সামাজিক বিবর্তনের সামপ্রতিক প্রবণতা: আমাদের ভূমিকা
আবর্তন ক্রিয়েটিভ সেল।।
সমাজ পরিবর্তনশীল, সমাজে বসবাসরত মানুষের আচার-আচরণ,চাল-চলন, চলা-ফেরা, অভ্যাস-রুচি, ভাবধারা প্রভৃতির পরিবর্তনে সামাজিক পরিবর্তন সংঘটিত হচ্ছে। এই পরিবর্তন একটি চলমান প্রক্রিয়া। কতিপয় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য মানুষ পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে একত্রিত হয়ে যে সমাজ গঠন করে তা এই চলমান প্রক্রিয়ারই ফল। পারস্পরিক সম্পর্কের নেটওয়ার্কের ভিত্তিতে সমাজ বদলের চলমান প্রক্রিয়ায় কতিপয় উপাদান অনুঘটকের কাজ করে।সমাজ সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে সময় স্রোতে অসংখ্য রূপ পরিবর্তিত হয়ে আজকের এই আদল গ্রহণ করেছে। সমাজের বর্তমান রূপটিও সার্বজনীন নয়, তা প্রতিনিয়ত পরিবর্তন প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে অগ্রসর হচেছ। সমাজ পরিবর্তনের/বিবর্তনের বিভন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রেক্ষিতে নানা ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সমাজের বিদ্যমান প্রবণতা গুলোর মাধ্যমেই সংশ্লিষ্ট সমাজকে বিশ্লেষণ করা হয।
মানুষ সামাজিক জীব। পরস্পর নির্ভরশীল এ সমাজে মানুষ একা চলতে পারে না। ফলে সামাজিক নেটওয়ার্কের বন্ধনে সে আবদ্ধ। এই নেটওয়ার্কের সাথে পরিবেশ প্রতিবেশের প্রতিটি জিনিস সম্পক যুক্ত। কতিপয় বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এ নেটওয়ার্ক কাজ করে। অর্থাৎ দলবদ্ধভাবে থাকার করণে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে যে সংগঠন গড়ে উঠে তা-ই সমাজ।
সামাজিক পরিবর্তন:
প্রতিনিয়ত অসংখ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সামজ এগিয়ে চলছে। সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ এ পরিবর্তনে বলা যায় মূল এবং একমাত্র ভূমিকা পালন করছে। তবে সামাজিক পরিবর্তন বলতে মানুষের আকার প্রকার কিংবা অবয়বগত পরিবর্তন বুঝায় না। বরং অবশ্যম্ভাবীরূপে সামাজিক পরিবর্তন সমাজের গঠনগত পরিবর্তন ও পরিবর্ধন কিংবা সংশোধনের প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করে। অর্থাৎ সমাজবদ্ধ মানুষের আচার-আচরণ, চাল-চলন, কথা-বার্তা, প্রথা-পদ্ধতি, রীতি-নীতি, অভ্যাস, কৃষ্টি-কালচার, পোষাক পরিচ্ছদ, উৎপাদন, বন্টন, ভোগ ইত্যাদিতে পরিবর্তনের মাধ্যমে যে ভিন্ন ব্যবস্থার সৃষ্টি হয় তা-ই সামাজিক পরিবর্তন। এ পরিবর্তন কখনো স্থায়ী আবার কখনো অস্থায়ী, কখনো বাহ্যিক বা বস্তুগত আবার কখনো আভ্যন্তরীণ বা অবস্তুগত হিসেবে প্রতিভাত হয়।
জে. গোল্ড ও ডবি্লউ. এল ক'ব সম্পাদিত A Dictionary of Social Sciencesগ্রন্থে বলা হয়েছে, সামাজিক পরিবর্তন বলতে কোন সমাজের সামাজিক কাঠামো, প্রতিষ্ঠান, অভ্যাস বা কলা-কৌশলের পূর্ববতর্ী অবস্থা হতে পৃথক এমন এক পরিবর্তিত অবস্থাকে নির্দেশ করে যা আইন প্রণয়নগত বা নিয়ন্ত্রণগত অন্যান্য প্রকাশ্য ব্যবস্থারই ফলস্বরূপ।
ডবি্লউ.ই.মুর বলেন "সামাজিক কাঠামোর সাথে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এবং আদর্শ (আচরণ বিধি), মূল্যবোধ কৃষ্টিগত সৃষ্টি ও প্রতীক সমূহের মাঝে রূপায়িত এরূপ কাঠামোসমুহের পরিণতি ও প্রকাশকেই বলা যেতে পারে সামাজিক পরিবর্তন। "
এ. এম. রোজ-এর মতে, "সামাজিক পরিবর্তন বলতে আমরা সমাজ কতর্ৃক বা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো কতর্ৃক পোষণ করা ধ্যান-ধারণা ও মুল্যবোধের ক্ষেত্রে সাধিত সংশোধনকেই বুঝাবো।"
সমাজ বিজ্ঞানী উইলিয়াম এ. অগবার্ন অবশ্য সমাজে বসবাসকারী জনগণের কৃষ্টিগত ও সংস্কৃতিগত পরিবর্তনকেই সামাজিক পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এসব মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, সময় ও অবস্থার প্রেক্ষিতে সমাজের যে পরিবর্তন সাধিত হয় সেখানে কিছু উপাদান ভূমিকা পালন করে। এসব ভিন্ন ভিন্ন উপাদানের ফলাফল হিসেবে সমাজে নানা ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি তথা মুক্ত চিন্তার বর্তমান সময়ে সামাজিক উপাদান ও মানুষের অভ্যাস ও আচার-আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে সমাজের পরিবর্তন ঘটে। এ পরিবর্তনের ফলে সামপ্রতিক প্রবণতাতেও সুর বেজে উঠে যা নিম্নে শনাক্ত করার চেষ্টা করা হল।
চিন্তার ক্ষেত্রে পরিবর্তনশীলতা:
সমাজের একমাত্র উপাদান হচ্ছে মানুষ- যাদের বিবেক শক্তি ও চিন্তা করার ক্ষমতা রয়েছে। চিন্তা-গবেষণা ও বিবেকের মাধ্যমে বিভিন্ন সংকট ও প্রয়োজন এবং উন্নয়ন-অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে মানুষ সমাজের কাঠামোর পরিবর্তন ঘটায়। চিন্তা ক্ষেত্রে পরিবর্তনের সাথে সাথে সমাজে যে পরিবর্তন সাধিত হয় সেখানে কতিপয় প্রবণতা যেমন ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যতা, স্বয়ংসমপূর্ণতা অর্জনের মানসিকতা, অধিকার সচেতনতা, সময় সচেতনতা, ধমর্ীয় ও সামাজিক কুসংস্কার থেকে মুক্ত হওয়া, অসামপ্রদায়িক মনোভাব, অপরাধ কিংবা ভাল কিছু করার ক্ষেত্রে নতুন নতুন কলা-কৌশল অর্জন ইত্যাদি দেখা যায়। সামপ্রতিক সময়ে মানুষের মধ্যে ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদী চেতনার উম্মেষ ঘটেছে। মানুষ তার অধিকার ও কর্তব্য সম্বন্ধে অধিক সচেতন হয়ে উঠেছে। কেউ কারো উপর প্রাধান্য বিস্তারের কিংবা কাউকে উপেক্ষা/অবজ্ঞা করে কোন কিছু হাসিল বা স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা করলে তাতে সে সফল হয় না। ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদী চেতনার ফলে তাই স্বয়ং সম্পর্ণতা অর্জনের সাথে সাথে তা পারিবারিক কাঠামোতেও প্রভাব ফেলে, যৌথ পারিবারিক অবস্থা ভেঙ্গে একক বা অণুপরিবারের সৃষ্টি হয়। তাছাড়া ইহা সামাজিক নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেয় এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শিথিলতা চলে আসে যা সমাজে পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ, হিংসা-বিদ্বেষ, মারা-মারিতে রূপ নেয়। চিন্তা ক্ষেত্রে স্বকীয়তা সামপ্্রতিক সময়ে একদিকে যেমন মানুষকে নাস্তিকতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে ইসলামের মৌল আকি্বদার ভিত্তিও শক্তিশালী করছে ফলে ইসলামী সমাজ বিনির্মাণে মানুষের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষ এখন অনেক কিছুই নিরপেক্ষভাবে চিন্তাা করে ভালটি গ্রহণ করার প্রয়াস/সুযোগ পাচ্ছে যা সমাজ পরিবর্তনে সামপ্রতিক প্রবণতাগুলোর অন্যতম।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



