ঢাকা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ভবন বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন বাংলাদেশি তরুণ কাজী রেজোয়ানুল আহসান নাফিস (২১)।
এদিকে, নাফিসের পরিবার ও এলাকাবাসী দাবি করেছেন, নাফিস নিরীহ ও শান্ত প্রকৃতির ছেলে। তাকে ইচ্ছে করেই এ ঘটনায় ফাঁসানো হতে পারে। হয়তবা বোকা নাফিজকে বড় ধরনের কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার বানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর নাফিসদের বাড়ি ১০৭/৪ উত্তর যাত্রাবাড়ী ও আশেপাশের বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
নাফিসদের বাড়িতে ঢোকার পর একটা কান্নাজড়ানো গুমোট পরিস্থিতি বোঝা গেল। বাড়িতে কারও মুখে কোনো কথা নেই। আত্মীয়-স্বজন বিমর্ষ, চিন্তিত। তাদের ছেলের আসলে কী হয়েছে, এ বিষয়ে মিডিয়ার সংবাদ ছাড়া আর কিছুই জানেন না তারা ।
বাড়ির সবার সঙ্গে কথা বলে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বন্দি ৩য় বিশ্বের সাধারণ একটি পরিবারের সদস্যদের অসহায়ত্বের চিত্র ফুটে উঠলো সেখানে গিয়ে। সবার চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ! কারণ, এ পরিবারের সবচেয়ে আদরের ছেলেটি পড়াশুনা করতে গিয়ে বন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।
প্রসঙ্গত, বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ভবন বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করার অভিযোগে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন বাংলাদেশি তরুণ কাজী রেজোয়ানুল আহসান নাফিস।
অপরদিকে, নাফিসের এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল হাইস্কুল সংলগ্ন এলাকায় নাফিসরা অনেক দিন থেকেই বসবাস করে আসছে। তারা ‘স্থানীয় লোক’ হিসেবেই পরিচিত। নাফিসের নানার পরিবার, নাফিসের মা-বাবা ওই এলাকায় নিরীহ ও ভদ্রলোক বাড়িওয়ালা হিসেবে পরিচিত।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নাফিজ লেখাপড়া করেছেন যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল হাইস্কুলে। ২০০৬ সালে তিনি জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। ২০০৮ সালে ঢাকা কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। এরপর তিনি নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ অনার্সে ভর্তি হন।
বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র নাফিস ভর্তির পর বিবিএ পড়তে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এর পর তিনি স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেন।
বিবিএ ৩য় সেমিস্টার পর্যন্ত পড়াশুনা করে বিরতি দেওয়ার পর সুযোগ পেয়ে তিনি পড়াশুনার উদ্দেশে বিদেশে পাড়ি জমান। এবছরের জানুয়ারিতে তিনি আমেরিকা যান।
নিউইয়র্কে নাফিস তার খালা সুফিয়া আকুঞ্জির ননদের মেয়ে সোনিয়ার বাসায় থাকতেন।
নাফিসের খালা সুফিয়া আকুঞ্জি বাংলানিউজকে জানান, সোনিয়া একজন মার্কিন নাগরিক। নিউইয়র্কে আগে সে একটি বেসরকারি চাকরি করতো। এখন গৃহিনী।
সোনিয়া জানিয়েছেন, নাফিসকে আসলে গোয়েন্দারা ফাঁসিয়েছে। নাফিস অনেকটাই নিরীহ স্বভাবের ছেলে। সে এখনও নিউইয়র্কের সবকিছু ভালোভাবে চেনেই না।
নাফিসের খালা সুফিয়া আকুঞ্জি জানান, নাফিস সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে। এ পরিবারের সবাই প্রতিষ্ঠিত এবং স্বনামধন্য। নাফিসের চাচা অ্যাপোলো হাসপাতালের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। ওর পরিবারের সবাই শিক্ষিত। কেউ রাজনীতি বা জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত নন।
তিনি বলেন, “নাফিজ খুবই ভদ্র ও লাজুক। সে রাজনীতি করতোনা। নিয়মিত নামাজ পড়তো। আমরা আমাদের ছেলের সঙ্গে কথা বলতে চাই। গোয়েন্দারা নিজেদের প্রমোশন বা কাজ দেখানোর জন্য নিরীহ এই ছেলেটাকে ফাঁসাতে পারে।”
নাফিসের বাবা কাজী মো. আহসান উল্লাহ ন্যাশনাল ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট। নাফিসের মা রোকেয়া সিদ্দিকী একজন গৃহিনী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে পড়াশুনা করেছেন।
নাফিসরা এক ভাই, এক বোন। নাফিসের বড়বোন ফারিয়াল বিলকিস নুশা সিলেট মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে ইন্টার্ন করছেন। যাত্রাবাড়ীতে নাফিসরা যে বাসায় থাকে, সেই ৫ তলা ভবনটি নাফিসের নানার। নাফিসের জন্মও এই এলাকায়।
এলাকার স্থানীয়রা নাফিসকে চিনতেন। তবে এলাকায় বসবাসকারী লোকজন তাকে চিনতেন না। নাফিস অনেকটা লাজুক এবং নামাজি বলে তার পরিবার ও স্থানীয় লোকজন বাংলানিউজকে জানিয়েছেন।
বাসায় গিয়ে দেখা যায়, নাফিজের মা কান্নাকাটি করছেন।
তিনি বাংলানিউজকে বলেন, “আমার ছেলে সহজ-সরল। ও এত কিছু করতে পারেনা। আমার ছেলের কিছু হলে আমি কাকে নিয়ে বাঁচবো। আমার ছেলে গত রোববার রাতে কথা বলেছে। সে বলেছে, সে পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত। আমার ছেলেকে আমি ফেরত চাই। বিদেশে পড়তে যাওয়াই ওর জন্য কাল হলো!”
এদিকে, নাফিসের বাবা সাংবাদিকদের বলেন, “রোববারও ছেলের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয়েছে। আমার ছেলেকে ফাঁসানো হয়েছে। বাংলাদেশের মিডিয়া সত্য কথা তুলে ধরুক। এলাকার লোকদের কাছে জানুক, সে কেমন ছিল। আমি জানি, আমার ছেলে মেধাবী, পড়ুয়া আর একেবারে নম্র ও ভদ্র। সে এ ধরনের কাজের সাহস কখনো পাবেনা। আমি বিশ্বাস করিনা, সে এ ধরনের কাজ করেছে।”
নাফিসকে ছোটবেলা থেকে ভালোভাবে চেনেন এমন একজন স্থানীয় ছাত্র রাসেল মাহমুদ বলেন, “আমি বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির ছাত্র। আমি নাফিসকে ছোটবেলা থেকেই চিনি। সে কোনো দুঃসাহসী বা এই ধরনের কাজ করার মতো ছেলে না। তবে স্থানীয় ছেলেদের সঙ্গে সে একটু কম মিশতো। আমার আর ওর পরিবার একটু ইসলামী মানসিকতার। নাফিসকে আন্তর্জাতিক কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার বানানো হয়ে থাকতে পারে। কারণ, এ ধরনের সাধারণ ছেলের পক্ষে এত বড় কাজ করার হওয়ার কথা নয়।”
নাফিসদের বাসার সামনের দোকান ‘সৃষ্টি ফ্যাশন হাউজ’-এর মালিক নাসিমা বেবি জানান, ছেলেটা সম্বন্ধে সবসময় ভালো কথা শুনেছি। তার এই ঘটনায় আমরা সবাই হতবাক!
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি এম এ খোকন বলেন, “আমরা এই ছেলেকে জন্ম থেকে চিনি ও ভালো করেই জানি। তার পরিবার ও সে নামাজি। কিন্তু মিডিয়াতে তাকে নিয়ে যে জঙ্গি বা চরমপন্থির কথা বলা হচ্ছে, এ ধরনের কিছু আমরা তার মধ্যে কখনো দেখিনি।”
নাফিসদের বাসার পার্শ্ববর্তী সাদিয়া জেনারেল স্টোরের মালিক সাত্তার আলী বলেন, “ছেলেটাকে আমি দেখিনি। তবে সবাই তাকে নিরীহ বলে। এখন টিভিতে সাংবাদিকদের কাছে নানা কথা শুনছি। আমেরিকার পুলিশরা মিথ্যা মামলায় তাকে ফাঁসাতে পারে। আসল কথা হলো, আমেরিকা বাংলাদেশকে দুর্নামে ফেলতে চায়।”
নাফিসদের প্রতিবেশী নাজমা বেগম বলেন, “নাফিজ খুবই ভদ্র ছেলে। সে এই ধরনের কাজ করতেই পারেনা। গোয়েন্দা পুলিশরা তো কত কিছুই বানায়! নাফিসকে এসব ঘটনায় জড়ানো হতে পারে। তবে নাফিসের পরিবার ভদ্র ও নিরীহ হিসেবেই পরিচিত।
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



