somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শাস্তি (ছোট গল্প)

২৮ শে অক্টোবর, ২০১০ রাত ১২:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সবুজ এর বয়সী প্রতিটি ছেলে নতুন জামা পড়ে বাবার হাত ধরে ঈদের নামাজ পড়তে ঈদগাহ যাচ্ছে। শুধু সবুজেরই যাওয়া হচ্ছে না। তার কোন নতুন জামা নেই। নতুন জামা নেই, কথাটা ঠিক না। ছিল একটা জামা। বাবা ঈদের দিন পড়ার জন্য সবুজের পছন্দের লাল রংয়ের একটা জামা কিনে দিয়েছিল। খুশিতে আত্মহাড়া সবুজ ঘুম থেকে উঠেই জামাটা গায়ে দিয়েছে। বাবা-মা কে সালাম করেছে। তারপর গ্রামে ঘুরতে বের হয়েছে। নতুন জামা পড়ার আনন্দে সে খাওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিল। বেলা বাড়তেই ক্ষিদেটা জানান দিল। উপায় না দেখে বাড়ি ফিরে এসছিল সে। ৮ বছরের সবুজের পক্ষে বাড়ির আবহাওয়া টের পাওয়া কঠিনই ছিল। মা উঠানে বসে কাঁদছে। বাবার কোন দেখা নাই। সবুজ মাঝে মাঝেই মা কে কান্না করতে দেখে। তাই মায়ের কান্না সে স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছিল। মায়ের সামনে দাড়িয়ে বলেছিল, ”মা, খিদা লাগছে। ভাত দে”
পরের ঘটনা সবুজ স্বপ্নেও কোন দিন ভাবেনি। মা কোন কথা না বলে ঠাস করে চড় বসিয়ে দিয়েছিল সবুজের গালে। তারপর একটানে গা থেকে নতুন জামাটা খুলে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল সবুজের ছলছল চোখের সামনেই। এত দ্রুত সবকিছু ঘটেছিল যে, সবুজ কিছু বুঝে উঠতে পারে নাই। যখন বুঝল তখন তার প্রিয় জামা আগুনে পুড়ছে।

সবুজের বাবা রহিম মিঞা, কুখ্যাত চোর। গ্রামের সবার মতে চুরি বিদ্যাকে সে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তাই কখোনো ধরা পরে না। বছর খানেক আগের কথা। সবুজের মায়ের কান্নাকাটি আর সবুজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সে মওলানা সাহেবের কাছে গিয়ে তওবা করে “আর কোনদিন চুরি করবে না।“ তারপর শহরে গিয়ে কাজ নেয়। কষ্ট হলেও ধীরে ধীরে মানিয়ে নিয়েছে। এবার ঈদে তাই পরিশ্রমের টাকা দিয়ে ভাল দেখে একটা শার্ট কিনে দিয়েছিল। সার্টটা শুধূ ভাল নয়। বেশ ভাল। তার মত গরীবের জন্য অনেক টাকা দাম । ঈদের দিন সবুজ যখন নতুন জামাটা পড়ে খেলতে গেল, নিজের অজন্তেই চোখে পানি চলে এসেছিল রহিম মিঞার। কি সুন্দর দেখাচ্ছে তার ছেলেকে। সবুজের মা ঈদ উপলক্ষ্যে সেমাই রান্না করছিল। পাশে গিয়ে বসে বলেছিল, “দেখছ, তোমার পোলারে তো রাইজপুত্তুরের মতন দেহা যাচ্ছে।” খুশিতে সবুজের মায়ের চোখও চিকচিক করে উঠেছিল। বলেছিল, ”যাও, ডুব (গোছল) দিয়া আস। খায়া নামাজ পড়তে যাও।” রহিম মিঞা খুশি খুশি ভাব নিয়ে আহ্লাদী কন্ঠে বলেছিল, ”আর এটু পরে যাবনে। ভালই তো আছি।” কিন্তু তার এই ভাল থাকা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় নাই। চেয়ারম্যান বাড়ির দুইজন কামলা চেচাতে চেচাতে তার বাড়িতে ঢুকে তাকে মারতে মারতে চেয়ারম্যান বাড়ির দিকে নিয়ে গেল।

তার অপরাধ!!!!! চেয়ারম্যানের নাতী-নাতনীর জন্য চেয়ারম্যান জামা কাপড় কিনে দিয়েছিল। সেগুলো পাওয়া যাচ্ছে না। চেয়ারম্যানের নাতী তার জন্য কেনা সেই সার্টটাটাই পড়ার জন্য বায়না ধরেছে। ঈদের জন্য তাকে কিনে দেয়া অন্য সার্টগুলো সে পড়বে না। কিছুক্ষণ আগে সবুজকে সেই সার্ট পড়ে ঘুরতে দেখা গেছে।

চেয়ারম্যানের বাড়ির সামনে দিয়েই গ্রামের প্রধান রাস্তা। সেই রাস্তার পাশে বড় আম গাছটায় রহিম মিঞাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা গেল। নাক ফেটে রক্ত আসছে। সারা শরীরেও মারের দাগ। রাস্তা দিয়ে সারী সারী লোক ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়তে যাচ্ছে। ঝুলন্ত রহিম মিয়াকে দেখে সবাই বলতে লাগল, ”আবার চুরি করছস!! তুই ভাল হবি না?”

চেয়ারম্যান আজমত খান বারান্দায় বসে তামাক টানছে। তামাকের প্রচলন চলে গেলেও তার খুবই পছন্দের কাজ তামাক টানা। আরাম কেদারায় বসে তামাক টানার মজাই আলাদা। নিজেকে জমিদার জমিদার মনে হয়। তবে আজ এই মুহুর্তে তামাক টেনে মজা পাচ্ছেন না। বারান্দা থেকে আম গাছটা দেখা যাচ্ছে। রহিম মিঞা নিথর হয়ে ঝুলছে। বড় ধরনের ভুল হয়ে গেছে তার। সব কিছুই পাওয়া গেছে। রহিম মিঞা চুরি করে নাই। ভাল ভাবে না খুজে, সবুজের গায়ে একই সার্ট দেখেই তার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী কয়েক ঘন্টা চোরকে ধরা আর শাস্তি দেয়া নিয়ে সবাই এত ব্যস্ত ছিল যে খুজে দেখার সময়ও হয় নাই। কিছুক্ষণ আগে সব জামা কাপড়ই পাওয়া গেছে। চেয়ারম্যান আজমত খান তার এক কামলাকে ডেকে নির্দেশ দিলেন। তাকে একটুও অনুতপ্ত মনে হল না।

নদীর পাড়ে সবুজ মন খারাপ করে বসে আছে। দুই চোখে অশ্রু। হটাৎ বাবার কণ্ঠ শুনে চমকে উঠল সে। রহিম মিঞা ছেলেকে বললেন, ”এখানে বসে আছিস বাপ। ভাত খাবি নে?” সবুজ ঘার ফিরিয়ে বাবাকে দেখল। বাবার চোখে পানি। সবুজ দৌড়ে বাবার বুকে মুখ লুকাল। অভিমানী সবুজ জানতে চাইল, ”বাজান, ওরা তোমারে ছাইড়া দিল?” রহিম মিঞা চোখ মুছতে মুছতে বলল, “ছাড়ব না কেন রে বাপ? আমি কি চুরি করছি?”
”তাইলে ওরা তোমারে মারল কেন?” জানতে চাইল সবুজ। রহিম মিঞা কষ্ট হাসি হাসল। সবুজ অভিমানী স্বরে বলল, ”বাজান, মা আমার জামা পোড়ায়া দিছে”। রহিম মিঞার চোখে আবারও পানি চলে এল। চোখ মুছে বলল, “চোরের পোলার দামী জামা পড়া লাগে না রে বাপ”। সবুজের জেরা তবুও শেষ হয় না। বলে, ”বাজান, চোর বড় অপরাধী না ডাকাইত?” রহিম মিঞা অবাক হয়ে জানতে চাইল, “কেন রে বাপ?” সবুজ চোখ মুছতে মুছতে বলল, ”তুমি চুরি করছ মনে কইরা তোমারে শাস্তি দিল। কিন্তু যারা ঈদের দিন আমগরে ঈদের খুশি ডাকাতি করল, তাগোরে কোন শাস্তি হইব না?”
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৫



সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

ফরাসি ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি বাক্য- Cherchez la femme। অর্থাৎ, ‘সেই মেয়েটিকে খোঁজ’।

ফরাসি লেখক আলেকজান্ডার ডুমা (Alexandre Dumas) ১৮৫৪ সালে তাঁর উপন্যাস Les Mohicans de Paris-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৩



তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে-

বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যু এখন রহস্যের আরেক নাম। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জুনিয়র বন্ধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইয়াংসান থেকে জুলাইয়ের নতুন বন্দোবস্ত

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৯



Youngsan সিউলের ভিতরে আমেরিকান একটি মিলিটারি বেইস। মিলিটারি বেইসের ভিতরে বার্গার কিং, KFC, Macdonald সব আছে। কোরিয়ান ভিতরে সামরিক ঘাঁটি হলে ও মিলিটারি বেইসের ভিতরে প্রধান কারেন্সি ইউএস ডলার।... ...বাকিটুকু পড়ুন

দারিদ্র্য কি মানুষকে মহান করে তোলে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৬


হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের শেষ জনপ্রিয় লেখক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন গুণী লেখক ও নাট্যনির্মাতা। হুমায়ূন আহমেদ সমুদ্রবিলাস নামে একটি নাটক নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে একজন শিক্ষক ছিলেন, নাম চ্যালেঞ্জার। তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

DNA — ঈশ্বর এবং প্রশ্ন ?

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:১২



১. ক্ষুধা
পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছিল, বাড়ছিল মানুষের খাদ্যচাহিদা; কিন্তু সীমিত জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠছিল।
মানুষ নির্বাচিত প্রজনন ও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে এমন ব্রয়লার মুরগির জাত তৈরি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×