একুশে পদক সাধারণ কোনো পুরস্কার নয়। এটি একটি দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানগুলোর একটি যা ভাষা, স্মৃতি এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত এক ধরনের নৈতিক ঘোষণা। তাই প্রতি বছর এই পদক ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে একটি অঘোষিত প্রশ্ন অনিবার্যভাবে ভেসে আসে - কে পেলেন তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, কেন পেলেন?
আর দেশটা যখন বাংলাদেশ, তখন কোনো কিছুর সঙ্গেই সন্দেহ, ব্যাখ্যা, কিংবা কন্সপিরেসি থিয়রির গল্প জুড়ে না থাকা প্রায় অসম্ভব। একুশে পদক ঘোষণার পর আলোচনা বা সমালোচনা হবে না এটা বরং অস্বাভাবিক। সুতরাং এবছর সেই প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়ে উঠতে পারে, যখন একটি ব্যান্ড ওয়ারফেজ একুশে পদক পাচ্ছে।
অনুমেয়ভাবেই কিছু তথাকথিত চেতনাধারী এতে আহত হবেন, কেউ প্রত্যক্ষত অপমানিত বোধ করবেন, কেউ “অপসংস্কৃতি” ধ্বংসের আর্তনাদ তুলবেন। শেষমেশ বলা হবে - এই সরকার সবকিছু ধ্বংস করে দিয়ে গেল, সব দোষ জেন-জির। এ আমার কল্পনা নয়; এ আমাদের পরিচিত বয়ান। চেতনা যখন যুক্তি থেকে বিছিন্ন হয়ে অলীক আবেগে রূপ নেয়, তখন তা বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
আশির দশকের স্বাধীন বাংলাদেশের ভুমিষ্ট হওয়ার কারণেই হোক আর সময়ের প্রয়োজনে হোক, আমি, আমার প্রজন্মের বার্তা বাহক না হলেও এটা বলতে পারি এই সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয় কারণ এটি দেরিতে হলেও একটি মৌলিক সত্য স্বীকার করে: সংস্কৃতি স্থির নয়; সংস্কৃতি চলমান। এ ধরনের স্বীকৃতি আরও আগে আসতে পারত, আসা উচিতও ছিল। কিন্তু না আসার ইতিহাসই হয়তো আমাদের সাংস্কৃতিক দ্বিধার প্রমাণ।
ব্যান্ড সংগীত কি একুশের উত্তরাধিকার বহন করতে পারে? এই প্রশ্নটি সহজ নয়, কিন্তু প্রয়োজনীয়।
দক্ষিণ এশিয়ার সাংস্কৃতিক পুরস্কারের ইতিহাসে ব্যান্ড সংগীত বরাবরই এক ধরনের ‘প্রান্তিক শিল্প’। একে প্রায়ই “পশ্চিমা অনুকরণ”, “যুব সংস্কৃতি”, কিংবা বড়জোর “বিনোদন” হিসেবে দেখা হয়েছে। অথচ ওয়ারফেজকে একুশে পদকের জন্য নির্বাচন করাই প্রমাণ করে - বাংলা ভাষায় রক বা হেভি মেটালও হতে পারে গভীর, দায়বদ্ধ এবং প্রজন্ম-নির্ধারক। এটিকে নিঃসন্দেহে একটি বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক স্টেটমেন্ট বলা যায়।
সত্যি বলতে কী, বহুদিন পর এমন কোনো সিদ্ধান্তে নিজেকে ‘নিজের বলে’ খুশি হতে দেখছি। সাধারণত জাতীয় সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে ব্যক্তিগত সংযোগ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু এক্ষেত্রে বিষয়টি জলবৎ তরল। যাদের গান শুনে বড় হওয়া—ছোটবেলায় যখন ৩৫ টাকায় ক্যাসেট কিনতে হতো—তাদের জন্য এটি কেবল রাষ্ট্রের ঘোষণা নয়, ব্যক্তিগত স্মৃতিরও স্বীকৃতি।
আমার এখনো মনে আছে, ”অবাক ভালোবাসা” অ্যালবামটা ধানমন্ডি খেলার মাঠের এক মেলা থেকে কেনা। সবে বের হয়েছে অ্যালবাম। যতদূর মনে পড়ে, তখন ওয়ারফেজের ভোকালিস্ট বুয়েটে পড়তেন। এই তথ্যটাই ব্যবহার করে আম্মা’র কাছ থেকে ৩৫ টাকা আদায় করেছিলাম - এই আশায় যে, তিনি ভাববেন, এটা শুনলে আমিও হয়তো কোনোদিন বুয়েটে পড়তে যাব। সে যাই হোক, ক্যাসেট বলে কথা।
আজ নিজেকেই প্রশ্ন করি - আমি কেন কিনেছিলাম? আমার পরিবারই বা কেন নব্বইয়ের দশকের এই ‘ক্রেজ’ মেনে নিয়েছিল? উত্তরটা লুকিয়ে আছে আমাদের সংগীত ও সংস্কৃতির রুচি পরিবর্তনের ইতিহাসে। সেই পরিবর্তনের একটি প্রতিষ্ঠিত স্বীকৃতি আজ একুশে পদক।
ওয়ারফেজ বাংলা ভাষাকে কেবল গান লেখার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেনি; তারা ভাষাকে একটি আধুনিক অভিব্যক্তির বাহন বানিয়েছে। আমার মতো লক্ষ লক্ষ শ্রোতার মনে সেই ভাষা দাগ কেটেছে এবং আমরা বুঝে ওঠার আগেই পরিবর্তনের বাহনে সওয়ার হয়েছি। ঠিক এই জায়গাটিতেই একুশের সঙ্গে তাদের গভীর সংযোগ ভাষাকে জীবিত রাখা, নতুন প্রজন্মের কাছে প্রাসঙ্গিক করে তোলা।
দক্ষিণ এশিয়ায় জাতীয় পুরস্কার মানেই সাধারণত ক্লাসিক্যাল সংগীত, লোকজ ধারা, সাহিত্য কিংবা চলচ্চিত্র। ব্যান্ড সংগীত - বিশেষ করে রক বা মেটাল - এই তালিকায় খুব কমই আসে। ফলে ওয়ারফেজের এই স্বীকৃতি কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়; এটি পুরো অঞ্চলের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়।
সংস্কৃতি কেবল অতীতের সংরক্ষণ নয়; সংস্কৃতি বর্তমানের ভাষাও।
হয়তো এটাই নতুন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্টেটমেন্ট - যা আমরা এতদিন উচ্চারণ করতে দ্বিধা করেছি।
এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এক ধরনের স্বীকারোক্তি যে আধুনিক শহুরে যুব সংস্কৃতি, আন্ডারগ্রাউন্ড সঙ্গীত, এবং বিকল্প শিল্পধারাও জাতীয় পরিচয়ের অবিচেছদ্য অংশ। স্বীকৃতিটি নিঃসন্দেহে দেরিতে এসেছে, কিন্তু তাতে এর গুরুত্ব কমে না। ওয়ারফেজ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সংগীত মানচিত্রে সক্রিয়। এই স্বীকৃতি ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করে।
এটি আমাদের আরও মনে করিয়ে দেয় একুশে পদক কেবল স্মৃতিচারণের জন্য নয়; এটি সময়কে বুঝতেও শেখা।
ওয়ারফেজের একুশে পদক প্রাপ্তি কোনো “একটি ব্যান্ডকে পুরস্কার দেওয়া” নয়। এটি একটি সাংস্কৃতিক শক্ত অবস্থান গ্রহণ যা বাংলা ভাষাকে শুধু কবিতায় নয়, গিটারের ডিস্টরশনেও বেঁচে থাকতে পারে। এবং সময়ের বহতায় একুশের প্রকৃত উত্তরাধিকার।
সবশেষে, কথাটা বলা যাক ওয়ারফেজেরই একটি গানের লাইনে যেটা হয়তো এই সিদ্ধান্তের সময়কাল, দ্বিধা আর পরিবর্তনের চরিত্রটাকে সবচেয়ে নিখুঁতভাবে ধরে:
“আমারও দেশে এমনি জীবনধারা
বদলে যায় রাজারা, থেকে যায় তার ছায়া।”
ধন্যবাদ সেই নির্বাচকমণ্ডলীকে, যারা একুশে পদকের পরিসরকে আরও প্রসারিত করার সাহস দেখিয়েছেন।
আর ধন্যবাদ ওয়ারফেজ - আমাদের মতো করেই আমাদের সংস্কৃতির ভাষা তৈরি করার জন্য।
হ্যাটস অফ এন্ড লং লিভ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

