somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইন্দুর দমন কমিশন

১১ ই মে, ২০০৬ রাত ১২:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


এই গল্পটি প্রাচীন বাংলার পটভূমিতে। অধূনা বাংলার কোন কিছুর সাথে মিল খুঁজে পেলে সেটা আপনার কল্পনাপ্রবণ মনের সমস্যা।


আলিশান সদাগরী জাহাজ "নোয়ার দোয়া"। চাটগাঁও বন্দরের গর্ব। সদাগর জনগণ শেঠের জাহাজ। কী না যায় ওতে! চাল, ডাল, পানসুপারি, কাপড়, তেল, গ্যাস, জনশক্তি ... কতকিছু! পণ্যের পসরা সাজিয়ে চাটগাঁও থেকে এ জাহাজ নিয়মিত যায় সিংহলের বন্দর ঘুরে সুদূর গুজরাটের শূপর্ারক বন্দরে। সেখানে মাল বেচে ফিরতি যাত্রায় নিয়ে আসে নানারকম ভারতীয় পণ্য, নিরমা সাবান, বোম্বাই নর্তকী, দিলি্লর লাড্ডু, বিএসএফ মার্কা গুলি, টাটা মার্কা চিরুনী, আরব থেকে আসা দুম্বা, আরো কত কী!

জনগণ শেঠ লোকটা যেন কেমন। মতিগতি বোঝা দায়। জাহাজের কাপ্তানি ঘনঘন পালটান। একবার একে দেন তো আর একবার ওকে। এ যাত্রায় কাপ্তানি করছে দুর্ধর্ষ মগ কাপ্তান কিপের্ালা খান। ঝানু জাহাজী, যদিও মাঝেমাঝেই মাল খেয়ে টাল হয়ে চড়ায় জাহাজ তুলে দ্যায়, ভুল বন্দরে জাহাজ ভিড়িয়ে বসে, জলদসু্য জাহাজ দেখলে জোরসে পাল তুলে ভাগার বদলে নিশান নেড়ে দাওয়াত দেয়। এরও মতিগতি জনগণ শেঠের মতোই, বোঝা ভার। তবে এঁর ওপর জনগণ শেঠের আস্থা আছে, এর আগেও সে কয়েকবার কাপ্তানি করেছে "নোয়ার দোয়া"তে। তবে নিন্দুকেরা বলে একদিন কিপের্ালা খান এই জাহাজ আরব সাগরে ডুবিয়ে ছাড়বে।

তো, পাঁজিপুঁথি দেখে, মৌলবি এনে দোয়া পড়িয়ে বন্দর ছেড়েছে নোয়ার দোয়া। জাহাজ বোঝাই মালসামানা, লোকলস্কর। জলদসু্যদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য কামান থেকে শুরু করে কান চুলকানোর জন্য মিহি তুলাপ্যাঁচানো কাঠি, কী নেই জাহাজে!

দিনের বেলা সূর্য আর রাতের বেলা চাঁদতারা দেখে জাহাজ চলতে থাকে সিংহলের বন্দরের দিকে। তবে কিপের্ালা খানের মেজাজ মর্জি কেমন যেন অদ্ভূত, মাঝে মাঝেই সে ডাইনে বামে জাহাজ মোচড় দিতে বলে। চলতি পথে উদ্ভট ফিরিঙ্গি জাহাজ থেকে প্যাসেঞ্জার তোলে, সামুদ্রিক জেলেদের কাছ থেকে পঁচা অক্টোপাস কেনে দামী তামাকের বিনিময়ে। লোকলস্কররা মৃদু গুঞ্জন তোলে ঠিকই, কিন্তু কিপের্ালা খান ওসবে কান দেয় না। সে জাহাজের কাপ্তান, যা খুশি তা-ই করবে, প্রয়োজনবোধে জাহাজ ডুবিয়ে দেবে, লোকজন গুনগুন করতে চায় করুক না!

কিন্তু একদিন দেখা যায়, জাহাজে প্রবল প্রকোপ দেখা দিয়েছে ইন্দুরের। তারা কাঠ কাটে, বস্ত্র কাটে, কাটে সমুদয়। রান্নাঘর থেকে শুরু করে হাগনকোঠি, কোথাও নিস্তার নেই তাদের হাত থেকে।

জাহাজের লোকলস্কর কাপ্তানের কাছেই নালিশ ঠোকে, বলে ইন্দুরের বড় যন্ত্রণা। কিপের্ালা খান হাসে। বলে জাহাজে তো ইন্দুর একটুআধটু থাকবেই। এটা তো আর জনগণ শেঠের সাতমহলা মঞ্জিল নয়। নোয়া পর্যন্ত তাঁর নৌকায় এক জোড়া ইন্দুর তুলেছিলেন, আর তাঁর দোয়াতে তো তাদের বংশধরেরা একটু ঘুরে বেড়াবেই। এতো খোঁচ ধরতে নেই। লোকলস্কর প্রতিবাদ করে, বলে, ইন্দুর সব কাটে। কিপের্ালা খান হাসে, বলে, ওটাই তো ইন্দুরের কাজ। কাটাকুটি করা। ইন্দুর তো গরু নয় যে দুধ দেবে, হাতি নয় যে কলাগাছ ওপড়াবে।

কিন্তু ইন্দুরের উৎপাত একেবারে অসহনীয় হয়ে পড়ে। উঠতে বসতে ইন্দুর। জাহাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ইন্দুরের দৌরাত্ম্য।

সিংহলের বন্দরে ভেড়ার আগে বন্দর কর্তৃপক্ষ একখানা নাও পাঠায় জাহাজে। সেখান থেকে নেমে এক ভিনদেশী কর্তা ফরমান পাঠায়। এ জাহাজে ইন্দুরের প্রবল উৎপাত, একে বন্দরে ভিড়তে দেয়া হবে না। ইন্দুরের উৎপাত সূচকে নোয়ার দোয়া শীর্ষে। এই ইন্দুর না কমালে এই জাহাজকে বন্দর থেকে ভাগিয়ে দেয়া হবে।

লোকলস্করের মুখ শুকিয়ে যায়। হায় হায়, বাণিজ্য হবে কিভাবে তাহলে? জনগণ শেঠ কী বলবে?

কিপের্ালা খান বিরক্ত হয়ে বলে, কী করতে হবে তাহলে?

বন্দরকর্তা বলে, ইন্দুর দমনের জন্য ব্যবস্থা নেয়া হোক।

কিপের্ালা খান মুচকি হাসে, বলে, এ আর এমন কী? ইন্দুর দমন কমিশন বানিয়ে দিচ্ছি, ওরাই ইন্দুরের তেরোটা বাজিয়ে ছাড়বে!

তখনকার মতো জাহাজ বন্দরে ভেড়ে, কিছু মাল কেনাবেচা হয়, আর রসদ নিয়ে আবার রওনা দেয় শূপর্ারকের দিকে।

লোকলস্কর আবার এসে নালিশ ঠোকে কিপের্ালা খানের কাছে, ইন্দুর দমন কমিশন গঠনের পরও ইন্দুরের দুষ্টুমি কমছে না।

কিপের্ালা খান হাসে মুহুহুহু করে। বলে, আমি তার কী জানি? আমি তো ইন্দুর দমন কমিশন বানিয়েই দিয়েছি, আমার কিসসা খতম এখানেই। তোমরাই গিয়ে শুধাও কমিশনকে, কেন তারা কাজ করে না।

লোকলস্কর কমিশনের কাযর্ালয়ে যায়। জাহাজের খোলে তামাকের গোডাউনের এক কোণায় বসে কমিশনের দুই খুনখুনে বুড়ো কর্মকতর্া, একজন আগে ছিলো খাজাঞ্চি, আরেকজন গোমস্তা। একজনের নাম নিধি সর্দার, আরেকজনের নাম রাম সর্দার। নিধি আর রামের মধ্যে বড়ই কলহ। নিধি যদি ডাইনে যায় রাম যায় বাঁয়ে, তাদের লোকে সারাদিন খুঁজে খুঁজে মরে, নিধি কই, রাম কই, আরে নাই রে নাই রে নাই রে নাই ...। মানে, দু'জনে মিলেমিশে কোন কাজ আজ পর্যন্ত করতে পারেনি।

লোকলস্কর নিধিকে শুধায়, কী ব্যাপার নিধিখুড়ো, ইন্দুর কমে না ক্যান?

নিধি বিড়বিড় করে রামকে গাল পাড়ে। বলে ঐ বুইড়া শকুন আমাকে কোন কাজ ঠিকমতো করতে দেয় না। কমিশনের লোকবল সংক্রান্ত দরখাস্ত পাঠাতে হবে কাপ্তানের কাছে, এ নিয়ে রাম জলঘোলা করছে। সব দোষ ঐ রেমোর।

লোকলস্কর রামের কাছে যেতেই রাম তেড়ে আসে। বলে, নিধি তো এক পা কবরে দিয়ে রেখেছে, ও কী ইন্দুর দমন করবে? আর মস্তিষ্ক বলে কিছু কি অবশিষ্ট আছে এই বয়সে ... সব তো পাইখানার সাথে দরিয়ায় ঢেলে দিয়েছে। নিধির জন্যই আজ জাহাজে ইন্দুরের এই জয়জয়কার। ইন্দুরেরা কাটাকুটি করে নিধি বসে বসে টপপা ভাঁজে।

এভাবেই কেটে যায় দিন। নিধি আর রামের কোন্দলে কমিশনের কাজ এগোয় না। ওদিকে ইন্দুরেরা গায়ে গতরে ফেঁপে কেঁদো হয়ে উঠতে থাকে। কোঁচা কাটে, পকেট কাটে, কাটে সমুদয়।

লোকলস্কর অতিষ্ঠ হয়ে আবার যায় কাপ্তানের কাছে, বলে কমিশন করেও লাভ হচ্ছে না, ইন্দুরের দল একেবারে মনের সুখে দুষ্টুমি করে যাচ্ছে।

কিপের্ালা খান গোঁপে তা দিয়ে মুচকি হাসে। বলে আচ্ছা ঠিক আছে, আমি একটা অর্গানোগ্রাম করে দিচ্ছি, চিন্তার কিছু নেই, স্বাধীন ইন্দুর দমন কমিশন সব ঠিক করে ফেলবে।

কে এক অর্বাচীন ওদিকে ফিসফিস করে বলে, ইন্দুরের যা গতর হয়েছে, এদের নিকেশ করতে গেলে এখন ঢাল তলোয়ার লাগবে। সেই ঢালতলোয়ার কি নিধি সর্দার আর রাম সদর্ারকে দেয়া হয়েছে?
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মুসা নবী এবং ফেরাউন

লিখেছেন রাজীব নুর, ৩০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮



মুসার নবীর নির্দেশ অমান্য করে এবং আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার কারণে-
লোহিত সাগরে ডুবে ফেরাউনের করুণ মৃত্যু হয়। হজরত মুসা আলাইহিস সালাম এমন এক ফেরাউনের আমলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন- যিনি রামেসিস... ...বাকিটুকু পড়ুন

যুদ্ধ ও প্রেমের দিন

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ৩০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪১




অরুনিমা, এখন যুদ্ধ চলছে চারদিকে
তাই হুটহাট ঘর থেকে বের হবেনা, আমার অপেক্ষায় থেকো না বাগানে বসে
কখন যে বোমারু বিমান বোমা ফেলে দেয় বলা তো যায় না।

তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের দামামা বেজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৭২০১৪

লিখেছেন ডি এইচ তুহিন, ৩০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৫৮

"ভাই, এইখানেই নামবেন?"

হেল্পার ছেলেটা দরজার হাতল ধরে আমার দিকে ঠিক এমনভাবে তাকালো, যেন আমি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করতে যাচ্ছি। বাসের ভেতরের হলদে আলোয় ওর মুখটা কেমন বিবর্ণ দেখাচ্ছিল। চোখের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৯২

লিখেছেন রাজীব নুর, ৩০ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১৯



বিএনপি সরকার দেশে ক্ষমতায় আসতে না আসতেই দেশে প্রতারকের সংখ্যা বেড়ে গেছে।
প্রতারক সব আমলেই ছিলো। কিন্তু বিএনপির আমলে যেন প্রতারকের উৎসব শুরু হচ্ছে। দেশে বেড়ে গেছে মারামারি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার পছন্দের বাংলা গানগুলো

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ রাত ১:১১


অনেকদিনের ইচ্ছে পছন্দের বেশকিছু গান নিয়ে একটা পোস্ট দেব। দেওয়া হয়নি, কারণ, বিষয়টা সময়সাপেক্ষ। আজ হুট করে বসেই পড়লাম। রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুলগীতি, লালনগীতিসহ নানান ধরনের গানের একটা তালিকা করছি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×