বধ্যভূমিগুলোওস্মৃতিবর্হিভুত হতে শুরু করেছে। মরতে মরতে যারা বেঁচে গিয়েছেন একাত্তরে কিংবা বিপাকে পড়ে হলেও যারা নরহত্যা কাজে শরিক ছিল নিয়তির বিধান অনুযায়ীই তারা ক্ষ য়িষ্ণু । অথচ প্রথম কাতারের মানুষগুলোর বয়ানে সেসব ঘটনা দলিলভুক্ত হওয়ার অভাব আজও রয়ে গেছে- স্বাধীনতা অর্জনের 35 বছর পরও। তেমন বড় আয়োজন চোখে পড়েনি গত 35 বছরে। কিছু তথ্য গ্রন্থিত হয়েছে বিচ্ছিননভাবে। সেগুলোকেও যদি সুষ্ঠুভাবে সংগ্রহ করা যেতো তাহলেও হয়তো কিছুটা সমৃদ্ধ হতো বধ্যভূমির ইতিহাস কিংবা । ইতিহাসের তেমনি দুয়েকটি উপকরণ নিয়ে এই রচনা।
জোরালোভাবে মনে করি, পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ বধ্যভূমিটি লাকসাম রেলওয়ে জংসনের কাছে অবস্থিত। স্টেশন ভবন থেকে সামান্য দক্ষিণে কেবিন বরাবর রাস্তার পূর্বপাড়ে, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদব্দের পাকা বাংকারটি রয়েছে, তার উত্তর ও দক্ষিণে বিশাল জায়গা নিয়ে তার অবস্থান। বৃহত্তর কুমিল্লা জেলা ও বর্তমান ফেনী জেলার অনেককেই এখানে জীবন দিতে হয়েছে। কতজন এখানে শুয়ে আছেন, সঠিক হিসাব বের করা সম্ভব নয়। তবে বধ্যভূমির কবর খোদক শ্রীধাম, প্রত্যদশর্ী ড.শান্তিরঞ্জন দাস ও হত্যার জন্য বধ্যভূমিতে নিয়ে আসা এসবি জামান তথ্য দিয়েছেন এ বিষয়ে। কবরখোদক শ্রীধাম বছর কয়েক আগে নিবল্পব্দকারকে বলেছেন- এই সংখ্যা প্রায় দশ হাজার বলে। এসবি জামান বলেছেন তারও বেশি হওয়াও অস্বাভাবিক নয় । ড. দাস এর মতে 5/6 হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এখানে।
ড.দাস একাত্তরে চিকিৎসাধীন ছিলেন রেলওয়ে হাসপাতালে দীর্ঘদিন। তার পরিবারও তখন সেখানেই ছিল। হাসপাতালে থেকে তিনি দেখেছেন কিভাবে হত্যা করা হয় মানুষ। আবার তাকেও একবার নেয়া হয়েছিল হত্যা করার জন্য। বেঁচে গিয়েছেন ভাগ্য গুণে। এসবি জামানকে আরো তেরজনের সঙ্গে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্টস্নানী বাহিনী। একমাত্র ভাগ্যবান জামান সেদিন গুলির হাত থেকে বেঁচে গেছেন। সঙ্গীদের সবাই প্রাণ হারিয়েছে এসবি জামানেরই বাড়ির কাছের এই বধ্যভূমিতে।
শ্রীধাম ও তার মামা মহেন্দ্র দাস গোরখোদক হিসেবে কাজ করেছেন সেখানে। রেলওয়ের কিনার হিসেবে কাজ করতেন দুজনই। তাদের দিয়ে এই কাজ করানো হতো। শ্রীধাম নিজেই শতাধিক কবর করেছেন । ওইসব কবরের একেকটিতে এক থেকে পাঁচ সাতজনকেও মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে।
তেমনি একটি কবর থেকে কংকাল বের করে এনেছিলেন শ্রীধাম এই নিবন্ধকারের অনুরোধে। ওটা এখন রতি আছে মুক্তিযুব্দ জাদুঘরে।
লাকসাম রেলওয়ে জংসনের কাছেই নসরতপুর। সেই গ্রামের আনু মিয়াও ছিলেন একাত্তরের বর্বরতার স্বাক্ষী। তিনিও বর্ণনা করেছেন সেখানকার নৃশংসতা নিয়ে। বলেছেন, কিভাবে এখানে যুবতীদের ধরে এনে নির্যাতন করা হতো। কিভাবে নিয়ে যাওয়া হতো বধ্যভূমিতে। বলেছেন পশ্চিমগাঁওয়ে অনেক রাজাকারের কথা। বকর আলী রাজাকার কিভাবে মানুষ হত্যা করেছে। কিভাবে সে পাকিস্তানি সৈন্যদের চাহিদা পহৃরণ করতে গিয়ে বাঙ্গালি মহিলাদের ধরে এনেছে, সবই এলাকার প্রবীণদের মুখে মুখে এখনো প্রচারিত হয়ে আসছে। নসরতপুরের শফিক রাজাকারের কুকীর্তি এখনো মানুষের মুখে মুখে। রাজাকার মফিজ তো জনগণের হাতেই টুকরো টুকরো মাংসে পরিণত হয়েছে। জীবিত রাজাকারদের নাম বলতে চায়নি আনু মিয়া। নিরাপত্তার কারণে এমন অনেক রাজাকার আলবদরই এখন তাদের অতীতের কুকীর্তির চিহক্র মুছে ফেলতে সম হয়েছে।
এসবি জামানকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল শওকত নামের এক রাজাকার। তার সঙ্গীদেরও নিয়েছিল সেই শওকতই।
পাকিস্টস্নানিদের নির্যাতনের একটি চিত্র তুলে ধরা যেতে পারে। যা বলেছিলেন এসবি জামান। সিগারেট কারখানা নির্যাতন কেন্দ্রে তাকে আটক করে রাখা হয়। একটি ক েতারা 14জন। দিনের পর দিন এখানে মানুষ রাখা হয়েছে, গরু-ছাগলের মতো। এখানেই প্রস্রাব পায়খানা করতে হয়েছে বন্দীদের। তেমনি একটি জায়গাতেই দুইদিন কাটিয়েছেন জামান। শুত্রক্রবার ছিল সেদিন। তারা অনুরোধ করলেন জীবনের শেষ জুমার নামাজ আদায় করতে যেন তাদের সুযোগ দেওয়া হয়। মেনে নিলো পাকিস্টস্নানি বাহিনী। কিন্তু প্রত্যেকের গায়ে প্রস্রাব পায়খানা লেপ্টেল্ট আছে। তাই অনুরোধ জানালো যেন গোসলের সুযোগ দেওয়া হয়। এই আবেদনও মঞ্জুর হলো। নিয়ে যাওয়া হলো সিগারেট কারখানার সামনের পুকুরে। তবে চোখ বেঁধে। সেখানে নিয়ে সবাইকে উলঙ্গ করা হলো সবাইকে। তখন তাদের চোখের কাপড় খুলে দেওয়া হলো। গরু যেভাবে পিটিয়ে পুকুরে নামানো হয় সেভাবেই তাদেরও নামানো হলো পুকুরে।
আবার ফিরিয়ে আনা হলো নির্যাতন কেন্দ্রে। এবার আর চোখে কাপড় নেই। এসবি জামান সেসময়ের স্ট্মৃতিচারণ করেছিলেন এভাবে, ' ' সিগারেট কারখানা ঢুকতেই দেখলাম বারান্দায় এবং এখানে ওখানে পড়ে আছে অনেক মহিলা। কাপড় নেই কারো গায়ে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কারো অত নেই। বীভৎস চিত্র দেখে আল্ক্নাহর কাছে ্একটাই দোয়া করলাম, আল্ক্নাহ এই চিত্র দেখার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো। মাটিটা যদি তুমি ফাঁক করে দিতে তাহলে আমি সেখানে লুকিয়ে যেতাম।
বলেছিলেন ড. দাসও। কিভাবে তিনি ফিরে এসেছেন বধ্যভূমি থেকে।
কুমিল্ক্না শহর থেকে 8 কিলোমিটার উত্তরে রসুলপুর রেলওয়ে সদ্বেশন। হযরত শাহ মনিপুরীর মাজার রয়েছে সদ্বেশন ঘর থেকে দেড়-দুইশ' মিটার দেিণ। মাজারের কাছে, রেললাইনের পশ্চিমে, উত্তর-দেিণ লল্ফ্বা জায়গাজুরে রয়েছে দুইশতাধিক মানুষের কবর। একাত্তরে রেলওয়ে সদ্বেশনটিতে থাকতো পাকিস্টস্নানি সৈন্যরা । ওরাই হত্যা করতো মানুষ। প্রথমে ধরে আনতো বিভিল্পম্ন জায়গা থেকে। তারপর নির্যাতন করতো নির্যাতন কেন্দ্রে রেখে। কখনো গুলি করে গর্তে ফেলা হতো লাশ কখনোবা মাটিতে চাপা দেওয়া হতো অর্ধমৃত মানুষ। বেয়নেট চার্জ করে কিংবা পিস্টস্নল চালিয়েও হত্যা করা হতো ।
গ্রামে মানুষজন ছিলনা তেমন। একেবারে খেটে খাওয়া মানুষ, যার হয়তো বাইরে গিয়েও বেঁচে থাকার কোনো উপায় নেই এমন দুয়েকটি পরিবার ছিল কোনোমতে। তাদেরই একজন ছিলেন সিরাজুল ইসলাম। প্রায় শতবর্ষী সিরাজুল ইসলাম একসময় কথা বলেছেন রসুলপুর বধ্যভূমি বিষয়ে। আষদ্বেপৃষদ্বে বাধা পড়েছিলেন তিনি পাকিস্টস্নানীদের কাছে।
যুবক মফিজুল নির্যাতন কেন্দ্র থেকে পালিয়ে যেতে পারলেও সিরাজুল ইসলামকে থাকতে হয়েছে পাকিস্টস্নানিদের সঙ্গে সঙ্গে। তিনি সবকটি হত্যাকা-ই প্রত্য করেছেন একেবারে কাছে থেকে।
মফিজুল তখন কিশোরোত্তীর্ণ মাত্র। তাকে দিয়ে যে গর্ত করা হয়েছিল সেই গর্তেই তাকেও শায়িত হওয়ার কথা ছিল। সেদিন এক বিহারী ইপিআর এর কল্যানে বেঁচে যায় মফিজুল। তারপর কয়েকদিন সেখানে কায়িক শ্রম দিতে হয়েছে মফিজুলকে। তারপর এক রাতে সুযোগ পেয়ে পালিয়ে গেছেন নির্যাতন কেন্দ্র থেকে। নাজির নামের ইপিআর সদস্য মফিজুলকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। আর এই নাজিরই মেরেছে বহু বাঙ্গালিকে। পাকিস্টস্নানি সৈন্যবাহিনীর সহযোগী হয়ে অনেক বাড়িতে আগুন দিয়েছে। নিয়তির বিচার হয়েছে। সেই নাজিরও মারা পড়েেেছ যুদব্দে। তারপরও ব্যক্তিগতভাবে মফিজুল কৃতজ্ঞতা জানায় বিহারি ঐ ইপিআরকে।
আরেকটি বৃহৎ বধ্যভূমি চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে। জেক লল্ফ্বাট নামের এক ব্রিটিশ ভদ্রলোক বানিয়েছিলেন এক বাড়ি। ছোট পাহাড়ের উপর অপহৃর্ব দেখতে দোতলা বাড়ি এটি। পাশেই সার্ভেন্ট কোয়ার্টার। তারপর পাহাড়ের ঢাল।
এই পাহাড়ের উপর রঙ্গালয় তৈরি করেছিল পাকিস্টস্নানি সৈন্যরা। ফয়জ লেকের কাছাকাছি সমতল নিন্মভূমিতে বড় আকারের দুটি পাথর রাখা ছিল সেসময়। সেই পাথরের উপর শুইয়ে দেওয়া হতো নির্যাতন পরবর্তী অচেতন মানুষগুলোকে। তারপর চলতো জল্ক্নাদের দায়ের কুপ। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতো বাঙালির। উল্ক্নসিত হতো বিহারী দুই জল্ক্নাদ আর তাদের প্রভু পাকিস্টস্নানি সৈন্যরা।
বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবন, চট্টগ্রামের সামনেই এই পাহাড়। সেই পাহাড়ের চূড়ায় বাগানবাড়িতে সৈন্যবাহিনীর সদস্যরা ট্রেনযাত্রীদের নিয়ে যেত দড়ি দিয়ে বেঁধে। আবু তাহের জং ও তাসাউর নামের দুই বিহারী জল্ক্নাদ তাদের নির্দেশ পালন করতো রামদা চালিয়ে। সেই পাথর দুটি ছিল বাগানবাড়িতে কয়েক বছর আগেও। সেটি তখন দেখা গেছে বাগানবাড়ির কেয়ারটেকার আ্বন্ধুল লতিফের ঘরে। জল্ক্নাদখানার জীবনস্ন স্ট্বাী পাথরটি সংগ্রহ করা হয়েছে কিনা জানি না। মুক্তিযোদব্দা মন্পণালয় হয়েছে মুক্তিযুদব্দ বিষয়ে কাজ করার জন্য। আ্বন্ধুল লতিফের ঘরে পাথরটি যদি নাও থাকে তাহলেও পাথরের খবর জানবে তারা। মুক্তিযুদব্দ মন্পণালয়ের উচিৎ অনস্নত স্ট্মৃতিচিহক্র হিসেবে পাথর সংরণ করা।
চট্টগ্রামের বিভিল্পম্ন জায়গাতেই রয়েছে এমনকিছু বধ্যভূমি। যেগুলোর সংরণ কিংবা অবকাঠামোগত উল্পম্নয়ন করা অতি জরুরী।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া উপজেলা সদর থেকে এক কিলোমিটার পহৃর্বদিকে তারাগণ ব্রিজ। ব্রিজের কাছে খালের ধারে পাকিস্টস্নানি বাহিনীর সদস্যরা হত্যা করেছে বহু মানুষ। আশেপাশের গ্রাম থেকেও অনেককে এনে হত্যা করেছে। আখাউড়া জংশন থেকেও ধরে আনা হতো সাধারণ মানুষকে। কখনো জবাই করা হতো। কখনো গুলি করে হত্যা করা হতো সাধারণ মানুষকে। আবুল মিয়া, কবির মিয়া, ইদ্রিস খাঁর , মিরজন মিয়ার মতো 20জন প্রাণ হারিয়েছেন এই বধ্যভূমিতেই।
বধ্যভূমিগুলো সমঙ্র্কে আজকের প্রজন্মকে অবহিত করা অতি জরুরী বলে মনে করি। সেজন্য বধ্যভূমিগুলোকে সংরণ করার দাবিও অনেক পুরণো। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে মুক্তিযোদব্দা বিষয়ক মন্পণালয়ের মাধ্যমে। এ নিয়ে রাজনৈতিক ফয়দাও হাসিল করা হয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদব্দের ইতিহাস যেমন বিকৃত ও আস্টস্নাকুড়ে নিপ্টিস্ন হওয়ার পর্যায়ে পড়েছে তারই অংশ হিসেবে পাকিস্টস্নানি বাহিনী আলবদর রাজাকার বাহিনীর নৃশংসতার চিহক্রগুলোকে মুছে দেওয়ার চেষদ্বাই যেন করা হচ্ছে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



