পৃথিবীর অনেক দেশ ঘুরেছি। কিন্তু কোথাও কাজের লোক বা অধস্তনের সাথে এত দুর্ব্যাবহার করতে দেখিনি কাউকে যেমন আমাদের দেশে ও উপমহাদেশে করা হয়। আমার এক দেশী বন্ধু তার মরক্কোর বউকে নিয়ে গিয়েছিল দেশে। কাজের মেয়ের এ অবস্থা দেখে মরক্কোর এই মহিলা বড় একটা ধাক্কা খেয়েছেন। বলেছেন, " তোমাদের কাজের বাচ্চা মেয়েটা যে কামিজ পড়ে থাকে, তা কখনো শুকোতে দেখিনি। সবসময় ধোওয়াধুয়ির কাজে ভিজে থাকে। আর সবাই তাকে ধমক দিয়ে কথা বলে, এমনকি ভাইয়ের ছোট্ট ছেলেটাও।" বলাবাহুল্য মরক্কো কোন ধনী দেশ নয়। তারপরেও সে দেশে শ্রেনীবৈষম্যের এতোটা কুপ্রভাব নেই যা আমাদের দেশে দেখা যায় প্রতিনিয়ত। ইউরোপে কাজের লোকের সাথে এক টেবিলেই বসে খাওয়াদাওয়া হয়। তাদেরকে আপনি করে বলা হয়। মানুষ হিসেবে সন্মান করা হয়। কোন পাঠক কি আমাদের দেশে এটা কল্পনা করতে পারেন ?
আমাদের দেশে তাদেরকে সারাদিন একমুহুর্তও বিশ্রাম দেয়া হয়না। প্রত্যেকটি কথার সাথে ধমক তাদের প্রাপ্য। বাসী, পঁচা, নিকৃষ্টতম খাবার দেয়া হয় তাদের। তাদের খাবার জায়গা হচ্ছে রান্নাঘরের নোংরা মেঝে। অনেকসময় তা তাদের ঘুমোনেরও জায়গা। মোদ্দাকথা এই যে, একটি মানুষ হিসেবে যতোটা সন্মান তাদের প্রাপ্য, আর যৎসামান্য অংশও তাদের ভাগ্যে জোটে না। কিন্তু এমন অবস্থার কারন কি? ধর্ম আমাদেরকে সাম্যবাদের শিক্ষা দিয়েছে। আমরা তার কতটুকু পালন করি ? করতে পারি না কেন ? কারন আমি বলবো আমাদের ভেতরে মনুষ্যত্ব নেই। অধস্তনের প্রতি মনুষত্বহীনতা আমাদের জাতীয় চরিত্রের অংশ। একটা অল্পবয়স্ক ছেলে একজন রিক্সাচালককে তুই করে বলতে দ্বিধা করে না। একজন মুটে, যিনি সকাল থেকে রাত অবধি অকান্ত পরিশ্রমে সংসার চালান, তাকে আমরা মানুষ মনে করি না। আমরা আমাদের সুবিধার জন্যে তাদেরকে একটা শ্রেনীতে ফেলেছি। সেখানেই তাদের ও তাদের সন্তানসন্ততিদের সাবর্ক্ষনিক স্থান। এ অবস্থা থেকে কোন মুক্তি তাদের নেই, আমরা তা হতেও দেব না। আমরা আমাদের ধর্ম, জাতি নিয়ে বড় বড় কথা বলে যাব, কিন্তু যে প্রশ্ন মনুষ্যত্বের কথা বলে, তার মুখোমুখি হবার সাহস আমাদের নেই।
ধর্ম মানুয়ের জন্যে, পশুর জন্যে নয়। যার ভেতরে মনুষ্যত্ব নেই, সে কি মানুষ, আমরা কি মানুষ ? অমানুয়ের কি কোন ধর্মের অধিকার আছে, মুসলিম, হিন্দু , বৌদ্ধ বা খ্রীষ্টান। তার কি কোন জাতিগত স্থান রয়েছে ? আমার মতে নেই। যাদের আছে,তারা পালন করেন তাদের ধর্ম সমাজ ও প্রতিপত্তির কারনে, তাদের আত্মার উৎকর্ষতার জন্যে নয়। যাদের ভেতরে মনুষ্যত্ব অনুপস্থিত, ধর্মে তাদের উপস্থিতি কোন যুক্তিতে সিদ্ধ ?
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




