্যাপ বাতিল বলে ঘোষিত হয়েছে।
ব্রিজঃ জাহাজের কন্ট্রোল রুম।
বল্বাজ বাউঃ জাহাজের একেবারে সামনের নাকের মতো অংশ।
স্কান চার্টঃ ইমেইলে পাওয়া ম্যাপ যা জাহাজের প্রিন্টারে প্রিন্ট নিয়ে ক্রমানুসারে সাজিয়ে ইমার্জেন্সিতে ম্যাপের প্রয়োজন মেটানো হয়।
থাথংঃ থাইল্যান্ডের একটা রিমোট এ্যংকরেজ পোর্ট।
লোডিং গ্যাংঃ কার্গো লোডিং আনলোড কর্মে নিয়োজিত পোর্টের জনবল।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৪ দুপুর ২:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




