পাদ্রির মুখেই শোনা যাক: "আর ঐ মোসলেম ফ্যানাটিকগুলোর যে ধর্ম সেইটার কথা শুনলে তো ঘেন্নায় মাথা কাঁটা যায়।
আরবের মরুভুমিতে একদল জোব্বা পড়া, মাথায় লাল সাদা কাপড় প্যাচানো অশিক্ষিতের ধর্ম ইসলাম। মুখে বলে ইসলাম ইজ পিস, ইসলাম ইজ পিস, কিন্তু তলোয়াড় দিয়ে মানুষকে কনভার্ট করেছে।
এরা দিনে পাঁচ বার মাটিকে চুমু খায়। মরুভুমির মধ্যে একটা চারকোনা বাক্সরে ঘুরে ঘুরে হাউমাউ করে। হাউ মাউ শেষে উট জবাই করে। এদের কোরান হইলো একটা টেরোরিস্ট ম্যানুয়াল। এরা মেয়েদের খোলসে পুড়ে রাখে, ইচ্ছা বিরুদ্ধে তাদের রেইপ করা তাদের ধর্মের নিদের্শ। নারী পুরুষের দাস, শিখিয়ে গেছেন এদের ভন্ড প্রফেট।
এরা প্যাগান মুন গডরে পুজা করে। এরা মুখে বলে এদের গড আর খ্রিস্টান গড একই, কিন্তু আসলে না। এদের ধর্ম যে বানাইছে সে হইলো প্রফেট মাহোমেত। তার মৃগী রোগ ছিলো, তাই হঠাৎ হঠাৎ উলটা পালটা দিবা স্বপ্ন দেখতো এবং সেইগুলো 20 বছর ধরে গোপনে লিখে লিখে সেটাকে ধর্মগ্রন্থ বলে চালায়ে দিছে।
এরা প্রত্যেকে চারটা বিয়ে করে। মাহোমেত অবশ্য বিয়ে করেছিলো ডজন খানেক। এই হইলো ইসলাম।
চার্চ ভর্তি সবাই রি রি করে নিজেদের ঘৃনা প্রকাশ করে ইসলাম সম্পর্কে। হল ভর্তি সবার ফিশফাশ শুরু হয় । মহিলার গলাই বেশি শোনা যায়। ফিশফাশ ছাপিয়ে মাঝে মধ্যে শোনা যায়, বর্বর, ইনফিডেল, প্যাগান, মুনগড, প্রফেট মাহোমেত ইত্যাদি টুকরো শব্দগুলো।
---------------------------------------
যে ঘটনার কথা বললাম এটা হলো খ্রিস্টান ফান্ডামেন্টালিস্টদের চার্চে কিভাবে ইসলামকে উপস্থাপন করা হয়। মজার বিষয় হলো একবিংশ শতাব্দিতে এসেও পশ্চিমা বিশ্বে খ্রিস্টানরা তাদের অন্ধবিশ্বাসীদের এভাবেই ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান দিয়ে থাকে।
---------------------------------------
হার্ডকোর খ্রিস্টানদের লেখা ইসলাম সম্পর্কে বই ঘাটলেও এই একই রকম ছবিই পাবেন যেখানে মুসলিম মানেই আরব প্যাগান যারা দিনে পাঁচ বার মাটিতে চুমু খায় এবং বউ পিটায়।
ধরুন আপনি খ্রিস্টান। এখন আপনি যদি ইসলাম সম্পর্কে জানতে চান তাহলে খ্রিস্টানদের কাছ থেকে যদি জানেন তাহলে সত্যি দৃশ্যটা কি জানতে পারবেন? যে দৃশ্য উপরে বললাম ঠিক সেইরকম একটা ছবি দেখতে পাবেন। ইসলাম জানতে লাইব্রেরিতে গিয়ে কার লেখা বই বের করবেন, রেফারেন্ড ফিলিপ জনসন নামের পাদ্রীর লেখা: "ইসলাম - এ রিলিজিয়ন স্প্রেড বাই সোর্ড" .... নাকি কোন মুসলিম স্কলারের লেখা "ইসলাম : দি মেসেজ"?
---------------------------------------
তুলনামূলক ধর্ম তত্ব আমার প্রিয় বিষয়।
ইসলাম ধর্মের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি ইনহারেন্টভাবে একটি কম্প্যারেটিভ রিলিজিয়ন। কুরআনে তাই বারবার খ্রিস্টান ও ইহুদী ধর্মের কথা এসেছে, পিপল অফ দি বুকের কথা এসেছে। তখন স্টাডির সময়ে যেটা খুব ভালোভাবে বুজেছি তা হলো ধর্ম বা দর্শন যেকোন ভিউ পয়েন্ট জানতে হলে অন্য পক্ষেরটা জানতে চাইতে সেই পক্ষের মানুষের কাছ থেকে জানতে হবে।
কেবল মুসলিম ঘরে জন্মেছি বলেই যে আমাকে বিশ্বাস করতে হবে তা নয়। আমি মন খুলে পড়েছি হিন্দু ধর্মের গীতা, উপনিষদ; পড়েছি বাইবেল, বাহাই দের বই এবং বৌদ্ধ ধর্মের পবিত্র বইগুলো ও সেই দর্শগুলো।
ইসলাম সম্পর্কে একজন খ্রিস্টান পাদ্রী নিশ্চিত ভাবেই বায়াসড করা বলবে। হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে জানতে হলে আপনাকে উপনিষদ এবং তার ব্যাখ্যা পড়তে হবে যা সেই ধর্মের একজন লিখেছেন। নইলে বিদ্্বেষ মেশানো মিথ্যে একটা ছবিই পাবেন, আর কিছু নয়।
---------------------------------------
এবার আসুন ইসলাম সম্পর্কে। মেইন স্ট্রিম ইসলাম, মেইন স্ট্রিম হিস্ট্রি বলে যারা চিল্লা পাল্লা করেন তাদের জন্য বলছি যে ইসলামের ইতিহাস এত সরল নয় যে বেশিরভাগ মানুষ যা করছে তা দেখে সেটা সত্য ধরে নিতে হবে। মুসলিমদের ধমর্ান্ধতার পেছনে এই মনোভাবটিই মুলত দায়ী। পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষই তো খ্রিষ্টান, তাই বলে পশ্চিমা দুনিয়ায় খ্রিষ্টানরা কি ইসলাম সম্পর্কে জানছে না? জেনে মনে প্রাণে গ্রহনও করছে হাজারে হাজারে।
মুহাম্মদ (তার প্রতি সালাম) মৃতু্যর সাথে সাথে একটা ট্রানসফরমেশনের মধ্যে দিয়ে যায় পুরো মুসলিম কমিউনিটি। যে নবীর পরিবারকে কুরআনে এবং নবী নিজে বারবার মযর্াদা দিতে বলেছেন তাদের সুকৌশলে হত্যা করতে শুরু করে একদল নরপিশাচ, উদ্দেশ্য ক্ষমতার ভোগদখল।
নবীর পরিবার ও লিনিয়েজ এতটাই সন্মানের যে আজো প্রতি নামাজের শেষে নবীর সাথে তার পরিবারের প্রতি স্রষ্টার রহমত কামনা করা হয়। Allah humma sal-li 'ala Muhammadin wa 'ala aali Muhammadin
এখানেই বোঝা যায় নবীর সমপর্যায়ে তাদের নাম উচ্চারনের মাধ্যমে তাদের কতটা সন্মান দিতে নিদের্শ দেওয়া হয়েছে।
যাই হোক, এখন নবীর মৃতু্যর প্রায় 50 বছর যেতে না যেতেই হাসান হুসেইন দুইজনকে শহীদ করা হয়। ততদিনে মুসলিম বিশ্বের ক্ষমতা নরপিশাচদের হাতে চলে এসেছে। মুয়াবিয়া, ইয়াজিদরা খলিফা বা শাসনকর্তা।
এদিকে ততদিনে সুসংবদ্ধ ধর্ম হিসেবে ইসলামের চেহারাটি কি দেখা যাক। নবীর মৃতু্যর প্রায় 25 বছর লেগেছে পুরো কুরআন কমপাইল করতে। হাতে গোনা কিছু মানুষ কেবল লিখতে ও পড়তে পারতো। অনেক হাফেজে কুরআন বিভিন্ন যুদ্ধে নিহত। সিংহভাগ মানুষ পড়তে জানে না।
খেয়াল করুন ইমাম বুখারীর বা অন্যান্য সুন্নী ইমামদের নবীর শিক্ষাগুলো কমপাইল করা হয়েছে নবীর মৃতু্যর প্রায় 200 থেকে 250 বছর পরে। অন্যান্য হাদীসের বইগুলো আরো পরে।
মুয়াবিয়া, ইয়াজীদরা যেহেতু অনৈতিক শাসক ছিলো তাই তারা ধর্মকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে শুরু করে, যা ঘটে নবীর মৃতু্যর মাত্র অর্ধ শতক বছরের পরেই। আজকের দিনের রাজনৈতিক দলবাজ বুদ্ধিজীবিদের মতো, শাসকদের তোষনকারী ধর্মপুতুলদের হাতে দায়িত্ব পরে ধর্মকে শোষকদের মতো করে তৈরী করা।
নবীর লিনিয়েজ ও পরিবারের মানুষজনের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া এইসব তোষক ধর্ম পুতুলদের একটা বড় কাজ ছিলো। ফলাফল স্বরূপ নবীর শিক্ষা যারা সবচেয়ে কাছ থেকে দেখেছে সেই মানুষদের রেফারেনস ছুড়ে ফেলে দেওয়া হলো (যেমন আলী, খেয়াল করবেন সহীহ বুখারী বা মুসলিমে নবীর নিজ রক্তের মানুষজনের কাছ থেকে খুব কম হাদীসই পাবেন)।
কারবালার সাথে সাথে আহলাল বায়াতদের অথর্াৎ নবীর লিনিয়েজের মানুষদের একেবারেই কোনঠাসা করে দেওয়া হয়, ভুখন্ড থেকে তাদের বারবার হিজরত করতে বাধ্য করা হয় যেমন করা হয়েছিলো পবিত্র নবীকে। কিন্তু তারা ইসলামের শিক্ষা এবং ইতিহাসকে পবিত্রভাবে সংরক্ষন করেছে। তাদেরকে বলা হয় আহলাল বায়েত।
অন্যদিকে শোষকরা ইতোমধ্যেই সংখ্যা গরিষ্ট। তারা ইচ্ছে মতো ইতিহাস লিখেছে, হাদীস পরিবর্তন করেছে, ধর্মকে নিজেদের স্বার্থ অনুসারে লিখেছে। তাদের ইতিহাসটাই বিজিতের ইতিহাস হিসেবে পৃথিবীর সুন্নীদের কাছে চলে এসেছে।
সুন্নী পৃথিবীতে পবিত্র নবীর লিনিয়েজ সম্পর্কে কুটকৌশলে এতটাই বিদ্্বেষ ছড়ানো হয়েছে যে সেখানে শিয়া একটা গালি সমতুল্য টার্ম আজকে। শিয়া ইতিহাস মানে মিথ্যা ইতিহাস, শিয়া ইসলাম মানে মুতাদি।
---------------------------------------
এই যখন দুইটা দিক তখন আমার বক্তব্য পরিস্কার। ঠিক যেভাবে একজন ধমর্ান্ধ খ্রিস্টান পাদ্রীর কাছ থেকে ইসলাম সম্পর্কেজানতে চাইলে আপনাকে অন্ধকারেই থাকতে হবে প্রকৃত সত্যের থেকে; তেমনি ইসলামের সত্যিকারের ইতিহাস জানতে হলে কেবল সুন্নীদের লেখা ইতিহাস জানলেই হবে না। নবীর পবিত্র লিনিয়েজরে সংরক্ষিত, রক্তাক্ত ইতিহাসও জানতে হবে। তাদের পক্ষ থেকে পড়লে তবেই বুঝতে পারবেন ইসলামের উদার বাণী ঠিক, কোথায়, কখন বারবার ধমর্ান্ধদের দ্্বারা পরিবর্তিত হয়েছে। ইভেন কারবালার যে ইতিহাস সুন্নীরা পড়ে আসছে সেটা কারা লিখেছে? লিখেছে যারা খুন করে জিতে আসলো তাদের তাবেদার ধর্ম পুতুলরা। সুতরাং সেখানেও গলদ আছে আমাদের জানার। কারবালা ও সমসাময়িক সময়টা সম্পর্কে তাই আহলাল বায়াতদের সোর্স থেকে পড়ুন। তারা তাদের ইতিহাস সম্পর্কে অনেক বেশি সত্যবাদী, অন্তত কুচক্রি খুনিদের চাইতে। (তুলনাটা অনেকটা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মতো। পাকিস্তানে দেখা হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটা গন্ডগোল এবং ভারতের কুট ষড়যন্ত্রে মুসলিম জাতির বিখন্ড হওয়া; আর বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ মানে হলো লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে দেশবাসীর চরম আত্নত্যাগ। কারবালায় পরাজিত নবীর লিনিয়েজরা শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে তুলনা করা যেতে পারে । তাদের কথা ঐ পাকিস্তানীদের কাছ থেকে শুনতে চাইলে কি ছবি পাবেন বুঝতেই পারছেন। শহীদ সেই মহাপুরুষদের কথা জানতে তাই তাদের মুখ থেকেই শুনতে হবে।)
এ কারনেই আমি বলেছিলাম আহলাল বায়াতদের লিটারেচার পড়ার জন্য। সুন্নী আলেমদের ঢালাওভাবে দোষ দিচ্ছি না, শিয়াদেরও ধোয়া তুলসীপাতা বলছি না। মূল কথা হলো ইসলামের উদারবাণীর পরিবর্তন ঘটেছে। তাই ইন্টেলেকচুয়াল ইসলাম, উদার ইসলাম, নবীর প্রকৃত শিক্ষার ইসলামের কথা জানতে হলে দি আদার সাইড অফ দি কয়েনটা জানা খুব জরুরী।
ভুলে যান শিয়া বা সুন্নী টার্ম দুটি। এরকম কোন টার্ম মহান নবী শিখিয়ে জান নি তার উম্মতকে বিভক্ত করতে। নিজেকে শুধু মুসলিম বলে পরিচয় দিন এবং ইতিহাসের সাথে পরিচিত হতে চেষ্টা করুন। কারন ঐ ইতিহাসেই লেখা আছে ইসলাম আসলে কতটা ইন্টেলেকচুয়াল একটা দর্শন। এটা ওয়াহাবী, ইয়াজিদ বা মুয়াবিয়ার দর্শনে রূপ নিয়েছে কিভাবে সেটাও বুঝতে পারবেন।
কোরআন হাতে টেরোরিস্টরা তো এমনি দাড়িয়ে জীবন বিলিয়ে দেয় না। একটা জীবনকে এভাবে বিলাতে উদ্্বুদ্ধ করতে কিছু ডকট্রিন প্রয়োজন। সেই ডকট্রিনগুলো সুন্নী ডকট্রিনের ভিতরেই আছে। হাদীস থেকে বিধমর্ীদের নির্বিচারে হত্যা, তাদের প্রতি বিদ্্বেষগুলো বিশেষ কিছু আলেমদের (!) গবেষণাপ্রসুত কাজ, যার শুরুটা হয়েছিলো নবীর মৃতু্যর খুব কাছাকাছি সময়ে।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মে, ২০০৬ ভোর ৪:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



