somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জিয়া হায়দার রহমান এবং মাইকেল মধুসূদন দত্ত সিন্ড্রম

১৩ ই নভেম্বর, ২০২৫ সন্ধ্যা ৭:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জিয়া হায়দার রহমান এই নামটা ক’দিন ধরে হঠাৎ এদিক-সেদিক থেকে কেমন করে যেন কান খাড়া করে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি যেন এক বিস্মৃত তারকার পুনরাগমনের মতো উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। পরিচিতজনদের সংগে ফেসবুকে ভিডিও টিডিও করছেন। ঢাকার নামী-দামী বইয়ের দোকানে তার সাথে "হঠাৎ দেখা" পাওয়ারও সুবর্ণ সুযোগ হচ্ছে। বলুন তো, এ আবার কেমন অবস্থা! কারও কারও মতো আমিও প্রথমে হতবাক, উনি কে? আবার ঠিক পরেই আরেক ধাক্কা, উনি এই হংস-কুক্কুটের দেশে কি করছেন?

ঘটনা খুলে বলি।

দশ বছর আগের কথা। ইংরেজি শেখার ধান্ধায় `ইন দা লাইট অফ হোয়াট উই নো' বইটা হাতে নিলাম। লেখকের নাম দেখে চোখ কপালে উঠল। আরে, দেশি ছেলে এমন ব্রেন ব্লোয়িং থিসিস নভেল লিখেছে? মনে হলো, এ তো আমাদের জাতীয় গর্ব। গুগল করে দেখি, লন্ডন, কেমব্রিজ, নিউ ইয়র্ক, যেন গ্লোবট্রটারের ডায়েরি। উনি বিশ্বনাগরিক, আর আমরা? গরমে ঘামে ভেজা, ডাল-ভাত খাওয়া উপনিবেশিক ফসিল। বই ধরার আগেই আমি সোল্ড, মানে, ফ্যান হয়ে গেলাম।

কিন্তু পড়া শুরু করতেই ধাক্কা। বাংলাদেশ তো উনার বইয়ে যেন একটা ফুটনোট, যেটা পড়তে গেলে চশমা লাগে, কিন্তু কেউ পড়ে না। ট্রেন চলছে অক্সফোর্ডের গার্ডেন, লন্ডনের সোয়ানকি পার্টি, ওয়াল স্ট্রিটের মিটিং আর আফগান যুদ্ধ, যেটা তো পশ্চিমের ফটোশপড ভার্সন। বাংলাদেশ? ওহ, সেটা তো শুধু একটা পাসিং রেফারেন্স, যেন ট্রেনের জানালা থেকে দেখা ধুলোয় ধূসর গ্রাম। আমি ভাবলাম, এ তো আমাদের লেভেলের বই নয়। উনার মস্তিষ্ক যেন বাংলাদেশ থেকে বহু আগেই ইমিগ্রেট করে গেছে, ব্রিটিশ অ্যাকসেন্ট নিয়ে। তবু মুগ্ধ হলাম। ভাবলাম, উনি বাংলাদেশকে গ্লোবাল কনটেক্সট দেবেন। যেন আমরা আগে কখনো ম্যাপে ছিলাম না।

তারপর লিট ফেস্টিভ্যালে এসে বোমা ফাটালেন। বাংলাদেশ হলো ইন্টেলেকচুয়াল ডেজার্ট। ওয়াও, কী শার্প তীর। আমরা তো ধোয়া তুলসীপাতা। সবাই মিলে উনাকে ব্যান করলাম (শোনা কথা, প্রুভ করার দরকার কী? এ দেশে গুজবই ইতিহাস)। কিন্তু আমি? আমি তো সুপারফ্যান। আহা, এমন বোল্ড কথা যে বলতে পারে, সে তো আমার সোলমেট।

টুইটারে ফলো করলাম। দেখি, উনি অ্যাকটিভ। কিন্তু টুইটগুলো যেন কোয়ান্টাম ফিজিক্সের থিসিস। ভাবলাম, স্বাভাবিক। উনি যে পশ্চিমের প্রিন্স, সেখানকার টপিক নিয়েই লিখবেন। সম্মান বাড়তে থাকল।

কিন্তু সময় গড়াতে গড়াতে বুঝলাম, উনার কৌতূহল কিন্তু বাংলাদেশে ফের জেগে উঠছে। ফেসবুকে আবার নতুন অ্যাকাউন্ট, ভিডিও টিডিও, বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজনীতি নিয়ে বহুবিধ বিশ্লেষণ। উনার দেশপ্রেম যেন জিনি বোতল থেকে বেরিয়ে এল।

এই লোক যিনি একসময় বাংলায় কোন টুইট করতেন না এখন কেমন যেন হরিহর আত্মা হয়ে উঠেছেন। এ যেন এক নতুন অবতার। এতদিন পরে এই নবপ্রেম কেন? নিয়ম তো সিম্পল। প্রথমে দূর থেকে গালি দাও, পরে হিরো হয়ে ফিরে এসো। সেলিব্রিটি ফর্মুলা। এতদিনের নীরবতার পর হঠাৎ করে জিয়া হায়দার রহমানের বাংলাদেশের প্রতি অতিরিক্ত প্রেম আমাকে অদ্ভুত দেজা ভু এর মতো মনে করিয়ে দিল। মাইকেল মধুসূদন দত্ত সিন্ড্রম।

এ যেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত সিন্ড্রমের রিবুট। ছোটবেলায় স্যার শিখিয়েছিলেন, মধুসূদন ইংরেজ হতে চেয়েছিলেন, শেষে দেশে ফিরে কষ্টে ক্লেশে মারা গেলেন। শিক্ষা, গরিব দেশ কঠিন দেশ, শেষমেশ সব হাই ফ্লাইয়ার কেই মাটিতে নামতে হয়। জিয়া হায়দারকেও আজ তেমনই লাগছে।

বিদেশে প্রতিষ্ঠিত, গর্বিত হাই ব্রাউ ইনটেলেকচুয়াল, হঠাৎ বাংলাদেশ নিয়ে মাতামাতি। এটাকে কি ইগো ডিপ্লিশন বলব? নাকি স্পটলাইট ফেডিং সিন্ড্রম? ওয়েস্টার্ন সার্কিটে তার স্টারডম ম্লান হচ্ছে? ইংরেজিতে নতুন বই? গুগল করেও পেলাম না, যেন মিসিং ইন অ্যাকশন।

হঠাৎ বাংলার প্রতি এই প্রেম জাগা কাকতালীয়? না না, এ তো স্ট্র্যাটেজিক মুভ। এ দেশে জনপ্রিয় হওয়া সহজ। গালিবাজি করো, হাততালি পাও। বুদ্ধিজীবী বাজার তো এখন বুমিং। একটা পোস্ট দিলে হাজার লাইক। আজ বিডি নিউজ ২৪ ডট কম এ মূল পাতায় তার করা কড়া উক্তি হেড লাইন হইয়েছে। পথ ঠিক আছে। তাই কি এই ঘরগতি প্রেম?

জানি না।

আমার সন্দেহ হয়, মধুসূদনের মতোই হয়তো একসময় ঘরগতি মানুষ হলে দেশটাকে নতুনভাবে দরকার পড়ে। এই দেশে এসে জনপ্রিয় হওয়া সহজ, গালিবাজি করলে হাততালি মেলে, আবার এখন বুদ্ধিজীবী বাজারও বেশ চাঙ্গা।
তাই কি হঠাৎ এই বাংলার প্রতি আকুলতা?

জানি না।

তবে একটা জিনিস পরিষ্কার, মাইকেল মধুসূদন দত্ত স্যারকে আবার খুলে পড়তে হবে। হয়তো সেখানেই এই রহস্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই নভেম্বর, ২০২৫ সন্ধ্যা ৭:৫৯
৫টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

স্বর্গময়

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৫ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৫৩


ওরা জান্নাত দেখে না
পুড়তে পুড়েই তো ছাই-
কতখানি জান্নাত দেখো
ঘরের ভিতর আছি কি?
নাকি মাটিতে থাক ঘুম;
যতক্ষুণ আছো নিঃশ্বাস
ততক্ষুণ জান্নাত দেখো
পরিবারে কিংবা চারপাশ!
পরকাল কে দেখে শান্তিময়
এখানে রচনা করো স্বর্গময়;

১৫-৬-২৬ ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘র’-এর কৌশল, প্রভাব ও গুপ্তচরবৃত্তির প্রকৃতি , পর্ব ০১

লিখেছেন মেহেদী আনোয়ার, ১৫ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৭

'র'-এর গুপ্তচরবৃত্তির প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করার পূর্বে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন ও তৎপরবর্তী পরিচালিত কয়েক ধরনের স্ট্র্যাটেজি ও বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতার বিবরণ দেয়া প্রয়োজন । ১৯৬৮ সালে 'র' গঠিত হয়েছিল মূলত বৈদেশিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের গল্প- ১০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৫ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৫০



১। একজন মা (কোহিনূর) সারারাত ঘরের দরজা খুলে বসে থাকেন।
কারণ কেউ একজন এসে তাকে বস্তা ভরতি টাকা দিয়ে যাবে। গতকাল রাতের কথা। আমার বাসায় ফিরতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৬ জুনের বিশ্বকাপ কড়চা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:২৩

দারুণ একটা ম্যাচ হয়ে গেলো একটু আগে। মিসর দারুণ খেলেছে আজ। সালাহ নেমে যাওয়ার পরে তাদের খেলার ধার বেশ বেড়ে গিয়েছিলো বলে মনে হলো! কিন্তু, বেলজিয়ামের ফরোয়ার্ডদের পাসিং আর ড্রিবলিং... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমন্ত্রন পত্র থাকলে ভিসার দরকার কী! আপনি জানেন আমি কে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৬ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০০



ভারত বাংলাদেশের কোনো একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানাতে চাইলে সেই আমন্ত্রণপত্র ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠাবে। সেখান থেকে আমন্ত্রণপত্র যাবে সেই রাজনৈতিক ব্যক্তির ডিপার্টমেন্টে, তারপর তার কাছে। এরপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×