somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কানাডিয়ান ম্যাপল দেখবো বলে

২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ রাত ১২:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Click This Link


১।
২০১৫ এর নভেম্বর এ কানাডার পি আর ভিসা পেলা। ২০১৪ এর অগাস্ট এ যখন আবেদন করি তখন দেশে আমার চাকরির ভবিষ্যৎ এবং বর্তমান দুটোই ভালো ছিলোনা। তার উপর ছিল অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ফলাফল : পি আর এর আবেদন। তদুপরি ২০১৫ হতে কানাডা সরকার ইমিগ্রেশন প্রণালীতে বিশেষ পরিবর্তন আন্তে যাচ্ছিল, তাই এরপর আর আবেদন করার সুযোগ থাকে কিনা তাও ওই সময় বিশেষ বিবেচণায় ছিল।
যাই হোক, আসল প্রসঙ্গে আসি, আবেদন করার প্রায় দেড় বছর পর ভিসা পেলাম। ইতিমধ্যে দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতির নাটকীয় (!) উন্নতি ঘটে। ভালো কি মন্ধ তর্ক সাপেক্ষ কিন্তু রাজনীতির মাঠ আপাতত দীর্ঘ সময়ের জন্য এক দলীয় খেলায় পরিণত হয়। সরকার নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করে এবং সরকারি চাকরির বেতন পরিণত হয় বেসরকারি স্ক্যালের সমান অথবা ক্ষেত্র বিশেষে ছাড়িয়ে যায়। সকরকারী কাজ করে বেসরকারি বেতন, এর চেয়ে লোভনীয় আর কি হতে পারে?!! বেতন হয়ে গেলো প্রায় দ্বিগুন। শুরু হলো কানাডা যাওয়ায় নিয়ে দোটানা।

যাবো কি যাবোনা করে করে ভিসার মেয়াদ শেষ হবার এক মাস আগে তল্পি-তল্পা গুছিয়ে কানাডার লন্ডন শহরে আগমন। লন্ডন আসার কারণ ওখানে ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার সুযোগ পেয়েছিলাম। জুলাই ২০১৬ তে লন্ডন এর বাঙালি পাড়া (২৫১/২৬১ প্লেটস লেন) এ এসে উঠলাম এক পরিচিত বড় ভাইয়ের সহায়তায়। উঠার পর আরো বেশ কিছু বুয়েটিয়ান সহপাঠীর দেখা মিললো।
কানাডিয়ান সামার, তারউপর ক্লাস শুরু হতে দুমাস বাকি। সুতরাং রঙিন দিনগুলি ভালোই কাটছিলো। বন্ধুদের গাড়িতে সওয়ার হয়ে লন্ডন চরে বেড়ানো, লেক অন্টারিও/হুরণ অথবা এরির পার ধরে গাড়ি নিয়ে ছুটে চলা, পিকনিক, ঘর ঘুছানো...ভালোই কাটছিলো দিনগুলি, কিন্তু....

লন্ডন, অন্টারিও প্রধানত ভার্সিটি কেন্দ্রিক শহর। তাই বাংলাদেশী যারা আছেন তারা প্রধানত বর্তমান ছাত্র অথবা প্রাক্তন ছাত্র কিন্তু নানা কারণে মায়ায় পরে রয়ে গেছেন। ছাত্র হওয়াতে সামারের এই সময়টায় বিকেল (৭ টা থেকে ৯ টা) কিংবা সপ্তান্তে তারা প্রায়ই ফ্রি থাকেন। তাই, ফ্রি গাড়ি , ফ্রি সময়...ঘুরতে মানা কি?! কিনতু সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো বাকি ৫ দিন নিয়ে। একেতো দীর্ঘদিনের পুরোনো অভ্যাস , তার উপর কানাডার গ্রীষ্মের দীর্ঘ দিন (!), ঘরে বসে ফেসবুকিং করে করে সময় কাটানো টাফ হয়ে গেলো। তাছাড়া সময় কাটাতে যতই ফেসবুকে ঢুকছি, ততই দেশের বন্ধুদের পোষ্ট দেখে বুকের ভিতর অজানা বেথাটা মুচড়ে উঠতে লাগলো। ফেসবুকটাই আসলে যত নষ্টের মূল! ফেসবুকে তাদের রংচঙ্গে এবং ঝকঝকে পোস্ট দেখেই এ দেশে আসা আবার আসার পরে দেশের বন্ধুদের পোস্ট দেখে হতাশার শুরু!
ভাবলাম ক্লাশ শুরু হতে যেহেতু দেরি আছে, যাই একটু জব মার্কেট থেকে ঘুরে আসি। শুরু করলাম চাকরি খোজ। ওমা, একি অবস্থা?! আবেদন করবো কি? এখানে দেখি আমার ফিল্ডের জবের সার্ক্যুলারি নেই! বলে রাখা ভালো, দেশে চাকরি করতাম বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এ। সবে ধন নীল মনি ওই একটাই এয়ারলাইন। না আছে কোনো ভবিষ্যৎ, না ছিল কোনো অতীত। অন্যের অনুগ্রহের দিকে তাকিয়ে বসে থাকা। কখন উনি অবসরে বা মারা যাবেন আর তাতে পোস্ট ফাঁকা হবে এবং প্রোমোশনের সুযোগ আসবে। তাও আবার প্রমোশন হবে সিরিয়াল অনুযায়ী। নো চান্স ফর সিরিয়াল কিলার! (অর্থাৎ যতই যোগ্য হউন না কেন, দুনিয়ায় পরে এসেছেন তো পরে আসুন!) ফলাফল: ৮ বছর যাবৎ তাবৎ সময় একই পদে এবং আমার অধীন একজনই মাত্র বেক্তি- অফিস পিয়ন! সেও আবার নানা বেস্ততায় ঠিক মত সার্ভিস দিতো না!
আটলান্টিক সাগরের তল খোঁজার মতো সারা কানাডা জুড়ে, অনলাইন ঘুরে ঘুরে যত এয়ারলাইন্স বা এভিয়েশন সম্পর্কিত কোম্পানি ছিল, ওয়েবসাইট বের করে হেড অফ হিউমান রিসৌর্স অথবা হেড অফ মেইনটেনেন্স বরাবর সিভি পাঠাতে থাকলাম। যদি লাইগ্গা যায় আর কি! কিন্তু লাগবেটা কোথায়? টার্গেট ফাঁকা বা আদৌ থাকলেতো! সারা রাত জেগে জেগে এপলাই এন্ড দিনভর ঝিমানোর দিন শুরু। শেষে এমন হল, কোম্পানির নামের শুরুতে এ(A/AV, starting letters for any aviation related company, like aerotek, avia, AAA…though they are not all necessarily related to aviation! ) থাকলেই ঢু মারতে লাগলাম.......

স্বপ্নের আকাশে আনন্দ শেষে হতাশার কালো মেঘেরা আনাঘোনা শুরু করলো। দেশে ফেলে আশা চাকরি, রুটিন করে সকাল ৯ টায় অফিসে যাওয়া, কলিগদের সাথে হালকা হাসি তামাশা, অফিসিয়াল লাঞ্চ, শীতকালীন পিকনিক, এয়ারপোর্ট এলাকায় বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ানো এসবের কথা মনে পড়তে লাগলো।
লন্ডন শহর ছাত্র কেন্দ্রিক হওয়ার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। সুবিধা হলো আশেপাশের সবাই মোটামুটি একই বয়সের এবং একই ব্যাকগ্রাউন্ডের হয়। এতে মতের সাথে সাথে মনেরও মিল পাওয়া যায় যা সময় কাটানো অথবা হোম সিকনেস কাটাতে শুরুর দিকে খুবি গুরুত্বপূর্ণ। আর অসুবিধার মধ্যে হলো ক্লাশ চলাকালীন ছাড়া বাকি সময়টাতে পুরো শহরটা খাঁ খাঁ করে। লোকজন, বেচাবিক্রি কম হওয়াতে সারভাইভাল কাজের সুযোগ নাই বললেই চলে। বিকেল ৬ টা বাজতে না বাজতেই দোকান পাট, রাস্তা ঘাট সবকিছুতে ঝাঁপ পড়ে যায় (পানশালা ব্যতীত!) . অথচ ওই সময়টাই হলো বাইরে বেরুবার, দলবেঁধে লাফাঝাফি করার উপযুক্ত সময় যা আমরা দেশে করে আসতে অভভস্থ। কিন্তু এখানে আপনি রাস্তায় বেরুবেন, কি সুন্দর ছিমছাম চারিদিক, বৌয়ের হাত ধরবেন সাথে মনে ধরবেন গুনগুন গান ...৫ মিনিট, ১০ মিনিট বা ১৫ মিনিট ভালোই লাগবে। কিন্তু এরপরই একাকিত্ব বা নির্জনতার বিষাদ সিন্ধু আপনাকে গ্রাস করতে থাকবে। আশেপাশে মানুষ না থাকলে বা নিজের ভালোলাগা কারো সাথে শেয়ার করতে না পারার ভিতর যে এতো অতৃপ্তি তা এর আগে আপনি কখনোই অনুভব করতে পারবেন না। ধরেন আপনি খুব সুন্দর একটা মুভি দেখলেন, বা কোনো হাসির নাটক, মনে হয়না যতক্ষণ তা আপনি আপনার প্রিয়জনদের না দেখাচ্ছেন বা আলাপ করছেন ততক্ষণ উপভোগটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়? ঠিক এক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সুন্দর পরিবেশ, সিনিক বিউটি, বিশুদ্ধ বাতাস কিন্তু যতক্ষণ না আপনি সে বাতাস বা সুন্দর্য অন্যের মাঝে বিলাতে পারছেন ততক্ষন পর্যন্ত আপনার বুকের মাঝেই তা জমতে থাকবে এবং জমতে জমতে তা আপনার জন্য আনন্দের চেয়ে বেদনার বা হা হুতাশের ভারে পরিণত হবে, মনে হবে আহা যদি মা বাবাকে বা ছোট ভাইটিকে অথবা পাড়ার বন্ধুদের এই পরিবেশ দেখতে পারতাম! নিজে উপভোগ করছেন তাই নিজেকে ভাগ্যবান ভাবার চেয়ে তখন আপনজনদের দেখাতে পারছেন না এই দুর্ভাগ্যই বেশি ধরা পড়ে! (আত্ম্যকেন্দ্রিক বা unsocial হলে ভিন্ন কথা)।

যাই হোক, প্রথম প্রথম মজা লাগলেও এরপর আস্তে আস্তে লন্ডনের সৌন্দর্য একঘেয়ে হতে শুরু করে আর বেশি বেশি মনে পড়তে থাকে ঢাকার রাস্তার যানজট, হকারের হাঁকডাক, রাস্তার পাশের টং দোকান। অনেকেই হয়তো বলবেন এসব নোংরা, সেঁতসেঁতে, অস্বাস্থকর। আমিও দ্বিমত করবোনা। কিন্তু এসবতো আমাদের ফেলে আসা স্মৃতি। স্মৃতিকি কখনো ওসাস্থকর হয়? স্মৃতি সবসময়ই সজীব সতেজ। তা আপনি গুলশানেই বড় হন আর সীতাকুণ্ডের মতো গ্রামীণ জনপদ থেকে। যা আপনি হারাবেন তা সবসময়ই মধুর!
এসব ভুলে থাকতে বেশি বেশি করে ক্যারিয়ার প্ল্যানিং এ মনোযোগ দিলাম। সিভি লেখার অনলাইন কোর্স, জব ইন্টারভিউয়ের প্রস্তুতি, আসন্ন মাস্টার্সের জন্য ব্রিজিং প্রোগ্রাম হাবিজাবি ইত্যাদিতে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করলাম। মাঝে ২৫১ আর ২৬১ প্লেটস লেনের বাঙালিদের কয়েকভাগে করে ছোটোখাটো একটা ফুটবল টুর্নামেন্ট হয়ে গেলো। যারা কখনো ফুটবলে ফুটি ফেলেনি তাদের মহা আগ্রহ নিয়ে প্রতিদিন মাঠে হাজির হতে দেখে কাজী সালাউদ্দিনের প্লানিঙে কি কি ভুল থাকতে পারে তা গবেষণার একটা বিষয় হয়ে দাঁড়ালো আমার কাছে!
দেখতে দেখতে সেপ্টেম্বরের মধ্যভাগে ক্লাশ শুরু হয়ে গেলো। যাক এইবার বুঝি কর্মহীনতার দিন শেষ হলো। বুকের ভিতর বুয়েট লাইফের মজার দিনগুলি ফ্ল্যাশ ব্যাক এ একের পর এক হাজির। তর আর সয় না। আবারো ফিরে যাবো ভার্সিটি লাইফের হৈহুল্লোরে পরিপূর্ণ সম্পূর্ণ নতুন জীবনে। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। ২০ বছর বয়সের এবং ৩২ বছর বয়সের ছাত্র জীবনের মাঝেযে ব্যবধান হাজারো ছত্রের তা ক্লাস শুরুর দু দিনেই টের পেলাম!

২।

কানাডার ছাত্র জীবন ভীষণ কষ্টের। টিউশন ফি বেশি হওয়াতে সবাই বেপক সিরিয়াস। ফেল করে এক সেমিস্টার দুবার করতে কেউই ইচ্ছুক না তার উপর সামারে কোর্স কম থাকায় বাকি সময়টায় চাপ পরে বেশি আর স্কলারশিপসহ মাস্টার্স হলেতো কোথায় নেই,পড়া এবং চাকুরীর খাটুনি দুটোই আছে। এতো বেস্ততার ভিড়ে ক্লাশ চলাকালীন ছাত্রদের অন্যদিকে নজর দেবার সময় খুব কম। আর আমার মত পরিবারওয়ালা বুড়ো ছাত্র হলে বেস্ততার কারণে ক্লাশ করাই দায়! সহপাঠীদের সাথে বয়সের গ্যাপটাও চোখে পড়ার মত। কোনো কিছু শেয়ার করতে কেমন যেন সংকোচ হতো। আপনারা বলবেন পড়ার আবার বয়স কি ? আমি বলবো, জনাব পড়ার কোনো বয়স না থাকলেও পড়া উপভোগের কিন্তু একটা বয়স আছে। বাড়ির দেয়াল কাঁচা থাকতে যেকোনো সাইজের ইট সেখানে পোতা গেলেও দাঁড়িয়ে যাওয়া দেয়ালে নতুন ফুটো করে রড ঢুকাতে গেলে দেয়ালেই ফাটল ধরবে!
তবুও দাঁতে কলম (দাত) চেপে শুরু করে দিলাম এই আশায় যে, উন্নত, আধুনিক দেশ, নতুন কিছুতো শিখতে পারবো যা আমাদের মতো পিছিয়ে পড়া দেশে পাইনি। নামকরা প্রথম সারির কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় ! ল্যাব ফ্যাসিলিটিও না জানি কেমন হবে। হয়ত দেখবো চারদিকে নানান অত্যাধুনিক কলকব্জার ছড়াছড়ি! ডান বাম যেদিকে তাকাই দেখতে পাবো ল্যাপটপ, রোবট, আরো কত কি !

বিধিবাম!! ফল সেমিস্টারে যে ৪ টা কোর্স নিলাম তার ৩ টাই ইতিমধ্যে বুয়েটে পড়ানো শেষ এবং বাকিটা ননডিপার্টমেন্টাল। ফুলে ফাঁপা বেলুনে হটাৎ পিন ডুকালে যেমন ভুশ করে চুপসে যায় তেমনি আমার ক্লাশ লেকচারে মনোযোগ দেবার ইচ্ছা এবং আগ্রহ দুটোই হারিয়ে গেল। থাকবেইবা কি করে? সবি যে বুয়েটের কল্লানে আগেই জানা! ননডিপার্টমেন্টাল কোর্সের শিক্ষকমশায়কে দেখে মনে হত ওনাকে ইচ্ছের বিরুদ্ধে কেউ এই রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছেন, পালাতে পারলে বাঁচেন!

একেতো পুরাতন পড়া, তারউপর পকেটের টাকা দিয়ে মাস্টার্স করছি, তাই কোর্সের প্রায়োগিকতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে লাগলাম। অনেকের কাছে শুনেছি এখানে উচ্চ শিক্ষা নিলে চাকরি পেতে সহজ হয়। কিন্তু এই মানের সুউচ্চ শিক্ষায় কিছু হবে বলে নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। ওয়েস্টার্নের মত ভার্সিটিতে এই অবস্থা হলে বাকিদের কি অবস্থা ভাবুন। হয়ত আমারটা কোর্স বেসড বলে তাই কিন্তু তাতেও হিসেবে মিলছেনা। কি করি, কি করি। ৫০০০ ডলার পেমেন্ট হয়ে গেছে। ভর্তি বাতিলের শেষ সময় মিড্ অক্টোবর। অক্টোবর এসে গেছে। এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে নাহলে আরো ১০০০০ ডলার হাওয়া হবে। এই ভার্সিটির জন্যই এখানে আসা। ভর্তি বাতিল করলে করবোটাকি? কোনো অড জব ও পাচ্ছি না যে করে কিছু সেভ করবো। টরন্টো মুভ করার কথাও ভাবি মাঝে মাঝে। কিন্তু সমস্যা হলো বৌ খুব খুশি এখানে। আমাদের বন্ধুদের বৌরা আবার কাকতালীয়ভাবে কাছাকাছি বয়সের তাছাড়া সব বৌরা আবার মোটামুটি বেকার জীবন কাটাচ্ছে তাই তাদের মধ্যে আড্ডাবাজি ভালোই জমছে। তার উপর ঢাকাতে মেয়েরা যতটাই নিরীহ এখানে ততটাই মহীরুহ! সে এখানেই থাকবে। প্রয়োজন হলে একা একা! আমাকে মাসে মাসে কিছু পাঠালেই হবে!

যাই হোক, বিমানের কলিগদের সাথে টুকটাক আলাপ হতো। শুনছি বিমান সরকার প্রদত্ত পে- স্কেল বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। সবাই বেস্ত কার বেতন বেড়ে কত হচ্ছে এই হিসেবে। দু একজন আগ বাড়িয়ে আমারটাও হিসেবে করে দিচ্ছে আমি কত পেতাম। এর মধ্যে চুড়ান্ত ঘোষণা এবং সাথে ইন্ডিভিজুয়াল বেতনের সার্কুলার জারি হলো। আমার বেতন বেড়ে হল লক্ষাধিক (আফটার ট্যাক্স)!! মাথাতো পুরাই নষ্ট!
ভার্সিটির খুব পাশেই মনোরম একটা পার্ক ছিল-গিবনস পার্ক। বাসা থেকে একটু দূরে হলেও হেটে যেতে খারাপ লাগতো না। সময় পেলেই বৌকে সাথে নিয়ে পার্ক থেকে একটু ঢুঁ মেরে আসতাম। যতটা না প্রকৃতি দেখতে তার চেয়ে বেশি মানুষ দেখার আশায়! শনি রবি বেশি যেতাম মানুষের আনাগোনা বেপক (!) বাড়ে তাই। অন্য দিনগুলিতে পার্কের পরিবেশটা থাকতো গা ছমছমে সুন্দর। সবচেয়ে যেটি দেখার মতো ছিল এর মসৃন পিচঢালা বাইক লেনটা। দেখলে পা নিশপিশ করতো! একটা দ্বিচক্রযান থাকলে মন্দ হতোনা। এদিকে মনের ভেতর দোটানা, লন্ডন থাকি কি না থাকি। শেষমেশ সকল দোটানা ছুড়ে ফেলে পা-টানা সাইকেল একটা কিনেই ফেলবো মনস্থির করলাম। যদি লন্ডন ছেড়েই যাই তবে ওয়ালমার্টের ৯০ দিনের ফেরত দেয়ার সুযোগের সদ্যবহার করার সুযোগতো থাকলোই। গেলাম নিকটস্থ ওয়ালমার্ট এ। এদিক ওদিক ঘুরি ফিরি। বেরুবার সময় বাজেট ছিল ১০০ ডলার। কিন্তু ফেরত যদি দিবো তবে দামি কেন নয়? ১০০ ডলার বাজেট মুহূর্তেই হয়ে গেলো ২৮০ ডলার। ড্যাশিং একটা সাইকেল কিনে বাসের ডগায় বেঁধে ফিরে চললুম ঘরের পানে!

কথায় আছে (আদৌ আছে কিনা জানিনা!) অভাগা যা ভাবিবে, কবু কি তা ফলিবে? কেনার ৮ ম দিনের মাথাতেই পাশ্চ্যাতের অন্যতম সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের পাঠাগারের সামনে থেকেই গেয়ান বিদ্যাকে কাঁচকলা দেখিয়ে উন্নত দেশের উন্নত চোর মহাশয় তার চুরি বিদ্যা দেখিয়ে আমার বই সাইকেলটি লকসহ বগলদাবা সরি উরু দাবা করে নিয়ে গেলো! সাথে সাথে গেলাম ক্যাম্পাস পুলিশের কাছে। পালিশ স্থান কাল পাত্র শুনে বললো ওই জায়গায়টাই আমাদের সিসি ক্যামেরার আওতায় নাই কেবল। লাও ঠেলা। সৌভাগ্য আর কাকে বলে। এদেশের পুলিশের মাথায় গিলু যে একটু কম তা প্রমানের সুযোগটা পেয়ে ছাড়তে চাইলাম না। আমি বললাম "এখানে ক্যামেরা নাই তা আপনি জানেন, আমি জানি কিন্তু চোর কি জানে?" পুলিশ বললো- "না" . আমি কই-"তাইলে এ এলাকাটিও আন্ডার সিসিটিভি সারভাইলেন্স লেখা থাকলে ক্ষতি কি ছিল?" পুলিশ কয়-"চোর বলেকি তার সাথে আমরা ধোঁকাবাজি করবো?" এবার আপনারা নেন ঠেলা! (অবশ্য দুদিন পরে দেখলাম ওই জায়গায় ছবিসহ লেখা- হেই থিফ, ইউ আর আন্ডার অবজারভেশন!)
বাসায় এসে বৌকে বললাম ঘটনা। বৌ বললো তুমিতো এখানে থাকতে চাচ্ছ না তাই এটা বোধহয় এখান থেকে চলে যাও বলার সাইন।

কানাডা ঘুরতে যাচ্ছি বলে বিমান থেকে দু মাসের ছুটি নিয়ে এখানে আসা। চাকরি যাবে যাবে করেও ঝুলে আছে। এদিকে এখানে এভিয়েশন ফিল্ডের বাজার খুব খারাপ দেখছি। তাছাড়া ফিল্ডটাও রেগুলেটেড। কুইবেক এ কিছু কোম্পানি আছে কিন্তু ভাষা গত কারণে ঐদিকে না যাওয়াই ভালো। হাতে থাকলো কেবল দুইটা অপশন- টরন্টো ফিরে অড জবের পাশাপাশি ট্র্যাক পাল্টানোর চেষ্টা শুরু করা অথবা ওসাপ লোন নিয়ে বাকি আর সবার মতো গোলেমালে বর্তমানটা কাটিয়ে দেয়া। কিন্তু এভিয়েশনে এতদিনের অভিজ্ঞতা, রক্ত পানি করা কোর্সগুলি, এয়ারপোর্ট এ এন্ট্রির সুযোগ এ সব ছেড়ে দিবো এই এত দিন পরে এসে? মনে মনে স্থির করলাম এই লাইন ছাড়বোনা। প্রয়োজনে যদি কানাডা ছাড়তে হয় তাও। সামনে এসে হাজির হল তৃতীয় অপশন। মাথা আমার আরো বেশি কনফিউসড হয়ে গেলো। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা বোধহয় নিতেই হচ্ছে।

৩।
ইতিহাদ এয়ারওয়েজ এর বিমানটি ঢাকার মাটি ছুঁতেই মোহ ভঙ্গের শুরু।

বেতন বৃদ্ধি, নির্ঝঞ্ঝাট সরকারি চাকুরী বা প্রবল হোমসিকনেস যেটাই বলুন, তিন বছরের ধর্য্য আর প্রচেষ্টায় যেটা পেয়েছিলাম তাকে কিছুতেই ১০ বছরের অধ্বসায় আর সাধনার উপরে স্থান দিতে পারলামনা। লন্ডনের বন্ধুদের নিরুৎসাহ আর BCCB এর ভার্চুয়াল বন্ধুদের উপদেশ উপেক্ষা করে ২০১৬ এর ২৬ এ অক্টোবর কানাডার পত্রপাঠ চুকিয়ে দেশের বিমানে চড়ে বসলাম বিমানে ফেলে আসা চাকরিটা ফিরে পেতে।

দেশে ফিরে পরদিন থেকেই আবার বাসা খোজ শুরু করলাম। যেন সদ্যই নববিবাহিত যুবক বৌকে নিয়ে মাথা গোজার ঠাঁই খুজসে! বিমানের চাকরির সুবাধে একদিনেই খুব সুন্দর বাসা পেয়ে গেলাম ঢাকার অভিজাত পাড়া উত্তরা, সেক্টর ৫ এ।
অফিসে এসে রিপোর্ট করলাম পরদিন। সহকর্মী, সিনিয়র সবাই খুব বাহবা দিলো। আমার দেশপ্রেম, ভালো না খারাপ করলাম ফিরে এসে তা সবার আলাপের একটা বিশাল টপিক হয়ে দাঁড়ালো। ইতোমধ্যে হেড অফিস থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পেলাম এবং সাথে এও পেলাম আমার বিরুদ্ধে বিধি বঙ্গের অভিযোগের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত বেতন স্থগিতের ঘোষণা। হায়রে, কোথায় বিমানকে ভালোবেসে ফেরত এলাম তার বাহবা পাওয়ার কথা, পেলাম চাকরি খাওয়ার হুমকি! যাই হোক, সরকারি চাকুরী হওয়ায় উপরের মহলে কিছু জানাশোনা লোকের সহায়তায় এক মাসের মধ্যেই চাকুরী ফেরত পেলাম। শাস্তিটাও একমাসের বেতনের উপর দিয়েই গেলো।

অফিসে যার সাথেই দেখা হয়, অঘোষিত ভাবে কেন ফিরে এলাম তার কারণ দর্শানো নোটিশ জারি হয়! উত্তর দিতে দিতে জেরবার পরিস্থিতি! একজন পিয়নতো এমনও বললো স্যার বোধয় ওখানে সুবিধা করতে পারেন নাই না?!

উত্তরার অলি গলি, মার্কেট ঘুরে বেড়াই। কি হারাতে জাস্সিলাম তা ভেবে গায়ে কাটা দিয়ে উঠে। নিবিষ্ট মনে পার্ক, মাঠ চষে বেড়াই কিন্তু কি যেন ঠিক মিলছেনা। আগের সেই মুগদ্ধতা আর নেই। কেমন যেন রংচটা , ধূসর মনে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি যেটা পীড়া দিতে লাগলো তা হলো যানবাহনের হর্ন আর আইন না মানার মহোৎসব। আগে যেটা কখনো খেয়ালি করিনি তাই এবার কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ালো।

ভাবলাম যাই একটু বন্ধুদের সাথে জম্পেশ আড্ডা মেরে আসি। হাজারহোক ওরাওতো ফিরে আসার অনেকগুলো কারণের একটি! একজনকে কল দিলাম ধরলো না, আরেকজন- সেও বিজি। তৃতিয়, চতুর্থ জন ধরে বললো আজ হবেনা, তোকে পরে জানাচ্ছি! ভাবলাম, অসুবিধা নাই, কলিগরাত আছেই। বলা ভালো ইতিমধ্যে ওই দুইজন কলিগ বিয়ে সেরে ফেলেছেন এবং পরে জানতে পারলাম অফিস সময়ের পরে ওদের মোবাইল হাতে নেয়ার উপরে ছোটোখাটো নিষেধাগ্গা জারি করা হয়েছে! এভাবে প্রায় এক মাস কেটে গেলো। দেশে থাকা কোনো বন্ধুই আর সময় বের করতে পারেনা। আর বাকিরাত বুয়েট লাইফের পরপরই দেশ ছেড়েছে। যে একাকিত্বের ভয়ে কানাডা ছেড়ে এলাম তা দেখি আমাকে তাড়া করে এখানেই হাজির!

যাই হোক, ফিরে পাওয়া চাকরিতে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করছি। হটাৎ এর মধ্যে ঘটে যায় সেই বিখ্যাত ঘটনা- প্রধানমন্ত্রীর বিমানের নাট-বোল্ট ডিলা পাওয়া যায়। রুটিন মেইনটেনেন্স প্রব্লেম। একটু আগেই দুবাই ফ্লাইট করে আসা বিমানে ভিআইপি চড়িয়ে দিলেইতো আর তা ভিআইপি বিমান হয়ে যায়না! কিন্তু চাটুকারের এদেশে কাকে কে বুঝাবে? চেংদোলা করে হাতে দড়ি বেঁধে মারতে মারতে জেলে পুড়ে দেয়া হলো বিমানের সবচেয়ে যোগ্য এগারজন প্রকৌশলীকে। মনে রাখবেন পাঠক, মেধা আর কর্মদক্ষতায় সবার উপরে বলেই কিন্তু তাদেরকে ভিআইপি ফ্লাইট চেক করতে দেয়া হয়। এরা এমন সেই ১১ জন প্রকৌশলী, যারা সরকারি চাকুরীকে স্রেফ সময় কাটানোর বিষয় মনে না করে বিমানের জন্য নিজেদের স্বর্ণালী সময়গুলোকে বেয় করেছে। এদের মধ্যে এমন কয়জন ছিল যারা কখনো কখনো সারাদিন অফিস করার পর সারা রাতেও মাইন্টেনেন্সের কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছে। বাংলাদেশের মতো ফাঁকিবাজ সরকারি কর্মকর্তাদের কাজের ধারা সম্পর্কে যারা অবগত তারা জানেন ২৫% কর্মকর্তা আছেন যাদের নির্মোহ ভালোবাসায় সরকারি প্রতিষ্টানগুলি এখনো ঠিকে আছে। বিমানের জন্য এরা ছিল সেই দলের শুরুতেই। এরপর শুরু হল যখন তখন যাকে তাকে ধরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন, হুমকি ধামকি। সূর্যের চেয়ে বালি অধিক গরম হলে যা হয়। প্রধানমন্ত্রীর সুনজরের আশায় কাউকে না কাউকে জড়িত প্রমানের সে এক প্রানান্ত চেষ্টা। মনটা এক বিশাল ঘৃণা আর বিতৃষ্ণায় ভরে উঠলো। কাজে মনোযোগ দেয়ার সকল আগ্রহ আর পরিবেশ বিদায় নিয়ে সেখানে অজানা আতঙ্ক স্থান নিলো। চেক প্যাকেজ বানানোর কাজে এই অধম কিছুটা জড়িত ছিলাম। তাই কখন কোন ভিআইপির চক্করে পরে জেলে যেতে হয় সেই ভয় পেয়ে বসলো। এরমধ্যে চাটুকারিতার সর্বোচ্চ ধাপ হিসেবে বিমান পরিচালনায় গাফিলতির সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে মহান সংসদে আইন পাশ হলো। দেশে ফেরাটা বুঝি পাপ হতে চললো!

৪।

প্রথম বারের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারি চাকুরীতে পাকাপাকিভাবে ইস্তফা দিয়ে তবেই কানাডা ফিরবো ঠিক করলাম। আসলে পিঠে সুতো বেঁধে কখনোই লাফ দিয়ে বেশিদূর উঠা যায়না , সুতো আপনাকে ফিরিয়ে আনবেই। সুতো কেটে দিন, উপরে উঠা ঠেকায় কে?!

ইতিমধ্যে সুখবর পেলাম আমি বাবা হতে যাচ্ছি আর আমার বৌ মা! খুশি হবার সাথে সাথে কিঞ্চিৎ দুষ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়লাম। আবার দেশ ছাড়ব জানি কিন্তু তাই বলে এত তাড়াতাড়ি বুঝিনি। ভেবেছিলাম বছর দুয়েক চাকরি করে বাড়তি কিছু টাকা সেভ করে তারপর আবার অনিচ্শিত জীবনের পানে বেরুবো। দেখতে দেখতে ৬ মাস পার হয়ে গেলো। আরতো দেরি করা যায়না। ৩০ সপ্তাহ পার হলে ফ্লাইও করা যাবেনা। যা থাকে কপালে, দিলুম পদত্যাগপত্র সাবমিট করে!

এইবার শুরু হল আরেক নতুন ঝামেলা। ফিরে আসার পর যেমন ঢুকতে দেয়নি সহজে ঠিক তার উল্টো এখন বেরুবার সময় আমি খুব গুরুত্ত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে গেলাম বিমানের জন্য! আমাকে ছাড়া তাদের চোলবেইনা! অরে ভাই তোমরা আমায় যেতে না দিলেই যে আমি থাকব তার কোনো কারণ আছে? সুতো আমি কেটে দিবই। এখানে বলে রাখা ভাল, আমি ফিরে আসার পর আমার অফিসের অনেক বড় সাহেবিই বিষয়টাকে অন্য আরো যারা ভিতরে ভিতরে চলে যাওয়ার প্ল্যান করছেন তাদের জন্য একটা দৃষ্টান্ত হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্ঠা করছিলেন এই বলে যে "দেখেন , ঐখানে কোনো সুখ নেই, যদি থাকতো তবে আমি এলাম কেন? সুতরাং ঐসব চিন্তা বাদ দেন. " কথা যে একেবারে মিথ্যা তা কিন্তু নয়. তবে দিনশেষে একটা জিনিসই আপনাকে মাথায় রাখতে হবে, তা হলো নীরবে নিভৃতে আপনার মনের কোণের লালিত স্বপ্ন, যা আপনি দেখে এসেছেন দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। একটা ব্যাপার মনে রাখবেন, স্বপ্নকে ছোয়ার আগে অন্য আর যা কিছুঁই আপনি ছুঁন না কেন, অতৃপ্তি আপনাকে পিছু ছাড়বেনা! স্বাভাবিক প্রশ্ন এখানে, আমার তবে স্বপ্নটা কি?? জীবনতো একটাই। এর অর্ধেকটা হেসে খেলে আরাম আয়েশে কাঠিয়ে দিয়েছি। বাকি অর্ধেটা না হয় স্বপ্নের পিছনে কাটাই। মসৃন পথে গাড়ি চড়ার চেয়ে রোলার কোস্টারে চড়ে আকাঁবাকাঁ, করে উৎরাই পেরুনোর মাঝেও অনেক উত্তেজনা আছে বই কি?!

আল্লার নাম নিয়ে টিকিটটা কেটেই ফেললাম আবারও।........

২০১৭ এর জুন মাসে ২য় বারের মত কানাডায় প্রবেশ করলাম। এবার আর দুরু দুরু বুকে নয়। পিছুটানহীন, দুরন্ত বালকের বেশে!

মনে পড়ে প্রথমবার যখন ঢাকায় এসেছিলাম বুয়েটের হলে, নিজেকে কেমন যেন অনাহুত, আনস্মার্ট , গেয়ো গেঁয়ো ঠেকতেছিলো। সবাইকে অনেক বেশি ফাস্ট মনে হত. আর নিজেকে মনে হত ক্ষেত! নিজেকে লুকিয়ে রাখতাম। কিন্তু মিডটার্মের বন্ধে বাড়ি থেকে ঘুরে এসেই নিজেকে কেমন জানি অনেক upgraded আর স্মার্ট ভাবা শুরু করেছিলাম। ঠিক এক্ষেত্রেও একই ফিলিং পেলাম। কারণটা শেয়ার করছি:

দুই ক্ষেত্রেই (কানাডা আগমন/ঢাকা আগমন) প্রথমবার আমার হোমওয়ার্ক এ কিছুটা ভুল ছিল. যেমন ছোট সিটিতে সুযোগ বেশি মনে করা (ভার্সিটি মানেই বিশাল ব্যাপার), এখানকার মাস্টার্সকে অনেক গুরুত্ত্ব দেয়া (জ্ঞান অর্জনটাই আসল), নিজের দেশের অভিজ্ঞতা এখানে অচল ভাবা (গ্রামীণ কালচার, বন্ধু বাঁধবের সাথে উঠাবসা) ইত্যাদি। এমনটা অনেকেই ভাবেন এবং এখানকার অনেকেই তা বলে থাকেন। কিন্তু আমার মনে হয় এখানে মাস্টার্সের চেয়ে কাজের অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ত্ব দেয়া হয়। মাস্টারস তখনি করবেন যদি দেশে আপনার ডিগ্রীটা অনেক আগের হয় অথবা হাতে যথেষ্ট টাকা আছে তাই কিছুটা রিলাক্স করা যায় এখন! ওসাপের লোভে কখনোই বাছবিচার ছাড়া পড়া শুরু করতে যাবেন না। এতে কাজের চেয়ে অকাজ বেশি হবে।
দেশে আপনি যে কাজী করুন না কেন, নিজের ফিল্ডের দিকে অবশ্যি চোখকান খোলা রাখবেন। অন্যরা কি করছে জানার চেষ্টা করবেন এবং ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে নিজের সিবিতে তা এড করবেন। তবে এমন কিছু বলতে যেয়েন না আবার যা আপনি আয়ত্ত্ব করতে হিমশিম খাবেন। ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই, ধরুন আপনি এপ্পলাই করছেন প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর পদে। আমরা জানি আমাদের দেশে এধরণের কাজগুলি খুব বেশি অর্গানআইজ্ড নয়। কিন্তু আপনিতো জানেন একটা আদর্শ প্রজেক্ট বা প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট এ কি কি এলিমেন্টস থাকে। বানিয়ে ফেলুন না নিজে নিজে একটা প্রজেক্ট, মেক ইট সাকসেসফুল এবং আপনাকে বানিয়ে নিন তার লিডার হিসেবে। কে যাচাই করতে যাচ্ছে। এই যে আপনি একটা প্রজেক্ট করেছেন শো করলেন এটাই কিন্তু আপনার যোগ্যতা কারণ সুযোগ পেলে আপনি এভাবেই করতেন তাই না?!

শুরু করে দিলুম সত্য মিথ্যা মিলিয়ে সার্কুলারে যা চায় ঠিক সেরকম করে কাজের অভিজ্ঞতা সহ আপ্পলাই করা. লেগেও গেল খুব শিগ্রী। চোখেমুখে তখনও জেট লেগের ধাক্কা!

যারা কানাডায় ইমিগ্রেশন নেয়ার কথা ভাবছেন তারা নিচের গ্রূপটি ঘুরে আস্তে পারেন।.১।

২০১৫ এর নভেম্বর এ কানাডার পি আর ভিসা পেলা। ২০১৪ এর অগাস্ট এ যখন আবেদন করি তখন দেশে আমার চাকরির ভবিষ্যৎ এবং বর্তমান দুটোই ভালো ছিলোনা। তার উপর ছিল অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ফলাফল : পি আর এর আবেদন। তদুপরি ২০১৫ হতে কানাডা সরকার ইমিগ্রেশন প্রণালীতে বিশেষ পরিবর্তন আন্তে যাচ্ছিল, তাই এরপর আর আবেদন করার সুযোগ থাকে কিনা তাও ওই সময় বিশেষ বিবেচণায় ছিল।
যাই হোক, আসল প্রসঙ্গে আসি, আবেদন করার প্রায় দেড় বছর পর ভিসা পেলাম। ইতিমধ্যে দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতির নাটকীয় (!) উন্নতি ঘটে। ভালো কি মন্ধ তর্ক সাপেক্ষ কিন্তু রাজনীতির মাঠ আপাতত দীর্ঘ সময়ের জন্য এক দলীয় খেলায় পরিণত হয়। সরকার নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করে এবং সরকারি চাকরির বেতন পরিণত হয় বেসরকারি স্ক্যালের সমান অথবা ক্ষেত্র বিশেষে ছাড়িয়ে যায়। সকরকারী কাজ করে বেসরকারি বেতন, এর চেয়ে লোভনীয় আর কি হতে পারে?!! বেতন হয়ে গেলো প্রায় দ্বিগুন। শুরু হলো কানাডা যাওয়ায় নিয়ে দোটানা।

যাবো কি যাবোনা করে করে ভিসার মেয়াদ শেষ হবার এক মাস আগে তল্পি-তল্পা গুছিয়ে কানাডার লন্ডন শহরে আগমন। লন্ডন আসার কারণ ওখানে ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার সুযোগ পেয়েছিলাম। জুলাই ২০১৬ তে লন্ডন এর বাঙালি পাড়া (২৫১/২৬১ প্লেটস লেন) এ এসে উঠলাম এক পরিচিত বড় ভাইয়ের সহায়তায়। উঠার পর আরো বেশ কিছু বুয়েটিয়ান সহপাঠীর দেখা মিললো।
কানাডিয়ান সামার, তারউপর ক্লাস শুরু হতে দুমাস বাকি। সুতরাং রঙিন দিনগুলি ভালোই কাটছিলো। বন্ধুদের গাড়িতে সওয়ার হয়ে লন্ডন চরে বেড়ানো, লেক অন্টারিও/হুরণ অথবা এরির পার ধরে গাড়ি নিয়ে ছুটে চলা, পিকনিক, ঘর ঘুছানো...ভালোই কাটছিলো দিনগুলি, কিন্তু....

লন্ডন, অন্টারিও প্রধানত ভার্সিটি কেন্দ্রিক শহর। তাই বাংলাদেশী যারা আছেন তারা প্রধানত বর্তমান ছাত্র অথবা প্রাক্তন ছাত্র কিন্তু নানা কারণে মায়ায় পরে রয়ে গেছেন। ছাত্র হওয়াতে সামারের এই সময়টায় বিকেল (৭ টা থেকে ৯ টা) কিংবা সপ্তান্তে তারা প্রায়ই ফ্রি থাকেন। তাই, ফ্রি গাড়ি , ফ্রি সময়...ঘুরতে মানা কি?! কিনতু সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো বাকি ৫ দিন নিয়ে। একেতো দীর্ঘদিনের পুরোনো অভ্যাস , তার উপর কানাডার গ্রীষ্মের দীর্ঘ দিন (!), ঘরে বসে ফেসবুকিং করে করে সময় কাটানো টাফ হয়ে গেলো। তাছাড়া সময় কাটাতে যতই ফেসবুকে ঢুকছি, ততই দেশের বন্ধুদের পোষ্ট দেখে বুকের ভিতর অজানা বেথাটা মুচড়ে উঠতে লাগলো। ফেসবুকটাই আসলে যত নষ্টের মূল! ফেসবুকে তাদের রংচঙ্গে এবং ঝকঝকে পোস্ট দেখেই এ দেশে আসা আবার আসার পরে দেশের বন্ধুদের পোস্ট দেখে হতাশার শুরু!
ভাবলাম ক্লাশ শুরু হতে যেহেতু দেরি আছে, যাই একটু জব মার্কেট থেকে ঘুরে আসি। শুরু করলাম চাকরি খোজ। ওমা, একি অবস্থা?! আবেদন করবো কি? এখানে দেখি আমার ফিল্ডের জবের সার্ক্যুলারি নেই! বলে রাখা ভালো, দেশে চাকরি করতাম বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এ। সবে ধন নীল মনি ওই একটাই এয়ারলাইন। না আছে কোনো ভবিষ্যৎ, না ছিল কোনো অতীত। অন্যের অনুগ্রহের দিকে তাকিয়ে বসে থাকা। কখন উনি অবসরে বা মারা যাবেন আর তাতে পোস্ট ফাঁকা হবে এবং প্রোমোশনের সুযোগ আসবে। তাও আবার প্রমোশন হবে সিরিয়াল অনুযায়ী। নো চান্স ফর সিরিয়াল কিলার! (অর্থাৎ যতই যোগ্য হউন না কেন, দুনিয়ায় পরে এসেছেন তো পরে আসুন!) ফলাফল: ৮ বছর যাবৎ তাবৎ সময় একই পদে এবং আমার অধীন একজনই মাত্র বেক্তি- অফিস পিয়ন! সেও আবার নানা বেস্ততায় ঠিক মত সার্ভিস দিতো না!
আটলান্টিক সাগরের তল খোঁজার মতো সারা কানাডা জুড়ে, অনলাইন ঘুরে ঘুরে যত এয়ারলাইন্স বা এভিয়েশন সম্পর্কিত কোম্পানি ছিল, ওয়েবসাইট বের করে হেড অফ হিউমান রিসৌর্স অথবা হেড অফ মেইনটেনেন্স বরাবর সিভি পাঠাতে থাকলাম। যদি লাইগ্গা যায় আর কি! কিন্তু লাগবেটা কোথায়? টার্গেট ফাঁকা বা আদৌ থাকলেতো! সারা রাত জেগে জেগে এপলাই এন্ড দিনভর ঝিমানোর দিন শুরু। শেষে এমন হল, কোম্পানির নামের শুরুতে এ(A/AV, starting letters for any aviation related company, like aerotek, avia, AAA…though they are not all necessarily related to aviation! ) থাকলেই ঢু মারতে লাগলাম.......

স্বপ্নের আকাশে আনন্দ শেষে হতাশার কালো মেঘেরা আনাঘোনা শুরু করলো। দেশে ফেলে আশা চাকরি, রুটিন করে সকাল ৯ টায় অফিসে যাওয়া, কলিগদের সাথে হালকা হাসি তামাশা, অফিসিয়াল লাঞ্চ, শীতকালীন পিকনিক, এয়ারপোর্ট এলাকায় বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ানো এসবের কথা মনে পড়তে লাগলো।
লন্ডন শহর ছাত্র কেন্দ্রিক হওয়ার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। সুবিধা হলো আশেপাশের সবাই মোটামুটি একই বয়সের এবং একই ব্যাকগ্রাউন্ডের হয়। এতে মতের সাথে সাথে মনেরও মিল পাওয়া যায় যা সময় কাটানো অথবা হোম সিকনেস কাটাতে শুরুর দিকে খুবি গুরুত্বপূর্ণ। আর অসুবিধার মধ্যে হলো ক্লাশ চলাকালীন ছাড়া বাকি সময়টাতে পুরো শহরটা খাঁ খাঁ করে। লোকজন, বেচাবিক্রি কম হওয়াতে সারভাইভাল কাজের সুযোগ নাই বললেই চলে। বিকেল ৬ টা বাজতে না বাজতেই দোকান পাট, রাস্তা ঘাট সবকিছুতে ঝাঁপ পড়ে যায় (পানশালা ব্যতীত!) . অথচ ওই সময়টাই হলো বাইরে বেরুবার, দলবেঁধে লাফাঝাফি করার উপযুক্ত সময় যা আমরা দেশে করে আসতে অভভস্থ। কিন্তু এখানে আপনি রাস্তায় বেরুবেন, কি সুন্দর ছিমছাম চারিদিক, বৌয়ের হাত ধরবেন সাথে মনে ধরবেন গুনগুন গান ...৫ মিনিট, ১০ মিনিট বা ১৫ মিনিট ভালোই লাগবে। কিন্তু এরপরই একাকিত্ব বা নির্জনতার বিষাদ সিন্ধু আপনাকে গ্রাস করতে থাকবে। আশেপাশে মানুষ না থাকলে বা নিজের ভালোলাগা কারো সাথে শেয়ার করতে না পারার ভিতর যে এতো অতৃপ্তি তা এর আগে আপনি কখনোই অনুভব করতে পারবেন না। ধরেন আপনি খুব সুন্দর একটা মুভি দেখলেন, বা কোনো হাসির নাটক, মনে হয়না যতক্ষণ তা আপনি আপনার প্রিয়জনদের না দেখাচ্ছেন বা আলাপ করছেন ততক্ষণ উপভোগটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়? ঠিক এক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সুন্দর পরিবেশ, সিনিক বিউটি, বিশুদ্ধ বাতাস কিন্তু যতক্ষণ না আপনি সে বাতাস বা সুন্দর্য অন্যের মাঝে বিলাতে পারছেন ততক্ষন পর্যন্ত আপনার বুকের মাঝেই তা জমতে থাকবে এবং জমতে জমতে তা আপনার জন্য আনন্দের চেয়ে বেদনার বা হা হুতাশের ভারে পরিণত হবে, মনে হবে আহা যদি মা বাবাকে বা ছোট ভাইটিকে অথবা পাড়ার বন্ধুদের এই পরিবেশ দেখতে পারতাম! নিজে উপভোগ করছেন তাই নিজেকে ভাগ্যবান ভাবার চেয়ে তখন আপনজনদের দেখাতে পারছেন না এই দুর্ভাগ্যই বেশি ধরা পড়ে! (আত্ম্যকেন্দ্রিক বা unsocial হলে ভিন্ন কথা)।

যাই হোক, প্রথম প্রথম মজা লাগলেও এরপর আস্তে আস্তে লন্ডনের সৌন্দর্য একঘেয়ে হতে শুরু করে আর বেশি বেশি মনে পড়তে থাকে ঢাকার রাস্তার যানজট, হকারের হাঁকডাক, রাস্তার পাশের টং দোকান। অনেকেই হয়তো বলবেন এসব নোংরা, সেঁতসেঁতে, অস্বাস্থকর। আমিও দ্বিমত করবোনা। কিন্তু এসবতো আমাদের ফেলে আসা স্মৃতি। স্মৃতিকি কখনো ওসাস্থকর হয়? স্মৃতি সবসময়ই সজীব সতেজ। তা আপনি গুলশানেই বড় হন আর সীতাকুণ্ডের মতো গ্রামীণ জনপদ থেকে। যা আপনি হারাবেন তা সবসময়ই মধুর!
এসব ভুলে থাকতে বেশি বেশি করে ক্যারিয়ার প্ল্যানিং এ মনোযোগ দিলাম। সিভি লেখার অনলাইন কোর্স, জব ইন্টারভিউয়ের প্রস্তুতি, আসন্ন মাস্টার্সের জন্য ব্রিজিং প্রোগ্রাম হাবিজাবি ইত্যাদিতে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করলাম। মাঝে ২৫১ আর ২৬১ প্লেটস লেনের বাঙালিদের কয়েকভাগে করে ছোটোখাটো একটা ফুটবল টুর্নামেন্ট হয়ে গেলো। যারা কখনো ফুটবলে ফুটি ফেলেনি তাদের মহা আগ্রহ নিয়ে প্রতিদিন মাঠে হাজির হতে দেখে কাজী সালাউদ্দিনের প্লানিঙে কি কি ভুল থাকতে পারে তা গবেষণার একটা বিষয় হয়ে দাঁড়ালো আমার কাছে!
দেখতে দেখতে সেপ্টেম্বরের মধ্যভাগে ক্লাশ শুরু হয়ে গেলো। যাক এইবার বুঝি কর্মহীনতার দিন শেষ হলো। বুকের ভিতর বুয়েট লাইফের মজার দিনগুলি ফ্ল্যাশ ব্যাক এ একের পর এক হাজির। তর আর সয় না। আবারো ফিরে যাবো ভার্সিটি লাইফের হৈহুল্লোরে পরিপূর্ণ সম্পূর্ণ নতুন জীবনে। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। ২০ বছর বয়সের এবং ৩২ বছর বয়সের ছাত্র জীবনের মাঝেযে ব্যবধান হাজারো ছত্রের তা ক্লাস শুরুর দু দিনেই টের পেলাম!

২।

কানাডার ছাত্র জীবন ভীষণ কষ্টের। টিউশন ফি বেশি হওয়াতে সবাই বেপক সিরিয়াস। ফেল করে এক সেমিস্টার দুবার করতে কেউই ইচ্ছুক না তার উপর সামারে কোর্স কম থাকায় বাকি সময়টায় চাপ পরে বেশি আর স্কলারশিপসহ মাস্টার্স হলেতো কোথায় নেই,পড়া এবং চাকুরীর খাটুনি দুটোই আছে। এতো বেস্ততার ভিড়ে ক্লাশ চলাকালীন ছাত্রদের অন্যদিকে নজর দেবার সময় খুব কম। আর আমার মত পরিবারওয়ালা বুড়ো ছাত্র হলে বেস্ততার কারণে ক্লাশ করাই দায়! সহপাঠীদের সাথে বয়সের গ্যাপটাও চোখে পড়ার মত। কোনো কিছু শেয়ার করতে কেমন যেন সংকোচ হতো। আপনারা বলবেন পড়ার আবার বয়স কি ? আমি বলবো, জনাব পড়ার কোনো বয়স না থাকলেও পড়া উপভোগের কিন্তু একটা বয়স আছে। বাড়ির দেয়াল কাঁচা থাকতে যেকোনো সাইজের ইট সেখানে পোতা গেলেও দাঁড়িয়ে যাওয়া দেয়ালে নতুন ফুটো করে রড ঢুকাতে গেলে দেয়ালেই ফাটল ধরবে!
তবুও দাঁতে কলম (দাত) চেপে শুরু করে দিলাম এই আশায় যে, উন্নত, আধুনিক দেশ, নতুন কিছুতো শিখতে পারবো যা আমাদের মতো পিছিয়ে পড়া দেশে পাইনি। নামকরা প্রথম সারির কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় ! ল্যাব ফ্যাসিলিটিও না জানি কেমন হবে। হয়ত দেখবো চারদিকে নানান অত্যাধুনিক কলকব্জার ছড়াছড়ি! ডান বাম যেদিকে তাকাই দেখতে পাবো ল্যাপটপ, রোবট, আরো কত কি !

বিধিবাম!! ফল সেমিস্টারে যে ৪ টা কোর্স নিলাম তার ৩ টাই ইতিমধ্যে বুয়েটে পড়ানো শেষ এবং বাকিটা ননডিপার্টমেন্টাল। ফুলে ফাঁপা বেলুনে হটাৎ পিন ডুকালে যেমন ভুশ করে চুপসে যায় তেমনি আমার ক্লাশ লেকচারে মনোযোগ দেবার ইচ্ছা এবং আগ্রহ দুটোই হারিয়ে গেল। থাকবেইবা কি করে? সবি যে বুয়েটের কল্লানে আগেই জানা! ননডিপার্টমেন্টাল কোর্সের শিক্ষকমশায়কে দেখে মনে হত ওনাকে ইচ্ছের বিরুদ্ধে কেউ এই রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছেন, পালাতে পারলে বাঁচেন!

একেতো পুরাতন পড়া, তারউপর পকেটের টাকা দিয়ে মাস্টার্স করছি, তাই কোর্সের প্রায়োগিকতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে লাগলাম। অনেকের কাছে শুনেছি এখানে উচ্চ শিক্ষা নিলে চাকরি পেতে সহজ হয়। কিন্তু এই মানের সুউচ্চ শিক্ষায় কিছু হবে বলে নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। ওয়েস্টার্নের মত ভার্সিটিতে এই অবস্থা হলে বাকিদের কি অবস্থা ভাবুন। হয়ত আমারটা কোর্স বেসড বলে তাই কিন্তু তাতেও হিসেবে মিলছেনা। কি করি, কি করি। ৫০০০ ডলার পেমেন্ট হয়ে গেছে। ভর্তি বাতিলের শেষ সময় মিড্ অক্টোবর। অক্টোবর এসে গেছে। এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে নাহলে আরো ১০০০০ ডলার হাওয়া হবে। এই ভার্সিটির জন্যই এখানে আসা। ভর্তি বাতিল করলে করবোটাকি? কোনো অড জব ও পাচ্ছি না যে করে কিছু সেভ করবো। টরন্টো মুভ করার কথাও ভাবি মাঝে মাঝে। কিন্তু সমস্যা হলো বৌ খুব খুশি এখানে। আমাদের বন্ধুদের বৌরা আবার কাকতালীয়ভাবে কাছাকাছি বয়সের তাছাড়া সব বৌরা আবার মোটামুটি বেকার জীবন কাটাচ্ছে তাই তাদের মধ্যে আড্ডাবাজি ভালোই জমছে। তার উপর ঢাকাতে মেয়েরা যতটাই নিরীহ এখানে ততটাই মহীরুহ! সে এখানেই থাকবে। প্রয়োজন হলে একা একা! আমাকে মাসে মাসে কিছু পাঠালেই হবে!

যাই হোক, বিমানের কলিগদের সাথে টুকটাক আলাপ হতো। শুনছি বিমান সরকার প্রদত্ত পে- স্কেল বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। সবাই বেস্ত কার বেতন বেড়ে কত হচ্ছে এই হিসেবে। দু একজন আগ বাড়িয়ে আমারটাও হিসেবে করে দিচ্ছে আমি কত পেতাম। এর মধ্যে চুড়ান্ত ঘোষণা এবং সাথে ইন্ডিভিজুয়াল বেতনের সার্কুলার জারি হলো। আমার বেতন বেড়ে হল লক্ষাধিক (আফটার ট্যাক্স)!! মাথাতো পুরাই নষ্ট!
ভার্সিটির খুব পাশেই মনোরম একটা পার্ক ছিল-গিবনস পার্ক। বাসা থেকে একটু দূরে হলেও হেটে যেতে খারাপ লাগতো না। সময় পেলেই বৌকে সাথে নিয়ে পার্ক থেকে একটু ঢুঁ মেরে আসতাম। যতটা না প্রকৃতি দেখতে তার চেয়ে বেশি মানুষ দেখার আশায়! শনি রবি বেশি যেতাম মানুষের আনাগোনা বেপক (!) বাড়ে তাই। অন্য দিনগুলিতে পার্কের পরিবেশটা থাকতো গা ছমছমে সুন্দর। সবচেয়ে যেটি দেখার মতো ছিল এর মসৃন পিচঢালা বাইক লেনটা। দেখলে পা নিশপিশ করতো! একটা দ্বিচক্রযান থাকলে মন্দ হতোনা। এদিকে মনের ভেতর দোটানা, লন্ডন থাকি কি না থাকি। শেষমেশ সকল দোটানা ছুড়ে ফেলে পা-টানা সাইকেল একটা কিনেই ফেলবো মনস্থির করলাম। যদি লন্ডন ছেড়েই যাই তবে ওয়ালমার্টের ৯০ দিনের ফেরত দেয়ার সুযোগের সদ্যবহার করার সুযোগতো থাকলোই। গেলাম নিকটস্থ ওয়ালমার্ট এ। এদিক ওদিক ঘুরি ফিরি। বেরুবার সময় বাজেট ছিল ১০০ ডলার। কিন্তু ফেরত যদি দিবো তবে দামি কেন নয়? ১০০ ডলার বাজেট মুহূর্তেই হয়ে গেলো ২৮০ ডলার। ড্যাশিং একটা সাইকেল কিনে বাসের ডগায় বেঁধে ফিরে চললুম ঘরের পানে!

কথায় আছে (আদৌ আছে কিনা জানিনা!) অভাগা যা ভাবিবে, কবু কি তা ফলিবে? কেনার ৮ ম দিনের মাথাতেই পাশ্চ্যাতের অন্যতম সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের পাঠাগারের সামনে থেকেই গেয়ান বিদ্যাকে কাঁচকলা দেখিয়ে উন্নত দেশের উন্নত চোর মহাশয় তার চুরি বিদ্যা দেখিয়ে আমার বই সাইকেলটি লকসহ বগলদাবা সরি উরু দাবা করে নিয়ে গেলো! সাথে সাথে গেলাম ক্যাম্পাস পুলিশের কাছে। পালিশ স্থান কাল পাত্র শুনে বললো ওই জায়গায়টাই আমাদের সিসি ক্যামেরার আওতায় নাই কেবল। লাও ঠেলা। সৌভাগ্য আর কাকে বলে। এদেশের পুলিশের মাথায় গিলু যে একটু কম তা প্রমানের সুযোগটা পেয়ে ছাড়তে চাইলাম না। আমি বললাম "এখানে ক্যামেরা নাই তা আপনি জানেন, আমি জানি কিন্তু চোর কি জানে?" পুলিশ বললো- "না" . আমি কই-"তাইলে এ এলাকাটিও আন্ডার সিসিটিভি সারভাইলেন্স লেখা থাকলে ক্ষতি কি ছিল?" পুলিশ কয়-"চোর বলেকি তার সাথে আমরা ধোঁকাবাজি করবো?" এবার আপনারা নেন ঠেলা! (অবশ্য দুদিন পরে দেখলাম ওই জায়গায় ছবিসহ লেখা- হেই থিফ, ইউ আর আন্ডার অবজারভেশন!)
বাসায় এসে বৌকে বললাম ঘটনা। বৌ বললো তুমিতো এখানে থাকতে চাচ্ছ না তাই এটা বোধহয় এখান থেকে চলে যাও বলার সাইন।

কানাডা ঘুরতে যাচ্ছি বলে বিমান থেকে দু মাসের ছুটি নিয়ে এখানে আসা। চাকরি যাবে যাবে করেও ঝুলে আছে। এদিকে এখানে এভিয়েশন ফিল্ডের বাজার খুব খারাপ দেখছি। তাছাড়া ফিল্ডটাও রেগুলেটেড। কুইবেক এ কিছু কোম্পানি আছে কিন্তু ভাষা গত কারণে ঐদিকে না যাওয়াই ভালো। হাতে থাকলো কেবল দুইটা অপশন- টরন্টো ফিরে অড জবের পাশাপাশি ট্র্যাক পাল্টানোর চেষ্টা শুরু করা অথবা ওসাপ লোন নিয়ে বাকি আর সবার মতো গোলেমালে বর্তমানটা কাটিয়ে দেয়া। কিন্তু এভিয়েশনে এতদিনের অভিজ্ঞতা, রক্ত পানি করা কোর্সগুলি, এয়ারপোর্ট এ এন্ট্রির সুযোগ এ সব ছেড়ে দিবো এই এত দিন পরে এসে? মনে মনে স্থির করলাম এই লাইন ছাড়বোনা। প্রয়োজনে যদি কানাডা ছাড়তে হয় তাও। সামনে এসে হাজির হল তৃতীয় অপশন। মাথা আমার আরো বেশি কনফিউসড হয়ে গেলো। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা বোধহয় নিতেই হচ্ছে।

৩।
ইতিহাদ এয়ারওয়েজ এর বিমানটি ঢাকার মাটি ছুঁতেই মোহ ভঙ্গের শুরু।

বেতন বৃদ্ধি, নির্ঝঞ্ঝাট সরকারি চাকুরী বা প্রবল হোমসিকনেস যেটাই বলুন, তিন বছরের ধর্য্য আর প্রচেষ্টায় যেটা পেয়েছিলাম তাকে কিছুতেই ১০ বছরের অধ্বসায় আর সাধনার উপরে স্থান দিতে পারলামনা। লন্ডনের বন্ধুদের নিরুৎসাহ আর BCCB এর ভার্চুয়াল বন্ধুদের উপদেশ উপেক্ষা করে ২০১৬ এর ২৬ এ অক্টোবর কানাডার পত্রপাঠ চুকিয়ে দেশের বিমানে চড়ে বসলাম বিমানে ফেলে আসা চাকরিটা ফিরে পেতে।

দেশে ফিরে পরদিন থেকেই আবার বাসা খোজ শুরু করলাম। যেন সদ্যই নববিবাহিত যুবক বৌকে নিয়ে মাথা গোজার ঠাঁই খুজসে! বিমানের চাকরির সুবাধে একদিনেই খুব সুন্দর বাসা পেয়ে গেলাম ঢাকার অভিজাত পাড়া উত্তরা, সেক্টর ৫ এ।
অফিসে এসে রিপোর্ট করলাম পরদিন। সহকর্মী, সিনিয়র সবাই খুব বাহবা দিলো। আমার দেশপ্রেম, ভালো না খারাপ করলাম ফিরে এসে তা সবার আলাপের একটা বিশাল টপিক হয়ে দাঁড়ালো। ইতোমধ্যে হেড অফিস থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পেলাম এবং সাথে এও পেলাম আমার বিরুদ্ধে বিধি বঙ্গের অভিযোগের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত বেতন স্থগিতের ঘোষণা। হায়রে, কোথায় বিমানকে ভালোবেসে ফেরত এলাম তার বাহবা পাওয়ার কথা, পেলাম চাকরি খাওয়ার হুমকি! যাই হোক, সরকারি চাকুরী হওয়ায় উপরের মহলে কিছু জানাশোনা লোকের সহায়তায় এক মাসের মধ্যেই চাকুরী ফেরত পেলাম। শাস্তিটাও একমাসের বেতনের উপর দিয়েই গেলো।

অফিসে যার সাথেই দেখা হয়, অঘোষিত ভাবে কেন ফিরে এলাম তার কারণ দর্শানো নোটিশ জারি হয়! উত্তর দিতে দিতে জেরবার পরিস্থিতি! একজন পিয়নতো এমনও বললো স্যার বোধয় ওখানে সুবিধা করতে পারেন নাই না?!

উত্তরার অলি গলি, মার্কেট ঘুরে বেড়াই। কি হারাতে জাস্সিলাম তা ভেবে গায়ে কাটা দিয়ে উঠে। নিবিষ্ট মনে পার্ক, মাঠ চষে বেড়াই কিন্তু কি যেন ঠিক মিলছেনা। আগের সেই মুগদ্ধতা আর নেই। কেমন যেন রংচটা , ধূসর মনে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি যেটা পীড়া দিতে লাগলো তা হলো যানবাহনের হর্ন আর আইন না মানার মহোৎসব। আগে যেটা কখনো খেয়ালি করিনি তাই এবার কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ালো।

ভাবলাম যাই একটু বন্ধুদের সাথে জম্পেশ আড্ডা মেরে আসি। হাজারহোক ওরাওতো ফিরে আসার অনেকগুলো কারণের একটি! একজনকে কল দিলাম ধরলো না, আরেকজন- সেও বিজি। তৃতিয়, চতুর্থ জন ধরে বললো আজ হবেনা, তোকে পরে জানাচ্ছি! ভাবলাম, অসুবিধা নাই, কলিগরাত আছেই। বলা ভালো ইতিমধ্যে ওই দুইজন কলিগ বিয়ে সেরে ফেলেছেন এবং পরে জানতে পারলাম অফিস সময়ের পরে ওদের মোবাইল হাতে নেয়ার উপরে ছোটোখাটো নিষেধাগ্গা জারি করা হয়েছে! এভাবে প্রায় এক মাস কেটে গেলো। দেশে থাকা কোনো বন্ধুই আর সময় বের করতে পারেনা। আর বাকিরাত বুয়েট লাইফের পরপরই দেশ ছেড়েছে। যে একাকিত্বের ভয়ে কানাডা ছেড়ে এলাম তা দেখি আমাকে তাড়া করে এখানেই হাজির!

যাই হোক, ফিরে পাওয়া চাকরিতে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করছি। হটাৎ এর মধ্যে ঘটে যায় সেই বিখ্যাত ঘটনা- প্রধানমন্ত্রীর বিমানের নাট-বোল্ট ডিলা পাওয়া যায়। রুটিন মেইনটেনেন্স প্রব্লেম। একটু আগেই দুবাই ফ্লাইট করে আসা বিমানে ভিআইপি চড়িয়ে দিলেইতো আর তা ভিআইপি বিমান হয়ে যায়না! কিন্তু চাটুকারের এদেশে কাকে কে বুঝাবে? চেংদোলা করে হাতে দড়ি বেঁধে মারতে মারতে জেলে পুড়ে দেয়া হলো বিমানের সবচেয়ে যোগ্য এগারজন প্রকৌশলীকে। মনে রাখবেন পাঠক, মেধা আর কর্মদক্ষতায় সবার উপরে বলেই কিন্তু তাদেরকে ভিআইপি ফ্লাইট চেক করতে দেয়া হয়। এরা এমন সেই ১১ জন প্রকৌশলী, যারা সরকারি চাকুরীকে স্রেফ সময় কাটানোর বিষয় মনে না করে বিমানের জন্য নিজেদের স্বর্ণালী সময়গুলোকে বেয় করেছে। এদের মধ্যে এমন কয়জন ছিল যারা কখনো কখনো সারাদিন অফিস করার পর সারা রাতেও মাইন্টেনেন্সের কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছে। বাংলাদেশের মতো ফাঁকিবাজ সরকারি কর্মকর্তাদের কাজের ধারা সম্পর্কে যারা অবগত তারা জানেন ২৫% কর্মকর্তা আছেন যাদের নির্মোহ ভালোবাসায় সরকারি প্রতিষ্টানগুলি এখনো ঠিকে আছে। বিমানের জন্য এরা ছিল সেই দলের শুরুতেই। এরপর শুরু হল যখন তখন যাকে তাকে ধরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন, হুমকি ধামকি। সূর্যের চেয়ে বালি অধিক গরম হলে যা হয়। প্রধানমন্ত্রীর সুনজরের আশায় কাউকে না কাউকে জড়িত প্রমানের সে এক প্রানান্ত চেষ্টা। মনটা এক বিশাল ঘৃণা আর বিতৃষ্ণায় ভরে উঠলো। কাজে মনোযোগ দেয়ার সকল আগ্রহ আর পরিবেশ বিদায় নিয়ে সেখানে অজানা আতঙ্ক স্থান নিলো। চেক প্যাকেজ বানানোর কাজে এই অধম কিছুটা জড়িত ছিলাম। তাই কখন কোন ভিআইপির চক্করে পরে জেলে যেতে হয় সেই ভয় পেয়ে বসলো। এরমধ্যে চাটুকারিতার সর্বোচ্চ ধাপ হিসেবে বিমান পরিচালনায় গাফিলতির সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে মহান সংসদে আইন পাশ হলো। দেশে ফেরাটা বুঝি পাপ হতে চললো!

৪।

প্রথম বারের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারি চাকুরীতে পাকাপাকিভাবে ইস্তফা দিয়ে তবেই কানাডা ফিরবো ঠিক করলাম। আসলে পিঠে সুতো বেঁধে কখনোই লাফ দিয়ে বেশিদূর উঠা যায়না , সুতো আপনাকে ফিরিয়ে আনবেই। সুতো কেটে দিন, উপরে উঠা ঠেকায় কে?!

ইতিমধ্যে সুখবর পেলাম আমি বাবা হতে যাচ্ছি আর আমার বৌ মা! খুশি হবার সাথে সাথে কিঞ্চিৎ দুষ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়লাম। আবার দেশ ছাড়ব জানি কিন্তু তাই বলে এত তাড়াতাড়ি বুঝিনি। ভেবেছিলাম বছর দুয়েক চাকরি করে বাড়তি কিছু টাকা সেভ করে তারপর আবার অনিচ্শিত জীবনের পানে বেরুবো। দেখতে দেখতে ৬ মাস পার হয়ে গেলো। আরতো দেরি করা যায়না। ৩০ সপ্তাহ পার হলে ফ্লাইও করা যাবেনা। যা থাকে কপালে, দিলুম পদত্যাগপত্র সাবমিট করে!

এইবার শুরু হল আরেক নতুন ঝামেলা। ফিরে আসার পর যেমন ঢুকতে দেয়নি সহজে ঠিক তার উল্টো এখন বেরুবার সময় আমি খুব গুরুত্ত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে গেলাম বিমানের জন্য! আমাকে ছাড়া তাদের চোলবেইনা! অরে ভাই তোমরা আমায় যেতে না দিলেই যে আমি থাকব তার কোনো কারণ আছে? সুতো আমি কেটে দিবই। এখানে বলে রাখা ভাল, আমি ফিরে আসার পর আমার অফিসের অনেক বড় সাহেবিই বিষয়টাকে অন্য আরো যারা ভিতরে ভিতরে চলে যাওয়ার প্ল্যান করছেন তাদের জন্য একটা দৃষ্টান্ত হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্ঠা করছিলেন এই বলে যে "দেখেন , ঐখানে কোনো সুখ নেই, যদি থাকতো তবে আমি এলাম কেন? সুতরাং ঐসব চিন্তা বাদ দেন. " কথা যে একেবারে মিথ্যা তা কিন্তু নয়. তবে দিনশেষে একটা জিনিসই আপনাকে মাথায় রাখতে হবে, তা হলো নীরবে নিভৃতে আপনার মনের কোণের লালিত স্বপ্ন, যা আপনি দেখে এসেছেন দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। একটা ব্যাপার মনে রাখবেন, স্বপ্নকে ছোয়ার আগে অন্য আর যা কিছুঁই আপনি ছুঁন না কেন, অতৃপ্তি আপনাকে পিছু ছাড়বেনা! স্বাভাবিক প্রশ্ন এখানে, আমার তবে স্বপ্নটা কি?? জীবনতো একটাই। এর অর্ধেকটা হেসে খেলে আরাম আয়েশে কাঠিয়ে দিয়েছি। বাকি অর্ধেটা না হয় স্বপ্নের পিছনে কাটাই। মসৃন পথে গাড়ি চড়ার চেয়ে রোলার কোস্টারে চড়ে আকাঁবাকাঁ, করে উৎরাই পেরুনোর মাঝেও অনেক উত্তেজনা আছে বই কি?!

আল্লার নাম নিয়ে টিকিটটা কেটেই ফেললাম আবারও।........

২০১৭ এর জুন মাসে ২য় বারের মত কানাডায় প্রবেশ করলাম। এবার আর দুরু দুরু বুকে নয়। পিছুটানহীন, দুরন্ত বালকের বেশে!

মনে পড়ে প্রথমবার যখন ঢাকায় এসেছিলাম বুয়েটের হলে, নিজেকে কেমন যেন অনাহুত, আনস্মার্ট , গেয়ো গেঁয়ো ঠেকতেছিলো। সবাইকে অনেক বেশি ফাস্ট মনে হত. আর নিজেকে মনে হত ক্ষেত! নিজেকে লুকিয়ে রাখতাম। কিন্তু মিডটার্মের বন্ধে বাড়ি থেকে ঘুরে এসেই নিজেকে কেমন জানি অনেক upgraded আর স্মার্ট ভাবা শুরু করেছিলাম। ঠিক এক্ষেত্রেও একই ফিলিং পেলাম। কারণটা শেয়ার করছি:

দুই ক্ষেত্রেই (কানাডা আগমন/ঢাকা আগমন) প্রথমবার আমার হোমওয়ার্ক এ কিছুটা ভুল ছিল. যেমন ছোট সিটিতে সুযোগ বেশি মনে করা (ভার্সিটি মানেই বিশাল ব্যাপার), এখানকার মাস্টার্সকে অনেক গুরুত্ত্ব দেয়া (জ্ঞান অর্জনটাই আসল), নিজের দেশের অভিজ্ঞতা এখানে অচল ভাবা (গ্রামীণ কালচার, বন্ধু বাঁধবের সাথে উঠাবসা) ইত্যাদি। এমনটা অনেকেই ভাবেন এবং এখানকার অনেকেই তা বলে থাকেন। কিন্তু আমার মনে হয় এখানে মাস্টার্সের চেয়ে কাজের অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ত্ব দেয়া হয়। মাস্টারস তখনি করবেন যদি দেশে আপনার ডিগ্রীটা অনেক আগের হয় অথবা হাতে যথেষ্ট টাকা আছে তাই কিছুটা রিলাক্স করা যায় এখন! ওসাপের লোভে কখনোই বাছবিচার ছাড়া পড়া শুরু করতে যাবেন না। এতে কাজের চেয়ে অকাজ বেশি হবে।
দেশে আপনি যে কাজী করুন না কেন, নিজের ফিল্ডের দিকে অবশ্যি চোখকান খোলা রাখবেন। অন্যরা কি করছে জানার চেষ্টা করবেন এবং ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে নিজের সিবিতে তা এড করবেন। তবে এমন কিছু বলতে যেয়েন না আবার যা আপনি আয়ত্ত্ব করতে হিমশিম খাবেন। ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই, ধরুন আপনি এপ্পলাই করছেন প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর পদে। আমরা জানি আমাদের দেশে এধরণের কাজগুলি খুব বেশি অর্গানআইজ্ড নয়। কিন্তু আপনিতো জানেন একটা আদর্শ প্রজেক্ট বা প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট এ কি কি এলিমেন্টস থাকে। বানিয়ে ফেলুন না নিজে নিজে একটা প্রজেক্ট, মেক ইট সাকসেসফুল এবং আপনাকে বানিয়ে নিন তার লিডার হিসেবে। কে যাচাই করতে যাচ্ছে। এই যে আপনি একটা প্রজেক্ট করেছেন শো করলেন এটাই কিন্তু আপনার যোগ্যতা কারণ সুযোগ পেলে আপনি এভাবেই করতেন তাই না?!

শুরু করে দিলুম সত্য মিথ্যা মিলিয়ে সার্কুলারে যা চায় ঠিক সেরকম করে কাজের অভিজ্ঞতা সহ আপ্পলাই করা. লেগেও গেল খুব শিগ্রী। চোখেমুখে তখনও জেট লেগের ধাক্কা!

যারা কানাডায় ইমিগ্রেশন নেয়ার কথা ভাবছেন তারা নিচের গ্রূপটি ঘুরে আস্তে পারেন..
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা অক্টোবর, ২০১৯ রাত ৮:৩২
৫টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তুমি আছ

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ০৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:৩৯




এই পৃথিবীতে তুমি কোথায় আছ প্রজাপতির মত ?
হৃদয়ে কি দু:খ জাগে উত্তাল ঢেউয়ের মত কত
দেখ মধু মঞ্জুরী লতায় ফুল ফুটেছে তোমার আশায়
তুমি কি ছুঁয়ে দিবেনা তারে তব ভালোবাসায়।

এই পৃথিবীতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধবিরতি মানবে ইসরায়েল

লিখেছেন লিংকন বাবু০০৭, ০৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:৪১

অনিচ্ছা নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধবিরতি মানবে ইসরায়েল: সিএনএন।

রাতভর উৎকণ্ঠার পর অবশেষে শর্তসাপেক্ষে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এই খবরে বিশ্ববাজারে কমতে শুরু করেছে জ্বালানি তেলের দাম।
যুদ্ধবিরতির... ...বাকিটুকু পড়ুন

=সবাই যে যার মত নিঃসঙ্গ=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:৪৮



নিস্তব্ধ রাত অথবা দিনের দুপুর
যখন একাকি আনমন
নিঃসঙ্গতা এসে চোখে দাঁড়ায়, কোথাও কেউ নেই;
হতে হয় নিমেষই নিঃসঙ্গতার কাছে নমন।

কেউ আসে না মনের ঘরে
খোঁজ নিতে দেয় না কেউ উঁকি;
স্মৃতিঘরে ফিরে যেতেও চাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

নেপাল সিরিজ ১ঃ শিক্ষায় নুতন চেষ্টা

লিখেছেন সাহাদাত উদরাজী, ০৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১০:৩৬

আসেন নেপালের নুতন সরকার এসে ১০০ দিনের যে পয়েন্ট গুলো ঘোষনা দিয়েছে তার মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থা এই কয়েক দিনে কি করলো, জানি! অন্যান্ন পয়েন্ট নিয়েও লিখবো, আজকে শুধু শিক্ষা নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরান যুদ্ধবিরতি ও ইসরায়েলের "ঘাস কাটা" এবং "মাটির স্তর সরিয়ে ফেলা" কৌশল

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৯ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৭:৩৩


পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ কিছুদিন আগেই ট্রাম্পের নাম নোবেল পুরস্কারের জন্য প্রস্তাব করেছিলেন। ট্রাম্পের এই ভৃত্যসুলভ মিত্র মধ্যস্থতা করে আমেরিকা-ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করিয়েছে - এই খবর শুনে মনে সংশয় তৈরি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×