somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইসলামী ব্যাংকিংয়ে মুরাবাহা

২৭ শে এপ্রিল, ২০১৫ দুপুর ১:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মুফতি মুহাম্মাদ শোয়াইব
মহান আল্লাহ তায়ালা সুদকে হারাম ঘোষণা করেছেন। তবে মানুষের লাভবান হওয়ার জন্য পুঁিজ বিনিয়োগের বিভিন্ন রাস্তা খুলে রেখেছেন। যাতে সুদের মতো ভয়াবহ হারাম কাজে লিপ্ত হতে না হয় এবং বিকল্প রাস্তায় সম্পদ উপার্জনের সুযোগ থাকে। অর্থ বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য কয়েক প্রকার বেচাকেনা নিম্মরূপ।
১. বাইয়ে মুরাবাহা (লাভযুক্ত বিক্রয়)
২. বাইয়ে মুয়াজ্জাল (বাকিতে ক্রয়-বিক্রয়)
৩. বাইয়ে মুদারাবা (উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে বিনিয়োগ)
৪. বাইয়ে সালাম (অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয়)
৫. বাইয়ে মুশারাকা (অংশীদারী ক্রয়-বিক্রয়)
৬. বাইয়ে সারফ (স্বর্ণ রৌপ্য মুদ্রার বিনিয়োগ)
৭. বাইয়ে তাওলিয়া (সমমূল্যে ক্রয়-বিক্রয়)
৮. বাইয়ে মুতলাক (মূল্যের বিনিময়ে পণ্যের ক্রয়-বিক্রয়)
৯. বাইয়ে মুকায়াদা (পণ্যের বিনিময়ে পণ্যের ক্রয়-বিক্রয়)
১০. বাইয়ে মুসাওয়ামা (ক্রয়মূল্য হিসাব না করে বিক্রয়)
১১. বাইয়ে ওয়াদিয়া (ক্রয়মূল্য থেকে বিক্রয়মূল্য কম ধরে বিক্রয়)
১২. বাইয়ে মুজাদিল আলানিয়্যাহ (নিলামে ব্যবসা)
১৩. ইসতিসনা (শ্রমিক দ্বারা উৎপাদন)
১৪. ইজারা (ভাড়া)
ইসলামী ব্যাংক বা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুঁিজ বিনিয়োগের জন্য বেচাকেনার এই সব প্রকার ব্যবহার করতে পারে। এ ছাড়াও ইসলামী ব্যাংকের সামনে উপার্জনের আরও অনেক পন্থা রয়েছে, সেগুলোও ব্যবহার করা যেতে পারে।

মুরাবাহার সজ্ঞা :
মুরাবাহা শব্দটি ‘রিবহুন’ শব্দ থেকে উদগত। এর অর্থ অতিরিক্ত, বাড়তি, লাভ ইত্যাদি। (আলফিকহু আলাল মাজাহিবিল আরবায়া ২/১২০, মাকতাবা শামেলা সংস্করণ) ইসলামী অর্থনীতির পরিভাষায় মুরাবাহা বলা হয় “ক্রয় মূল্যের ওপর লাভ নিয়ে অপর কোনো ব্যক্তির কাছে বিক্রয় করা”। পবিত্র কোরআনে মুনাফা নিয়ে লাভ করা বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। বাইয়ে মুরাবাহা লাভজনক ব্যবসার একটি পদ্ধতি। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ‘হজরত হাকিম বিন হিযাম (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) তাকে এক দিনার দিয়ে বাজারে প্রেরণ করেন একটি বকরী খরিদ করার জন্য। তিনি গিয়ে এক দিনার দিয়ে একটি দুম্বা খরিদ করে আবার দুই দিনার দিয়ে বিক্রি করে গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। আবার গিয়ে এক দিনারে একটি কোরবানীর পশু ক্রয় করে পশু ও অতিরিক্ত এক দিনার রাসুল (সা.) কে এনে দেন। রাসুল (সা.) ওই দিনার সদকা করে দেন এবং তার ব্যবসায় বরকত হওয়ার জন্য দোয়া করেন। তিরমিযি, আবু দাউদ) এই হাদিস দ্বারা ‘বাইয়ে মুরাবাহা’ এর বৈধ্যতা প্রমাণিত হয়।

মুরাবাহার গুরুত্বপূর্ণ শর্তসমূহ :
বাইয়ে মুরাবাহা শুদ্ধ হওয়ার জন্য নিম্মের কয়েকটি শর্ত পাওয়া যেতে হবে।
১. ক্রয় বিক্রয়ের জিনিস পণ্য হতে হবে।
২. কোন প্রকার টাকা পরিশোধ করবে তা চুক্তিপত্রে উল্লেখ থাকতে হবে।
৩. বিক্রিত মালের মূল্য টাকার অংকে নির্ধারিত হতে হবে।
৪. যে মাল বিক্রি করবে সে মাল বাস্তবে উপস্থিত থাকতে হবে।
৫. হালাল মাল হতে হবে।
৬. মাল অস্থাবর সম্পত্তি হলে এর ওপর বিক্রেতার পূর্ণ মালিকানা ও দখল থাকতে হবে।
৭. ক্রয় বিক্রয়ের চুক্তির মধ্যে নির্দিষ্ট সময় সীমা হতে পারবে না।
৮. একই ব্যক্তি ক্রেতা ও বিক্রেতা হতে পারবে না; বরং দুই পক্ষ অবশ্যই থাকতে হবে।
৯. উভয় পক্ষ বুদ্ধিমান হতে হবে। তবে বালেগ না হলেও চলবে।
১০. কোন প্রকারের মাল এবং তার পরিমাণ, গুনাগুণ, মূল্য ইত্যাদি নির্দিষ্ট হতে হবে। নতুবা বিবাদ ও প্রতারণা সম্ভবনা থাকবে।
১১. ক্রেতা ও বিক্রেতার ইজাব ও কবুল দ্বারা চুক্তি সম্পাদিত হতে হবে।
১২. ইজাব ও কবুল একই মজলিসে হতে হবে।
১৩. মালামাল উপকারী ও প্রয়োজনী হতে হবে।
১৪. বিক্রয়ের জিনিস হস্তান্তরযোগ্য হতে হবে।
১৫. মাল ক্রেতার নিকট পরিচিত হতে হবে।
১৬. মূল্য পরিশোধ ও মাল হস্তান্তরের মাধ্যমে চুক্তি কার্যকর হতে হবে।
১৭. নগদ বিক্রয়ের মূল্য পরিশোধ না করা পর্যন্ত বিক্রেতা মাল হস্তান্তর বন্ধ রাখতে পারবে।
১৮. কোনো পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এবং শরিয়ত পরিপন্থী নয় এরূপ যে কোনো শর্ত চুক্তিপত্রে উল্লেখ করা যাবে। কোনো পক্ষ চুক্তিতে উল্লেখিত শর্ত পালনে ব্যর্থ হলে এক তরফা চুক্তি বাতিল করতে পারবে।
১৯. ক্রয় বিক্রয়ের পর কোনো প্রতারণা প্রমাণিত হলে ফেরৎ দেয়ার এখতিয়ার থাকবে। রাখতে চাইলে পূর্ণ মূল্যই পরিশোধ করবে।
২০. আর ক্রেতার নিকট মাল নষ্ট হলে এখতিয়ার বাতিল হয়ে যাবে। ইমাম আবু ইউসুফ (রা.) এর মতে প্রতারণা অর্থ পরিমাণ মূল্য কম দিতে পারবে, উল্লেখিত শর্তসমূহ পাওয়া না গেলে বাইয়ে মুরাবাহা সহিহ হবে না।

সুদি ঋণের বিকল্প মুরাবাহা
ইসলামের দৃষ্টিতে সুদ প্রদান ও গ্রহণ যেহেতু হারাম তাই সুদি ঋণের বিকল্প হিসেবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাইয়ে মুরাবাহা ব্যবহার করা যেতে পারে। অনেক ইসলামী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই মুরাবাহার পদ্ধতি গ্রহণ করে বেশ ভালো ফল পাচ্ছে। যেমন কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কোনো গ্রাহকের বাড়ি বানানোর প্রয়োজনে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। সুদি ব্যাংক থেকে এই অর্থ গ্রহণ করলে সুদি ব্যাংক তার কাছে ঋণের ওপর সুদ গ্রহণ করবে। সুদ থেকে বাঁচার জন্য ইসলামী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ ক্ষেত্রে উক্ত গ্রাহকের সাথে মুরাবাহা চুক্তি করতে পারে। যেমন কোনো গ্রাহকের বাড়ি তৈরিতে এক কোটি টাকার প্রয়োজন। সে এক কোটি টাকা দিয়ে বাড়ির রড সিমেন্ট কিনবে তাহলে সে ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে বরং দ্রব্যটিই সরাসরি ব্যাংকের কাছ থেকে মুরাবাহার ভিত্তিতে কিনতে পারে। এ ধরনের গ্রাহকদের সাথে ব্যাংক এ মর্মে চুক্তি করতে পারে যে, আমরা এই দ্রব্যটি ক্রয় করে শতকরা ১০% লাভে আপনাকে সরবরাহ করব। উভয়পক্ষ সম্মত হলে বৃহৎমানের দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক এ ধরনের মুরাবাহার চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারে। মুরাবাহা নগদ ও বাকি উভয় ধরনের হতে পারে। নগদ মূল্য পরিশোধ করলে ক্রয়মূল্যের ওপর শতকরা যত টাকা লাভ ধার্য করা হবে, ছয় মাস বা এক বছর পরে মূল্য পরিশোধ করার শর্তে লেনদেন করা হলে ক্রয় মূল্যের ওপর সংযোজিত লাভের হার অবশ্যই বেশি ধার্য করা যাবে। বর্তমানে এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন দেশে ইসলামী ব্যাংকগুলো অর্থ বিনিয়োগ করছে। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন যে, এই পদ্ধতিতে অর্থ বিনিয়োগ করার জন্য মুরাবাহার সব শর্ত মেনে চলতে হবে। অন্যথায় সামান্য কারণেই তা সুদে পরিণত হতে পারে।
বাইয়ে মুরাবাহার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা অবশ্যই মনে রাখতে হবে। অনেক দেশের ইসলামী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মুরাবাহাকে অর্থায়নের মাধ্যমরূপে ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু বাস্তবে এটি কোনো অর্থায়ন পদ্ধতি নয়। এটি হচ্ছে ইসলামি অর্থনীতির এক বিশেষ প্রকার বেচাকেনার নাম। তাই বেচাকেনার মৌলিক বিধি-বিধানগুলো এতে লক্ষ্য রাখা জরুরি। বেচাকেনার মৌলিক বিধি-বিধানের প্রতি অবহেলা করলে কোনো বেচাকেনাই শরিয়তের দৃষ্টিতে শুদ্ধতার রূপ পায় না। তবে মুরাবাহা অর্থায়নের কোনো পদ্ধতি না হলেও একে কিছু শর্তসাপেক্ষে অর্থায়ন পদ্ধতিতে রূপান্তরিত করা যায়। সেটা হতে হবে সীমিত পরিসরে এবং শুধু সুদ থেকে বাঁচার কৌশল হিসেবে। তবে মুরাবাহাকে কখনই বিনিয়োগের আদর্শ পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। ইসলামের দৃষ্টিতে অর্থায়নের আদর্শ পদ্ধতি হচ্ছে ‘মুদারাবা’ ও ‘মুশারাকা’। কোথায়ও যদি যৌক্তিক কারণে মুশারাকা বা মুদারাবাকে গ্রহণ করা না যায়, সেখানে প্রয়োজনের খাতিরে ফুকাহায়ে কেরাম সীমিত পরিসরে মুরাবাহার ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। তাই মুরাবাহার ব্যবহার শুধু সেই ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত যেখানে অর্থায়নের মৌলিক ও আদর্শ পদ্ধতি মুদারবা ও মুশারাকা প্রয়োগ করা যায় না।
মুরাবাহাকে অর্থায়ন পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা আছে। সামনের কোনো লেখায় সেগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

সম্পাদক, মাসিক আরবি ম্যাগাজিন ‘আলহেরা’
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার ফিরে আসার পদ্ধতি কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আপা কেন ভারতে বেড়াতে গেলেন সেটা সবাই জানে। আগামী ডিসেম্বরে আপা দেশে ফিরে আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সেটাও সবাই জানে। আপা কিভাবে দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×