কিন্তু তারপরেও জাতিসংঘে একটি সার্বক্ষনিক অচলাবস্থা বিরাজমান। নিরাপত্তা পরিয়দে দুই জোটের অনঢ় ও নীতিবোধ বিবর্জিত অবস্থান কার্যকরী কোন পদেেপর সহায়ক ছিলনা। এই অচলাবস্থায় নতুন কোন বিশ্বযুদ্ধের শুরু না হলেও একটি যুদ্ধপরিস্থিতি সবময়েই বিরাজমান ছিল। পরিনামে শুরু হয় বিরামহীন অস্ত্রপ্রতিযোগিতা। এতে আরেকটি যুদ্ধের সম্ভাবনা ও আনবিক অস্ত্রের ভীতি জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বিশ্বরাজনীতির নিয়ন্ত্রণ গ্রহন করে।
আশি শতাব্দীর মাঝামাঝি আরেকটি বড় ধরণের পরিবর্তন ঘটে পৃথিবীর রাজনৈতিক ধারায়। পশ্চিমা জোটের বানিজ্যিক প্রসার, বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর একত্রীকরণ তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে আরো বেশী শক্তিশালী করে তোলে। এর উত্তর দেয়ার মতো কোন ক্ষমতাই পুর্ব জোটের ছিলনা। বরং সে দেশগুলোতে এক ধরণের অর্থনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। এই অর্থনৈতিক মন্দা, সাধারন মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রন অধিকারের উপর ত্রমবর্ধমান আঘাত ও কম্যুনিষ্ট ও সোসালিষ্ট ক্ষমতাচক্রের সেচ্ছাচারিতা এই দেশগুলোর অধিবাসীদের ক্রমশ:ই বিদ্রোহী করে তোলে। এই প্রতিযোগিতায় তারাই যে বিজিত, তা সময়মতো অনুধাবন করেন পুর্ব জোটেরই একজন ক্ষমতাশীন রাজনীতিবিদ। সুতরাং এই অসম প্রতিযোগিতার সমাপ্তি টেনে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে নতুনভাবে সাজানোর পদক্ষপে নিলেন। সোভিয়েট ইউনিয়নের মিশাইল গর্বাচভ তার পেরিষ্ট্রোয়িকার দের সঙ্গী করে শান্তি ও মানবিকতার সপক্ষে অবস্থান নিয়ে 1990 সালে পুর্ব জোটের অবসান ঘটালেন । 'শান্তিপূর্ন পৃথিবীর' যে সপ্ন একদিন বিরাজমান, তার কাছাকাছি আসার এক অভুতপুর্ব সুযোগ তৈরী হলো।
কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো বিশ্বশান্তির এই অভূতপুর্ব সুযোগকে কাজে লাগাতে সচেষ্ট না হয়ে নিজেদের জয় ও আত্মপ্রচারে ব্যাস্ত হয়ে উঠলো। যদিও নতুন পৃথিবী ও শান্তির স্বপক্ষে বুলি আওড়ানো হলো বারবার, সবার আগে রইলো তাদের সেচ্ছাচারী, আগ্রাসী ও উন্নাসিক দৃষ্টিভঙ্গী। একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে অবশিষ্ট রইলো আমেরিকা। তাদের সে মতা নিয়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার সে সুযোগ তাদের হাতে আসল, তারা তার অপব্যাবহার করে তাদের নিজস্ব প্রতাপ প্রতিষ্ঠাতেই ব্যাস্ত হয়ে উঠলো। নিজেদেরকে একধরণের সেচ্ছাচারী 'বিশ্বপুলিশ' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলো তারা। শুধুমাত্রই আমেরিকানদের স্বার্থরক্ষা এই বিশ্বপুলিশের একমাত্র দ্বায়িত্ব। জুনিয়ার বুশের একটি বাক্যেই তাদের বক্তব্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। " যারা আমাদের মতের অনুসারী নয়, তারাই আমাদের শত্রুপক্ষ।" নতুন শত্রুপক্ষ তৈরী হলো এভাবেই। ইরাক ও পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মগোষ্ঠি মুষলমানদেরকে তারা তাদের প্রধান শত্রুপক্ষ হিসেবে দাঁড় করালো। এর প্রতিবাদী শক্তি হিসেবে সারা পৃখিবীব্যাপী ধর্মীয় মৌলবাদ ও সন্ত্রাস। সে সব প্রতিরোধ এখন অবধি শান্তিপুর্ন, সেগুলোও একসময় সন্ত্রাস, অপরাধ ও অবশেষে পৃথিবীব্যাপী রক্তয়ী যুদ্ধে পরিনত হতে পারে।
সন্ত্রাস বিরোধী আখ্যা দিয়ে যুদ্ধকে শান্তির সপক্ষে যুদ্ধ হিসেবে সাজানো হয়েছে। নিজেদের প্রতিরক্ষা হিসেবে আমেরিকানরা যে কারণ দেখায়, তা তাদের অর্থনৈতিক আগ্রাসনেরই ফসল। যেহেতু তাদের সবগুলো যুদ্ধই তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, যুদ্ধবন্দীদের সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণ যুদ্ধবন্দী হিসেবে তাদের যে অধিকার তাদের প্রাপ্য, তারা তা পায়না। লোকচুর আড়ালে ভয়াবহ নির্যাতন ও মানবিক অপমানের শিকার হয় তারা। এখানে আরও উল্লেখযোগ্য যে, যেহেতু এই যুদ্ধ সস্ত্রাসবিরোধী মুখোসের অন্তরালে চলছে, সাধারণ মানুষের সাধারণ আত্মনিয়ন্ত্রণঅধিকারও হৃাস পাচ্ছে প্রতিদিনই।
পরিসংখ্যাবিদদের মতে ধনী দেশগুলোর শোষনের প্রভাবে প্রতিদিন গড়ে এক লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছেন। 2500 মিলিয়ন দরিদ্রের সম্পদ প্রথম 340 জন ধনীর হাতে। এই দরিদ্রদের নেই পান করার পর্যাপ্ত পানীয় জল, প্রতদিনের আহার ও শিক্ষার কোন ব্যাবস্থা। এবং এই দরিদ্রদের মাঝে সে অংশটি প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে, যারা জনে, তাদের এই দুরবস্থায় কাদের সবচেয়ে বেশী অবদান। একসময় তারা যখন তার উত্তর দিতেও সচেষ্ট হবে, তখন হয়তো আরেকটি নতুন পৃথিবীর মুখোমুখি হবো আমরা।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




