দৃশ্য ১ - মহাখালি রেলগেইটের উলটা দিকে ফলের দোকান গুলোর কাছে, তখন আনুমানিক সকাল ১১টা। লেগুনা থেকে নেমে মনে হলো আনারস খাই, এটা আমি প্রায়ই রাস্তা ঘাটে পেলেই খাই। যে লোকটি বয়োম এর ভিতর আনারাস টুকরা টুকরা করে ভরে কাসন্দি দিয়ে মাখাচ্ছিল, তার কাজের নৈপুণ্যের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। পাশে পাঞ্জাবি লুঙ্গি পড়া ২৩/২৪ বছরের এক যুবক চূড়ান্ত আগ্রহ নিয়ে সেইরকমই আনারস মাখানো খাচ্ছে। আমি আনারসের ভ্যানটার অনেক কাছেই পৌঁছে গেলাম। আনারস এর চোকলা ছিলে ভ্যানের এক পাশে রাখা থাকে, আমি ভ্যানের সেইদিকটায় দাঁড়িয়ে । হঠাত করে একটা ৩ ফুট উচ্চতার বাচ্চা এসে আমার পাশে দাঁড়ালো। বয়স অনুমান করতে পারছি না। মুখের পরিপক্কতা আর শারিরীক গঠনের মধ্যে অপুষ্টিজনিত বেশ অসামঞ্জস্য আছে । গায়ে জাম রঙের একটা হাতাকাটা গেঞ্জি। মাথার চুল একদমই ছোট করে ছাটা । পায়ে জুতা স্যান্ডেল কিছু নেই। দুটো হাতে তেল ও যত্নের অভাবে শুস্ক পদ্মা নদীর চরের মতো সাদা সাদা দাগ। আমার পাশে এসে দাঁড়াবার সাথে সাথেই হাত বাড়িয়ে ভ্যানের এক কোনা থেকে 'টুথ' পিকের মতো কাঠি নিয়ে মুখস্থ বিদ্যার কৌশলে আনারসের উচ্ছিস্ট চোকলার সমারহ থেকে বেছে বেছে নিচ্ছে। বুঝলাম এ কাজ প্রায় সে করে থাকে। যেই চোকলা গুলোর সাথে একটু আনারসের মাংসের মতো আছে সেইগুল অনায়সে মুখে পুরে দিচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন এমন দৃশ্য দেখলে চোখে পানি চলতে আসত। এখন সেই অনুভূতি গুলো পুরানো বন্ধুর মতো হয়ে গেছে, চোখে পানি আসে না। তাই এখন আমার একদমই উচ্ছ্বাস কমে একটা দীর্ঘশ্বাসে রুপ নিয়েছে মাত্র; সমস্ত আবেগের রত্নঘর জেনে গেছে এই সোনার বাংলায় অনেক অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতাই হয়, কিন্তু এই ছোট্ট ছেলেটির একটুকরো আনারস খাওয়ানোর মতো বিলাসিতা ওর বাবা মা করতে পারে না । একটু ম্লান হেসে তাই মাথায় হাত বুলিয়ে অভ্যাস বশতঃ জিজ্ঞাস করলাম - " কিরে? আনারস খাবি?" আমার দিকে না তাকিয়েই মাথা নেড়ে বলল "হ, খামু" । আমি তার হাতে দুইটা বড় টুকরো আনারস কিনে দিলাম। আমার আর আনারস খাবার মতো ইচ্ছা নাই। আমি চলে গেলাম 'জাতীয়' খাবার সিঙ্গারা খেতে একটু ভিতরে বাজারের পথে । যাবার সময় দেখলাম ছেলেটা আনারস গুলো নিয়ে মহাখালি বাজারের ভিতর দিয়ে সাততলার দিকে রওনা দিয়েছে । এই স্বভাবটার সাথে আমি কিছুটা পরিচিত। ওরা সাধারণত ওদের ভাইবোনদের না দিয়ে খেতে পারে না। একটু কৌতুক বোধ করে আমিও ঐ চলে গেলাম সিঙ্গারার খোঁজে।
দৃশ্য ২ (সিঙ্গারা খাওয়া শেষে)- কয়েকদিন ধরে তরমুজের রহস্যটা বের করার চেষ্টা করছি। কোন আক্কেলের ভরপুর মাথা থাকতেও তরমুজের এতো দাম আমার মত ব্যাক্কলের মাথায় তা কিছুতেই ঢুকছে না। তাই আজকাল সুযোগ পেলেই তরমুজ বিক্রেতা সম্রাটদের আশপাশে দাঁড়িয়ে দেখি আসলে কতো দামে এরা শেষ পর্যন্ত এইগুলা বিক্রি করে । ঐ পাশেই একটা বিরি-সিগারটের দোকান আছে। হঠাত করে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি ঐ আনারস খেকো ছেলেটা। আমি ঠিক হিসাব মিলাতে পারছিলাম না। ও কি আনারস গুলো খেয়ে আবার এই অল্প সময়ের মধ্যেই চলে আসল? উহু! ঠিক মিলছে না। কৌতূহল বশত ওকে গিয়ে জিজ্ঞাস করলাম, " কিরে? আনারস কি করলি?" আবার আমার দিকে না তাকিয়ে, "মায়রে দিছি", সিগারেট বিক্রেতার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আল্লাদের মতো করতে করতে কথা গুলো বলছিল। সেই লোক আমাকে আঙ্গুল দিয়ে অদুরেই একটা হোটেল দেখিয়ে বলল "ওর মা ঐখানেই থালা বাসন ধয়" । আমি আবার জিজ্ঞাস করলাম, "কি রে তুই খাস নাই? " গা মোচড়াতে মোচড়াতে, লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে বলল, "মারে দিছি, মা খাইব, মা সকালে কিছু খায় নাই" ।
আমার সামনে সব কেমন ঝপাসা হয়ে গেলো, এই একটি শিশুর কণ্ঠে মুহূর্তেই শুনতে পেলাম লাখো কণ্ঠের মিথ্যা অখঙ্কার - "আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।" সব মিথ্যা কথা, সব মিথ্যা শ্লোগান, সব মিথ্যা গান।
অনেকদিন রাস্তায় অভুক্ত শিশু দেখলে চোখে জল আসে না, সে কথা আগেই বলেছি। কিন্তু আবারো অনেক দিন পরে চোখটা একদমই ভিজে গেলো।
একটি অবোধ শিশু নিজে না খেয়ে অভুক্ত মাকে দিয়ে এলো। এরাই তো এই দেশের একদিন হতে পারত সুযোগ্য নাগরিক, এই শিশু জানে নিজে না খেয়ে কি করে অভুক্ত মা কে খাওয়াতে হয়।
আমি এগিয়ে চলছি আমার অফিসের দিকে, আরেকবার শিশুটিকে চিনে রাখতে মন চাইল। কিন্তু তাকাতে গিয়েই বার বার শুধু কষ্টের সাথে কানে বাজচ্ছে আমদের লাখো কণ্ঠে দীপ্ত হুঙ্কারে মিথ্যা অহঙ্কার, "আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি", "আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি"।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


