somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার সোনার বাংলা - সত্যিই কই তোমায় ভালবাসি?

০১ লা মে, ২০১৫ বিকাল ৪:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দৃশ্য ১ - মহাখালি রেলগেইটের উলটা দিকে ফলের দোকান গুলোর কাছে, তখন আনুমানিক সকাল ১১টা। লেগুনা থেকে নেমে মনে হলো আনারস খাই, এটা আমি প্রায়ই রাস্তা ঘাটে পেলেই খাই। যে লোকটি বয়োম এর ভিতর আনারাস টুকরা টুকরা করে ভরে কাসন্দি দিয়ে মাখাচ্ছিল, তার কাজের নৈপুণ্যের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। পাশে পাঞ্জাবি লুঙ্গি পড়া ২৩/২৪ বছরের এক যুবক চূড়ান্ত আগ্রহ নিয়ে সেইরকমই আনারস মাখানো খাচ্ছে। আমি আনারসের ভ্যানটার অনেক কাছেই পৌঁছে গেলাম। আনারস এর চোকলা ছিলে ভ্যানের এক পাশে রাখা থাকে, আমি ভ্যানের সেইদিকটায় দাঁড়িয়ে । হঠাত করে একটা ৩ ফুট উচ্চতার বাচ্চা এসে আমার পাশে দাঁড়ালো। বয়স অনুমান করতে পারছি না। মুখের পরিপক্কতা আর শারিরীক গঠনের মধ্যে অপুষ্টিজনিত বেশ অসামঞ্জস্য আছে । গায়ে জাম রঙের একটা হাতাকাটা গেঞ্জি। মাথার চুল একদমই ছোট করে ছাটা । পায়ে জুতা স্যান্ডেল কিছু নেই। দুটো হাতে তেল ও যত্নের অভাবে শুস্ক পদ্মা নদীর চরের মতো সাদা সাদা দাগ। আমার পাশে এসে দাঁড়াবার সাথে সাথেই হাত বাড়িয়ে ভ্যানের এক কোনা থেকে 'টুথ' পিকের মতো কাঠি নিয়ে মুখস্থ বিদ্যার কৌশলে আনারসের উচ্ছিস্ট চোকলার সমারহ থেকে বেছে বেছে নিচ্ছে। বুঝলাম এ কাজ প্রায় সে করে থাকে। যেই চোকলা গুলোর সাথে একটু আনারসের মাংসের মতো আছে সেইগুল অনায়সে মুখে পুরে দিচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন এমন দৃশ্য দেখলে চোখে পানি চলতে আসত। এখন সেই অনুভূতি গুলো পুরানো বন্ধুর মতো হয়ে গেছে, চোখে পানি আসে না। তাই এখন আমার একদমই উচ্ছ্বাস কমে একটা দীর্ঘশ্বাসে রুপ নিয়েছে মাত্র; সমস্ত আবেগের রত্নঘর জেনে গেছে এই সোনার বাংলায় অনেক অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতাই হয়, কিন্তু এই ছোট্ট ছেলেটির একটুকরো আনারস খাওয়ানোর মতো বিলাসিতা ওর বাবা মা করতে পারে না । একটু ম্লান হেসে তাই মাথায় হাত বুলিয়ে অভ্যাস বশতঃ জিজ্ঞাস করলাম - " কিরে? আনারস খাবি?" আমার দিকে না তাকিয়েই মাথা নেড়ে বলল "হ, খামু" । আমি তার হাতে দুইটা বড় টুকরো আনারস কিনে দিলাম। আমার আর আনারস খাবার মতো ইচ্ছা নাই। আমি চলে গেলাম 'জাতীয়' খাবার সিঙ্গারা খেতে একটু ভিতরে বাজারের পথে । যাবার সময় দেখলাম ছেলেটা আনারস গুলো নিয়ে মহাখালি বাজারের ভিতর দিয়ে সাততলার দিকে রওনা দিয়েছে । এই স্বভাবটার সাথে আমি কিছুটা পরিচিত। ওরা সাধারণত ওদের ভাইবোনদের না দিয়ে খেতে পারে না। একটু কৌতুক বোধ করে আমিও ঐ চলে গেলাম সিঙ্গারার খোঁজে।

দৃশ্য ২ (সিঙ্গারা খাওয়া শেষে)- কয়েকদিন ধরে তরমুজের রহস্যটা বের করার চেষ্টা করছি। কোন আক্কেলের ভরপুর মাথা থাকতেও তরমুজের এতো দাম আমার মত ব্যাক্কলের মাথায় তা কিছুতেই ঢুকছে না। তাই আজকাল সুযোগ পেলেই তরমুজ বিক্রেতা সম্রাটদের আশপাশে দাঁড়িয়ে দেখি আসলে কতো দামে এরা শেষ পর্যন্ত এইগুলা বিক্রি করে । ঐ পাশেই একটা বিরি-সিগারটের দোকান আছে। হঠাত করে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি ঐ আনারস খেকো ছেলেটা। আমি ঠিক হিসাব মিলাতে পারছিলাম না। ও কি আনারস গুলো খেয়ে আবার এই অল্প সময়ের মধ্যেই চলে আসল? উহু! ঠিক মিলছে না। কৌতূহল বশত ওকে গিয়ে জিজ্ঞাস করলাম, " কিরে? আনারস কি করলি?" আবার আমার দিকে না তাকিয়ে, "মায়রে দিছি", সিগারেট বিক্রেতার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আল্লাদের মতো করতে করতে কথা গুলো বলছিল। সেই লোক আমাকে আঙ্গুল দিয়ে অদুরেই একটা হোটেল দেখিয়ে বলল "ওর মা ঐখানেই থালা বাসন ধয়" । আমি আবার জিজ্ঞাস করলাম, "কি রে তুই খাস নাই? " গা মোচড়াতে মোচড়াতে, লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে বলল, "মারে দিছি, মা খাইব, মা সকালে কিছু খায় নাই" ।

আমার সামনে সব কেমন ঝপাসা হয়ে গেলো, এই একটি শিশুর কণ্ঠে মুহূর্তেই শুনতে পেলাম লাখো কণ্ঠের মিথ্যা অখঙ্কার - "আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।" সব মিথ্যা কথা, সব মিথ্যা শ্লোগান, সব মিথ্যা গান।

অনেকদিন রাস্তায় অভুক্ত শিশু দেখলে চোখে জল আসে না, সে কথা আগেই বলেছি। কিন্তু আবারো অনেক দিন পরে চোখটা একদমই ভিজে গেলো।

একটি অবোধ শিশু নিজে না খেয়ে অভুক্ত মাকে দিয়ে এলো। এরাই তো এই দেশের একদিন হতে পারত সুযোগ্য নাগরিক, এই শিশু জানে নিজে না খেয়ে কি করে অভুক্ত মা কে খাওয়াতে হয়।

আমি এগিয়ে চলছি আমার অফিসের দিকে, আরেকবার শিশুটিকে চিনে রাখতে মন চাইল। কিন্তু তাকাতে গিয়েই বার বার শুধু কষ্টের সাথে কানে বাজচ্ছে আমদের লাখো কণ্ঠে দীপ্ত হুঙ্কারে মিথ্যা অহঙ্কার, "আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি", "আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি"।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা মে, ২০১৫ বিকাল ৪:১৮
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ২০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১



এবছর দেশে আমড়ার ফলন ভালো হয়েছে।
আমড়ায় আছে প্রচুর ফাইবার যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এক কেজি আমড়া মাত্র ৫০ টাকা। এক কেজি আপেল ৩৫০ টাকা। মালটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×