বেশীরভাগ লোকই তাদের গন্তব্যস্থলে যত দ্রুত সম্ভব পৌঁছাতে চায়। সেজন্যে আওটোবান (হাইওয়ে) রয়েছে। আমি তা করি না। চাই, আমার যাত্রাপথটিও যাতে মুল ভ্রমনের একটি সুন্দর অংশ হয়ের উঠুক। তাই ছোট ছোট রাস্তা খুজে নিই। সময় বেশী লেগে যায়, কিন্তু আমি তার তোয়ক্কা করি না। সাধারনত: সঙ্গী বা সঙ্গীনির সাথে এ নিয়ে দ্বিমত থাকলে বাদানুবাদ হয়। আমার সে সমস্যা নেই। আমি আর আমার স্ত্রী প্রায় একই রূচির মানুষ। সুবিধার জন্যে একটা নেভিগেশান কিনে নিয়েছি। মহিলা কন্ঠস্বরে নেভিগেশান কথা বলে। দু'জনে মিলে তাই নাম দিয়েছি নাতালি। নাতালিকে বলি হাইওয়ে না নিতে। ও তা বিনা দ্বিধায় মেনে নেয়। মাঝে মাঝে মুল রাস্তা ছেড়ে পাহাড়ের ভেতরে ঢুকে পড়ি। নাতালির উপর ভরসা আছে, দরকারে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসে মুল পথে।
বহুবার ইটালী গিয়েছি। বিভিন্ন শহরে ঘুরেছি। হাইওয়ে ধরে বেশ দ্রুতই পৌছে যাওয়া যায়। আমি কোখেল লেক, ওয়ালখেন লেক মিটেনওয়াল্ড, ইন্সব্রুক(অষ্ট্রিয়া) হয়ে যেতেই পছন্দ করি। এটা আমার সবচে' প্রিয় পথ। ইন্সব্রুক এর পর অনেক সময় হাইওয়ে নিয়ে নিই। তারপর ব্রেনারপাস হয়ে ইটালী।
কেখেল লেক থেকে ওয়ালখেন লেকে যাবার সময় একটা খুব অাঁকবাকা পাহাড়ী পথ পড়ে। ভয়ঙ্কর সে পথ। বেশ উপর ওঠার পর উপর থেকে কোখেল লেক দেখা যায়। উপর থেকে দেখার যে সৌন্দর্য, তা বর্ননার বাইরে। পাহাড়ের অন্যপাশে নামলেই ওয়ালখেন লেক। দুটো লেক, কোখেল ও ওয়ালখেনের উচ্চতার বেশ পার্থক্য রয়েছে। ওয়ালখেন লেক অনেকটা উচুতে। এই পার্থক্যটা জলবিদ্যুত তৈরীর কাজে ব্যবহার করা হয়। ওয়ালখেন লেকের পাড়ে একটা পাহাড় রয়েছে, নাম হেরছগস্ট্যান্ড। তার প্রায় দু'হাজার মিটার উচু চুড়ায় উঠলে দুটো লেকই দুপাশে দেখা যায়। উচ্চতার পার্থক্য বেশ চোখে পড়ে। কেবলকারে ষোলশো মিটার ওঠার পর বাকী চারশ মিটার হেটে উঠতে হয়। এই হাটাপথে লোকজনকে নীচ থেকে হেটে উঠতে দেখলে মরুতীর্থ হিংলাজ ছবিটির কথা মনে পড়ে যায়। কয়েকবার উঠেছি। নামার সময় নীচের ষোলশো মিটারও হেটে নামা যায়। বেশ ভাল লাগে পাহাড়ী নীরবতায় যানবাহনের শব্দদুষনের বাইরে প্রাকৃতিক নীরবতার মাঝে নিজেকে খুজে পেতে।
কোন এক শীতের বরফের সময় আমার এক ভারতীয় আসামের এক বন্ধুকে নিয়ে ওই এলাকাতেই বেড়াতে বেরিয়েছিলাম। বন্ধুটি ভারতের একজন নামকরা বাঁশীবাদক। হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়ার ছাত্র। জার্মানীতে প্রোগ্রাম করার জন্যে এসেছিল। আমরা বরফ ডিঙ্গিয়ে পাহাড়ের বিভিন্ন কোনায় কোনায় ঘুরে বেড়ালাম। দীপক প্রতিবারই বাঁশীতে পাহাড়ী (পাহাড়ী নামের একটা রাগও রয়েছে) সুর তুলল। সুরের মুচ্র্ছনায় তন্ময় আমরা দুজনেই। দিনটি ছিল আমার জীবনের সেরা দিনগুলোর মাঝে অন্যতম।
ওয়ালখেন লেকের চারপাশেই উঁচু পাহাড়। পানি সামারেও বেশ ঠান্ডা থাকে। চারপাশই রাস্তা রয়েছে সাপের মতো আকানো বাকানো। কোন কোন যায়গায় শুধুমাত্র হাঁটার পথ। পাড়ে পাড়ে হেটেই সারাদিন পার করে দেয়া যায়। অনেকগুলো কফিশপ আছে। লেকের উপরে কাঠের গুড়ির উপর ভর করে একটা কফিশপ আমার সবচে' প্রিয়। ওখানে বসে একটা কফি না হলে আমার পুরো দিনটাই বৃথা। একবার বন্ধ ছিল কফিশপটা কোন কারণে। মন খারাপ হয়েছিল খুব। সেইলিং করা যায়। শিখে নিয়েছিলাম কোন এক সামারে। কোন কোন বার সারাদিন তাই করে কাটিয়ে দিই। তবে পকেটের কথা ভেবে অনেকসময় চারপাশ বেড়িয়েই কাটিয়ে দিই সময়।
ওয়ালখেন লেক পেরিয়ে মিটেনওয়াল্ড হয়ে অষ্ট্রিায়ার ইন্সব্রুক যাবার রাস্তাটি আমার দেখা সেরা পথের একটি। এ নিয়ে সময় করে পরে লিখব।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



