somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্প: ভয় (প্রথম অংশ)

০৩ রা মার্চ, ২০০৬ ভোর ৬:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এই অতি সাধারণ গল্পটি দু,বছর আগে লিখেছিলাম। আমি নামী লেখক নই, লেখার চেষ্টা করি মাত্র। পড়লে আনন্দিত হব।
.......
অন্ধকার গলিটা দিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরতে প্রতিবারই খুব ভয় হয় সুতপার। ঢোকার মুখে ছোট্ট একটা দোকান ছাড়া পুরো পথটায় কোন আলো নেই বললেই চলে। ভেতরে ঢোকার পর বেশ একটু এগোনোর পর ভাঙ্গাচোরা একটা কাঁচকারখানা। দিনের বেলা কিছু লোকজন থাকলেও রাতে সেখানে ভূতুরে নিঃস্তব্ধতা। সেটা পেরুনোর পরই গলিটা কোন এক যন্ত্রণায় যেন দুমড়ে মুচড়ে একটা বাঁক নিয়ে আরো সরু হয়ে গিয়েছে। সেখানে নর্দমাটাও যখন মুচড়েছে, ঠিক তার পাশেই মালাদি'দের বসার ঘর। ওখান থেকে সামান্য আলো আসে তখন, যখন ওদের বাড়ীতে লোকজন আসে। না হলে ওখানকার ভাঙ্গা অংশটুকুও পেরুনো শক্ত হয়ে পড়ে। বাবাকে অনেকবার বলেছে সুতপা বাসা পাল্টাতে। কিন্তু বাবা তা করবো করবো বলে এখনো করে উঠতে পারেননি। সেজন্যে বাবাকে দোষও দেয়া যায়না। এই বাজারে ভালো একটা এলাকায় এমন একটা বাসা পাওয়া কি সহজ ? পেলেও ভাড়ার কথা ভেবে সুতপা নিজেই পিছিয়ে যায় বারবার।

আজও গলিটা দিয়ে আসতে ভয় পেলো সুতপা। এতোটা ভয় যে, এই শীতের সন্ধ্যাতেও ঘাম এসে গেল শরীরে। একবার ভাবলো দোকানের ছেলেটাকে বাসা পর্যন্ত সাথে আসতে বলবে। কিন্তু ও বেচারা দোকান ছেড়ে আসবেই বা কি করে ? এর মাঝে আবার লোড শেডিং। মালা'দির বসার ঘরের আলো উপরও ভরসা করা যাচ্ছেনা। রিঙ্ার ভাড়াটা মিটিয়ে ভয় বুকে করেই সুতপা দ্রুতপায়ে হাঁটা শুরু করলো বাসার দিকে। কারখানাটার কাছাকাছি আসার পর বুকের ভেতর ভয়টা যখন জেকে বসেছে শক্তভাবে জোকের মতো আকড়ে, তক্ষুনি লোকটাকে দেখতে পেলো সে। কারখানার বারান্দায় বসে, দেয়ালে হেলান দিয়ে। কোন নড়াচড়া নেই, চোখদুটো জলজল করছে অন্ধকারে। হয়তো চিৎকারই দিয়ে ফেলতো সুতপা। কিন্তু সেই মূহুর্তেই কারেন্ট এসে যাওয়ায় একটা আলোর আভা পড়ল গলিতে। সুতপার জন্যে ভয়ের মুখোমুখি এই সামান্য আভা দিনের আলোর চেয়েও উজ্জল। আর কোন দিকে না তাকিয়ে সে প্রায় দেঁৗড়ে দেঁৗড়েই পৌছালো বাসায়। হোঁচট খেয়ে বা' পায়ের আঙ্গুলটা ছড়ে গেলো একটু। কিন্তু সেদিকে কোন নজরই করলো না সে।

বাসার কাছাকাছি আসতেই দরজা খুলে দিলেন বাবা। হয়তো কাছাকাছিই অপেক্ষায় ছিলেন। সুতপার ফ্যাকাসে চেহারা তাঁর দৃষ্টি এড়াল না। ইদানীং বাবা দেখেন কম। চশমার পওয়ার বদলানো দরকার। কিন্তু এসব ব্যাপারগুলো তাঁর দৃষ্টি এড়ায় না একেবারেই।
-- কি রে, ভয় পেয়েছিস বুঝি ?
-- হ্যা বাবা, খুব অন্ধকার ছিল গলিটা আজ।
সুতপা ইচ্ছে করেই লোকটার কথা এড়িয়ে গেল। বাবা এমনিতেই ভয়ে ভয়ে থাকেন খুব। সোমত্থ মেয়ের উপার্জনে সংসার চলে। ভয় তো থাকবেই। সেটা বাড়িয়ে আর কি হবে ? অথচ একসময় কি সাহসী ছিলেন।
-- লোড শেডিং এর পর শিমনটাকে বললাম টর্চটা নিয়ে এগিয়ে যেতে। বলল ব্যাটারী কিনতে হবে। তারপর যে গেল, এখনও কোন খবর নেই।
-- হয়তো পেতে দেরী হয়েছে। তুমি খেয়েছ বাবা ?
-- না রে। এখনও ক্ষিদে পায়নি। তুই মুখ হাত ধুয়ে খেয়ে নে, আমি শিমন ফিরলে ওর সাথেই খাব।
-- না বাবা, তুমি এখনই খেয়ে নাও। ডাক্তার তোমাকে সময়তো খেতে বলেছেন। আমি নাহয় শিমনের জন্য অপো করি।
-- না না, তা হয়না। সারাদিন খেটে খুটে করে এসেছিস। চল্, তাহলে আমরা দু'জনেই একসাথে খেয়ে নিই। শিমনের জন্য ভাত ঢাকা দিয়ে রাখলেই হবে।

খেতে খেতে তেমন বেশী কথা বললো না কেউ। ইদানীং এ বাড়ীতে কথার পরিমান কমে গেছে খুব। এতে বেশ দমবন্ধ লাগে বটে, কিন্তু বাহ্যিক শান্তিটা কিছুটা হলেও রা পায়। শিমন এটা ওটা নিয়ে আগে হৈ চৈ করতো বেশ, এখন সে ও চুপচাপ হয়ে গেছে অনেকটা। সারাদিন তো বাইরে বাইরেই কাটায়। রাতে ভাত ঢাকা দেয়া থাকে। খেয়ে চুপচাপ নিজের ঘরে চলে যায়। তবে তার সমস্ত চলাফেরায় কার বিরুদ্ধে যেন নিঃশব্দ কর্কশ এক প্রতিবাদ। ভালো না লাগলেও সুতপা কিছু বলেনা আজকাল।

বাবাকে বিছানায় পাঠিয়ে যখন নিজের ঘরে আঙ্গুলে যখন ডেটল লাগাচ্ছে সুতপা, তখনই ফিরল শিমন। সুতপা দরজা খুলে দিল। ভাইয়ের সাথে একটা দুটো কথা বলতে ইচ্ছে হলো ওর।
-- কিরে, পেয়েছিস্ ব্যাটারী ?
-- না।
-- কেন ? দোকান বন্ধ ?
-- না, দোকানে ব্যাটারী নেই।
-- বাবার কাছে শুনলাম, তুই নাকি পরীক্ষা দিচ্ছিস না এবার।
কিছুটা যেন চমকে উঠল শিমন। বোনের মুখের দিকে তাকাল সরাসরি। তাতে উদ্ধত ভাবটা বেড়ে গেল আরো। সুতপাও ওর দিকে তাকাল সরাসরি। একটা দুটো ব্রণ চেহারাটা রূ করে দিয়েছে আরো। গালের পাশে চেয়ালদুটো একটু উঁচু উঁচু ছিল আগেই। সে দু'টো যেন আরো বেশী উঁচু হয়ে গেছে চেহারার রূক্ষতার নাথে মিলে মিশে।
-- বাবা যখন বলেছে, তাহলে নিশ্চয়ই ঠিক শুনেছ।
-- কেন দিচ্ছিস্ না, পড়াশোনা হয়নি ?
-- না।
-- করিস নি কেন ?
-- করতে পারিনি।
বলেই গম্ভীর দৃষ্টিতে দিদির মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল শিমন। সুতপা অবাক হয়েই ওর দিকে তাকিয়ে রইল। ওদের বয়েসের খুব সামান্যই ফারাক। তারপরেও কতোটা নির্ভরতা ছিল ওর দিদির উপর। এখন সে নির্ভরতা যে কতোখানি সত্য, তার প্রমান দিচ্ছে সুতপা প্রতি মূহুর্তে। অথচ দুরত্ব বেড়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। খুব কষ্ট হলো সুতপার। রাতে ঘুম হলোনা তাই।

মধ্যবিত্তের ঘরের দিন কখনো সোনালী হয়না। বরং মাঝখানে ফেটে যাওয়া কাসার থালার মতন পরিত্যাক্ত আর বিদঘুটেই হয়। টুংটাং সুরেলা কোন শব্দের আকাং্খা খাকলেও সে ঝংকার শোনা যায়না কখনোই। কর্কশ, একঘেয়ে, বেসুরো সময় অভাব আর অভিযোগে খিটখিটে সারান। সেখানে হুংকার ছাড়া ঝংকার কোথায় ? সকালবেলা বাবাকে তক্তাপোষের উপর উবু হয়ে অনেকদিনের পুরোনো কাগজ পড়তে দেখে সুতপার সেকথাই মনে হলো বারবার। ভীষন ছা'পোষা মনে হলো নিজের বাবাকে। তারচে' গত সন্ধ্যার ভয়টা তার কাছে আরো বেশী গ্রহনযোগ্য মনে হলো। একটা চমক তো নিদেনপক্ষে রয়েছে। বুকের ভেতর একটা শিরশিরে কাঁপুনি তো আনে ! সে কাঁপুনি তো চিমটি খেয়ে জেগে থাকার প্রমাণ।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হিন্দু মুসলমান ভুলে গিয়ে, আমরা সবাই মানুষ হই

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা মে, ২০২৬ দুপুর ১:৫৭



আমি জন্মগত ভাবে মুসলমান।
অবশ্য ধর্মীয় নিয়ম কানুন কিছুই মানতে পারি না। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। এখন তো আর এটা ফকির লালনের যুগ না। মানবিক এবং সচেতন... ...বাকিটুকু পড়ুন

নান্দাইলের ইউনুস ও স্বপ্নভঙ্গের বাংলাদেশ

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০


নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় একটি নাটকে একজন ভাড়াটে খুনীর চরিত্র ছিল। খুনীর নাম ইউনুস - নান্দাইলের ইউনুস। গ্রামের চেয়ারম্যান তার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন ভালো মানুষ স্কুল শিক্ষককে হত্যার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বনির্ভর অর্থনীতি থেকে ঋণনির্ভর, আমদানিনির্ভর, পরনির্ভর রাষ্ট্রে পরিনত হতে যাচ্ছি।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪




মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতজানু হয়ে যে রাষ্ট্রগুলো নিজের অর্থনীতি, কৃষি আর ভবিষ্যৎ বিক্রি করে দেয়- তার পরিণতি কী, তার জীবন্ত উদাহরণ পাকিস্তান। কোটি কোটি মানুষকে ভিক্ষুক বানানোর সেই পথেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

এরা খুবই বিপদজনক

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ০৩ রা মে, ২০২৬ রাত ১১:০১

যে তোমার সাফল্য দেখে হিংসে করে,
যে তোমার বিপদ দেখে খুশি হয়,
যে তোমার সামনে এক আর পেছনে আরেক।
তাকে তোমার গোপন কথা কিংবা তোমার কোনো পরিকল্পনার কথা বলতে যেও না।
সবসময় তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্পিরিট শোন বাই আমেরিকান এয়ারলাইন্স-এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত!

লিখেছেন ঢাকার লোক, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ ভোর ৪:১৫

গতকালের একটা বড় খবর ছিল আমেরিকার একটি অন্যতম জনপ্রিয় বিমান সংস্থা স্পিরিট এয়ারলাইন্স দেউলিয়া হয়ে তাদের সব সেবা তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরেই স্পিরিট অর্থনৈতিক সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছিলো,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×