somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভয় (ছোটগল্প: তৃতীয় অংশ)

০৬ ই মার্চ, ২০০৬ ভোর ৬:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রতিবাদ, পালটা প্রতিবাদ, পালটা পালটি প্রতিবাদের তীব্রতা গত ক'দিন এত বেশী ছিল যে, গল্প পড়ার সময়ই কেউ করে উঠতে পারেননি। দ্্বিতীয় অংশ কেউ না পড়লেও তৃতীয় অংশ পোষ্ট করলামা। আশা করি কেউ কেউ শান্তহয়েছেন।
...................................................

রিক্সায় বসে মাকিদের কথাই ওর মন জুড়ে রইল। ন'টা বেজে গেছে তখন প্রায়। রাস্তায় লোকজনের তখনো অনেক আনাগোনা। অবক্ষয়ের শেষ মূহুর্তে টিকে থাকার সর্বশেষ নিঃশ্বাসের মতন। মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক জ্যাম কমেনি তখনো । এর মাঝে প্রায় প্রতিটি কোনাতেই যেন হাট বসেছে। দোকানীরা বসেছে তাদের পন্য নিয়ে সলতের বাতি জ্বালিয়ে। ঘরে ফেরা পথের লোকজন সেখানে দরদাম নিয়ে ব্যাস্ত।

মোটামুটি ভাল একটা চাকুরি ছিল বাবার। দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে সচ্ছন্দেই চলছিল। কিন্তু আরো বেশী চাইতে গিয়েই বিপদ হলো। জেল জরিমানা না হলেও চলে গেলো চাকুরীটা। তারপর চাকুরির শোকে অসুস্থ হয়ে গেলেন বাবা। পড়াশোনায় ভাল ছিল সুতপা। সেটা ছেড়ে হাল না ধরলে হয়তো এতোদিনে না খেয়েই থাকতে হতো ওদের। এখন সুতপা বিয়ের কথা ভাবলেই ভয় পেয়ে যায় বাবা, ভাই দু'জনেই। তখন একটা না একটা অজুহাত দাঁড় করাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে দু'জনেই। মাকিদের ভালো চাকুরি নেই, এমন কথা দাঁড় করিয়েছে বাবা, পাড়ার মস্তানদের সাথে ওঠাবসা আছে - সেটা দাঁড় করিয়েছে ভাই। এ নিয়ে শিমনের সাথে তীব্র একটা ঝগড়াও হয়ে গেল। অথচ পাড়ার বখাটেদের সাথে মিশে মিশে উচ্ছন্নে যাচ্ছে, সেদিকে খবর নেই কারো।

প্রতিদিনের মতোই গলির মোড়ের সামনে এসে থামল রিক্সাটা। পানবিড়ির দোকানের ছেলেটা ওর দিকে তাকিয়ে হাসল একটু। ওখান থেকে সুতপা কখনোই কেনেনি কোনকিছু। তারপরেও এই অকৃত্রিম হাসি। ওর ভালো লাগল খুব। এই মুহূর্তে মনে হলো দুরের মানুষের সাথেই ওঠাবসা ভালো বেশী। প্রত্যাশা বেশী নেই, অল্পেই সন্তুষ্টি আসে। কতোদিন হয়ে গেলো, শিমন ওর সাথে হেসে কথা বলেনি। অথচ কি মিল ছিল ওদের দুই ভাই বোনের। একই প্রাইমারি স্কুলে পড়েছে, আসাযাওয়াও একসাথেই করতো। ওখানকার পাট শেষ হয়ে যাওয়ার পর যেতে হলো দু'জনকে আলাদা স্কুলে। কিন্তু স্কুল থেকে ফেরার পর একজন উন্মুখ হয়ে থাকতো আরেকজনের জন্যে। মা হঠাৎ করে মারা যাওয়ার পরও কোন পরিবর্তন আসেনি, কিন্তু বাবার সমস্যাটার পরপরই কেমন যেনো অন্যরকম হয়ে গেলো সবকিছু। বাস্তব তার বিকট চেহারা নিয়ে জায়গা গাড়লো ভাই বোনের মাঝামাঝি। আর এখন তার অবস্থান এতোটা শক্ত যে, তাকে একচুলও সরানোর সাধ্য নেই কারো।

কারখানার কাছাকাছি আসতেই লোকটাকে দেখতে পেল সে। লোড শেডিং ছিলনা। অন্ধকারেও তাই লোকটার অবয়ব বোঝা গেলো। খুব হালকা পাতলা একটা চেহারা। বসে আছে কারখানার দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে। সিগারেটের লাল আলো কেঁপে কেঁপে উঠছে আর নামছে। ওকে কি যেন বলতে চাইলো। তাতে আরো বেশী ভয় পেলো সুতপা। প্রায় দৌড়ে বাড়ীতে এসে ঢুকলো।

বাবা অনুযোগের সুরে কি যেনো বলতে চাইলেন। সুতপা শুনেও যেন শুনতে চাইল না। ওর দেহ, মন আর সত্বায় এক শিরশিরে ভয়ের কাঁপন। কিন্তু এই ভয়ের অন্তরালেও কোথাও না কোথাও একটা শক্তির সন্ধান পেলো সে। সে শক্তিটা যেন ওর দিকে এগিয়ে এসে বেড়ে উঠতে চাইছে ওর ভেতরেই।

ঘরোয়া পোষাক পড়ে রাতের খাবারগুলো ফ্রিজ থেকে বের করে গরম করলো। টেবিল সাজিয়ে ডাকলো বাবাকে। বাবার সাথে নিজেই নানারকম গল্প করে সারলো খাওয়া দাওয়া। বাবাও পরিবেশের প্রভাবে তার অনুযোগ ভুলে ছোটবেলার অনেক কথা বলে হাসালেন সুতপাকে। ওদের খাওয়া শেষ হবার একটু পরেই শিমন এলো। ও ভাইকে খাবার বেড়ে দিয়ে ওদের সাথে টেবিলে বসে থাকলো খাওয়া শেষ না হওয়া অবধি। বাবাও অনেক পুরোনো দিনের কথা বললেন। ওরা দু' ভাই বোন মিলে মিশে হাসলো সে কথায়। এতদিন পর ওদের ছোট্ট সংসারে তারল্যের হাওয়া লাগলো।

সকালে অফিসে যাওয়ার সময় লোকটাকে বারান্দায় ঘুমিয়ে থাকতে দেখলো সুতপা। ক্র্যাচদু'টো পড়ে আছে একপাশে। পাশে পুরোনো রংচঙে, শতছিন্ন একটা ঝোলা। চলি্লশ থেকে পয়তালি্লশের মতো হবে লোকটার বয়েস। অনাহার আর অনিয়মে চারপাশের পৃথিবীর মতোই শীর্ণ। কিন্তু কাঁচাপাকা, ঘন কোকড়ান চুলগুলো কোন না কোন শক্তির অহংকারে উজ্জল। কার কথা মনে করে সুতপার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠলো সহসা কে জানে ! কিন্তু সে কষ্ট ভেদ করে পৃথিবীটা এক লহমাতেই কেমন যেন আপন হয়ে গেলো ওর কাছে।

মাকিদের সাথে দেখা হলো আরো দু'দিন পর। অফিস থেকে একটু আগেই বেরুলো সুতপা। ওদের সেই পরিচিত রেস্তোরাতেই বসলো দু'জন। আলো ঝলমল সুন্দর একটা বিকেল। ওদের মনেও সামনের ছবি দিনগুলোর অাঁকলো সে বিকেল। তারই নকশীকাথার রচনা ও আনন্দে বিভোর হয়ে কথার মালায় ভরিয়ে দিল ওদের বাকি সময়।
(শষ)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চিরবিদায়ে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় শায়িত ডা. খায়রুল ইসলাম – Regional Director for South Asian Countries, WaterAid UK

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৫৪




২০ অগাস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার রাতে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে ফিরে ঘুমাতে ঘুমাতে কিছুটা দেরি হয়ে গিয়েছিল। ফলে সকালে উঠতেও দেরি। আগের দিন দুপুরে বিদ্যুৎ এক ঘণ্টার জন্য চলে যাবার পর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আন্দোলনের সময় বেকারদের দরকার ছিল, এখন কি আর নেই?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:২০


সারজিস আলমকে দেখে একসময় মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের রাজনীতিতে হয়তো সত্যিই নতুন কিছু আসতে যাচ্ছে। কোটা আন্দোলনের আইকনিক মুখ, গর্বিত ঢাবিয়ান, এনসিপির বড় নেতা। শেখ হাসিনার আমলে সকাল বিকাল... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হবে?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৩২

বাংলাদেশ কি মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হবে?

প্রশ্নটি এখন আর নিছক কল্পনা নয়।
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান Makkah Joint Defence Agreement-এ স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা জানেন না তাদের জন্য! কফি এনিমা (Coffee Enema)!

লিখেছেন সাহাদাত উদরাজী, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৩

কফি এনিমা হলো মলদ্বার দিয়ে কোলন বা বৃহদন্ত্রে তরল কফি প্রবেশ করিয়ে পেট পরিষ্কার করার একটি বিকল্প পদ্ধতি। নিচে এটি শরীরে দেওয়ার সাধারণ প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে উল্লেখ করা হলোঃ

প্রয়োজনীয় উপকরণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×