বামুন আর চাষীকন্যা
ভাগ্য আর কাকে বলে। ছিল চাষীর কন্যা, হয়ে গেল রাজরাণী। তা কি আর এমনি এমনি। সে এক অনেক বড় কাহিনী। তাই বলছি।
এক দেশে ছিল এক কৃষক। একটি কন্যা ছিল তার। অপরূপ সুন্দরী। গুণও ছিল অনেক। হলে কী হবে। বাবা ছিল গরীব। দুই বেলা খাবারই জোগাতে পারতো না ঠিকমতো। একবার সে স্বপ্ন দেখল। রাজার কাছে যেতে পারলে তার ভাগ্য ফিরে যাবে। আর রাজা তাকে সুযোগ দেন তাহলে রাজারও ধনসম্পদ বেড়ে যাবে অনেক।
বাবার কষ্ট দেখে তার মনে হলো স্বপ্নের কথা। একবার চেষ্টা করে দেখতে অসুবিধা কি?
একদিন সে চলে গেল রাজদরবারে। রাজাকে বলল- আমি আপনার সাহায্য প্রাথর্ী মহামান্য।
রাজা বললেন, কী সাহায্য চাও তুমি।
এই একটু থাকা খাওয়ার নিশ্চয়তা। এবং কাজে খুশি হলে ইনাম।
খুশি হলে? তুমি কিভাবে আমাকে খুশি করতে পারৰে? কী মতা আছে তোমার?
মেয়েটি বলে, মহারাজ আপনি যদি আমাকে চাকরি দেন তাহলে আমি আপনার সম্পদের পরিমান অনেক বাড়িয়ে দেবো।
রাজা ছিলেন প্রচণ্ড লোভী। তাই রাজী হয়ে গেলেন। বললেন-ঠিক আছে।
রাজা এত সহজে রাজী হয়ে যাবেন তা ভাবতে পারেনি মেয়েটি। চাকরি পেয়ে তার চিন্তা বেড়ে যায়। সে ভাবে হায়রে! স্বপ্নে দেখেছি সম্পদ বাড়িয়ে দিতে পারবো। কিন্তু কিভাবে বাড়াবো। তা যে কিছুই জানি না। এভাবে চিন্তা করতে করতে বেলা চলে যায়।
রাতের বেলা তাকে একটা ঘরে ঢুকিয়ে দিলেন রাজা। বললেন, এই যে খড় দেখতে পাচ্ছ, সেগুলোকে স্বর্ণ বানাতে হবে তোমাকে। সময় পাবে এক রাত।
এ কি যেমন তেমন কাজ ? চাষীকন্যা তাই কাঁদতে থাকলো। কাঁদতে কাঁদতে চোখ দিয়ে আর পানি আসে না। এমন সময় দেখে কী, তার দিকে এগিয়ে আসছে এক বামুন ।
কেন যে তার কাছে মনে হতে থাকে নিশ্চয়ই এ বামুন তাকে সাহায্য করতে পারে। তাই কাছা কাছি হতেই বামুনকে সালাম জানায় মেয়েটি।
সালামের জবাব দিয়ে বামুন মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে কেন সে এভাবে কাঁদছে।
চাষীকন্যার কথা শোনার পর বামুন তাকে আশ্বস্ত করে। জানতে চায়, তার সমস্যা সমাধান করে দিতে পারলে বিনিময়ে তাকে কি দেবে চাষীকন্যা।
চাষীকন্যা তার গলার নেকলেসটা খুলে দিয়ে দেয় বামুনকে।
বামুন চাষীকন্যার কানে কানে বলে দিল কিভাবে ঘরের খড়গুলো একরাতেই সব সোনা হয়ে যাবে।
গভীর রাতে চাষীকন্যা খড়গুলো নিয়ে বসল বামুনের নির্দেশ মতো। খড়গুলো একবার এদিক আরেকবার ওদিক করলো।
রাত পোহানোর আগেই দেখা গেল সোনা হয়ে গেছে ঘরের সব খড় ।
লোভী রাজা তো রাত শেষ হওয়ার আগেই এলো চাষীকন্যার ঘরে। ঢুকেই তার চোখ ছানাবড়া। অবাক করা কাণ্ড। ঘরের সব খড়ই এখন সোনা হয়ে গেছে। আর তা কিনা করেছে এ চাষীকন্যা।
পরের রাতে আবারো একই ঘটনা। রাজা বললেন, ঘরের খড় সব সোনা বানিয়ে দাও। আবারো সেই কান্না। এবং বামুনের উপস্থিতি। বামুন এসে বললো, আজকে আমাকে কী দেবে?
চাষীকন্যা তার আংটি খুলে দিল বামুনকে।
একইভাবে চাষীকন্যা খড়গুলো এদিক ওদিক করলো। ঘরের সব খড় সোনা হয়ে গেলো রাত পোহাবার আগে।
সকাল বেলা সোনার স্তুুপ দেখে রাজাও খুশি হলো। রাজা এতই খুশি যে, সে চাষীকন্যাকে বলে আর একরাত যদি তুমি সোনা বানাতে পারো তাহলে তোমাকে আমি রানী বানাবো।
রাত এলে আবারো সোনা বানানোর নির্দেশ । চাষীকন্যাও কাঁদতে থাকে। বামুন এসে জিজ্ঞেস করে আজ তুমি আমাকে কি দেবে ? কিন্তু চাষীকন্যার এমন কিছু বাকি নেই যা সে দিতে পারে।
বামুন বলল, ঠিক আছে, তোমাকে আজও আমি সাহায্য করবো। কথা দিতে হবে তোমার প্রথম সন্তানটি তুমি আমাকে দিয়ে দেবে।
চাষীকন্যার কোনো উপায় ছিল না। সে রাজী হয়ে যায়।
এদিকে আগের দুই রাতের মতো ঘরের সব খড়ও সোনা হয়ে যায়।
রাজার কথা তো হেরফের হয় না। তাই রাজার সঙ্গে চাষীকন্যার বিয়ে হয়ে যায়। আর তাদের দিনকালও ভালো চলতে থাকে।
ভালোই যেতে থাকে নতুন রানীর দিনকাল ।
বিয়ের এক বছর পর রাণীর কোলে আসে ফুটফুটে এক শিশু।
পরদিনই এসে হাজির সেই বামুন।
বামুনকে দেখে কাঁদতে থাকে রাণী । বামুনেরও মায়া হয়। সে বলে,ঠিক আছে তুমি যদি আমার নাম বলে দিতে পারো তাহলে তোমার শিশুকে আমি আর নেবো না। সময় দিলাম তিন রাত।
পরেরদিন রানী সারা রাজ্যে ঢেড়া পিটিয়ে জানিয়ে দিল সব বামুনদের নাম যেন তাকে তাৎণিক জানিয়ে দেয়া হয়।
রাতের বেলা বামুন আসে। রানী তাকে বলে, তোমার নাম পিটার, না হলে- জেমস কিংবা ম্যাকলি।
বামুন বলে,না হয়নি। তোমার আর দুই রাত বাকি রয়ে গেছে।
দ্বিতীয় দিনও রানী সারা রাজ্যের বামুনদের নাম সংগ্রহ করল। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। তৃতীয় দিন লোকজন এসে বলল,রানীমা, পারলামনা।
একজন চুপি চুপি রানীকে বললো, রানীমা, আমি ফেরার পথে ঐ বনের ধারে দেখলাম একটা্ কুড়ের ঘর। সেখানে আগুন পোহাচ্ছে এক বামুন। হঠাৎ দেখলাম সে নাচতে শুরু করেছে। আর গাইছে, বাহ কী মজা। আজই আমি শিশুটি পেয়ে যাচ্ছি। অবশ্যই পাবো। কারণ আমার নাম যে চিয়ার্স সে কী আর কেউ জানে?
রানী নিশ্চিত হলো তাহলে সেই বামুন।
রাতের বেলা বামুন এলো। আজকে কিন্তু রানী আর কাঁদছে না। বামুনকে বেশ সমাদর করে বসাল রাজপ্রাসাদে। তারপর বললো,বামুন সাহেব আপনার নাম হচ্ছে-চিয়ার্স।
নিজের নাম শুনে বামুনতো হতবাক।
রানী জিজ্ঞেস করে- হলো তো?
বামুন বলে, নিশ্চয়ই এটা কোনো ডাইনীর কাজ। তুমি কি তাহলে ডাইনী পোষ মানিয়েছ নাকি?
রানী চুপ করে থাকে। বামুন মনে করে নিশ্চয়ই ডাইনীটা তাকে ধরতে আসবে এখনি। তাই সে কিছু চিন্তা-ভাবনা না করে দেয় দৌড়।
অনেক দূর গিয়ে পিছু তাকায়। রানী তাকে হাত নেড়ে বিদায় জানায়। বলে- বামুন, তোমার কাছে আমি ঋনী। অনেক ধন্যবাদ তোমাকে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




