মুণ্ডুহীন গাড়িচালক
মধ্যরাত। ঘুটঘুটে অন্ধকার। রাজপথ খালি হয়ে গেছে অনেক আগে। ঘরের আলোও নিভিয়ে দিয়েছে মানুষ-ঘুমে যাওয়ার আগে। মৃদু বাতাস বইছিল দনি থেকে। একবারে চুপচাপ সব-সুনশান। এমনি নীরব মুহূর্তকে সঙ্গী করে বসে আছে এক মহিলা। জানালা খুলে অপো করছে- কখন ডাক্তার আসবে। অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা করে সারিয়ে তুলবে।
মোমের আলোয় সে দেখছে তার স্বামী কী কঠিণ যন্ত্রণায় ছটফট করছে। সে তার স্বামীর হাত শক্ত করে আক্রে ধরল। তার ধারণা ভালো করে চেপে ধরলে হয় তো ব্যথার কিছুটা উপশম হতেও পারে। মহিলার হাতের চাপ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয় তার স্বামী একটু চুপ হয়ে যায। মনে হচ্ছে কিছুটা কমেছে রোগযন্ত্রণা। ধীরে ধীরে স্বামী ঘুমিয়ে পড়ছে। উহঃ আহঃ শব্দ করছে না। স্বামীর যন্ত্রণা কমে যাওয়ার পর তার মনের ইচ্ছাগুলো স্মরণ হতে থাকে। সে এখন চাইছে-ইশ্বর যেন তাকে স্বামীহারা না করেন।
সে ইচ্ছাতে পূরণের জন্যই ডাক্তারের উপস্থিতি খুবই জরুরী।
একসময় তার কানে বাজে ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ। তার মানে ঘোড়ার গাড়িতে করে নিশ্চয় ডাক্তার আসছেন। সে অধির আগ্রহে অপো করতে থাকে কখন ঘোড়ার গাড়ি তার ঘরের দুয়ারে এসে থামবে।
মনে হচ্ছে ঘোড়ার গাড়িটা দ্রুতই এগিয়ে আসছে। হয়তো বা দুয়েক বাড়ি দূরে মাত্র। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার বাড়ির সামনে এসে থামবে।
ডাক্তারকে অভ্যর্থনা জানাতে হবে। কারণ এত রাতে তিনি আসছেন। তিনি অন্যের উপকারে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। এ কাজ করতে গিয়ে তাকে রাতের ঘুম নষ্ট করতে হয়েছে।
মহিলা তাকিয়ে দেখে তার স্বামী সজাগ। স্বামীকে বলে একটু সময়ের জন্য তাকে ঘরের দরজার কাছে যেতে হবে। ডাক্তারকে স্বাগত জানাতে হবে।
এরপর সে ঘরের দরজার কাছে যায়। ও মা, অন্ধকার রাতেও সে দেখতে পায় এক আজব কারবার। ঘোড়ার গাড়িতে ঘোড়া আছে। গাড়ির চালকও আছে। তবে সেই চালকের মুণ্ডু নেই।
এ অবস্থা দেখলে কী আর কারো হুশ থাকে?
এক দৌড়ে সে চলে আসে স্বামীর কাছে। স্বামীকে বলে- হায়! কোথায় ডাক্তার।
স্বামী জানতে চায়, ঘোড়ার গাড়ি কি ঠিকমতো এসেছে?
মহিলা চুপ করে থাকে। আর ভয়ে কাঁপন ধরে তার।
স্বামী তাকে সাহস দেয়। স্মরণ করিয়ে দেয়, তোমাকে অনেক আগেই বলেছিলাম, ঘরের দুয়ারে যদি ঘোড়ার গাড়ি থামে আর সে গাড়িতে যদি ধরহীন মানুষ থাকে তাহলে জানবে আমার মৃুতু্যদূত সেই মুণ্ডুহীন মানুষ।
স্বামী মহিলাকে বলে, তুমি আর খামোখা চেষ্টা তদবির করো না। কারণ আমার যমদূত চলে এসেছে। সে আমাকে নিয়েই যাবে।
মহিলা বুঝতে পারছে না এ অবস্থায় কী করবে । কয়েকবার সে দরজার দিকে তাকাতে চেষ্টা করলো। কিন্তু সাহস হলো না।
এদিকে তার স্বামী যেন কুমড়ো লতার মতো নেতিয়ে পড়ছে। চোখ দুটি টেনে রাখতে পারছে না। মনে হচ্ছে ঘুম যেন জেকে ধরেছে তাকে। কিন্তু এটা যে ঘুম নয় তা তো আর বুঝতে অসুবিধা হয় না। কারণ চোখ বুঝে আসার সঙ্গে সঙ্গে তার বোধশক্তিও কমে আসছে। দেখতে না দেখতেই তার চোখ বন্ধ হয়ে এল। চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো দুফোঁটা।
মহিলা বুঝতে পারল, সবই শেষ।
কিন্তু ডাক্তারকে জানিয়ে দেওয়া দরকার যে, তার স্বামী ইতোমধ্যে মৃতু্য বরণ করেছে। স্বামীর মৃতদেহ পেছনে ফেলে সে রওনা দেয় পাশের ঘরেও। ওখানে টেলিফোন রয়েছে।
ও মা দেখে কি, তার স্বামী দরজার সামনে দাঁড়ানো।
তাহলে বিছানায় কে? দ্রুত তার চিন্তা হলো, হয়তো সে মরেনি। এবং ওঠে দরজার কাছে চলে গেছে। তাই সে আবারো বিছানার দিকে তাকালো।
ও মা বিছানায় তার স্বামীর মৃতদেহ পড়ে আছে।
এমন অবস্থায় কার খারাপ না লাগবে। সে ভাবতে থাকে। হায় কী হবে আমার। কী দেখছি এসব?
ঘরের এদিক ওদিক তাকাতে থাকে মহিলা। কানে বাজে তার স্বামীর কণ্ঠ। বলছে- বিদায় । আমি চলে যাচ্ছি। তুমি সুখে থেকো। আমার এখন আর কোনো যন্ত্রণা নেই। যন্ত্রণা হবে না আর কোনোদিনও। বিদায় বন্ধু বিদায়।
তার কানে বাজল ঘোড়ার পায়ের শব্দ। কিন্তু সাহস পাচ্ছিল না ঘরের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়ার। তবে সে বুঝতে পারছিল, তার স্বামী মুণ্ডুহীন গাড়ি চালকের সাথেই চলে যাচ্ছে।
তবে এটা ঠিক এখন তার স্বামীর কোনো যন্ত্রণা নেই। সে আর কোনোদিনও যন্ত্রণাবিদ্ধ হবেও না। কিন্তু মহিলার মনে যন্ত্রণা রয়েই গেলো।
যন্ত্রণা তাকে কুঁকড়ে খেতে থাকে। কারণ এ যন্ত্রণায় তার মনকে বিষিয়ে দিয়েছে। সে যন্ত্রণা ভোগতে থাকবে। প্রথম যন্ত্রণা সে তার স্বামীকে হারিয়েছে। দ্বিতীয় যন্ত্রণা হচ্ছে- সে রাতের যেসব দৃশ্য সে দেখেছে তা কাউকে বলতে পারবে না।
কারণ সবাই বলবে- এগুলো সবই কল্পনা। স্বপ্ন। কারণ তার স্বামীর মৃতু্যকে সে সহজে মেনে নিতে পারেনি।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




