somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মিউনিকে হুমায়ুন আজাদের মৃত্যু ও আমার স্মৃতিচারণ

২৪ শে মার্চ, ২০০৬ রাত ৮:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

12 আগষ্ট 2004 সাল। দুদিন আগে মিউনিকে বেড়াতে এসেছে রুমানা হাশেম। রুমানা নারী অধিকারের একটি বিষয়কে ভিত্তি করে ডক্টরেট করতে এসেছে জার্মানীতে। একসময় মিউনিকে থাকত, পরে অন্য শহরে বদল করেছে। একসপ্তাহের জন্যে পুরোনো বন্ধুদের সাথে দেখা করতে এসেছে এখানে আমার বাড়ীতে উঠেছে। রুমানা আমাকে ভাইয়া বলত ও আমি ওকে নিজের বোনের মতোই স্নেহ করতাম।

সেদিন সকাল আটটায় ডাক্তারের কাছে একটা এপয়েন্টম্যান্ট ছিল আমার। সকাল সকাল উঠেই তাই বেরিয়ে পড়লাম। চেম্বারে পৌছানের আগের মুহূর্তেই মোবাইল বেজে উঠলো। এখানে গাড়ী চালানো অবস্থায় মোবাইল ধরলে জরিমানা করা হয়। রাস্তার পাশে থামানোর একটা জায়গা খালি ছিল। থামিয়েই মোবাইল ধরলাম তাই। ফোনটি এসেছে ঢাকার সংবাদ অফিস থেকে। হমায়ুন আজাদ নাকি মারা গেছেন মিউনিকে। কোন একটি সুত্রে খবরটি পেয়েছেন তারা ও আমার সাথে যোগাযোগ করে খবরটা সন্মন্ধে নিশ্চিত হতে চান । সেই সাথে আশা করেন আরো খোঁজখবর ও ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ। ডয়েচেভেলের বাংলা অনুষ্ঠানে মাঝে মাঝে বিভিন্ন বিষয়ে সাক্ষাৎকার দিয়ে মোটামুটি একটা পরিচিতি তৈরী হয়েছে আমার। সেখানে ফোন করে পেয়েছেন আমার নম্বর। সে নম্বরে ফোন করে রুমানার মাধ্যমে পেয়েছেন আমার মোবাইল নম্বর। ভীষন বড় রকমের একটা ধাক্কা লাগল নিজের ভেতরে। হমায়ুন আজাদ যে জার্মানীতে আসছেন পেন নামে একটা সংস্থার স্কলারশীপে, তা বাংলাদেশের একটি পত্রিকায় পড়েছিলাম আমি। কিন্তু ওনি যে মিউনিকেই আসছেন, তা লেখা ছিল না। আর সে মুহূর্তে কারো জানাও ছিল না, তার মৃত্যু স্বাভাবিক না হত্যা করা হলো তাকে। নিজের ভেতরে একটা লজ্জাবোধও কাজ করছিল যে আমার শহরেই এমন একটি দূর্ঘটনা ঘটলো। কোনক্রমে এপয়েন্টম্যান্ট শেষ করে বাড়ী ফিরলাম।

বাড়ীতে ফিরে দেখি হলুস্থুল ব্যপার। ফেনের পর ফোন আসছে বাংলাদেশ ও বিভিন্ন শহর থেকে। সবারই একই প্রশ্ন। এরই মঝে রূমানা আর আর আমি পুলিশের কাছে ও যে সংস্থা হুমাযুন আজাদ কে এখানে এনেছিল, তার পরিচালককে ফোন করে মৃত্যুর খবরটি সম্পর্কে নিশ্চিত হলাম। কিন্তু তখনও আমরা পরিস্কার জানি না মৃত্যুটি স্বাভাবিক কি না। পুলিশ এ ব্যপারে আমাদের সাথে কথাই বলতে নারাজ। আর পেনের পরিচালক নিজেই ঘটনার আকস্মিকতায় স্তম্ভিত। বাংলাদেশ দূতাবাসে ফোন করলাম অনেকবার। জার্মান রিসেপশানিস্ট মহিলা দ্বায়িত্বশীল কারো সাথেই যোগাযোগ করিয়ে দিতে চাইলেন না। আর আমার বাড়ীতে চলছে ফেনের পর ফোন। কেউ কেউ জানতে চাইল আমাদের নম্বরটা কোন সংবাদ সংস্থার কি না। এর মাঝে এর মাঝে টেলিফোনে সাক্ষাৎকার চাইল ডয়েচেভেলে ও বাংলাদেশ থেকে ই টিভি। রুমানা ও আমি মিলে মিশে সাক্ষাৎকার দিলাম। এরই মাঝে পুলিশকে ও পেনকে আবার ফোন করে জানা গেলো মৃত্যুর আসল বর্ননা। হমায়ুন আজাদের এখানে আসার খবরটি ইচ্ছাকৃতভাবেই তার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে গোপন রাখা হয়। তার থাকার বন্দোবস্ত করা হয় ইউনিভার্সিটি এলাকা শোয়াবিং একটি এপার্টমেন্টে। তার আসার পরদিন সন্ধ্যায় একটি বারবিকিউ অনুষ্ঠানে সম্বর্ধনা দেয়ার আয়োজন ছিল। অনেক রাত পর্যন্ত চলে সে অনুষ্ঠান। তারপর তাঁকে পৌছে দেয়া হয় এপার্টমেন্টে। পরদিন তাকে মিউনিকে বৈদেশিক দপ্তরে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সে অনুযায়ী পরদিন সকালে ডাকা হয় তাকে। কিন্তু বারবার ডাকার পরও দরজা না খোলায় পুলিশ ডেকে দরজা ভাঙ্গা হয় ও মৃত আবস্থায় পাওয়া যায় তাকে। পোষ্টমর্টেম করে জানা যায়, তার হৃদপিন্ডের একটি ভাল্ব বন্ধ হওয়াই তার মৃত্যুর কারণ।একটি নামী পত্রিকা (সু্যডডয়েচে ছাইটুং )ও তার সাংবাদিক এর সাথে কথা বলেও নিশ্চিত হলাম আমরা। হুমায়ুন আজাদের বাড়ীতে ফোন করে সহযোগীতার আশ্বাস দিলাম। তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের কান্নায় ভার হলো মন।

এর মাঝে বেশ কতগুলো বিষয় আমাকে অবাক করলো বেশ। সাংবাদিক হিসেবে নাম যশ কুড়োতে চান, এমন বেশ কিছু জার্মান প্রবাসী বাঙ্গালী আমাদেরকে ফোন করে, আমরা যতটুকো জানি- তা জেনে আরো ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রকাশ করলেন বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোতে পরদিন। মিউনিক খেকে 60 কিলোমিটার দুরে থাকেন, এমনি এক প্রবাসী নিজেকে মিউনিকের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দিয়ে পরদিন সাক্ষাৎকার দিলে ডয়েচেভেলেতে। বার্লিন প্রবাসী দাউদ হায়দার জনকন্ঠে লিখলেন, বিভিন্ন জার্মান শহর থেকে প্রবাসীরা এসে ভীড় জমিয়েছেন মিউনিকে হুমায়ুন আজাদকে একনজর দেখার জন্যে। গ্যোটিঙেন থেকে একজন ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে লিখলেন আজকের কাগজে।

কোন বাংলাদেশীই মিউনিকে আসেনি। কোন কোন বাঙালী বালিনে বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে গিয়ে প্রতিবাদ করবেন বলেও বাড়ী থেকেই বের হননি। এমনকি মিউনিকের বাংলাদেশীদের প্রতিক্রিয়াতেও আমি ব্যাথিত হয়েছি বেশ। তাদের ভেতর কোন আগ্রহ বা কষ্টবোধ দেখিনি এমন একজন কৃতি ও মুল্যবান মানুষের অকস্মাত মৃত্যুতে। তাদের কাছে ঘটনাটি বাংলাদেশে ছোটখাট এক বন্যা বা অষ্ট্রেলিয়ার কাছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের পরাজয়ের মতোই একটি স্বাভাবিক খবর। এর মাঝে রুমানার সাক্ষাৎকার বিকৃত করে ছাপা হলো ইনকেলাবে পরদিন। ও তার প্রতিবাদও লিখলো। আমি রিপোর্ট লিখলাম সংবাদে।

পরদিন পুলিশে ফোন করে জানলাম কোন মর্গে রাখা হয়েছে তার মরদেহ। আমরা দু'জনেই সেখানে গিয়ে দেখার অনুমতি চেয়ে ব্যার্থ হলাম। পরে বিফলমনোরথ হয়ে সেই মর্গেরই আশে পাশে ঘোরাঘুরি করলাম বিরসমুখে আমরা দ'জন। মর্গেরই কিছু ছবি তুলে পাঠালাম বাংলাদেশের সংবাদপত্রে। ছাপাও হলো সেগুলো।

এমন একটি দুঃখজনক ঘটনার মাঝেও একটা বিষয় নিয়ে রুমানা ও আমি গর্বিত। সঙ্গত কারনেই হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর স্বাভাবিকতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ বিরাজ করছিল। একজন মানুষ সুস্থ অবস্থায় ঘুমোতে গেলেন, পরদিনই মৃত। সন্দেহ আসাটাই স্বাভাবিক। অনেকের চেষ্টাও ছিল তেমন কিছু প্রমান করার। তা যদি সম্ভব হতো, তাহলে আরেকটা আন্দোলন, অরাজকতা ও হরতালের শিকার হতো হরতাল বিদ্ধস্ত বাংলাদেশ। আমরা সাবধানী ছিলাম ও প্রাণপনে চেষ্টা করেছি সত্যনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সংবাদ প্রকাশের। সেখানে আমাদের সাফল্য ছিল পুরোপুরি।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের খারাপ দিনের পর

লিখেছেন সামিয়া, ০৫ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৪




আমার মাথা যেন আর কাজ করছিল না। বাইরে থেকে আমি স্বাভাবিক হাঁটছি, চলছি, পড়ছি, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছি কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলাম মায়ের কথা ছোট বোনটার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কিংকর্তব্যবিমূঢ়

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৫ ই মে, ২০২৬ রাত ৯:৩৩


দীর্ঘদিন আগে আমার ব্যক্তিগত ব্লগ সাইটের কোন এক পোস্টে ঘটা করে জানান দিয়ে ফেইসবুক থেকে বিদায় নিয়েছিলাম। কারণ ছিলো খুব সাধারন বিষয়, সময় অপচয়। স্ক্রল করে করে মানুষের আদ্য-পান্ত জেনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গেরুয়া মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গ: একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও শিক্ষা।

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৫ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:৩৮


দীর্ঘ ১৫ বছরের টিএমসির শাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। গেরুয়া শিবিরের এই ভূমিধস জয়ের পেছনে অবশ্য মোদি ম্যাজিকের চেয়ে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতার ব্যর্থতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা: ইতিহাসের প্রতি অবমাননা।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ০৫ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:৪৩

বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা: ইতিহাসের প্রতি অবমাননা।
=======================================
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যাঁরা অমর হয়ে আছেন, তাঁদের অন্যতম হলেন তোফায়েল আহমেদ। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে মহান... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিজের দোষ দেখা যায় না, পরের দোষ গুনে সারা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই মে, ২০২৬ রাত ২:১০


ভারতের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পতন নিয়ে বাংলাদেশে যে পরিমাণ চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে, তা দেখে অবাক না হয়ে উপায় নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই দেখা যায় অদ্ভুত সব তত্ত্ব। ফেইসবুক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×