অফিসে কাজে মন বসাতে হয়না। কাজই জোঁকের মতো ছেঁকে ধরে সমস্ত মনযোগ শুষে নেয়। কিন্তু এরই মাঝে লোকটার কথা মাঝে মাঝেই মনে হলো তার। গা ছম্ ছম্ করে উঠল রাতের অন্ধকারে আধাভৌতিক অস্তিত্বের কথা ভেবে। ছোট একটা সমস্যার কারণে বসের মৃদু অনুযোগও শুনতে হলো। সুতপার কাজ ভালো। মধ্যবিত্তের দৈনন্দির জীবনে যতোই ভাঙ্গাচোড়া হোক না কেন, কাজ সবসময়ই নীরেট হতে হয়। সুতপা তা পারে। বসের অনুযোগও তাই সীমা ছাড়িয়ে গেল না। কিন্তু কিছু কিছু কলিগের জন্যে এটুকুই সারাদিনের খোরাক হয়ে রইল।
ঢাকার রাস্তাঘাটে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। চিৎকার, ব্যাস্ততা আর কালো ধোঁয়ায় অবয়ের দাঁত বের করা হাসি। মনে হয় এ ভীড়, ট্রাফিক জ্যাম উপচে পড়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সব। তারপর একটি একটি করে মানুষ, বস্তু, ট্রাক-রিকশা, সমাবেশ, জীবন খসে পড়বে পৃথিবীর ঘুর্ণির সাথে অনন্ত শুন্যে। এমনি একটা সময়ে সুতপা বেরুলো অফিস থেকে। রাস্তার মোড়ে কোন এক গন্ডগোলে থেমে গেল রিক্সা। এক পকেটমার ধরা পড়েছে, বলল রিক্সাওয়ালা। হয়তো পিটিয়ে মেরেই ফেলা হবে কোন প্রমাণের অপেক্ষা না করে। অফিস ফেরৎ অনেকেরই এ দৃশ্যে মহা আনন্দ। এটাও এক ধরণের চমক ছা'পোষা মধ্যবিত্ত সমাজে। অনেকে মতো সুতপাও উঁকি মারল রিক্সা থেকে।
বেশ একটু দেরী হয়ে গেল। মাকিদ তবুও দাড়িয়ে ছিল রাস্তায়, কফি শপের সামনে। সুতপাকে দেখে এগিয়ে এল,
-- দেরী হলো যে এতটা ?
সুতপা রিক্সা থেকে নেমে মিটিয়ে দিল ভাড়াটা। ভাড়া নিয়ে একটু ঘ্যান ঘ্যান করল রিক্সাওয়ালা। কিন্তু ওরা দু'জনেই সেদিকে কোন নজর না দিয়ে এগিয়ে গেল কফি শপের দিকে। কোনার দিকে একটা টেবিল বেছে নিয়ে দু'টো চেয়ার টেনে বসল দু'জন।
-- কেমন আছ সুতপা ?
মাকিদের গলার আওয়াজ অন্যান্য দিনের চেয়ে আরো বেশী ঘন, আরো বেশী আবেগপ্রবণ।
-- ভালো। তুমি ?
-- ভালো, মা গতকাল তোমার কথা খুব বলছিল।
সুতপা মাথা নীচু করলো একটু। ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে মুখটা মুছে নিল আলতো করে। কপালের উপরের চুলগুলোকে বিলি কেটে পেছন দিকে সরিয়ে দিল।
-- সত্যি, অনেকদিন যাওয়া হয়নি তো তোমাদের বাসায়। কেমন আছেন খালাম্মা ?
-- ভালো, তবে বাবা মারা যাবার পর কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে।
দু'জনের জন্যে দু'টো কফির অর্ডার দিয়ে সুতপার চোখের দিকে সরাসরি তাকালো মাকিদ। এ চোখের দিকে তাকালে কেমন যেন দুর্বল হয়ে যায় সে।
-- মা'র এখনকার সবচে' বড় চাওয়া হচ্ছে আমাদের বিয়েটা।
-- কেন কিছু বলেছেন নাকি ?
-- হ্যা, তোমাকে যেতে বলেছে। তোমার বাবার সাথেও নাকি কথা বলবে।
-- তুমি কি বলেছ ?
-- সেজন্যেই তোমার সাথে দেখা করলাম আজ। আর দেরী করো না সু'।
সুতপা কোন উত্তর দিল না। টেবিলের উপর আঙ্গুল দিয়ে অদৃশ্য আঁকিবুকি করলো কতোন। কষ্টের একটা শীর্ন, কিন্তু খরস্রোতা নদী বয়ে গেল বুকের ভেতর কুলকুলিয়ে।
-- মাকিদ, তুমি তো জান আমার সমস্যাগুলো। শিমন কোনকিছু না করা অবধি কি করে বিয়ে করি।
-- শিমন, তোমার বাবাকে আমরা দু'জনে মিলে দেখব।
-- না, তা হয়না মাকিদ। তুমি আমার সংসারের ঝামেলা বইতে যাবে কেন ? আমি তা কখনোই চাইব না।
-- আমার মা কেও তো আমরা মিলে মিশেই দেখব। তাছাড়া আমি তোমাকে ভালোবাসি সুতপা।
কষ্টের শীর্ণ নদীটা ততনে বিশাল এক সমুদ্র হয়ে আচড়ে পড়ছে সুতপার বুকের ভেতরের স্পর্শকাতর কোনগুলোতে। সেটাকে সামলে চেষ্টাতেই কফি হাউজের কালো কাঁচের দেয়াল ভেদ করে বাইরের আধো অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকলো সে অনেকন। তার হাতের আঙ্গুলগুলো নিয়ে খেলা করতে করতে একসময় মাকিদ ছেড়ে দিল সে হাত। সুতপা নিজেই মাকিদের হাতের উপর হাত রাখলো আবার।
-- আমিও তোমাকে ভালবাসি মাকিদ। কিন্তু এরকম একটা সময়ে বিয়ে আমরা কি করে করি ?
কোন উত্তর দিলনা মাকিদ। কিন্তু যন্ত্রণার একটা থির থির কাঁপন ওদের মিলিত হাত বেয়ে সুতপার বুকের ভেতরে আঘাত হানছিল ্বারবার। সে যন্ত্রনা শরীরের প্রতিটি কোষে কোষে আঘাত করে ছড়িয়ে জল হয়ে বেরিয়ে এল চোখের কোল বেয়ে।
চলবে.......
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



