somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এই নারী কি বাঙালি নারী!!

০৭ ই মার্চ, ২০১৩ রাত ৮:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ট্রেনে উঠলেন এক নবদম্পতি। ট্রেনের জানালা খুলেই বধূটি দেখতে পেলেন তরতাজা আমলকি বিক্রি হচ্ছে। দেখেই স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে আমলকি খাওয়ার আদুরে আবদার জানালেন স্বামীটির কাছে। স্বামী নববধূর ইচ্ছাপূরণের অভিলাষে নেমে গিয়ে আমলকি বিক্রেতাকে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, আমলকি ভালো কি না। তারপর কিনলেন। কিন্তু ততক্ষণে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। বধূটি দরজার কাছে ছুটে এসে অধীরভাবে ট্রেন ধরতে দৌড়ে আসা স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলছেন, ‘এসো...!’ কিন্তু যখন আমলকি নিয়ে স্বামী তার কাছে এলেন তখন স্বামীর হাত না ধরে আমলকির প্যাকেটটি নিয়ে নিলেন। মুহূর্তেই চোখ-মুখ থেকে উবে গেল অধীরতার চিহ্ন। অপেক্ষা যেন স্বামীর জন্য নয়, ছিল আমলকির প্যাকেটের জন্য। তারপর কোনো কথা না বলে লবণ না আনার জন্য মুখ ঝামটা—‘লবণ কই!’ এটি বেসরকারি একটি মোবাইল ফোন কোম্পানির বিজ্ঞাপনের দৃশ্যায়ন। আমার আলোচনা কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে নয়, নারীর পক্ষে নয়; নয় পুরুষের পক্ষে। একজন মানুষ হিসেবে চোখে দেখে খারাপ লাগা একটি বিষয়ে। একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে আমি শুধু আলোচনা করতে চাই বাঙালি নারীর চিরায়ত চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে এই বিজ্ঞাপনের কপিরাইটারের স্ক্রিপটা কতটা যুক্তিসঙ্গত তা নিয়ে। বিজ্ঞাপন চিত্রটি শেষ হওয়া মাত্র ড্রয়িং রুমে হাসির ঝড় ওঠে; ওঠে সমালোচনাও। কিন্তু কেন? আমরা যে বাংলার নারীকে চিনি, জানি সেই বাংলার নারী কি এমন? আমি মুষ্টিমেয়ের কথা বলছি না, অধিকাংশের কথা বলছি। অম্বুজাসুন্দরী নামের এক একজন নারীর লেখা কবিতা উদ্ধৃত করে মূল আলোচনায় যাবো। বড় ভালবাসি আমি বঙ্গ-কুল-নারী, ধীরতা নম্রতা মাখা, ঘোমটায় মুখ ঢাকা রয়েছ উনান-ধারে চিরকাল ধরি, বড় ভালবাসি আমি বঙ্গ-কুল-নারী। নয়নে কজ্জল-দাগ অধরে তাম্বুলরাগ ললাটে সিন্দুর-বিন্দু লক্ষ্মীর আসন...... বুক-ভরা স্নেহ-ধারা, পতি-প্রেমে মাতোয়ারা স্থির সরসীর ন্যায় গম্ভীর সুস্থির। কবি চিরকাল উনান ধারে থাকা নারীর হয়ে একটি চাপা প্রতিবাদ এ কবিতায় করেছেন। কিন্তু তিনিও নারীর রমণীয় স্বভাবের কথা স্বীকার করতে একবারও ভোলেননি। নারী আধুনিক হয়ে উঠুক সেটা আমিও চাই। কিন্তু নারীর একান্ত নিজস্ব রমণীয় স্বভাবগুলো বিসর্জন দিয়ে নয়। আমাদের দেশের নারীবাদীরা মেরি ওলস্টোনক্রাফট, ভার্জিনিয়া উলফ, সিমোঁ দ্য বুভোয়ার, হেনরিক ইবসেন, বেগম রোকেয়া পাঠ করে তাতে উদ্বুদ্ধ হয়ে নারীর অধিকার রক্ষায় আলোচনার টেবিল, মাঠ গরম করেন। বিজ্ঞাপনে নারীকে পণ্য হিসেবে প্রদর্শনের জন্য সমালোচনার ঝড় বইয়ে দেন। কিন্তু একটি বিজ্ঞাপনে যখন নারীর চরিত্রে কাণ্ডজ্ঞানহীনতা ও নির্বিবেক স্বার্থপরতা চাপিয়ে দিয়ে নারীকে হেয় করা হচ্ছে, ছোট করা হচ্ছে, এক অর্থে অপমান করা হচ্ছে, তখন কেন তারা চুপ করে বসে আছেন? আমাদের মা, বোনদের মধ্যে কি আমরা এই চরিত্র দেখি? পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব নিশ্চয় আমাদের সমাজে পড়েছে। কিন্তু নারীর এই রূপ আমরা আসলেই কি গড়পড়তা নারীদের মধ্যে দেখি? নিশ্চয় ‘না’ বলবেন। বাংলার যে মা নিজের সন্তানের জন্য জীবন পর্যন্ত বাজি রাখতে ভয় পান না, যে স্ত্রী স্বামী ঘরে না ফেরা পর্যন্ত মুখে খাবার তুলতে অপরাধবোধে ভোগেন, সেই নারীর কাছে স্বামীর চেয়ে এক প্যাকেট আমলকি এবং সবশেষে লবণ না আনার জন্য মুখ ঝামটা কি কোনোভাবেই কি শোভন? স্বীকার করি আর নাই করি বাঙালি নারী অম্বুজাসুন্দরীর কবিতার মতো স্বভাবের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চিত্রাঙ্গদাকে, মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রমীলাকে সমাজের চিরায়ত প্রথা ভেঙে নারীর ভিন্ন রূপ দেখিয়েছেন। চিত্রাঙ্গদা নিজের পরিচয় দিচ্ছে এভাবে: চিত্রাঙ্গদা। দেবী নহি, নহি আমি সামান্যা রমণী। পূজা করি রাখিবে মাথায়, সেও আমি নই; অবহেলা করি পুষিয়া রাখিবে পিছে সেও আমি নহি। যদি পার্শ্বে রাখো মোরে সংকটের পথে, দুরূহ চিন্তার যদি অংশ দাও, যদি অনুমতি কর কঠিন ব্রতের তব সহায় হইতে, যদি সুখে দুঃখে মোরে কর সহচরী আমার পাইবে তবে পরিচয়। (চিত্রাঙ্গদা, ১২৯৮) নারীর আধুনিকতার আলোচনায় বারবার উঠে আসা মধুসূদনের প্রমীলা রণসজ্জায় সজ্জিত হয়েছে পতি মেঘনাদের জন্যই, নারীত্বকে বিসর্জন দিতে নয়। মধুসূদন নারীকে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে এসেছেন, রণসজ্জায় সজ্জিত করেছেন, কিন্তু নারীর স্বভাবকে বিসর্জন দেননি। সাধারণ দর্শক হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে বিজ্ঞাপনে নারীর এই অবমূল্যায়ন মেনে নেওয়া কঠিন। এটা মেনে নিলে আধুনিকতার নামে আমাদের মা, বোনদের অপমানকে সহ্য করা হয়। এটাও নিশ্চয় একজন বাঙালির স্বভাব নয়। সাময়িক মজা দিতে, কিংবা একটি মেসেজ দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে নারীকে এভাবে না উপস্থাপন করে অন্যভাবেও তো করা যায়, সে দৃষ্টান্ত এই প্রতিষ্ঠানেরই অন্য অনেক বিজ্ঞাপনে রয়েছে। সেগুলোর জনপ্রিয়তা নিশ্চয় কম নয়। আরও একটি বিজ্ঞাপনের কথা নিশ্চয় দর্শকের মনে আছে। এটিও একই সিরিজের আগেরটি। আট বছর আগে এক দ্বীপে আটকে পড়েছিল সাইফুল। সেখানে যোগ হয় মুকিত নামে আরেক জেলে। অবশেষে ঘরে ফেরার পথ তৈরি করে তারা। সাইফুল মুকিতকে তার স্ত্রী সম্পর্কে বলেন দেখো, তোমার ভাবির ইমোশন, ভালোবাসা। তার ইমোশন দেখে তুমি আবার ইমোশনাল হয়ে পড়ো না। কিন্তু বাস্তবতা দেখা যায় ভিন্ন। সাইফুলের স্ত্রী তাকে আপ্যায়ন করলো ভিন্নভাবে। আট বছর পর স্বামীর বাড়ি ফিরে আসার কোনো কারণ না জেনে, সহানুভূতি প্রকাশ না করে ঝাঁঝালো ভাষায় মুখের ওপর বাজারের থলি ছুঁড়ে দিয়ে আপ্যায়ন করা কি বাঙালি মেয়েদের স্বভাব? প্রতেকের বাড়িতে মা, বোন আছে। একবার ভেবে দেখুন তো। একজন মানুষ হিসেবে আনন্দ দেওয়ার নামে, পণ্যের প্রচারের জন্য মানুষকে ছোট করা নিশ্চয় শোভন নয়। বিজ্ঞপনী সংস্থাগুলোর ক্রিয়েটিভ ডিপার্টমেন্টে অনেক মেধাবী মানুষ কাজ করেন। তারা, আশা করি, বিকল্প পথ বেছে নেবেন। কাউকে ছোট করে নিজের প্রসারে সাময়িক আনন্দ হয়তো পাওয়া যায়, কিন্তু একবার ভাবুন। কাজটি আসলেই কি ঠিক?
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ওনাকে দেখা না গেলেও লেজটা ঠিকই দেখতে পাচ্ছি

লিখেছেন আহা রুবন, ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:০১




তারা চলে গিয়েছেন। আসলে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কয়েক দিন পর পর বাংলাদেশকে নতুন করে জন্ম দিতেন—নিজেদের
পশ্চাৎদেশে নিজেরাই তালি বাজিয়ে নিজেরাই নাচতেন!

সংস্কার, বিচার, ফ্যাসিস্ট নির্মূল, উঁচা বাসা-নিচা বাসা (উচ্চ... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিখোঁজ সংবাদ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৫২



কাজকর্ম, রোজা, ঈদ, ছুটি, গ্রামের বাড়ি - সকল কিছুর পরেও আমি মাঝে মাঝেই ব্লগ পড়ি, পড়ার মতো যা লেখা ব্লগে প্রকাশিত হচ্ছে কম বেশি পড়ি। এখন তেমন হয়তো আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

রোগাক্রান্ত সাস্থ্য ব্যাবস্থাপনা

লিখেছেন মোঃ খালিদ সাইফুল্লাহ্‌, ০৫ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:১৪

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ কম—এটা সত্য, কিন্তু শুধু বাজেট বাড়ালেই সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হবে না। বরং ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা—এই তিনটি জায়গায় শক্তিশালী সংস্কার সবচেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে। নিচে বাস্তবভিত্তিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভঙ্গুর ভবিষ্যৎ এর ভয় কি আমাদের শিক্ষার্থীদের জীবন কেড়ে নিচ্ছে?

লিখেছেন শরৎ চৌধুরী, ০৫ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:১২


আমরা প্রায়ই একটা কথা শুনি—
“ডিপ্রেশন ছিল”, “প্রেশার নিতে পারেনি”, “পারিবারিক সমস্যা ছিল”…


তারপর গল্পটা শেষ।

কিন্তু সত্যি কি এতটাই সহজ?

বাংলাদেশে ২০২৫ সালে অন্তত ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে ৭৭... ...বাকিটুকু পড়ুন

মায়েরা ,আপনার শিশুকে টিকা দিন

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৫ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:১১


টিকা দান কর্মসূচী আবার শুরু হয়েছে,
মায়েরা আপনার শিশুকে কেন্দ্রে নিয়ে টিকা দিন
এবং সকল টিকা প্রদানের তথ্য সংরক্ষন করুন, যা আপনার সন্তানের
ভবিষ্যৎ জীবন যাপনে কাজে লাগবে ।



(... ...বাকিটুকু পড়ুন

×