
২।ক
আমাদের গ্রামের বাড়ি ঠিক এমন জায়গায় যেখান থেকে সাগর এবং পাহাড় পশ্চিম এবং পূর্বে ঠিক একই দূরত্বে। এতে সুবিধার চেয়ে অসুবিধায় পড়তাম বেশি। ছেলেপেলে মিলে যখন কোথাও ঘুরতে যাওয়ার প্রসঙ্গ আসতো সবাই দুভাগে ভাগ হয়ে যেত আর যেহেতু দুইটাই একই দূরত্বে তাই কোনোটাই বাদ দেয়া যেত না। শেষে এমন ও হয়েছে সকালে পাহাড়ে যেয়ে সন্ধ্যায় সাগরে যেতে হয়েছে।
আমি সেইই ১৯৯৮-২০০০ সালের কথা বলছি। তখন যদি এখনকার মতো স্মার্ট ফোন বা ফেসবুক থাকতো তাহলে বুঝানো যেত স্কুল কলেজ লাইফের আনন্দ মাখা সেই দিনগুলি কত মধুর আর রঙিন ছিল। এখন সবার হাতে হাতে ফোন থাকাতে যেখানেই যায় তাইই টুরিস্ট স্পট হয়ে যায়। আর আমাদের সময় আমরা এমন এমন জায়গায় গিয়েছি যেখানে ঘুরার কথা কারো মাথাতেই আসেনি। দুএকটি জায়গার নাম বলতে পারি যা এই প্রজন্মের ছেলেপেলেদের কল্যানে (নাকি ফেসবুকের!) রীতিমতো দর্শনীয় স্থান এ পরিনত হলেও আমাদের পা সেখানে পড়েছিল আরো সিকি শতাব্দী আগেই, কেবল প্রমান নেই এই যা! যেমনঃ খৈয়াছড়া, সহস্রধারা, গুলিয়াখালী, নাপিত্তাছড়া, বাঁকখালী, মুহুরী নদীর মোহনা ইত্যাদি। আর তাছাড়া আমরা সেইসব জায়গা পভোগ করেছিলাম প্রকৃতির সান্নিধ্যে এখনকার মত হাউকাউ এর মাঝে নয়। এখনকার ইবনে বতুতাদের হাতে হাতে স্মার্ট ফোন থাকলেও সেসময় আমরা নিজেরাই ছিলাম অনেক স্মার্ট!
স্মার্টদের মধ্যে দুএকজন ছিল স্মার্টেস্ট। তাদের কথা বা কাজকারবার না বললেই নয়। এদের মধ্যে সবার সেরা ছিল বাল্যবন্ধু এ ও বি। ঈশ্বর প্রদত্ত্ব নাকি বয়স লুকানোর কারণে কিনা জানিনা, তাদেরকে দেখতে আমাদের বাকিদের চেয়ে ২-৩ বছরের বড় মনে হত। ফলে দাড়ি গোফ বা বুকের ছাতি দুইটাই গজিয়েছে বাকিদের চাইতে বেশ আগেই। উঠতি বয়সের ওই সময়টাতে স্মার্টনেস শো করার প্রথম শর্ত যে ওই দুটোই এ ব্যাপারে নিশ্চয় কেউ দ্বিমত করবেন না। আর এই দুই বৎস ঠিক সেই সুযোগটাই নিত এবং জন্ম দিত চির স্মরণীয় কিছু মুহূর্তের বা গল্পের। সেরকমই কিছু গল্প আজ শেয়ার করতে মন চাইছে।
বন্ধু এ
বন্ধু মহলে ইনি বেশ সুদর্শন/লেডিকিলার হিসেবে বেশ সুনাম কুড়িয়েছিলেন। ছোট ছোট ছাটে ব্যাকব্রাশ করা চুল, টাইট জিন্স, কালো চশমা, বুতাম খোলা বুকে গোল্ডেন চেইন ....বন্ধু আমার পুরাই হিরো! সকাল বিকাল মেয়েরা উনার প্রেমে পড়ছেন। বন্ধুর হৃদয় এত বিশাল, কাউকেই না করতে পারছেন না! কিভাবে করবে? বন্ধু যে আমার 'তুমি এক জনের তো আর কারো নও ' এই নীতিতে বিশ্বাস করে কাউকেই হতাশ করতে চায় না।
বন্ধু বি
এনি আবার কিঞ্চিৎ কবি প্রতিভাধারী। পোশাক আশাকে বেস্ট চোস্ত। বিভিন্ন দিবস ভেদে উনার জামা কাপড়ের ভিন্নতা ছিল সুস্পষ্ট। তবে বন্ধু আমার ভীষণ স্মার্ট। মুখে সদাই মিষ্টি হাসি আর কবিতার লাইন! ছাত্রী ছাড়া পড়ানোতে কমফোর্ট ইল করেন না!
এই এ এবং বি সাথে আমরা বাকি সি দি সবাই মিলে প্ল্যান করেছি মহালঙ্কার সমুদ্র পারে যাবো। ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকের কথা, হালকা হিম হিম ভাব . বার্ষিক পরীক্ষার শেষ দিন। ঠিক হল দুপুরের পর পরীক্ষা শেষ করেই সবাই মিলে হাটা দিব।
পরীক্ষা শেষ। সবাই যাবো যাবো করছি। এইদিকে বন্ধু এ এর কোনো খবর নাই। কই গেল কৈ গেল?? সবাই হক ডাক। এই দিকে বন্ধু আমার মন কালো করে বিজ্ঞান রুমের কোনায় বসে আছে। ঘটনা কি? চেপে ধরতেই বললো "দোস্ত, আজতো স্কুলের শেষ দিন, এরপরতো আর ক্লাস নেই। এতদিন আশায় আশায় ছিলাম তার উত্তরের। এখনো পেলাম না। আজকের পরে আর কিভাবে পাবো ? "
সবার জিজ্ঞাসা কোন জন?
বন্ধুর উত্তর: "একজনও না"
-"সেকি? তুই না সকাল বিকাল প্রেমের প্রস্তাব পেতি ?"
-"দোস্তরে, আরো সুন্দরের আশায় সেসবের কোনোটাই যে গ্রহণ কর হয়নি, আর যার থেকে আশা করতাম সেও নাকি সকাল বিকাল পায় !"
বন্ধুকে কি আর সান্ত্বনা দিবো, নিজেই কিছু পেলাম না!
দেখতে দেখতে ইন্টার পরীক্ষা এসে গেলো। ইন্টার পরিক্ষায় ভালোই করলাম। আর সবশেষে আবারো প্রমান করতে পারলাম নিজেরি প্রদত্ত একটা চিরন্তণ সত্যবাণী - 'চট্টগ্রাম কলেজ, ঢাকা কলেজ বা আরো যা ভালো ভালো নামি কলেজ, তারা ভালো করে ভালো কলেজ বলে নয়, দেশের সব ভালোরা সেখানে পড়তে আসে বলে।'
২ খ
ইন্টার পরীক্ষা শেষ। রেজাল্টের অপেক্ষায় আছি। নিজের উপর বিশ্বাস ছিল রেজাল্ট ভালোই হবে। তাই আর দেরি না করে বুয়েট ভর্তি কোচিংয়ে ভর্তি হলাম। ওমেগায় খরচ বেশি তাই কংক্রিটেই ভর্তি হলাম। ৫০০ টাকা খরচ করে বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষার ফরম কিনলাম। ফর্মের টাকা যাতে লস না হয় তাই হেভ্ভি প্রস্তুতি চালিয়ে গেলাম। এখানে অনেকেই বলবেন, "আমি অনেক মেধাবী, বেশি পড়তেই হয়নি।" তাদের বলবো, মুখোশ খুলে ফেলুন, সত্য স্বীকার করুন। ২৪ ঘন্টার মধ্যে ২৪ ঘন্টাই যদি পড়ার মধ্যে না থাকেন তবেঁ আপনি বুয়েটের জন্য নন। তবে হ্যা, এখানে ঢুকার পরে হিসেব ভিন্ন। শৃঙ্খলার শিকল ছিড়ে অনেকেই এত বেশি উশৃঙ্খল হয়ে যায় যে, বুয়েটে ঢুকে গেছে মাগার বেরুতে পারে না!
যাই হোক, বুয়েটের শুরুর দিকের কথা। স্যারেরা পরিচয় নিচ্ছেন রোল কলের পরপর।
"এই যে তুমি, কোন কলেজ?"
...এনডিসি
....তুমি?
...এনডিসি
...তুমি?
....এনপিসি
...হুমমম...হু...কি? কি বললা??....এনপিসি?..সেটা আবার কি?
আমি: "স্যার, নটরডেম কলেজ যদি এনডিসি হতে পারে তবে নিজামপুর কলেজ কেন এনপিসি হবে না?"
স্যারের কোনো জবাব নাই আর এনডিসির বন্ধুরা সবাই মাননীয় স্পিকার হয়ে গেল আর বুঝে নিল ক্লাসে অতীব পুংটা একজনের আগমন ঘটেছে। সাধু সাবধান!
চলবে....
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা অক্টোবর, ২০১৯ রাত ৮:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


