তবে অপবাকের অভিযোগটি আমায় ভাবিয়েছে। তাই স্পষ্ট করে কথা বলা বা লেখা নিয়ে এই পোস্টটি। ভাবনায় যেটা ঘুরে ফিরে বেশি এসেছে তা হলো, আসলে কি স্পষ্ট করে বললেই মানুষ বুঝতে পারে? কয়েকটা উদাহরন দেওয়া যাক।
উপনিষদে স্পষ্ট করেই বলা ছিলো মহাবাক্যে: 'তাত তোয়াম আসি' বা 'ইউ আর দ্যাট'। অসম্ভব মরমী এক বাণী। ব্যাখ্যায় যাবো না। যার বোঝার বুঝে নিন।
বাইবেলে স্পষ্ট করেই বলা ছিলো: God created man in His own image
কুরআনে স্পষ্ট করেই বলা আছে: আদমকে সৃষ্টির পরে স্রষ্টা তার নিজের রুহ বা আত্না প্রবিষ্ট করান আদমের অন্তরে। আরো বলা আছে মানুষের নিজের রক্ত মাংসের চাইতেও স্রষ্টা নিকটবতর্ী।
মুহাম্মদ (তার প্রতি সালাম) বলেছেন: God says, man is my secret and I'm his secret.
খোদার প্রেমে সম্পূর্ণভাবে আসক্ত হয়ে প্রেমিক মনসুর আল হাল্লাজ পৃথিবীকে জানিয়ে গেছেন: আনাল হক (উপনিষদের 'ইউ আর দ্যাট' এরই প্রতিধ্বনি, পার্থক্য কেবল ফাস্ট পার্সন আর সেকেন্ড পার্সনে)।
আমাদের নিজস্ব যে নজরুল ইসলাম, তার ভাষায়: মিথ্যা শুনিনি ভাই, এই হৃদয়ে চেয়ে বড় কোনো মন্দির কাবা নাই।
সনাতন ধর্ম থেকে শুরু করে পৃথিবীর শেষ ধর্ম পর্যন্ত মানুষ এবং স্রষ্টার এই যে পরম সম্পর্ক; যুগে যুগে যথেষ্ট স্পষ্টতার সাথেই বলা হয়েছে এমন এক কথা যা সত্যিকারের উপলব্ধি করলে মানুষ হতো সত্যিকারের খোদার প্রতিনিধি (খালিফাতুল্লাহ), নিবিড় অর্থে; কেবল আক্ষরিক অর্থে প্রতিনিধি নয়। কই মানুষ কি তার ডিভাইন আইডেনটিটির বা ন্যাচারারের এই অনুভুতিকে ধরে রাখতে পেরেছে? পারে নি, বরং সে পশুর থেকেও নিকৃষ্ট হওয়ার প্রমান দিয়েছে। তাই বলি, সব কিছু স্পষ্ট ভাবে বললেই কি হয়?
অন্যদিকে অস্পষ্ট করে বললেই যে মানুষ বুঝবে না তা কিন্তু নয়। কবি পরম মমতায় একটা সুন্দর কবিতা জন্ম দেয়; তা অস্পষ্টতা আর উপমায় ঘেরা থাকলেও তার বাণী কিন্তু অন্তরে গেঁেথ যেতে ব্যহত হয় না। বাউলদের গানের কথায় আসা যাক। তাদের বেশিরভাগ গানই অস্পষ্ট উপমা দিয়ে সৃষ্টি। যেমন: "পাখিটা বন্দী আছে দেহের খাঁচায়। ও তার ভবের বেড়ি পায় জড়ানো উড়তে গেলে পড়িয়া যায়।"
এখানে পাখি হলো আত্না; 'দেহের খাঁচা' হলো আমাদের দেহ এবং একই সাথে পৃথিবী। ভবের বেড়ি হচ্ছে পার্থিব মোহ এবং আকাংখা। 'উড়তে গেলে পড়িয়া যায়' মানে হলো নস্বর পৃথিবীর মায়া কাটাতে বারবার ব্যর্থ হওয়ার রূপক।
এই যে অসাধারন বাউল গানটি। এটা কিন্তু আক্ষরিক অনুবাদ করে বুঝতে গেলে পুরো ধরা খেতে হবে। তাহলে বোঝার বা উপভোগের উপায়টি কি? উপভোগের উপায় হলো প্রথমত বাউল দর্শন সম্পর্কে জানা এবং তার সাথে সাথে হৃদয়গত উপলব্ধি। কেবল এই দুটির সমন্বয় হলেই গানটি বোঝা যাবে।
আমরা বাউল দর্শনও জানবো না, বোঝার চেষ্টাও করবো না; বিজ্ঞান বিজ্ঞান চিৎকার করে উপলব্ধির জানালাগুলো বন্ধ করে দেবো, তা হলে কি উপলব্ধি আসবে? অপার্থিব সৌন্দযর্্য নিয়ে একজন বাউল যখন সব টুকু দরদ দিয়ে গানটি গাইবে তা কি উপলব্ধি করা যাবে এরকম রিজিড মানসিকতা নিয়ে?
তখন কি আপনি অপবাকের মতো দর্শকের সারি থেকে কর্কশ গলায় বলে উঠবে, ওরে বাউল তুই স্পষ্ট কথা বলিস না কেন?
সমর্্পকিত পোস্ট: অভিযোগ সাদিক স্পষ্ট কথা বলে না।
http://www.somewhereinblog.net/kkk/post/7833
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



