somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্প: ভয় (দ্্বিতীয় আংশ)

০৪ ঠা মার্চ, ২০০৬ সকাল ৮:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সকাল বেলা বেরিয়ে যাওয়ার সময় কারখানার বারান্দায় কাউকে দেখতে পেলোনা। হয়তো খোলার সময় তখনো হয়নি, তাই অন্য লোকজনও ছিলনা। যেখানে বসে ছিল লোকটা, দূর থেকেই তার চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করল সুতপা। না পেয়ে হতাশ হয়ে নিজেই নিজের কথা ভেবে অবাক হলো সে। সাহসী সে নিজে কখনোই নয়, কিন্তু ভয় পেতে ভালো লাগছে তার।

অফিসে কাজে মন বসাতে হয়না। কাজই জোঁকের মতো ছেঁকে ধরে সমস্ত মনযোগ শুষে নেয়। কিন্তু এরই মাঝে লোকটার কথা মাঝে মাঝেই মনে হলো তার। গা ছম্ ছম্ করে উঠল রাতের অন্ধকারে আধাভৌতিক অস্তিত্বের কথা ভেবে। ছোট একটা সমস্যার কারণে বসের মৃদু অনুযোগও শুনতে হলো। সুতপার কাজ ভালো। মধ্যবিত্তের দৈনন্দির জীবনে যতোই ভাঙ্গাচোড়া হোক না কেন, কাজ সবসময়ই নীরেট হতে হয়। সুতপা তা পারে। বসের অনুযোগও তাই সীমা ছাড়িয়ে গেল না। কিন্তু কিছু কিছু কলিগের জন্যে এটুকুই সারাদিনের খোরাক হয়ে রইল।

ঢাকার রাস্তাঘাটে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। চিৎকার, ব্যাস্ততা আর কালো ধোঁয়ায় অবয়ের দাঁত বের করা হাসি। মনে হয় এ ভীড়, ট্রাফিক জ্যাম উপচে পড়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সব। তারপর একটি একটি করে মানুষ, বস্তু, ট্রাক-রিকশা, সমাবেশ, জীবন খসে পড়বে পৃথিবীর ঘুর্ণির সাথে অনন্ত শুন্যে। এমনি একটা সময়ে সুতপা বেরুলো অফিস থেকে। রাস্তার মোড়ে কোন এক গন্ডগোলে থেমে গেল রিক্সা। এক পকেটমার ধরা পড়েছে, বলল রিক্সাওয়ালা। হয়তো পিটিয়ে মেরেই ফেলা হবে কোন প্রমাণের অপেক্ষা না করে। অফিস ফেরৎ অনেকেরই এ দৃশ্যে মহা আনন্দ। এটাও এক ধরণের চমক ছা'পোষা মধ্যবিত্ত সমাজে। অনেকে মতো সুতপাও উঁকি মারল রিক্সা থেকে।

বেশ একটু দেরী হয়ে গেল। মাকিদ তবুও দাড়িয়ে ছিল রাস্তায়, কফি শপের সামনে। সুতপাকে দেখে এগিয়ে এল,
-- দেরী হলো যে এতটা ?
সুতপা রিক্সা থেকে নেমে মিটিয়ে দিল ভাড়াটা। ভাড়া নিয়ে একটু ঘ্যান ঘ্যান করল রিক্সাওয়ালা। কিন্তু ওরা দু'জনেই সেদিকে কোন নজর না দিয়ে এগিয়ে গেল কফি শপের দিকে। কোনার দিকে একটা টেবিল বেছে নিয়ে দু'টো চেয়ার টেনে বসল দু'জন।
-- কেমন আছ সুতপা ?
মাকিদের গলার আওয়াজ অন্যান্য দিনের চেয়ে আরো বেশী ঘন, আরো বেশী আবেগপ্রবণ।
-- ভালো। তুমি ?
-- ভালো, মা গতকাল তোমার কথা খুব বলছিল।
সুতপা মাথা নীচু করলো একটু। ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে মুখটা মুছে নিল আলতো করে। কপালের উপরের চুলগুলোকে বিলি কেটে পেছন দিকে সরিয়ে দিল।
-- সত্যি, অনেকদিন যাওয়া হয়নি তো তোমাদের বাসায়। কেমন আছেন খালাম্মা ?
-- ভালো, তবে বাবা মারা যাবার পর কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে।
দু'জনের জন্যে দু'টো কফির অর্ডার দিয়ে সুতপার চোখের দিকে সরাসরি তাকালো মাকিদ। এ চোখের দিকে তাকালে কেমন যেন দুর্বল হয়ে যায় সে।
-- মা'র এখনকার সবচে' বড় চাওয়া হচ্ছে আমাদের বিয়েটা।
-- কেন কিছু বলেছেন নাকি ?
-- হ্যা, তোমাকে যেতে বলেছে। তোমার বাবার সাথেও নাকি কথা বলবে।
-- তুমি কি বলেছ ?
-- সেজন্যেই তোমার সাথে দেখা করলাম আজ। আর দেরী করো না সু'।
সুতপা কোন উত্তর দিল না। টেবিলের উপর আঙ্গুল দিয়ে অদৃশ্য আঁকিবুকি করলো কতোন। কষ্টের একটা শীর্ন, কিন্তু খরস্রোতা নদী বয়ে গেল বুকের ভেতর কুলকুলিয়ে।
-- মাকিদ, তুমি তো জান আমার সমস্যাগুলো। শিমন কোনকিছু না করা অবধি কি করে বিয়ে করি।
-- শিমন, তোমার বাবাকে আমরা দু'জনে মিলে দেখব।
-- না, তা হয়না মাকিদ। তুমি আমার সংসারের ঝামেলা বইতে যাবে কেন ? আমি তা কখনোই চাইব না।
-- আমার মা কেও তো আমরা মিলে মিশেই দেখব। তাছাড়া আমি তোমাকে ভালোবাসি সুতপা।

কষ্টের শীর্ণ নদীটা ততনে বিশাল এক সমুদ্র হয়ে আচড়ে পড়ছে সুতপার বুকের ভেতরের স্পর্শকাতর কোনগুলোতে। সেটাকে সামলে চেষ্টাতেই কফি হাউজের কালো কাঁচের দেয়াল ভেদ করে বাইরের আধো অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকলো সে অনেকন। তার হাতের আঙ্গুলগুলো নিয়ে খেলা করতে করতে একসময় মাকিদ ছেড়ে দিল সে হাত। সুতপা নিজেই মাকিদের হাতের উপর হাত রাখলো আবার।
-- আমিও তোমাকে ভালবাসি মাকিদ। কিন্তু এরকম একটা সময়ে বিয়ে আমরা কি করে করি ?
কোন উত্তর দিলনা মাকিদ। কিন্তু যন্ত্রণার একটা থির থির কাঁপন ওদের মিলিত হাত বেয়ে সুতপার বুকের ভেতরে আঘাত হানছিল ্বারবার। সে যন্ত্রনা শরীরের প্রতিটি কোষে কোষে আঘাত করে ছড়িয়ে জল হয়ে বেরিয়ে এল চোখের কোল বেয়ে।

চলবে.......
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হিন্দু মুসলমান ভুলে গিয়ে, আমরা সবাই মানুষ হই

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা মে, ২০২৬ দুপুর ১:৫৭



আমি জন্মগত ভাবে মুসলমান।
অবশ্য ধর্মীয় নিয়ম কানুন কিছুই মানতে পারি না। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। এখন তো আর এটা ফকির লালনের যুগ না। মানবিক এবং সচেতন... ...বাকিটুকু পড়ুন

নান্দাইলের ইউনুস ও স্বপ্নভঙ্গের বাংলাদেশ

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০


নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় একটি নাটকে একজন ভাড়াটে খুনীর চরিত্র ছিল। খুনীর নাম ইউনুস - নান্দাইলের ইউনুস। গ্রামের চেয়ারম্যান তার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন ভালো মানুষ স্কুল শিক্ষককে হত্যার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বনির্ভর অর্থনীতি থেকে ঋণনির্ভর, আমদানিনির্ভর, পরনির্ভর রাষ্ট্রে পরিনত হতে যাচ্ছি।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪




মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতজানু হয়ে যে রাষ্ট্রগুলো নিজের অর্থনীতি, কৃষি আর ভবিষ্যৎ বিক্রি করে দেয়- তার পরিণতি কী, তার জীবন্ত উদাহরণ পাকিস্তান। কোটি কোটি মানুষকে ভিক্ষুক বানানোর সেই পথেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

এরা খুবই বিপদজনক

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ০৩ রা মে, ২০২৬ রাত ১১:০১

যে তোমার সাফল্য দেখে হিংসে করে,
যে তোমার বিপদ দেখে খুশি হয়,
যে তোমার সামনে এক আর পেছনে আরেক।
তাকে তোমার গোপন কথা কিংবা তোমার কোনো পরিকল্পনার কথা বলতে যেও না।
সবসময় তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্পিরিট শোন বাই আমেরিকান এয়ারলাইন্স-এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত!

লিখেছেন ঢাকার লোক, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ ভোর ৪:১৫

গতকালের একটা বড় খবর ছিল আমেরিকার একটি অন্যতম জনপ্রিয় বিমান সংস্থা স্পিরিট এয়ারলাইন্স দেউলিয়া হয়ে তাদের সব সেবা তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরেই স্পিরিট অর্থনৈতিক সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছিলো,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×