গত কিছুদিন থেকে গোরস্থানের কোনাটা থেকে প্রায় একটা বাচ্চার কান্নার শব্দ ভেসে আসে
গোরস্থানের মালী প্রথমে ব্যাপারটাকে পাত্তা দিতে চাইল না। বর্তমানে গোরস্থানের দেখাশোনা সেই করে। আগে যে মালী ছিল উনার বয়স হয়েছে। মানুষের বয়স হয়ে গেলে তার মধ্যে মৃত্যুভয় বেশি কাজ করতে শুরু করে। সবসময় গোরোস্থানেই থাকতেন বলে তার মধ্যে মৃত্যুভয়টা মনে হয় আরো বেশি পেয়ে বসেছিল। কাজ ছেড়ে নিজের গ্রামে চলে গেছেন। নতুন মালীর কাজ পাওয়া বেশি দিন হয় নি। এখনি যদি এমন একটা উদ্ভট ব্যাপার নিয়ে মুরব্বী বা ইমামের সাথে কথা বলে তাহলে হয়ত তারা ভাববেন ভয়ে মালী এমন সব কথা বার্তা বলছে। কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না তাকে। কেজানে হয়তো কাজ থেকেও বিদায় করে দিতে পারে। এই ভয়ে ও কাউকে কিছু বলে না। আবার পরক্ষনেই ভাবে আসলেই হয়ত এটা তার ভ্রম। গোরস্থানে মালীর কাজ আগে কখনও সে করেনি। প্রথম বলেই হয়ত এমনটা মনে হচ্ছে। আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু ঠিক হয় না। সে প্রায় সময়েই একটা কান্নার আওয়াজ পায়। খুব ছোট্ট একটা বাচ্চার কান্না। মালী কান পেতে শোনে। হ্যা তো,স্পষ্ট। একটা বাচ্চা খুব কাঁদছে। ভয়ে মালীর বুকের ভিতরটা ধক করে উঠে। কি করবে কিছু বুঝে উঠতে পারে না। কারো সাথে কি এই ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলবে সে। গোরস্থানের পাশ দিয়ে একটা লোক হেঁটে যাচ্ছিলো। মালী লোকটাকে ডাক দিয়ে বলে "ভাইজান,একটু শুনেন।" ডাক শুনে লোকটা এগিয়ে আসে। "কি মিয়া,তাড়াতাড়ি কও। ম্যালা কাম পইড়া আছে।"
মালী লোকটার কানের কাছে মুখটা এনে ফিসফিস করে বলে "কিছু শুনতেসেন?"
-কি? লোকটা পাল্টা প্রশ্ন করে।
-একটা বাচ্চা কান্দে যে,শোনেন না?
-মিয়া,দিনে-দুপুরে নেশা করছো নাকি?কি কও আবোল-তাবোল।
-কান ডা একটু খাড়া কইরা শোনেনই না। কান্দে একটা বাচ্চা।
লোকটা এবার চোখ বড় করে মালীর দিকে তাকায়। ভাবে মালী মনে হয় তাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে। বলে "আমারেই পাইলা মিয়া মজা করার লাইগ্যা। যাও মিয়া কাম করো গিয়া,আমারেও আমার কাম করতে দাও।"
মালী এবার লোকটার একটা হাত ধরে একপ্রকার জোর করেই আরো কাছে নিয়ে আসে। চোখ নাচিয়ে ফিসফিস করে বলে "এহন শুনতেসেন?"
এবার লোকটার শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল রক্ত বয়ে যায়। হ্যা,ঠিকই তো। কবর থেকে একটা বাচ্চার কান্না আসছে। কাঁপা কাঁপা গলায় লোকটা বলে "কোন গৌর থেকে আওয়াজ আসতাসে?"
মালী বলে "সর্ব কোনার টা।"
-গৌরে কান লাগায়া শোনো তো মিয়া।
মালী ভয়ে ভয়ে কবরটার কাছে যায়। উবু হয়ে বসে কান পেতে শোনে। কোনো সন্দেহ নেই,এই কবরটা থেকেই কান্নার শব্দ আসছে। মালী দরদর করে ঘামতে থাকে। গলা ভারী হয়ে আসে। "আল্লাহ হু আকবার" বলে চিৎকার করে। বলে "ভাইজান, এই কবরের মধ্যে বাচ্চা কান্দে।"
-ঐটা তো নাজনীনের কবর। মাসখানেক আগে মারা গেছে। মরার আগে আট মাসের পোয়াতি ছিল।
দুজন দুজনের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। দুজনেরই চোখে পানি। চোখে মুখে অজানা এক আতঙ্ক। মালী বলে "কি করবো ভাইজান? বুকটা তো ফাইটা যাইতেসে।"
-চল ইমাম সাহেবের কাছে যায় বলে দুজনে মসজিদের দিকে "আল্লাহ হু আকবার" বলতে বলতে দৌড় দেয়।
ইমামকে সব কথা খুলে বলে।তারপর মুর্দার বাড়ির লোকজনকে খবর দেয়া হয়। ইতিমধ্যে গ্রামের সবাই ঘটনা জেনে গেছে। দলে দলে সবাই গোরস্থানের কাছে ভিড় জমায়।
ইমাম সাহেব কবরের সামনে এসে দাঁড়ালেন।ভিতর থেকে কোনো শব্দ আসছে না। তিনি মনে মনে দোয়া পড়ছেন। একসময় বললেন "তোমরা ঠিক শুনছো তো?"
একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন খোদার নামে কসম কাটে। এরপর ইমাম মুর্দার পরিবারের অনুমতি নিয়ে কবর খোঁড়ার অনুমতি দেন।
-একটা ফুটফুটে বাচ্চা ঘুম ঘুম চোখে তার মৃত মায়ের দুধ পান করছে।
ইমাম সাহেব চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলেন "আল্লাহ হু আকবার।"

সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ দুপুর ২:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




