আমাদের ব্লগে ইদানিং মারাত্নক ইগোর লড়াই চলছে। একজন এইটা বলে তো আরেকজন, 'কী আমি কি কম বুঝি নাকি?' বলে নেমে পড়ছে পাল্টা পোস্টে। ব্যাপারটা যে ইগোর কারনে হচ্ছে এটা কি কেউ বুঝতে পারছেন?
ইগো মানুষের চরিত্রের অংশ। ইগো না থাকলে মানুষ, মানুষ হতো না - এটা যেমন সত্য তেমনি ইগোই যে মানুষকে ডুবায় এটা আরো ভয়াবহ সত্য। ইগোকে অনেক ভাবে অনুবাদ করা যেতে পারে, তবে এর প্রকৃত সংজ্ঞা বা রূপ কি তা কেউ জানে না। দার্শনিকরা অনেক ঢিল ছুড়েছেন ইগোর জ্ঞান পুকুরে। তবু পুকুরের গভীরতা অজানাই থেকে গ্যাছে।
যাই হোক যেটা বলছিলাম, ইগো আমাদের সবারই আছে। একটা অবুঝ শিশু মায়ের বুকের দুধ সময় মতো না পেলে ঠোট উল্টে যে তীব্র অভিমানে কাঁদে সেটাও তার ইগো। ইগো মানেই যে সবসময় নেগেটিভ অর্থ তা নয়। এখানে ইগো মানে ঐ শিশুর বিল্টইন সারভাইভাল ইনসটিকট। ওটারও প্রয়োজন আছে বলেই ইগো মানুষকে দেওয়া হয়েছে ।
কিন্তু একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ যখন তার বিবেক বুদ্ধি ম্যাচিউরড বলে ধরে নেওয়া হয় তখন ইগোর প্রকৃতি ঠিক না বুঝতে পারলে ভয়াবহ ফলাফল হতে পারে। এই ইগোর কারনে বুশ মনে করে 'দাড়া সাদ্দাম তোরে দেখে নিচ্ছি। আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দেশের প্রেসিডেন্ট, আমি যে সেরা সেটা দ্যাখাচ্ছি।' অন্ধ ইগোতে আক্রান্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে হাজার হাজার শিশু, নারী, বৃদ্ধ, যুবক বোমা মেরে উড়িয়ে দাও।
এই ইগোর কারনে বাংলা ভাইরা মানুষকে কিডন্যাপ করে, খুন করে, চিরদিনের জন্য পঙ্গু করে দ্যায়। কারন একসময়ে তার ইগো কানেকানে ফিশফিশিয়ে বুদ্ধি দ্যায় এই গ্রামে বাংলা নামে সবার ডরাইতে হইবো। যে ব্যাটা ডরাইবো না তারে দ্যাখায়েদে বাংলা ভাইয়ের জোর কতো।
এই যে আমি (সাদিক বেকুব) এত বড় লেকচার দিয়ে ফেলছি আমার নিজের ইগোর কথা বলি। দুই একটা বই পড়ি সময়ে অসময়ে। আমার ইগো আমার কানে কানে ফুসলাইয়া কয়, শিয়াল পন্ডিত অনেক তো জানো (!) এইবার একটা জ্ঞানী ভাব কইরা ল্যাখা ছাড়ো .. সব্বাইর কাছে ভাব লও যে তুমি না জানি কি বিদ্যার জাহাজ। মিস্টিক, ইসলাম, সুফিজম, বুদ্ধিজম, জেন, হিন্দু, বুললে শাহ সব বিষয়ে পোস্ট করো। পাবলিক বাহবা দিবো। মাঝে মধ্যে সুন্দর সুন্দর কথা কনবা, পাবলিক হুমড়ি খাইয়া মুড়ি খাইবো।
আমার ইংরেজী ব্লগের জন্মও মনে হয় আমার ইগো থাইক্যা। কানে কানে বারবার ইগো আইসা ফুসলায়। চেষ্টা করি নিরন্তর (যেটারে স্ট্রাগল বলে, আরবীতে বলে জিহাদ)। অসফল হই বারবার। দিন মজুর যেমন প্রতিদিন উপার্জন করে কাজের বিনিময়ে তারচেয়েও অনেক বেশি পাপ অর্জন করি, প্রতিদিন। কিন্তু শয়তানরে দোষ দেই না। কারন ইগো যদি হয় শয়তান সেটা তো আমারই অংশ, কারে থুইয়া কারে দোষ দিমু। আমি কোন সাধুও না, সন্তও না। ইগোর কাছে হেরে যাই বারবার। ইগোর আরবী হলো নফস। বলা হয় বিচারের দিনে মানুষ হাহাকার করবে, ইয়া নফসী, ইয়া নফসী বলে।
এই যখন ঘটনা তখন আপনারা কি একটু নিজেদের ইগোকে সামলানোর চেষ্টাটা করবেন? অযথা কাঁদাছোড়া ছুড়ি দিয়ে নিজেদের ইগোকে শ্রেষ্ঠ প্রমান থেকে বিরত থাকতে পারি না আমরা? হুট করে হয়তো মাথায় চিন্তা চলে আসলো, "আরে সাদিক ব্যাটা .. কে আগে কাঁদা ছুড়ছে দ্যাখ গিয়া।"
আমি বলি, ওইযে আবার ইগো ফুসলায়। বুঝাইতে চায় যে আপনে সাধু। নিজের দোষ কেউ দেখতে চায় না।
শেষ করি একজন প্রিয় মানুষের গল্প দিয়ে। যিশুর কাছে একজন ব্যাভিচারী বা যৌন অপরাধীকে হাজির করা হয় বিচারের জন্য। সেই সময়ে ব্যাভিচারের ইহুদী ধর্ম মতে শাস্তি ছিলো পাথর মেরে হত্যা করা। যিশুর হৃদয় ছিলো অসীম করুনাময়। তিনি চাইছিলেন মেয়েটিকে মাফ করে দেওয়া হোক। কিন্তু সাধারন মানুষ অবুঝ। রক্ত দেখতে চায় তারা।
তখন যিশু বললেন, তোমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে কম পাপী সেই প্রথম পাথরটি ছুড়ে মারবে। সমবেতরা একজন আরেকজনের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। সবাই তো পাপী, কে কাকে বিচার করবে? লজ্জিতরা মুখ নতকরে একে একে বিদায় দেয়। যিশু তার একবুক ভরা ভালোবাসা দিয়ে মেয়েটিকে ক্ষমা করে দেন। যিশুর এই বানীটা খুব প্রাসঙ্গিক: Do not judge, lest you will be judged
ইগো থেকে সাবধান। মনে মনে কি আমারে একটা গাইল দিলো নাকি আপনার ইগো, 'এই ব্যাটা একটা পুরা ভন্ড .. শেয়াল পন্ডিতের মতো কুমিরের বাচ্চা নামায়। যতসব আউলফাউল। (যেটার সরল অনুবাদটা এরকম : বাকিরা সবাই আউলফাউল আমার ইগোই সেরা। )
আবারও স্মরণ করাই, নিজেরে এবং আপনাদের.. ইগো থেকে সাবধান। পৃথিবীর সব পৌরাণিত কাহিনী, ধর্ম গ্রন্থতে শয়তান যাকে বলা হয় সেই শয়তান যার প্রতীকি রূপ তার নাম ইগো। ওটাকে চোখে চোখে রাখবেন।
নো অফেনস। কাউকে বিচার করতে আসি নি, কাউকে বিচার করার দায়ভার আমাকে কেউ দেয় নাই। শুধু মাথার চিন্তার পোকাটা এখানে ছেড়ে দিলাম।
http://mysticsaint.blogspot.com
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে মে, ২০০৬ রাত ১:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



