'এই তরা চুপ করবি ? নাইলে উপরে তক্তা দিয়া, নীচে আরেকটা দিয়া যাইত্তা ধরমু'
শুনেই পিলে চমকে যাবার যোগাড়। যে বন্ধুর ঘরে বসে আড্ডা মারছিলাম, তার মুখের দিকে তাকালাম। আমার শুকনো চেহারা দেখে অভয় দিল।
'না,না তেমন কিছু না। ছোট ভাইরা চিল্লাচিলি্ল করছিল দেখে বাবা ধমক দিয়েছে'।
ধমকের এই বহর ? মনে মনে ভাবতেই বন্ধুটি আরো অভয় দিল।
'বাবার কথার ধরণই এমন, এ পর্যন্ত কখনো আমাদের গায়ে হাত তোলেনি'
বাচ্চাদের হইচই একটু থেমে আবার আগের মতোই শুরু হলো। একটু পরেই ওনি দরজায় টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকলেন। বড় ছেলের কাছে একটা সিগারেট চেয়ে নিয়ে ধরিয়ে বাইরে চলে গেলেন।
অনেকগুলো ভাইবোন আমার এই বন্ধুর। বাবা বেশ বড় সরকারী চাকুরে। বাইরে বাইরে বেশ কঠিন হলেও ভীষন নরম মনের মানুষ। পরে তাকে আরো কাছে থেকে চিনেছি।
ছেলেমেয়েরা বাবার ভালবাসার প্রতিদান দিয়েছে। দেশে বিদেশে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এই ভদ্রলোক পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন কয়েক বছর হলো। আমার নিজের বাবার কথা ভাবতে গিয়ে আজ ওনার কথা মনে হলো।
আমার বাবাও কয়েক বছর হল গত হয়েছেন। আমরাও ভাইবোন মিলে কম ছিলাম না। সংসার ও সবার পড়াশোনার দিকে নজর দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে তাঁকে। তাতে অনেক সময়েই মেজাজ গরম থাকতো তার। তার জের আমাদের উপর, মায়ের উপর অনেক পড়েছে। তারপরেও তার ভালবাসায় কমতি ছিল, তা কখনোই বলতে পারবো না। এই মেজাজ ছাপিয়েও অনেক সময় বাবা হঠাৎই ছেলেমানুষ হয়ে যেতেন। আমরা ভাইবোনে বসে ক্যারাম খেলার সময় যোগ দিতেন আমাদের সাথে। খেলায় পেরে না উঠলে একটা দুটো গুটি হাতের টোকায়ও গর্তে ফেলে দিতেন। আমরা কখনো কখনো রেগে যেতাম, কখনো হাসতাম। বাবাও সে হাসিতে যোগ দিতেন।
বাইরের টান ছিল আমার ছোটবেলা থেকেই। ম্যাট্রিক পাশ করার পর রাজধানীতে সুযোগ থাকার পরও চলে গেলাম কুমিল্লা শহরে কলেজে। হোস্টেলে থাকতাম। ভাল লাগতো না বলে প্রতি মাসে একবার ঢাকা আসতাম। বাবা রাগ করতেন। মাসে মাসে আসা মানে টাকা খরচ আর পড়াশোনার সময় নষ্ট। একবার তাই মাস পেরিয়ে গেলাম না ঢাকায়। দেড় মাস পরেই বাবা হোস্টেলে হাজির। আমি ঢাকায় যাচ্ছিনা বলে চিন্তায় ম্রিয়মান।
জাহাঙ্গীরনগরে পড়ার সময় প্রতি সপ্তাহে বাড়ী আসতাম। বাবাও রাগ করতেন আগের মতোই। একবার দেড় সপ্তাহ না যাওয়ায় হোস্টেলে এসে হাজির। এমনি হঠাৎ, যে আমি মেঝেতে সিগারেটের টুকরো, বিছানার উপর হারমোনিয়াম লুকানোরও সময় পাইনি। কিন্তু এসব দিকে কোন নজরই গেলো না তার। আমি ভালো আছি জেনে, কিছু টাকাপয়সা দিয়ে, সপ্তাহশেষে বাড়ী যাবার কথা বলে হাসিমুখে বিদায় নিলেন।
আমি নিজেও এখন বাবা। ছেলের বয়েস চৌদ্দ। মা তার বিদেশীনি। আমরা এখানে থাকি, ছেলেও এখানকার রীতিনীতিতেই বড় হচ্ছে। পড়াশোনায় ভাল, এই বয়েসে বয়সন্ধিজনিত ঝকমারী ছাড়া আর কোন সমস্যা নেই। বয়েসটাই এরকম! ইদানীং লম্বা চুল রেখেছে। আমার দেখতে ভাল না লগলেও আপত্তি নেই। আমিও সে সময়ে মাথার সামনের দিকের চুল ফুলিয়ে নায়ক রাজ্জাকের মতো হতে চেয়েছিলাম। এখনই তো নিজেকে নিয়ে পরীক্ষা করার সময়! একসময় নিজেই নিজেরটা বুঝে একটা পথ খুঁজে নেবে- নিজেকে খুজে পাবে।
তবে বাবা হয়ে একটি কথা ভাবি বারবার। আমরা আমাদের বাবাদের রোলটা এমনভাবে দেখি যে আমাদের মনেই থাকেনা যে তাদেরও একটা ছেলেবেলা ছিল। বাবা হবার পরও তাদের ভেতর যে সে ছেলেমানুষী থেকেও যেতে পারে বা মাঝে মাঝে তাদের ছেলেমানুষ হতে ইচ্ছে হয়, তা ভাবিনি কখনো। আমার বাবাকে নিয়ে যখন এ বিষয়টা ভাবি, তখন কষ্ট পাই খুব।
আমার ছেলে বাবা-মা দুজনেরই ভালবাসা পেয়ে বড় হচ্ছে। খেলনার কোন কমতি নেই। আই পড থেকে শুরু করে একস্ বক্সের সর্বাধুনিক সংস্করণ তার হাতে। আমাদের সাথে, স্কুলের সাথে দেশেবিদেশে ঘুরছে। বাংলাদেশেও যাই আমরা প্রতি বছর বছর। তারপরও আমার একটা কথা মনে হয় সবসময়,
"আমার বাংলাদেশের ছেলেবেলা পাল্টে কেউ যদি আমাকে এখানকার প্রাচুর্যের ছেলেবেলা দিতে চাইতো, কোনকিছুর বিনিময়েই তাতে রাজী হতাম না আমি"।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




