
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ কিছুদিন আগেই ট্রাম্পের নাম নোবেল পুরস্কারের জন্য প্রস্তাব করেছিলেন। ট্রাম্পের এই ভৃত্যসুলভ মিত্র মধ্যস্থতা করে আমেরিকা-ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করিয়েছে - এই খবর শুনে মনে সংশয় তৈরি হলেও, এটাই সত্য হোক এমনটা চাচ্ছিলাম। বিশেষ করে, গতকাল যখন ট্রাম্প পুরো সভ্যতাকে মুছে ফেলার হুমকি দিলেন, যেটি ইরানে পারমাণবিক হামলার ইঙ্গিত বলে মনে হচ্ছিল, তখন যুদ্ধবিরতির খবর শোনার জন্য মন লালায়িত ছিল। মনে হয়েছিল, ভৃত্যের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি, এমনটা কি একেবারেই অসম্ভব?
পরে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলো যে ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব আমেরিকা মেনে নিতে প্রাথমিকভাবে সম্মত হয়েছে। খবরটি এত বেশি ভালো যে, এটি মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি! কী এই দশ দফা? লেবাননসহ সব ফ্রন্টে ইসরায়েল-আমেরিকার সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে; মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময়সূচি নির্ধারণ করতে হবে; ইরানের উপর পাশ্চিমাদের অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে; যুদ্ধের জন্য আমেরিকার দায় স্বীকার করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ও ভবিষ্যতে হামলা না হওয়ার আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি দিতে হবে।
শর্তগুলো ইরানের জন্য এতটা অনুকূল যে মনে হলো, ট্রাম্প নিজেই কি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজকে দিয়ে যুদ্ধবিরতির খবর প্রচার করিয়ে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন? আমেরিকার জনগণ এমন একজনকে তাদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছে, যে শেয়ারবাজারে কারসাজির জন্যও এ ধরনের ঘোষণা দিতে পারেন, যার নজির অতীতে একাধিকবার দেখা গেছে।
আজ যখন ১২ ঘণ্টা যেতে না যেতেই ইসরায়েল বৈরুতে বোমা হামলা করে আড়াইশোর বেশি মানুষ হত্যা করল, এবং তারপর ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিল, তখন স্পষ্ট হয়ে গেল, এটা ট্রাম্পের আরেকটা জালিয়াতি ছাড়া আর কিছু নয়। যতদিন আমেরিকা ইসরায়েলকে সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে যাবে, ততদিন এই ধরনের যুদ্ধবিরতি ফলপ্রসূ হবে বলে মনে হয় না।
ইসরায়েল কীভাবে যুদ্ধবিরতিতে যায়, তার একটি পরিচিত ধরণ আছে। যেমন, গাজায় হামাসের সঙ্গে তাদের যুদ্ধবিরতি সামরিক কৌশলের অংশ, যাকে তারা নাম দিয়েছে "মোয়িং দ্য লন" বা "ঘাস কাটা"। পশ্চিমা দেশগুলোতে বাড়ির উঠোনের ঘাস পুরো গ্রীষ্মকাল জুড়ে নিয়মিত কেটে ছোট করে রাখা হয়। ঘাস একটু বড় হলেই আবার কাটা হয়। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানও ঘাস কাটার মত বারবার চালানো হয়। এটি একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া। ঘাস যেমন একবার কাটলে আবার বড় হয়ে ওঠে, তেমনি প্রতিরোধ শক্তিকেও স্থায়ীভাবে নির্মূল করা সম্ভব নয়, এমন ধারণার ভিত্তিতে এই সামরিক কৌশল।
সামরিক অভিযান চলাকালীন সময়ে মাঝে মাঝে বিরতি দেওয়া হয়। এসব যুদ্ধবিরতির শর্ত সাধারণত প্রায় একই রকম থাকে। দেখা যায়, হামাস চুক্তি মেনে চলে, আর ইসরায়েল তা অমান্য করে। এভাবেই পরিস্থিতি চলতে থাকে, যতক্ষণ না ইসরায়েলি সহিংসতা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায় এবং তার প্রতিক্রিয়ায় হামাস সাড়া দেয়। এরপর হামাসের প্রতিক্রিয়াকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ইসরায়েল আরও ভয়াবহ হামলা করে।
একজন মার্কিন সামরিক অফিসার ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনকে আরও নির্ভুলভাবে নামকরণ করেছেন। সেটা হল "উপরের মাটির স্তর সরিয়ে ফেলা" (রিমুভিং দ্যা টপসয়েল)। টপসয়েল হলো মাটির সবচেয়ে উপরের উর্বর স্তর। এটি সরিয়ে ফেললে জমি অনুর্বর হয়ে যায়। এটাতে বোঝানো হয় যে, হামলা শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং পুরো অবকাঠামো, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বসবাসের পরিবেশ, স্কুল-কলেজ-হাসপাতালসহ সবকিছু ধ্বংস করে দেওয়া হবে। যাতে ভবিষ্যতে সেই সমাজের মানুষদের জন্য কোন সম্ভাবনা আর অবশিষ্ট না থাকে। ফলে, শুধু সামরিক বাহিনীর ওপর নয়, হামলা করা হয় বেসামরিক মানুষদের উপর; তাদের সমাজ, জীবনযাত্রা এবং ভবিষ্যত কে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
ইসরায়েল ইরানে এখন যে হামলার পরিকল্পনা করছে, তা সম্ভবত এই "উপরের মাটির স্তর সরিয়ে ফেলা" হামলা। যেখানে পুরো অবকাঠামো, বসবাসের পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে ফেলা হবে। এরপর যুদ্ধবিরতির ভান করা হবে। তারপর ইসরায়েল কোন একটা কারণ দেখিয়ে সেটা ভঙ্গ করবে। ইরান যদি সেই প্রতিক্রিয়ায় সাড়া দেয়, তখন সেটিকে বড় অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে আমেরিকা ও ইসরায়েল আরও বড় ও ভয়াবহ হামলা কররে।
ইসরায়েল তার আগ্রাসী ও সহিংস কর্মকাণ্ডের যৌক্তিকতা হিসেবে নিরাপত্তার অজুহাত দেয়। গত এক শতাব্দী ধরে, জায়নবাদীরা তাদের গণহত্যা, দখলদারিত্ব ও উপনিবেশায়নে এই কৌশল অনুসরন করেছে। সারা বিশ্বকে তারা বুঝিয়েছে, এটাই তাদের একমাত্র রাস্তা।
নোম চমস্কি বলেছিলেন "যারা নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে উদ্বিগ্ন, তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আমেরিকার নীতিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা।" এই কথাটি আজ শুধু ফিলিস্তিনিদের জন্য নয়, ইরান সহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

