somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রূপকথার রাজকুমার- নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী

২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ বিকাল ৩:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মনে আছে ব্লকব্লাস্টার “সারফারস” এর কথা?? কিংবা ধরা যাক রাজকুমার হিরানির “মুন্নাভাই এম বি বি এস” এর কথা।যেকোনো বলিউড সিনেমাপোকাদের মাথায় এই সিনেমাগুলো অনেকদিন গিজগিজ করবে সমসাময়িক সুপারহিট নায়ক আমির খান বা সঞ্জয় দত্তের অভিনয়গুণ,সাবলীল স্ক্রিপ্ট বা অসাধারন ডিরেকশানের জন্যে।কিন্তু কজন জানে এইসব মুভিতে একজন সত্তিকারের অভিনেতা তার অঙ্কুর গজাচ্ছিলেন।হ্যাঁ, সারফারসে আমির খানের হাতে পিটুনি খেতে খেতে প্রান ভিক্ষে চাওয়া বা মুন্না ভাই এম বি বি এস –এ লাথি খাওয়া পকেটমারটার কথা বলছি।হোক কয়েক সেকেন্ডের অভিনয়,হোক জুনিয়র আর্টিস্ট,এত এত অসাধারনের ভিড়ে হয়ত কেউ ঐ অতি সাধারনটাকে খেয়াল করে নি,তবুও তিনি ছিলেন।আর এখন?তিনি এখন আছেনই নয়,বলিউডের ইতিহাসে তিনি আজীবন থাকবেন।

নাম- নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি।

“কেউ যখন আমার দিকে তাকায়, মনে হয় সে আমাকে দেখছে না। আমার ভেতর অন্য কাউকে খুঁজছে। তারা আসলে আমাকে নয়, আমার ভেতরের তারকাকে খোঁজে। কিন্তু আমার তো সেই তারকাদ্যুতি নেই। তাই তাদের সেই চাহনির সঙ্গে এখনো আমি অভ্যস্ত হতে পারিনি” কথাগুলো নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকির।যশ,খ্যাতি আর অর্থের প্রাচুর্য হলেও পা এখনো মাটিতেই আছে নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকির।রূপকীয় কথা হলেও অজপাড়া গ্রামের মাটি থেকে উঠে এসেই বিশ্ব মাতিয়েছেন এই মানুষটা।কৃষক বাবার নয় ছেলেমেয়ের মধ্যে নওয়াজ সবার বড়।অভাবের সংসারে যেখানে তিনবেলা খাবার জোটানই দায় সেখানেও নওয়াজউদ্দিন শেষ করেছেন তাঁর গ্রাজুয়েশন।ওহো,গ্রামের প্রথম গ্রাজুয়েট!!গল্প-উপন্যাসে ছাই এর মধ্যে খুব সহজেই মুক্তো পাওয়া যায়।নওয়াজউদ্দিন কোন গল্প-উপন্যাস নন,সেজন্যই হয়ত সেই ছাই এর কয়লাটার মুক্তো হওয়াটা খুব সহজ ছিল না।

কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিঙের ডিগ্রি ছিল।একটা কোম্পানিতে কেমিস্টের চাকরিও করতেন।চাইলেই আর পাঁচটা সাধারন মানুষের মত জীবন বেছে নিতে পারতেন।কিন্তু না,স্বপ্ন তাঁকে ঘুমাতে দিত না।তাড়িয়ে বেড়াতো প্রতিনিয়ত। তাইত সবকিছু ছেড়েছুড়ে শুধুমাত্র মেধা,বিশ্বাস আর স্বপ্নটাকে পুজি করে চলে এলেন মুম্বাই।যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ তাদের স্বপ্ন নিয়ে এই শহরটাই ভিড় করেন।সত্যি হয় কজনের?হারিয়ে যান তারা যারা হাল ছেড়ে দেন।কিন্তু নওয়াজউদ্দিন তো হাল ছেড়ে দেবার মানুষ নন। তাইত ভারতের উত্তর প্রদেশের অখ্যাত গ্রাম বুধানায় জন্ম নেয়া নওয়াজ তার পরিশ্রম ও ধৈর্যের জোরে আজ বিখ্যাতদের কাতারে।

সাল ২০০০। নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকির শুরুর গল্পটা মোটেই সিনেমার মত “নায়কের এন্ট্রি” টাইপ ছিল না। থাকবেই বা কেন, কৃষ্ণবর্ণ নওয়াজের না ছিল নায়কের মত চেহেরা,না ছিল সিক্স প্যাক অ্যাবস।তবে হ্যাঁ, ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা থেকে নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকির ডিগ্রি ছিল।কিন্তু এটা তো আর কোন লিখিত পরীক্ষা নয় যে ডিগ্রি থাকলেই সিনেমাই ভাল রোল পেয়ে যাবেন।নওয়াজউদ্দিন ঘুরতে থাকলেন পরিচালক, প্রযোজকদের অফিসে অফিসে।যেখানেই কড়া নাড়েন,ফিরে আসতে হয় সেখান থেকেই।রোজগার নেই,পকেটে খাবার টাকা নেই,রাতে ঘুমানোর জায়গা নেই।তবু আঁকড়ে পড়ে থাকেন মুম্বাইয়ে।শেষমেশ একটা অফিসে নিশিপ্রহরীর চাকরি নিলেন।আশা,তাতে অন্তত যদি হাতখরচটা আসে।ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা-র বড় ভাইয়ের সাথে রুমে উঠলেন এই শর্তে যে বড় ভাইয়ের জন্য খাবার তৈরি করতে হবে।দাঁতে দাঁত চেপে নওয়াজ তাতেই রাজি হয়ে গেলেন।ভাবলেন মরতেই যদি হয় তবে মুম্বাইয়েই মরবেন অন্তত নিজেকে সান্তনা তো দিতে পারবেন যে তিনি চেষ্টা করেন নি।

ঘুরতে ঘুরতে নওয়াজ “সারফারস” ছবিতে প্রথম সুযোগ পেলেন।কয়েক সেকেন্ডের অভিনয়।ছোট-খাট চরিত্র।তিনি করলেন...। এমনিভাবে “মুন্নাভাই এম বি বি এস” “ব্লাক ফ্রাইডে” “পিপলি লাইভ” “ডেভ ডি” “দ্যা বাইপাস” “নিউ ইয়র্ক” এমন অনেক ছবিতেই ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করতে লাগলেন।ইতিহাস সাক্ষী, কঠোর পরিশ্রমী মানুষকে ভাগ্য কখনও হতাশ করে না। নওয়াজউদ্দিন দেখা পেলেন পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপের সাথে।যার চিন্তা ভাবনার সাথে নওয়াজউদ্দিনের চিন্তা ভাবনা মিলে গেলো একেবারে খাপে খাপ। অনুরাগ বানালেন সুপারহিট “দ্যা গ্যাংস অব ওয়াসিপুর”।যেখান থেকে নতুনের শুরু হল নওয়াজ এর।আর বলিউড আবিস্কার করল একজন সত্তিকারে অভিনেতা।

এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি নওয়াজকে। “পান সিং তমার” “কাহানি” “দ্যা লাঞ্চবক্স” “তিন” কিক” “বাজরাঙ্গি ভাইজান” “মাঝি দ্যা মাউনটেন ম্যান” “রইস” “তালাশ” “রমণ-রাঘব” “বাদলাপুর” “গ্যাংস অব ওয়াসিপুর ২” “হারামখোর” এমন বেশ কিছু ছবিতে শক্ত অভিনেতা হিসেবে নিজের ছাপ রেখেছেন নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি। সময়টা এখন একেবারে বদলেছে নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকির।প্রযোজকরা এখন টাকা লগ্নি করার জন্য নওয়াজউদ্দিনের পিছু নিচ্ছেন।বরং সময় দিতে পারছেন না নওয়াজউদ্দিন নিজেই।বিষয়টা এমন নয় যে একক অভিনেতা হিসেবে নওয়াজউদ্দিনের ছবি শত শত কোটি রুপির আয় করছে কিন্তু তার ছবি নিয়ে আসছে দেশ-বিদেশের পুরস্কার, আর সম্মাননা।কারন, নওয়াজউদ্দিন বলিউডের মাল-মশলা ঘরানার ছবি থেকে বেরিয়ে এসে ছবি করেন অন্য আঙ্গিকের।যেখানে গল্প বলা হয় সম্পূর্ণ আলাদাভাবে,গল্পই তৈরি হয় নওয়াজউদ্দিন চরিত্রটাকে মাথায় রেখে।

খুব বেশি সিনেমা তিনি করেন নি।কিন্তু যে অল্প কিছু সিনেমা তিনি করেছেন সেখানে তিনি রেখেছেন নিজের প্রতিভা।আর এই প্রতিভা দিয়েই তিনি বলিউডে গেড়েছেন নিজের শক্ত খুঁটি।হোক সেটা বলিউডি মারকাটারি ছবি কিংবা আর্ট ফিল্ম। নওয়াজউদ্দিন সবখানেই ফিট।যদিও মারকাটারি ঘরানার ছবি খুব একটা পছন্দ নয় নওয়াজের, তবুও তিনি মাঝে মাঝে নিজের খোলস থেকে বেরিয়ে এসে এমন ছবি করেন।কারণটা জানলে একটু অবাকই হবেন।এর পিছনে আছে নিজের গ্রামের মানুষের প্রতি ভালবাসা।কেউ কি জানেন নওয়াজউদ্দিনের গ্রামের মানুষদের কাছে সবচেয়ে পছন্দের ছবি “কিক”। আর সবচেয়ে পছন্দের দৃশ্য??

“কিক” ছবিতে সালমান খান-কে মারা নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকির সেই ঘুষি।

সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ বিকাল ৩:২০
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রশ্নের আগুন যুক্তির মহাযাত্রা :প্রজ্ঞার জয়ধ্বনি বিজ্ঞান ও যুক্তির মহাকাব্য ২য় পর্ব ।

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০১ লা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:০৮


আদিতে ছিল প্রশ্ন
অন্ধকার আকাশের তলে দাঁড়িয়ে মানুষ
চেয়ে দেখেছিল নক্ষত্রের দিকে
মনে তার জেগেছিল বিস্ময়
কে জ্বালালো এই দীপ
কেন ঘোরে পৃথিবী, কেন নামে বৃষ্টি
কেন জন্ম, কেন মৃত্যু
কেন এই অনন্ত চলা?
উত্তর ছিল না হাতে
ছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাফপ্যান্ট ফুলপ্যান্টের দেশে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০১ লা অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৪:২৮


বাংলাদেশে যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখতে ভালোবাসেন, তারা সাধারণত খুব নিরীহ বিষয় পছন্দ করেন। এর একটা কারণও আছে। বেশিরভাগ মানুষই অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক এড়িয়ে চলতে চান। এমন কোনো বিষয় নিয়ে লেখা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আইনের ঊর্ধ্বে কেউ না - সরকারের পদক্ষেপ প্রশংসনীয়

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০১ লা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:৪৫




মিরপুর-১ রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগের ঘটনায় ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে এমপি পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া সরকারের একটি সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ বলেই মনে করি। তবে পদত্যাগের নির্দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফেরারী বিকেল

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ০১ লা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:১৫

বাংলা বর্ষপঞ্জীর ষষ্ঠ মাস, আশ্বিনের শুরু থেকেই দিনের ‘বিকেল বেলা’ টা আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করে। আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহ থেকে আহ্নিক পরিবর্তনের ফলে প্রতিদিনের দৈর্ঘ্য একটু একটু... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্ধকারের রসায়নবিদ, Case File 02 — সিউলের অসমাপ্ত গুলি

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০১ লা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৯


লেখকের নোট:
এই গল্পটি ১৯৭৪ সালের দক্ষিণ কোরিয়ার একটি ঐতিহাসিক হত্যাচেষ্টার ঘটনাকে পটভূমি হিসেবে নিয়ে নির্মিত সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম থ্রিলার। ঐতিহাসিক ব্যক্তি ও ঘটনার পাশাপাশি প্রফেসর রেহান আশরাফ, তাঁর পরিকল্পনা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×