somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাবা

০৩ রা জুন, ২০০৬ রাত ৮:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

'এই তরা চুপ করবি ? নাইলে উপরে তক্তা দিয়া, নীচে আরেকটা দিয়া যাইত্তা ধরমু'

শুনেই পিলে চমকে যাবার যোগাড়। যে বন্ধুর ঘরে বসে আড্ডা মারছিলাম, তার মুখের দিকে তাকালাম। আমার শুকনো চেহারা দেখে অভয় দিল।

'না,না তেমন কিছু না। ছোট ভাইরা চিল্লাচিলি্ল করছিল দেখে বাবা ধমক দিয়েছে'।

ধমকের এই বহর ? মনে মনে ভাবতেই বন্ধুটি আরো অভয় দিল।

'বাবার কথার ধরণই এমন, এ পর্যন্ত কখনো আমাদের গায়ে হাত তোলেনি'

বাচ্চাদের হইচই একটু থেমে আবার আগের মতোই শুরু হলো। একটু পরেই ওনি দরজায় টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকলেন। বড় ছেলের কাছে একটা সিগারেট চেয়ে নিয়ে ধরিয়ে বাইরে চলে গেলেন।

অনেকগুলো ভাইবোন আমার এই বন্ধুর। বাবা বেশ বড় সরকারী চাকুরে। বাইরে বাইরে বেশ কঠিন হলেও ভীষন নরম মনের মানুষ। পরে তাকে আরো কাছে থেকে চিনেছি।
ছেলেমেয়েরা বাবার ভালবাসার প্রতিদান দিয়েছে। দেশে বিদেশে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এই ভদ্রলোক পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন কয়েক বছর হলো। আমার নিজের বাবার কথা ভাবতে গিয়ে আজ ওনার কথা মনে হলো।

আমার বাবাও কয়েক বছর হল গত হয়েছেন। আমরাও ভাইবোন মিলে কম ছিলাম না। সংসার ও সবার পড়াশোনার দিকে নজর দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে তাঁকে। তাতে অনেক সময়েই মেজাজ গরম থাকতো তার। তার জের আমাদের উপর, মায়ের উপর অনেক পড়েছে। তারপরেও তার ভালবাসায় কমতি ছিল, তা কখনোই বলতে পারবো না। এই মেজাজ ছাপিয়েও অনেক সময় বাবা হঠাৎই ছেলেমানুষ হয়ে যেতেন। আমরা ভাইবোনে বসে ক্যারাম খেলার সময় যোগ দিতেন আমাদের সাথে। খেলায় পেরে না উঠলে একটা দুটো গুটি হাতের টোকায়ও গর্তে ফেলে দিতেন। আমরা কখনো কখনো রেগে যেতাম, কখনো হাসতাম। বাবাও সে হাসিতে যোগ দিতেন।

বাইরের টান ছিল আমার ছোটবেলা থেকেই। ম্যাট্রিক পাশ করার পর রাজধানীতে সুযোগ থাকার পরও চলে গেলাম কুমিল্লা শহরে কলেজে। হোস্টেলে থাকতাম। ভাল লাগতো না বলে প্রতি মাসে একবার ঢাকা আসতাম। বাবা রাগ করতেন। মাসে মাসে আসা মানে টাকা খরচ আর পড়াশোনার সময় নষ্ট। একবার তাই মাস পেরিয়ে গেলাম না ঢাকায়। দেড় মাস পরেই বাবা হোস্টেলে হাজির। আমি ঢাকায় যাচ্ছিনা বলে চিন্তায় ম্রিয়মান।

জাহাঙ্গীরনগরে পড়ার সময় প্রতি সপ্তাহে বাড়ী আসতাম। বাবাও রাগ করতেন আগের মতোই। একবার দেড় সপ্তাহ না যাওয়ায় হোস্টেলে এসে হাজির। এমনি হঠাৎ, যে আমি মেঝেতে সিগারেটের টুকরো, বিছানার উপর হারমোনিয়াম লুকানোরও সময় পাইনি। কিন্তু এসব দিকে কোন নজরই গেলো না তার। আমি ভালো আছি জেনে, কিছু টাকাপয়সা দিয়ে, সপ্তাহশেষে বাড়ী যাবার কথা বলে হাসিমুখে বিদায় নিলেন।

আমি নিজেও এখন বাবা। ছেলের বয়েস চৌদ্দ। মা তার বিদেশীনি। আমরা এখানে থাকি, ছেলেও এখানকার রীতিনীতিতেই বড় হচ্ছে। পড়াশোনায় ভাল, এই বয়েসে বয়সন্ধিজনিত ঝকমারী ছাড়া আর কোন সমস্যা নেই। বয়েসটাই এরকম! ইদানীং লম্বা চুল রেখেছে। আমার দেখতে ভাল না লগলেও আপত্তি নেই। আমিও সে সময়ে মাথার সামনের দিকের চুল ফুলিয়ে নায়ক রাজ্জাকের মতো হতে চেয়েছিলাম। এখনই তো নিজেকে নিয়ে পরীক্ষা করার সময়! একসময় নিজেই নিজেরটা বুঝে একটা পথ খুঁজে নেবে- নিজেকে খুজে পাবে।

তবে বাবা হয়ে একটি কথা ভাবি বারবার। আমরা আমাদের বাবাদের রোলটা এমনভাবে দেখি যে আমাদের মনেই থাকেনা যে তাদেরও একটা ছেলেবেলা ছিল। বাবা হবার পরও তাদের ভেতর যে সে ছেলেমানুষী থেকেও যেতে পারে বা মাঝে মাঝে তাদের ছেলেমানুষ হতে ইচ্ছে হয়, তা ভাবিনি কখনো। আমার বাবাকে নিয়ে যখন এ বিষয়টা ভাবি, তখন কষ্ট পাই খুব।

আমার ছেলে বাবা-মা দুজনেরই ভালবাসা পেয়ে বড় হচ্ছে। খেলনার কোন কমতি নেই। আই পড থেকে শুরু করে একস্ বক্সের সর্বাধুনিক সংস্করণ তার হাতে। আমাদের সাথে, স্কুলের সাথে দেশেবিদেশে ঘুরছে। বাংলাদেশেও যাই আমরা প্রতি বছর বছর। তারপরও আমার একটা কথা মনে হয় সবসময়,

"আমার বাংলাদেশের ছেলেবেলা পাল্টে কেউ যদি আমাকে এখানকার প্রাচুর্যের ছেলেবেলা দিতে চাইতো, কোনকিছুর বিনিময়েই তাতে রাজী হতাম না আমি"।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সীমিত মগজ, লিলিপুটিয়ান, ডোডো পাখি (সৌজন্যে - চাঁদগাজী)...

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সকাল ১১:২৯



১. যেনা করব আমরা, ৫০১-এ যাব আমরা, পার্কে যাব আমরা। তুমি তো আলেম। তুমি কেন যাবে? তুমি তো ইসলামের সবক দাও সবাইকে। তুমি মাহফিলে কোরআন, হাদীস বয়ান কর। তুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭



মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×