আমি পড়তে শিখেছি অল্প বয়সে। বড় ভাইবোনেরা অনেকদিন পর একটা ছোট ভাই পেয়ে বেশ সময় দিতেন আমাকে, অনেকটা খেলনার মতো, তাই হুড়োহুড়ি করে লেখাপড়া শিখিয়ে দিয়েছিলেন। তাই আমি মাসুদ রানা পড়তে শুরু করি ফেলুদারও আগে, ক্লাস ফোরে পড়ার সময়। তার আগে অবশ্য কুয়াশা সিরিজ পড়ে শেষ করে ফেলেছি, আর শঙ্কু খানিকটা। তারপরই এই মহাপুরুষের কীর্তি আমার গোচরে আসে।
তবে আমি এঁচড়ে তখনও পাকিনি। মাসুদ রানার কীর্তি আমাকে বিস্মিত করতো। প্রতি পর্বেই সে নিত্যনতুন কোন নারীর অন্দরমহলে (আক্ষরিক অর্থে নিলে লজ্জা পাবো, আবার রূপক অর্থে নিলেও) আনাগোনা করে, একেওকে মেরেধরে একশা করে ছাড়ে, আবার পদে পদে নানা রসিক বোলচাল ... আমি মুগ্ধ হই তার কার্যকলাপে। ঠিক করি বড় হয়ে মাসুদ রানা হবো। এর আগে ভাবতাম জলদসু্য হবো, দেখলাম জলদসু্য হওয়ার চেয়ে মাসুদ রানা হওয়াই বেশি মাস্তিপ্রদ ও মৌজদায়ক।
মাসুদ রানার বান্ধবীদের প্রেমে পড়তাম আমিও। তাদের দেহ সৌষ্ঠব ও সলজ্জ সমর্পণের রাখোঢাকো বর্ণনা পড়ে সেই বালক বয়সেই একটু পাক ধরলো আমার মনে। হুমম। মনে মনে ভেবে রাখি, অনাগতা সোহানাদের কী কী উপায়ে খাতির করা যায়।
কিন্তু মাসুদ রানার প্রচ্ছদগুলো শাহাদাৎ চৌধুরী একেবারে মন খুলে করতেন। বিবসনা নারীর মোহময়ী কটাক্ষ দিয়ে একেবারে ভরপুর ... মূল্য এক কোটি টাকা মাত্র, আই লাভ ইউ ম্যান, নীলছবি ... এগুলো বেশ ইয়ে প্রচ্ছদসম্পন্ন ছিলো। আমার বড় ভাই খুব যত্ন করে মলাট দিতেন সব বইয়ে, কৌতূহলী বাড়ন্ত আমি আবার মলাট খুলে খুলে উঁকিঝুঁকি দিতাম।
বইয়ের ব্যাপারে বাসায় গুরুজনেরা বোধহয় একটু উদারই ছিলেন, তবে তাঁরা মাঝে মাঝে পঠিত বইগুলো হাতে নিয়ে উলেটপালেট দেখে গম্ভীর হয়ে যেতেন, নিজেদের মধ্যে গুজগুজ করে মাঝেমাঝে ইনজাংশন জারি করতেন, উঁহু, ঐ শেলফের তিন নাম্বার তাকের বইগুলো আরো বড় হয়ে পড়বে। এখন এই নাও, দার্জিলিং জমজমাট পড়ো বরং। দুষ্টু আমি রাজি হয়ে যেতাম লক্ষী ছেলের মতো, কারণ ঐ দাগী তাকের বইগুলো ইতিমধ্যে পড়ে ফেলেছি। মুহাহাহাহাহা।
আমার রানাফিলিয়া অবশ্য বেশিদিন থাকেনি, কয়েক বছর পর রানার অভিযানের মান নামতে থাকে। শান্তিদূতের পর রানা আর পড়িনি সেভাবে, স্কুলের পড়াশোনার চাপ তেমন ছিলো না, তাই কী চাপে পড়ে রানা ছেড়ে দিলাম জানি না নিজেও। এখনও মাঝে মাঝে দানবাকৃতির শেলফের পেছনের সারি থেকে মাঝে মাঝে বার করে পড়ি জিপসী, রিপোর্টার, আই লাভ ইউ ম্যান, হ্যালো সোহানা, বিদায় রানা, চাই সাম্রাজ্য, লাল পাহাড়, অকস্মাৎ সীমান্ত... ভালো লাগে। এক একটা বই যে শৈশবের এক একটা দিনের স্মারক হয়ে আছে, সেটা বুঝতে পারি। সেই পুরনো বাড়ির জানালার মোটা কাঁচ দিয়ে আসা রোদ, কড়ই গাছের ছায়ার কথা মনে পড়ে, এক একটা পৃষ্ঠা উলটাই, মাঝে মাঝে চোখ কেমন ভেজা ভেজা মনে হয়। মাসুদ রানা পড়তে পড়তে আমি আবার শিশু হয়ে যাই।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



