ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অসি চাচা খুব সহজ সরল একটা মানুষ। বিভিন্ন অঙ্গনে তার অনেক আসাযাওয়া, সাফল্য থাকলেও, এসব তার সারল্যের উপর কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। তবে তাঁর এতোটা সোজা পথে চলার কারণে, অনেক সময় কোন কোন পরিবেশে তাঁকে বেশ অসহায় মনে হতো। বিশেষ করে মায়ের অনেক মনগড়া আক্রমণে তিনি কেমন যেনো বোবা হয়ে যেতেন, প্রতিরার কোন মতা থাকতো না তাঁর। তখন শুভর মনে হতো, এ বাড়ীর, এখানকার মানুষের সবরকম স্পর্শ থেকে দুরে থাকলেই ভালো থাকতে পারবেন তিনি।
মনে পড়ে, তার সামনেই দু'জনের ঝগড়ায় পর শুভ একা ছিল অসি চাচার সাথে তাঁর গাড়ীতে।
মা তোমাকে এতো উল্টোপাল্টা বলল, তুমি তো কিছু বললে না।
কেন ? আমিও তাকে যা বলার বলেছি। উত্তর দিলেন অসি চাচা বাইরের দিকে তাকিয়ে।
বলেছ, কিন্তু মা'ই তোমাকে বলে বেশী। আর আমি দেখেছি, অনেকবারই অন্যায়ভাবে। শুভ্র মানতে চাইল না।
তুই কি চাস্, আমিও তোর মাকে অন্যায় কিছু বলি ? তার চোখাচোখি তাকালেন অসি চাচা।
কিন্তু সেটা যে তুমি করবে না, আমি ভালো করেই জানি। শুভও তার চোখ সরালো না।
তবে আমাকে কি করতে বলিস তুই ?
শুভ কোন উত্তর দিলনা। গাড়ীর জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলো কতোন। বাইরে মিছিল চলছে কোন এক রাজনৈতিক দলের। হরতাল ডাকেনি, তাই ভাংচুর হচ্ছে না তেমন। কিন্তু ভাংচুর হচ্ছে শুভর বুকের ভেতর। একটা অব্যক্ত ব্যাথা যেনো দলা পাকিয়ে হাতুড়ী পেটাচ্ছে বুকের প্রতিটি কোষে।
তুই তোর মা কে ভালোবাসিস শুভ ? জানলা দিয়ে সিগারেটের ছাইটা ঝাড়তে ঝাড়তে প্রশ্ন করলেন অসি চাচা।
হ্যা, বাসি। যদিও তার উপর অনেক রাগ আছে আমার।
প্রকাশ করিস সে রাগ ?
সবসময় করিনা। চুপ করে থাকি। উত্তর করলো শুভ।
কেনো করিস্ না ? সিগারেট শেষ হলো অসি চাচার।
কেনো করি না, তা তুমি নিজেও জানো অসি চাচা। কিন্তু তারপরেও মায়ের এতোটা অন্যায় কথাবার্তা অন্ততপ েতোমার সহ্য করা উচিত না।
কিন্তু কথা সবসময় সবকিছু প্রকাশ করেনা শুভ ! সাবধানে, রাস্তার মাঝের একটা গর্তকে পাশ কাটিয়ে চালাতে চালাতে বললেন অসি চাচা।
কিন্তু এতোটা মিথ্যে সবসময় মেনে নেয়া যায়না। অসহায় একটা ভাব ফুটে উঠলো শুভর চেহারায়।
অনেকন কোন কথা হলোনা দুজনের মাঝে। শহরের অনেকটা শেষ সীমানায় এসে পৌছুলো ওদের গাড়ী। দুপাশের দোকানপাটের ঘনত্ব কমে এসেছে। কয়েকটা ইতস্তত: ছড়ানো ছিটানো গাছপালা কিছুটা হলেও সবুজের অস্তিত্ব প্রকাশ করছে, কিন্তু ক'দিনের জন্যে কে জানে।
অসি চাচা নীরবতা ভেঙ্গে স্বগোক্তির মতোই বললেন,
একটা বিশ্বাসের বলে আমি এতদিনও আছি। সেটা ভাঙ্গলে আমি নিজেই হয়তো আর পারবো না। চলে যাব কোথাও।
শুভ তাকালো অসি চাচার দিকে। নিজের জন্যে কিছু করার একটা সুস্থ ইচ্ছে তো সবারই থাকা দরকার। ওনার কি সেটাও নেই ?
তাই করো অসি চাচা। একটা কিছু করো সুধুমাত্র তোমার নিজের জন্যে। একটা বিষন্ন আকুতি ভেসে আসলো শুভর কথায়।
অসি চাচা চুপ করে থাকলেন। কিন্তু সে চুপ থাকার মাঝে যে কতোটা যন্ত্রনা তাঁর বুকে হাতুড়ী হানলো, শুভ টের পেলো তা। মা গান করেন সবরকম আবেগ অনুভূতি নিয়ে। আত্মার ভেতরের ভাব শুদ্ব না হলে এরকম কি কেউ গাইতে পারে ? সেটা না হলে শুভ তো মাকে ভালোবাসতে পারতো না। কিন্তু বাইরে মা এমন কেন ? শুভর ধারণা, মায়ের ভেতরে কোথাও কোন বড় একটা কষ্ট লুকিয়ে রয়েছে, যা তিনি কাউকেই কথনো প্রকাশ করেননি। আর যদি কিছু প্রকাশ করে থাকেন, একমাত্র অসি চাচার কাছেই। অসি চাচাও সেটা জানতেন বলেই, নিজে কষ্ট পেয়েও মায়ের অনেক অন্যায়কেই প্রশ্রয় দিতেন। কিন্তু মায়ের আত্মার ভেতরে যে সৌন্দর্য ছিল, তার স্পর্শে তিনি যে কতোটা সুখী হতেন, সে ও শুভ অনুভব করেছে বহুবার। মাকেও তখন অনেক সুখী মনে হতো। মনে হয় মা ও ভালোবাসতেন অসি চাচাকে, কিন্তু সে ভালোবাসার জন্যে নিজের বাইরের খোলস ছিড়ে বেরুনোর মতা ও সাহস ছিলনা তাঁর।
সেদিন অসি চাচার সাথে অনেক বেড়ানো হয়েছিল শুভর। মাকে নিউমার্কেটে ছেড়ে দিয়েছিল তারা। মা'র কেনাকাটা করার ছিল তাঁর কোন এক বন্ধুর সাথে। জসীম চাচারও ঘনঘন আসাযাওয়া ছিল বাড়ীতে। বাবা ও মায়ের সাথে একসাথে আড্ডাও দিতে দেখেছে তাঁকে। কিন্তু অসি চাচা সে আড্ডায় থাকতেন না বললেই চলে। শুভর সাথেও তেমন এতটা আলাপ হয়নি তাঁর।
-0-0-
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



