- এবার!
গর্বের সাথে বললেন তিনি।
- এরচেয়ে সুন্দর কোন ছাপ আর কোথাও কখনো দেখেছেন? কতো সুক্ষ, কতো পরিচ্ছন্ন, প্রতিটি দাগ স্পষ্ট। আমি এটা ড্রেসডেনের আর একটি ছাপের সাথে মিলিয়ে দেখেছি। এটার পাশাপাশি ওটাকে একেবারেই ভোতা মনে হয়। এবার দেখুন এর সিলগুলো! দেখুন!
কাগজটির উল্টো দিকটি মেলে ধরলেন। আঙ্গুলের নখে কাগজটির কতগুলো খালি জায়গার দিকে এমনভাবে চুলমাত্র সুক্ষতার সাথে নির্দেশ করলেন যে, আমি সেখানে অক্ষরগুলো সেখানেই আছে ভেবে তাকাতে বাধ্য হলাম।
- দেখুন, নাগলার এর সিল, এই যে এখানে রেমি ও এসডাইলের সিল দেখুন। এই নামীদামী সংগ্রাহকরাও হয়তে কখনোই ভাবেননি যে এই মুল্যবান কাগজটি এই ভাঙ্গা বাড়ীতে স্থান পাবে।
আমার শিড়দাঁড়ায় ভেতরে শীতল এক স্রোত বয়ে গেল। যেভাবে একটি খালি কাগজকে চোখে না দেখে ছবি ভেবে উত্ফুল্ল এই ভদ্রলোক, আমার জন্যে তা রীতিমতো ভৌতিক বলে মনে হলো। মিলিমিটার হিসেবের সুক্ষতায় তিনি তাঁর আঙ্গুলের নখে সিলের কাল্পনিক অক্ষরগুলো স্পর্শ করছেন। ভয়ে দম বন্ধ হয়ে আসছিল আমার, কোন উত্তর দেবার ক্ষমতাও রইল না। বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে দুই মহিলার দিকে তাকাতেই তারা একজন কম্পিত ও আরেকজন উত্তেজিত হাত তুলে অনুনয় জানালেন। নিজেকে সংবরণ করে আমি আমার অভিনয়ে মন দিলাম।
- অবিস্মরণীয়, অতুলনীয় সুন্দর ছাপ!
মুখ থেকে কোনক্রমে বের করার সাথে সাথেই গর্বে আলোকিত হলো তাঁর পুরো চেহারা।
- এটা তেমন কিছুই নয়! জয়ের উল্লাস তাঁর কন্ঠে।
- আপনাকে প্রথমে 'মেলাঙ্কোলিয়া' অথবা 'পাসিয়ন' দেখার পর বলতে হবে। চোখে লেগে থাকার মতো উদাহরণ। হলফ করতে পারি, এই মানের দ্বিতীয়টি আর কোথাও পাবেন না। দেখুন এবার!
আবার আঙ্গুল নির্দেশিত হলো আরেক কাল্পনিক সৃষ্টির দিকে।
- দেখুন, তাজা, ছোট ছোট দানার মতো উষ্ণ রঙ। এটা পেলে বার্লিন তার মিউজিয়াম পরিচালক বা যে কোন সংগ্রাহককে মাথায় তুলে রাখতো।
দুই ঘন্টাব্যাপী তিনি তাঁর নেশা ও কথার তোড়ে বিজয়োল্লাস চালিয়ে গেলেন। কতোটা ভৌতিক ছিল পরিবেশ, তা আপনাকে বর্নণায় বোঝানো আমার সাধ্যের বাইরে। তাঁর সঙ্গে এই একশো বা দু্থশো খালি কাগজের টুকরো ও সস্তা ধরণের নকল দেখে যাওয়া, যা এই অসহায় অবোধ মানুষটির স্মৃতিতে ধ্রুবতারার মতোই সত্য। যা তিনি নির্ভুলভাবে ও সঠিক ক্রমানুসারে প্রতিটির আলাদা সুক্ষ বর্নণায় সন্মানের সর্বোচ্চ শিখরে তুললেন, এক অদৃশ্য শিল্পসংগ্রহ, বাস্তবে তা বাতাসে উড়িয়ে দেয়ার মতো মূল্যহীন। এই প্রবঞ্চিত মানুষটির জন্যে সেগুলো এখনও এতো বেশী জীবন্ত, ও তারঁ আত্মদৃষ্টির প্রখরতা এতো বেশী বলশালী যে, আমার নিজের কাছেও এগুলো একসময় প্রায় সত্য বলেই মনে হতে লাগলো। শুধুমাত্র একবার তার এই বিশ্বাসের উন্মাদনা আর লোমহর্ষক আনন্দ চুরমার হবার উপক্রম হয়েছিল। রেমব্রান্টের 'আন্টিওপ' (একটি পরীক্ষামূলক ছাপ, বাজারে যার মূল্য এখন অস্বাভাবিক চড়া) দেখাতে গিয়ে এর ছাপের স্পষ্টতা নিয়ে প্রশংসায় বিমুগ্ধ ছিলেন তিনি। প্রশংসার সাথে সাথে তার উত্তেজিত, কিন্তু নির্ভুল আঙ্গুলও প্রগাঢ় ভালোবাসায় সেই ছাপ বেয়ে বেয়ে চলছিল এদিক সেদিক। একসময় সে আঙ্গুল ছবির ফ্রেমের বাইরে এক সাদা কাগজে গিয়ে পড়লো, যেখানে দাগের গভীরতা অনুপস্থিত। এক কালো ছায়া এসে ভর করলো তাঁর কপালে, গলার স্বরেও অনিশ্চয়তা।
- এটা তো, .... এটা কি রেমব্রান্টের আন্টিওপ?
বলে বিড় বিড় করলেন তিনি, কিছুটা লজ্জায় পড়েই। সাথে সাথে হস্তক্ষেপ করলাম আমি। ফ্রেমে বাঁধানো কাগজটি তাঁর হাত থেকে নিয়ে প্রতিটি সম্ভাব্য খুটিনাটি উল্লসিত বর্নণা শুরু করলাম। লজ্জিত অন্ধ বৃদ্ধের চেহারা, রঙ আবার শান্ত হলো। যতো বেশী প্রশংসা করলাম আমি, তত বেশী এক অনাবিল আন্তরিকতায় ও রৌদ্রোজ্জল আত্মগর্বে ভরে উঠলেন বয়েসের ভারে ন্যূজ, শীর্ণকায় এই বৃদ্ধ। বিজয়ের উল্লাসে স্ত্রী ও মেয়ের দিকে ফিরে বললেন,
- এতদিন পর একজন সত্যিকারের বোদ্ধা খুঁজে পেলাম! তোমরা, তোমরাও তাঁর কাছ থেকে শুনে রাখ, এই কাগজগুলো কতো অমূল্য! সমস্ত টাকাপয়সা যখন আমার এই সংগ্রহের পেছনে ঢালতাম, আমার প্রতি তোমাদের বিশ্বাসই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সত্যি কথা, গত ষাট বছরে কোন বিয়ার নয়, ওয়াইন নয়, সিগারেট নয়, বই, সিনেমা, থিয়েটার বা কোথাও বেড়াতে যাওয়াও নয়, সব জমিয়েছি এই সংগ্রহের পেছেনই। এখন তোমরা দেখছ তার ফলাফল। আমি যখন আর থাকব না, তোমরা তখন ধনী, এই শহরের সবচেয়ে বড় ধনী, ড্রেসেডেনের সবেচেয়ে বড় ধনীদের সমকক্ষ। তখন তোমরা আমার এই বোকামীর জন্যে আনন্দিত হবে। কিন্তু আমি যতক্ষন বেঁচে আছি, একটি কাগজও বাড়ীর বাইরে যেতে পারবে না। আমাকে আগে বাড়ী থেকে বের করবে, তারপর আমার সংগ্রহ।
এই কথা বলতে বলতে পরম আদরে হাত বোলালেন তাঁর খালি এলবামগুলোর গায়ে। পুরো বিষয়টা আমার কাছে একাধারে ভীতিপ্রদ ও অন্যদিকে স্পর্শকাতরও বটে। গত কয়েকটি যুদ্ধের বছরে এতোটা পরিপূর্ন , এতোটা পরম আত্মতৃপ্তির ছাপ কোন জার্মান চেহারায় দেখিনি। তার পাশে দাঁড়ানো দুই মহিলা, যেন এক জার্মান শিল্পসম্রাটএর দুই রহস্যময়ী চরিত্র, যারা যীশুর কবরে শেষ সন্মান জানাতে হাজির হয়েছেন। ভাঙ্গা, খালি কবরের সামনে একাধারে লোমহর্ষক ভীতি ও বিস্ময় অন্যধারে যীশুর প্রতি বিশ্বাসের চুড়ান্ত উচ্চতায় দাঁড়িয়ে। সেখানে যীশুর ঐশ্বরিক ক্ষমতার সামনে বালিকাদের যে চিত্র, এই বুড়িয়ে, দুমড়ে যাওয়া, হাড়হাভাতে নিম্নবিত্ত চেহারায় একই শিশুসুলভ আনন্দ, আধো হাসি, আধো কান্নায় মেশানো একই দৃশ্য, যা এতটা শিহরণে কখনো দেখিনি। কিন্তু আমার প্রশংসায় তখনো এই বৃদ্ধ যথেষ্ট পরিতৃপ্ত নন। প্রতিবারই এলবামগুলো উল্টে পাল্টে দেখাচ্ছিলেন আমার আরো প্রশংসার তৃষ্ণায়। যখন খালি এলবামগুলো বন্ধ করে পাশে সরানো হলো ও কফির জন্যে তাঁর অনিচ্ছা সত্তেও টেবিল খালি করতে বাধ্য হলো, তখন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম আমি। কিন্তু আমার এই অপরাধবোধের গ্লানি মেশানো মুক্তির শ্বাস ভদ্রলোকের বাধভাঙ্গা আনন্দ ও অদম্য উচ্ছাসের কাছাকাছি একেবারেই ম্লান! হঠাৎই যেন তিরিশ বছর বয়স কমে গিয়েছে তাঁর! এই সংগ্রহের পেছনে হাজারো যতো ঘটনা, যতো খোঁজাখুঁজি, যতো চালাকী ছিল, একটার পর একটি বলে যাচ্ছেন। মাঝে মাঝে কারো সাহায্য ছাড়াই উঠে এলবাম খুলে কাগজ বের করে আনছেন। একসময় আমি যখন বিদায় নিতে চাইলাম, চমকে উঠলেন তিনি। অবাধ্য শিশুর মতো মাটিতে পা ঠুকে ঠুকে বার বার বললেন, অর্ধেক দেখাই শেষ হয়নি আমার, এখনই কেন বিদায়! মহিলাদের উপরই কঠিন দ্বায়িত্ব পড়লো, তাঁকে এই বলে বোঝানো যে, আমাকে আটকে রাখলে ট্রেন ধরতে পারবো না।
একসময় যখন তার হতাশা মেশানো বাধা ব্যর্থতায় পর্যবসিত ও বিদায়ের সময় হলো, তখন খুব নরম হয়ে গেলো তাঁর কন্ঠস্বর। আমার দুই হাত টেনে নিলেন নিজের হাতে, একজন অন্ধের অনুভবশক্তির বলে হাত থেকে শুরু কব্জির জোড়াগুলোতে এত আদরে স্পর্শ করলেন যেন, মনে হলো ওনি আমাকে আরো বেশী কথা, আরো বেশী ভালোবাসা জানাতে চাইছেন, যা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছেন না।
- আপনি যে আমাকে দেখতে এসেছেন, আমার জন্যে বিরাট, অভাবনীয় আনন্দ।
তাঁর কথাগুলো এমনভাবে ছুঁয়ে গেল আমাকে, যা কোনদিনই ভুলতে পারব না।
- অবশেষে একজন সত্যকারের বিশারদকে সব দেখাতে পারা আমার জন্যে অপার এক আনন্দ। কিন্তু মনে রাখবেন, এই অন্ধ বৃদ্ধের কাছে আসা আপনার একেবারেই বিফলে যায়নি। আমার স্ত্রীকে সামনে রেখে আপনার কাছে এই মর্মে প্রতিজ্ঞা করছি যে, আমার উইলে আপনার ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠানকে এসব সংগ্রহ নীলামে বিক্রি করার অধিকার দিয়ে যাব। এই অপরিচিত অমূল্য সম্পদকে দেখাশোনা পৃথিবীতে পরিচিত করানোর বিরল সন্মানের অধিকারী আপনিই হবেন।
বলেই এলবামগুলোর গায়ে মমতায় হাত বোলালেন তিনি।
- কথা দিন আমাকে, একটি সুন্দর ক্যটালগ তৈরী করবেন। এই ক্যটালগই হবে আমার কবরের নামফলক, এর চেয়ে ভাল কোন চাওয়াই আমার নেই।
আমি তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলাম। একজন আরেকজনের কাছে ঘন হয়ে দাঁড়িয়ে। মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছিলেন ওদের একজন। সে কাঁপুনির সঞ্চার হলো আরেকজনের শরীরেও। তাতে মনে হচ্ছিল দু'জনের একই শরীর। একজন তার সমস্ত সম্পদ দেখাশোনার দ্বায়িত্ব আমার হাতে তুলে দিচ্ছেন, যদিও সে সম্পদের আর কিছুই নেই, শুধুমাত্র এক অদৃশ্য সংগ্রহ, তারপরও তার বিশ্বাস ও ভালোবাসা আমাকে এক অপরিসীম তৃপ্তি দিলো। কথা রাখা অসম্ভব জেনেও আবেগে আপ্লুত হয়ে কথা দিলাম তাকে। আবারো এক আলো তাঁর মৃত চোখের তারায় খেলা করে গেলো ও আমাকে অনুভব করার জন্যে তাঁর ভেতর থেকে উঁপচে পড়া আকুলতা তাঁর হাতের আদরে টের পেলাম। সে স্পর্শে ছিল কৃতজ্ঞতা আর আশীর্বাদ।
মহিলারা আমাকে দরজা অবধি এগিয়ে দিলেন। ভদলোকের প্রথর শ্রবনশক্তির কথা ভেবে কোন কথা বলার সাহস ওরা পেলেন না। কিন্তু চোখের জলে ভেসে কৃতজ্ঞতাভরা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। অবশের মতো সিড়ি বেয়ে নীচে নামলাম। আসলে লজ্জা হচ্ছিল আমার। নিজেকে মনে হলো রূপকথার কোন এক ফেরেশতার মতো, কোন এক দরিদ্র অন্ধের ঘরে ঢুকে এক ঘন্টার জন্যে চোখের আলো ফিরিয়ে দিয়েছে এই প্রক্রিয়ায়, যে প্রক্রিয়ায় তাকে সারাক্ষন অবলীলায় মিথ্যে বলে যেতে হয়েছে। আসলে আমি এসেছিলাম কিছু মুল্যবান সংগ্রহ অল্পমূল্যে হাতিয়ে উদ্দেশ্যে। কিন্তু এখন যা নিয়ে গেলাম, তা তারচেয়েও দামী। এই ভোতা, নিরানন্দ সময়ে এক নি:কলঙ্ক আনন্দ নিজে উপস্থিত থেকে অনুভব করার সুযোগ পেলাম। এটা এক ধরণের আত্মিক আলো, শিল্পকে ঘিরে এক ধরনের অপার্থিব আবেগ, যা এখনকার মানুষ ভুলেই গিয়েছে প্রায়। তারপরও কেন নিজেকে লজ্জায় অবনত মনে হচ্ছিল আমার, তার কোন উত্তর জানা ছিলনা আমার।
রাস্তায় এসে পড়তেই সশব্দে দোতালার জানালা খোলার আওয়াজ শুনে ফিরে তাকালাম। ভদ্রলোক তাঁর অন্ধ চোখে আমি যে দিকে যেতে পারি, সেদিকে ফিরে একটি রুমাল নাড়িয়ে আমার নাম ধরে ডাকছেন। দেহটি এমনভাবে বাইরে ঝুঁকিয়ে দিয়েছেন যে, বিপদ এড়ানোর জন্যে দুই মহিলা দু'দিক তাঁকে থেকে রেখেছেন।
- আপনার ভ্রমণ শুভ হোক!
একজন বালকের মতো উল্লসিত, তাজা তার গলার আওয়াজ। এ দৃশ্য ভোলার মতো নয়: জানালায় এক পাকা চুল বৃদ্ধের উচ্ছসিত চেহারা, রাস্তার সমস্ত গোমড়া, ম্রিয়মান, ব্যতিব্যস্ত মানুষের উপরে। তার উপরে আমাদের বাস্তব, নোংরা পৃথিবীকে ছাড়িয়ে একগুচ্ছ নরম সাদা মেঘের সারল্য। তখনই অতি পুরোনো একটি কথা আমার মনে এলো, সম্ভবত: গ্যেটেই বলেছিলেন, 'শিল্প সংগ্রাহকরা সত্যিই সুখী মানুষ'।
সমাপ্ত....
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



