অর্ধেক পথ আসার পরই বিপদজনক একটি বাঁক নেমে গেছে নীচের দিকে। সেখানে বাঁদিকে আরো একটি বাঁক নেবার পরই আমার সবচেয়ে প্রিয় রেষ্টুরেন্ট রাস্তার ডানদিকে। বাইরে থেকে দেখলে সাধারন ট্রা্যকারদের বিশ্রামের জায়গা বলেই মনে হয়। খাবার দাবারও ভালো নয় তেমন। তবে আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষনীয় হচ্ছে রেস্টুরেন্টের ডানদিকে জানালায় বসার পর বাইরের দৃশ্য। খাবার বা পানীয়ের মান আরো খারাপ হলেও আমার কোন আপত্তি থাকবে না। গরমের সময় উপরের ছাদে বসার ব্যাবস্থা করা হয়। তখন আরো ভালো লাগে। কোন কোন মেঘলা দিনে দেখা যায় ইন নদীর উপর রৌদ্র মেঘের লুকোচুরি। নদীর বাঁকের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেঁকে যাওয়া মেঘ মুহুর্তেই মিলিয়ে যায় রোদের আলোয়, পরমুহুর্তেই মেঘ রোদ সরিয়ে তার জায়গা খুঁজে নেয়। প্রকৃতির এই শিল্পময় লীলাখেলা যে কোন নাটকের পাত্রপাত্রীকে হার মানাতে সক্ষম। রাস্তাটি শেষ হবার পর সমতলে নেমেই ইন্সব্রুক শহর।
একবার ইন্সব্রুকে না গিয়ে ডাদিকে পাহাড়গুলো আরো কাছ থেকে দেখতে চাইলাম। ভ্যালি পেরিয়ে পাহাড়গুলোর কাছাকাছি আসতেই একটা স্রোতস্বিনী খাল দেখতে পেলাম। পাহাড় থেকে নেমে আসছে দূরন্ত গতিতে। খাল বা একে ঝর্ণাও বলা যেতে পারে। খালের বাদিক ঘেসে একটা রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে গাড়ী ছুটালাম। প্রায় দশ কিলোমিটার খালের পাশাপাশি যাবার পর একটা গ্রামে এসে খালটি উঠে গেল আরো খাড়া বাদিকের এক পাহাড়ে। মুল রাস্তা থেকে আরেকটি ছোট রাস্তা উঠেছে সেদিকে। আমি বাঁদিকেই চালালাম গাড়ী। প্রায় এক কিলোমিটার আসার পর একটু বাঁয়ে বেকে সোজা। খালের নিশানা ডানদিকে আরো খাড়া এক পাহাড়ে। হতাশ হলাম বেশ। গাড়ী থামিয়ে বাইরে এসে ঝর্ণাধারার কাছে বিদায় চাইতে গেলাম। হতাশা আনন্দে পরিনত হতে সময় লাগলো না। ছোট এক ব্রীজের উপর দিয়ে একটি পাথুরে পথ উঠে গেছে খালের ডানদিক ঘেসে। জার্মানীতে এসব রাস্তায় গাড়ী নিয়ে ওঠা নিষেধ। এখানে কোন নিষেধাজ্ঞা দেখতে পেলাম না। গাড়ী ঘুরিয়ে তাই রওয়ানা হলাম এই পাথর বিছানো পথেই।
গাড়ীর আওয়াজ ছাপিয়ে শুনতে পেলাম ঝর্ণার ঝমঝম আওয়াজ। পাথরের কণায় পিছলে যাচ্ছিল গাড়ীর চাকা। সঙ্গীরা ভয় পেল বেশ। আমি সাবধান হলাম। উল্টো দিক থেকে আরেকটা গাড়ী নামতে দেখে সাহস বাড়ল আরো। প্রায় পাঁচ কিলোমিটারের মতো আকানো বাকানো পথ বেয়ে খাড়া উপরে উঠে এলাম। পাশাপশি দেখছি ঝর্ণার জলধারা, শুনতে পাচ্ছি জলপ্রপাতের শব্দ কখনো জোরে, কখনো আস্তে। এবার শেষ হলো পথ। কিন্তু ঝর্ণার উৎপত্তি দেখা হলো না। উৎপত্তি আরো উঁচুতে বরফসাদা চুড়োয়। পথের শেষেই একটি রেষ্টুরেন্ট। তার বারান্দায় পাহাড়ের দিকে মুখ করে বসে কফিতে কান্তি নিবারণ হলো আমাদের। তারপর ঝর্ণার আশেপাশে ঘুরে ফিরে সময় কাটিয়ে ফেরৎ পথ ধরলাম। ফেরৎ পথের বর্ণনা পরের অধ্যায়ের জন্যে রইল।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


