কেমন হচ্ছে আধুনিক বাংলা গান
গান হচ্ছে কথা ও সুরের বৈচিত্য এবং সে সঙ্গে কাব্যময়তা। মহৃলত কথা ও সুরের মেলবল্পব্দনের দ্বারাই তৈরি হয় একটি পরিপহৃর্ণ গান। অর্থাৎ একটিকে ছাড়া অন্যটির জীবন সমঙ্হৃর্ণ ব্যর্থ। ভালো বা সুমধুর সুরের অভাব এবং উপযুক্ত যন্পানুষজ্ঞ ব্যবহূত না হওয়ার কারণে যেমন একটি গানের বাণী নিষম্ফল ও নিরর্থক হয়ে যেতে পারে, তেমনি গানের সুরেরও একই পরিণতি হতে পারে, যদি গানের বাণী মানুষের হূদয় ও মনের তলদেশকে না ছুঁয়ে যায়, আন্দোলিত না করে।
বর্তমানে আধুনিক গানের বড় দুর্দিনই চলছে বলা যায়। অথচ এ দেশের ভৌগলিক সীমার লোকসঙ্গীতের ধারাটি সমৃদব্দ থেকে সমৃদব্দতর, তার গানের বাণী ও সুরের অভাব বা আকাল পড়েনি কোনোদিন। এমন কি আধুুনিক গানেরও। আজকাল দেখা যায়, অকবিদের হাতে গান রচনা, সুরকারদের কাব্যবোধের অভাব_ এসব কারণই হচ্ছে বাংলাদেশের আধুনিক গানের প্রধান সমস্যা।
বিংশ শতা্বন্ধীর পাঁচ, ছয় এবং সাতের দশক পর্যনস্ন আমাদের আধুনিক বাংলা গানের ধারাটি, সামগ্রিক অর্থেই ছিল খুবই সজীব ও জীবনস্ন_ কী বাণীতে, কী তার সুরে এবং যন্পানুষজ্ঞে। বাংলাদেশ স্ট্বাধীন হওয়ার আগে অর্থাৎ পাকিস্টস্নান আমলে আধুনিক বাংলা গানের আকাশজুড়ে ছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের যেসব কণ্ঠশিল্কপ্পী তারা হলেন_ হেমনস্ন মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, জগন্ময় মিত্র, মাল্পম্না দে, সল্পব্দ্যা মুখোপাধ্যায়, উৎপলা সেন, প্রতীমা বন্দ্যোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, হৈমনস্নী শুল্ক্কা প্রমুখ। পরে তাদের সঙ্গে যুক্ত হন লতা মুঙ্গেশকর, আশা ভোসলে এবং কিশোর কুমার। সে সময় যারা গান লিখতেন তারাও ছিলেন তাদের গানের বাণীর জন্য পৃথক সত্তার অধিকারী। তারা প্রত্যেকেই ছিলেন আপন গুণে ও পরিচয়ে উজ্জ্বল। আর এসব গীতিকারের মধ্যে উল্ক্নেখযোগ্য হলেন_ গৌরী প্রসল্পম্ন মজুমদার, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, নিশিকানস্ন ও প্রণব রায়। আর তখন যারা সুর করতেন তাদের মধ্যে ছিলেন_ কমল দাশগুপ্টস্ন, নচিকেতা ঘোষ, রবীন মজুমদার, শচীন কর্তা, সলিল চৌধুরী, সুধীন দাশ গুপ্টস্ন, শ্যামল গুপ্টস্ন, হিমাংশু দত্ত, দিলীপ কুমার রায় এবং কণ্ঠশিল্কপ্পী হেমনস্ন মুখোপাধ্যায় নিজেও। এসব সুরকারের শ্রম, মেধা ও চেষদ্বার ফসলস্ট্বরূপ তখনকার সময়ের একেকটি গান প্রতিনিয়ত শ্রোতাদের হূদয় ও মন জয় করে নিয়েছিল_ কী তার বাণীতে, কী সুরের ঝগ্ধকার ও বৈচিত্র্যে, কী যন্পানুষজ্ঞে। তাদের সুরারোপিত গানগুলো আজো অমর হয়ে আছে। এসব গান বারবার শুনলেও যেন মনের তৃপ্টিস্ন মেটে না। আর এরই সঙ্গে পাল্ক্না দিয়ে আমাদের দেশেও শুরু হয় একেবারে শহৃন্য থেকে আধুনিক বাংলা গানের অভিযাত্রা।
তদানীনস্নন পাকিস্টস্নান আমলে আধুনিক বাংলা গানের জগতে আসেন একঝাঁক নবীন শিল্কপ্পী। যেমন_ আনোয়ার উদ্দিন খান, বশীর আহমেদ, মোহাল্ফ্মদ আলী সিদ্দিকী, মাহমুদুল্পম্নবী, সৈয়দ আবদুল হাদী, আবদুল জব্বার, খন্দকার ফারুক আহমদ, ফেরদৌসী রহমান, আঞ্জুমান আরা বেগম, শাহনাজ রহমতউল্ক্নাহ, জিনাত রেহানা, ফরিদা ইয়াসমিন, খুরশীদ আলম, নীলুফার ইয়াসমিন, সাবিনা ইয়াসমিন প্রমুখ। আর গীতিকার হিসেবে যাদের আবির্ভাব ঘটলো তাদের মধ্যে উল্ক্নেখযোগ্য হলেন_ আবু হেনা মোস্টস্নফা কামাল, সিকান্দর আবু জাফর, সৈয়দ শামসুল হক, ডা. মোহাল্ফ্মদ মনিরুজ্জামান, খান আতাউর রহমান, কেজি মোস্টস্নফা, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, জেবুল্পেম্নসা জামাল, লোকমান হোসেন ফকির, মাসুদ করিম, মোহাল্ফ্মদ রফিকউজ্জামান প্রমুখ। সে সময় সুরকার হিসেবে যারা হাল ধরেন তারা হলেন_ আবদুল আহাদ, সমর দাস, মুসলেহ উদ্দিন, খান আতাউর রহমান, সুবল দাস, রবীন ঘোষ, সত্য সাহা, ধীর আলী মিয়া, শহীদ আলতাফ মাহমুদ, আজাদ রহমান প্রমুখ।
এসব সুরকারের সুরাপিত গান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আধুনিক বাংলা গানের সঙ্গে রীতিমতো পাল্ক্না দিয়েই তাদের জয়যাত্রা অব্যাহত রাখে। তখনকার দিনের সুরকার, গীতিকার ও কণ্ঠশিল্কপ্পীদের সল্ফ্মিলনে সৃষদ্ব সেসব গান এখনো যখন বেতার ও টেলিভিশনে পরিবেশন করা হয়, মনেই হয় না সে গানগুলোর আবেদন বিন্দুমাত্র হারিয়েছে। আমাদের আধুনিক গানের ভা-ারে এসব গান এখনো 'ধ্রুপদী' বা 'চিরায়ত' মর্যাদার অধিকারী। এখনো যে আমাদের এসব আধুনিক গান তার আবেদন ধরে রাখতে পেরেছে, তার মহৃলে রয়েছে সেগুলোর মৌলিক সুর, বাণীর মৌলিকত্দ্ব, অপহৃর্ব গায়কী ও সঙ্গত যন্পানুষজ্ঞ।
বাংলাদেশ স্ট্বাধীন হওয়ার পরও এ ধারা অব্যাহত থাকে। আর এ ধারা চলে সত্তর দশকের শেষ পর্যনস্ন; কিন্তু তারপর থেকেই ঘটতে থাকে আধুনিক বাংলা গানের অবনমন, কী বেতারে, কী টেলিভিশনে, কী চলচ্চিত্রে পরিবেশিত গানে প্রায় ধারাবাহিকভাবে। অথচ সত্তর দশকের মধ্যভাগ ও আশির দশকের শেষ থেকে নব্বই দশক পর্যনস্ন এ সময়ের মধ্যে আমাদের সঙ্গীত জগতে প্রবেশ করেন বেশকিছু প্রতিভাবান গায়ক-গায়িকা। যেমন_ সুবীর নন্দী, শাল্ফ্মী আকতার, এন্ড্রু কিশোর, শাকিলা জাফর, সামিনা চৌধুরীসহ আরো অনেকে; কিন্তু পরে চলচ্চিত্র সংশি্নষদ্ব গানের জোয়ারে তাদের ভেসে যেতে দেখা যায়। পৃথকভাবে আধুনিক গানের যে ধারাটি বহমান ছিল, তাও ত্রক্রমেই আবেদন হারাতে থাকে। ফলে আমাদের আধুনিক গানের জগতে কালজয়ী তেমন বেশি গান আমরা পায়নি, যা চিরকাল মানুষের হূদয় ও মনের তলদেশ ছুঁয়ে থাকবে। পরে আরো কিছু প্রতিভাবান গায়ক-গায়িকা আমাদের আধুনিক গানের জগতে প্রবেশ করেছেন। তারা হলেন_ কনকচাঁপা, বেবী নাজনীন, মনির খান, রবি চৌধুরী, এসডি রুবেল, পলাশ, আসিফ, ডলি সায়নস্ননী প্রমুখ। এ সঙ্গীত শিল্কপ্পীদেরও কণ্ঠে গাওয়া কালজয়ী আর ক'টি গানইবা আছে! এ অবস্ট্থার জন্য আসলে কারা দায়ী? আমার মতে, এ জন্য আমাদের প্রতিভাবান সুরকার ও গীতিকারের প্রচ- অভাবই দায়ী। এখন অবস্ট্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, হাতেগোনা যে ক'জন প্রতিভাবান সুরকার ও গীতিকার রয়েছেন, নকলবাজ সুরকার ও তথাকথিত অকবি-গীতিকারদের দাপটের চোটে তারা আধুনিক গানের জগৎ থেকে এখন ছিঁটকে পড়েছেন। ফলে আধুনিক বাংলা গানের জগতে চলছে ঘোরতর দুর্দিন।
বর্তমানে আমাদের দেশে যে ধারায় বাংলা আধুনিক গান চলছে আগামীতে এমন ধারায় গান চলতে থাকলে আধুনিক বাংলা গানের ভাগ্যে কী বিপর্যয় ঘটবে তা সহজেই অনুমেয়। তাই এমন ধারায় গান না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। কারণ পাশ্চাত্য পপ ও ভারতীয় হিন্দি গানের সুর বর্তমানে আমাদের দেশের আধুনিক বাংলা গানে ভীষণভাবে মিশে যাচ্ছে, যা আদৌ হওয়া উচিত নয়। এসব গানের কথা ও সুর হয়তো নতুন প্রজন্মের রক্তে উত্তেজনা সৃষদ্বি করতে পারে; কিন্তু তার স্ট্থায়িত্দ্ব খুবই কম। অর্থাৎ মানুষের মন থেকে এসব গানের আবেদন দ্রুত মুছে যায়। সহসাই সে গানের মৃতু্য ঘটে। বিশেষত বাংলা গানের নিজস্ট্ব ধারা, চরিত্র ও বৈশিষদ্ব্য রয়েছে। এগুলো বজায় রেখে যদি গানের প্রতি গুরুত্দ্ব দেওয়া যায়, তবে অবশ্যই আধুনিক বাংলা গানের আরো উল্পম্নতি ঘটবে।
আমাদের দেশে এখন আধুনিক যন্পসংগীতের অভাব নেই। অডিও রেকর্ডিং ষদ্বুডিওগুলো অত্যাধুনিক সরঞ্জ্যামে সজ্জিত। ক্যাসেট কোমঙ্ানীগুলোও প্রায় প্রতিদিনই নবীন-প্রবীন গায়ক-গায়িকাদের গানের সিডি বের করছে, এ্যালবাম প্রকাশ করছে। কিন্তু তাতে হূদয়গ্রাহী, চিত্তজয়ী আধুনিক গান কয়টাই থাকছে, সে বিষয়টা নিবীড়ভাবে দেখা প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে আধুনিক বাংলা গানকে এগিয়ে নিতে হলে দরকার সবার সল্ফ্মিলিত সহযোগিতা। শিল্কপ্পী-সুরকার এবং গীতিকারদের বাংলা আধুনিক গানের প্রতি আরও বেশী মনোযোগী হতে হবে। আমরা আধুনিক বাংলা গানের নামে কোন বিরক্তিকর, বস্টস্নাপচা গান শুনতে চাই না। চাই জীবন রসে সিক্ত হূদয় ছোঁয়া প্রকৃত আধুনিক বাংলা গান।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



