somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

মোস্তাফিজ ফরায়েজী জেরী
মোস্তাফিজ ফরায়েজী জেরী

গল্পঃ প্রতীক্ষায়

২৬ শে জুন, ২০১৪ সকাল ৯:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



কাঠের চেয়ারে বসা। পাশে আরো দু’জন। সবার মুখের চামড়া জড় জড়। দাঁড়ি-গোফ, চুল পেকে সাদা। দাঁড়িতে মেহেদী দিতে মন চাই আকবর আলীর, কিন্তু কে দেবে তাকে? বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বাইরের জগত দেখতে থাকে আকবর আলী। তার চোখে ভেসে ওঠে নানা অতীত স্মৃতি।

পাশে বসা লিয়াকত সরদার পান চিবুচ্ছে। ইদানীং পান চিবুতে তার সমস্যা হয়। দাঁতের মাড়িগুলোতে প্রচন্ড ব্যথা, সামনের কয়েকটি দাঁত তো আগেই গেছে। যুবক কালে পুরো দুস্তর কুস্তিবিদ ছিল লিয়াকত সরদার। তবে আজ আর তার সেই সরদারী তেজ নেই।

তার পরের জন মীর তাহির। কয়েকদিন আগে তার ছেলে তাকে পাজেরো গাড়িতে করে দিয়ে গেছে। পাঁচদিন ধরে প্রচন্ড ঠাণ্ডা-জ্বর তার। মাঝে মাঝেই খক খক করে কেশে ওঠে।

আকবর আলী অনেক কষ্ট করে মীর তাহিরের ছেলের কাছে ফোন দিয়ে বলে, ‘বাবা, তোমার আব্বার তো দু’দিন ধরে ঠাণ্ডা-জ্বর।’

অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে কণ্ঠস্বর, ‘জ্বর? বাবার তো মাঝে মাঝেই জ্বর আসে। ঊনাকে গোসল করতে দিবেন না। দু’দিনেই ভালো হয়ে যাবে।’

দু’দিন পার হয়ে চার-পাঁচ দিন হয়ে গেছে, তবু জ্বর যায় নি। মীর তাহিরের ছেলেও কোন খোঁজ নেয় নি। এই ক’দিনে ওষুধ বলতে নাপা ছাড়া কিছুই জোটে নি তার। আজকে মীর তাহিরের অবস্থা খুব একটা ভালো না।

আকবর আলী ভাবে, ‘আমার ছেলেই তো ভালো। প্রতি দু’সপ্তাহ অন্তর একবার এসে দেখে যায়। আমাকে আব্বা! আব্বা! বলে বার বার ডাকে। কিন্তু আমাকে এখানে আসতে হল কেন? কিসের জন্য?’

হঠাত প্রশ্নটা মাথায় আসে আকবর আলীর। তার ছেলে যে তাকে এখানে আসতে বলবে তা কখনো ভাবতে পারি নি। তার স্ত্রী সালেহা বেগম মারা যাবার দু’মাস যেতে না যেতেই তোড়-জোড় শুরু হয়। বৌমাকে একদিন বলতে শোনে আকবর আলী, ‘তোমার বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসো। ঊনার দেখ-ভাল করার মানুষ কই বাড়িতে?’

কথাটা শুনে আকবর আলী যেন থ’ বনে যায়।

তার ছেলে কিছু বলে না। তবে ছ’মাসে এসে আর বৌমার কথা ফেলতে পারে নি সাহেদ।

প্রথম প্রথম আকবর আলী ভেবেছিল, ‘এ কি নিষ্ঠুর দুনিয়া! আমাকে দূরে ঠেলে দেবার এই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কি আমার ছেলে?’

আকবর আলীর মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরে অবশ্য মন পরিবর্তন হয়।

‘ঠিকই তো বলেছে বৌমা। আমাকে দেখার লোক কই! সাহেদ তো তার চাকরী নিয়েই ব্যস্ত থাকে। আর বৌমা দুই ছেলে নিয়েই থাকে সারাদিন। সামান্য কথা বলার লোকও নেই তো। মাঝে মাঝে কাজের বুয়ার সাথে দু’একটা কথা হয়। তার চেয়ে বরং নতুন আবাসে যাওয়ায় ভালো। ওখানে তো দু’দন্ড কথা বলার লোক পাওয়া যাবে।’

এগুলো ভাবতে ভাবতেই দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আকবর আলী।

ভালোয় লাগছিল এখানে আসার পরের ক’দিন। তবে সে একদিন আবিষ্কার করল সে আছে কিছু মৃত্যু ব্যক্তির মাঝে খাঁচার প্রানীর মত। জীবনের রস-স্বাদ এখানকার মানুষদের নেই। তাই এখন আশা-নিরাশা কিছুই ছুঁয়ে যায় না তাকে।

পরদিন সকাল হতে না হতেই একটা খাটিয়া এসে থামে এই মৃত্যুপুরীতে। মারা যাবার সময় মীর তাহির বারবার বলছিল, ‘আমার ছেলেকে একটু খবর পাঠাবেন কি কেউ? আমি তাকে শেষবারের মত দেখতে চাই।’

দুপুরে কাঁদতে কাঁদতে চলে আসে মীর তাহিরের ছেলে। তার কান্না আকবর আলীর কাছে মেকি মনে হয়। এই শোকের দিনেও আকবর আলী এ পরিহাস দেখে বিষণ্ণ এক হাসি দেয়। কত শত পিতা যে তার সন্তানকে না দেখার বেদনা নিয়ে চলে যায়, তা ক’জনে জানে?

আজ বড্ড নিজের ছেলেকে দেখতে মন চায় আকবর আলীর। একবার, এক মিনিটের জন্য। সন্ধ্যা পর্যন্ত বারান্দার গ্রিলের ফাঁকে দৃষ্টি দিয়ে তার ছেলের আগমনের জন্য অধীর আগ্রহে বসে থাকে আকবর আলী। সে প্রতীক্ষায় থাকে পরের দিন, পরের দিন এবং পরের দিন...।

*****
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুন, ২০১৪ সকাল ৯:৩২
৮টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে ট্রাম্প চাচা ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৫


সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ভোট দিয়ে এসে অনেকক্ষণ ধরেই অপক্ষো করছিলাম কখন সন্ধ্যা হবে সে প্রত্যাশায়। সন্ধ্যার পর মোটামুটি বসে গিয়েছিলাম ফলাফলের উপর টেলিভিশনে বিশেষ আলোচনা দেখার জন্য।... ...বাকিটুকু পড়ুন

"বন্ধ দুয়ার"

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৪


"বন্ধ দুয়ার"

ক্লান্ত এ সপ্তাহে শুনি, আজ কারো কাজ নাই,
বন্ধ কারখানায় তালা, কোথা যাব তবে ভাই?
ছুটা বুয়া হয়ে খাটা, সে সুযোগও মেলা ভার,
তরুণী দেখিয়া মোরে, কেহ খোলে না যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যালটের চিঠি: মাননীয় ট্রাম্প, আপনার বাকি বন্ধ

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩

ব্যালটের চিঠি: মাননীয় ট্রাম্প, আপনার বাকি বন্ধ

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

"আমেরিকাকে আবার মহান করব" বলে এসে যিনি দুনিয়ার সবাইকে বিরক্ত করলেন, ভোটাররা তাঁকে জানিয়ে দিলেন: হুমকি ধমকি আর উম্মাতাল আঁতলামির... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×