ফ্যাশনে আমাদের দেশে পোশাকের ইতিহাস খুব বেশি দীর্ঘদিনের নয়। আমাদের দেশে মানুষের মনের সৌন্দর্যপ্রিয়তা যদিও যা অনেক আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে তারপরও আমাদের দেশে-এর প্রাতিষ্ঠানিক অবয়ব পেতে সময় লেগেছে দীর্ঘদিন। ফ্যাশন তার একটি চিরায়ত রূপ নিয়ে এদেশে বিরাজ করছিল। কিনত্দু সেেেত্র কখনো কোনো কারণ বা ব্যাখ্যা খুব একটা প্রয়োজন হয়ে ওঠেনি। কিংবা কোনো ডিজাইনারের ভূমিকা গত তিন দশক ধরে যতটা আলোচিত হচ্ছে তার পূর্ব পর্যনত্দ তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাই আমাদের দেশে ফ্যাশন চর্চাটা খুব বেশি দৃষ্টি সম্পন্ন দিকে এগিয়ে যেতে পারেনি। ফ্যাশনের চর্চার েেত্র আমাদের দেশে যেটি হয়েছে সেটি হচ্ছে বাইরের বিশ্বের চলতি স্টাইলের সঙ্গে আমরা মানানসই কিংবা তাল মিলিয়ে চলার প্রবণতা দেখিয়েছি। আমাদের দেশে ঈদের সময় ব্যবসায়ীরা যে বাজার তৈরি করেছেন সে বাজারের সঙ্গেই ক্রেতাগণ মিশে গেছেন। এতে ক্রেতার কোন স্পেশাল চাহিদা বা রুচির কোন আলাদা বর্হিপ্রকাশ ঘটানোর চেষ্টা খুব বেশি দেখা যায়নি। আশির দশকে ঈদ বা উৎসবকে কেন্দ্র করে যে ফ্যাশনের ভূমিকা থাকতো তা ছিল অনেক বেশি গার্মেন্টস শিল্প নির্ভর। অর্থাৎ দেখা যেত যে পশ্চিমা পোশাকের আদলে তৈরি পোশাকের প্রতি আমাদের চাহিদা অনেক বেশি। 80'র দশকের শেষ দিকে এসে এবং নব্বই দশকের শুরুর দিকে আমাদের দেশে উৎসব ভিত্তিক ফ্যাশন চর্চায় বুটিকের ভূমিকা আসত্দে আসত্দে বেড়ে যাচ্ছিল। মূলত এই সময় থেকেই আমাদের দেশে ডিজাইনারদের গুরুত্ব বাড়তে থাকে এবং ডিজাইনাররা ফ্যাশন চর্চায় ক্রেতাদের একটি নির্দিষ্ট স্টাইল বা দেশীয় ফ্যাশনের দিকে আগ্রহী করে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। আমাদের দেশের ডিজাইনাররা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট মোটিভ বা এক ধরনের কাপড়ের ওপর কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এবং ক্রেতাদেরকেও সেই ধরনের কাজ কিনতে উৎসাহিত করেন। বেশির ভাগ েেত্রই আমাদের দেশে ডিজাইনারদের কাটিং বা ট্রেন্ড সম্পর্কে খুব বেশি সচেতন হতে দেখা যায় না। আসত্দে আসত্দে যদিও এ অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। কেননা ক্রেতারা এখন আগের তুলনায় সচেতন হয়ে উঠছেন এবং ফ্যাশন চর্চার েেত্র ক্রেতার এ সচেতন হয়ে ওঠা নতুন নতুন কাটিং-এর সূচনা করছে। অভিজ্ঞ ডিজাইনাররাও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গবেষণাধর্মী। দেখা গেছে যে ডিজাইনারদের মধ্যে বেশির ভাগেরই প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিা না থাকলেও অভিজ্ঞতা এবং পারিপাশ্বর্িক অবস্থা থেকে তারা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। যার ফলাফল হিসেবে তারা আমাদের ফ্যাশন চর্চাকে একটা দীর্ঘমাত্রার অবস্থানে পেঁৗছে দিতে পেরেছেন। ফ্যাশন চর্চার এই বহুমাত্রিক প্রোপটের কারণে নতুন নতুন ডিজাইনার সৃষ্টি হওয়ার সময় এসে গেছে। এখন নবীন ডিজাইনারদের আগ্রহও বাড়ছে। মানুষের এ পেশার প্রতি বিশ্বসত্দতা এসেছে অনেক বেশি। তাই যারা নতুন ডিজাইনার হতে চান তাদের জন্য এ বিষয়গুলো ল্য করা বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতে যেভাবে ডিজাইনার তৈরি হয়েছে বিশ্বের চলমান প্রোপটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে বাংলাদেশেও সে অবস্থাটা বদলে দিতে হবে। অর্থাৎ এখন আর শুধু অভিজ্ঞতার বদৌলতে ডিজাইনার হওয়া যাবে না। বরং অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে এখন দরকার কিছু প্রাতিষ্ঠানিক শিা এবং নতুন নতুন দৃষ্টিভঙ্গী। তাই যেকোন নবীন ডিজাইনারের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হয়ে দাঁড়াবে নতুন দৃষ্টিভঙ্গীর প্রকাশ। নিজেকে এ নতুন রূপে প্রকাশ করতে হলে যেটি খুব বেশি পরিমাণে জরুরী সেটি হচ্ছে হাতে কলমে চর্চা। চেষ্টা করতে হবে নিজের সুযোগ-সুবিধা এবং নিজের পারিপাশ্বর্িক অবস্থাকে ব্যবহার করে নিজের যে চিনত্দাভাবনা তা ফ্যাশন ডিজাইনে ব্যাপ্ত করে তার চর্চা করা। অর্থাৎ নিজের পোশাক আশাক থেকে শুরু করে আশেপাশের অন্যান্যদের পোশাক আশাকও এখন থেকে নবীন পর্যায়ে ডিজাইন করে একটি নতুন রূপ দেয়ার চেষ্টা করতে হবে। মনে রাখতে হবে আগের আমলের ডিজাইনাররা যে ধরনের উপকরণ বা যে বিষয়গুলির ওপর জোর দিয়ে ডিজাইন করে গেছেন বর্তমান সময়ে তার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য দেশে ফ্যাশনের যে ধারাগুলি প্রচলিত আছে সেগুলি খুব তীর্যকভাবে অনুসরণ করতে হবে। এই হাতে কলমে চর্চার একটি বড় উদাহরণ হয়ে থাকতে পারে বুটিকগুলোর ফ্যাশনে ভূমিকা। সাধারণত আমাদের দেশে বুটিকগুলোতে ডিজাইনরা, সমাদৃত হন সবচেয়ে বেশি। সুতরাং বুটিকগুলোর বিভিন্ন কাজকর্মে দেখা যায় যে ডিজাইনের সঠিক প্রতিফলন ঘটে। তাই আপনি যদি খুব বেশি হাতে কলমে চর্চারপ্ত করতে চান তাহলে বিভিন্ন বুটিকগুলোর শো-রুমে গিয়ে মাঝে মাঝেই খেয়াল করে দেখতে পারেন যে তারা ফ্যাশন ট্রেন্ড বা ফ্যাশনের চিনত্দাধারাকে ঠিক কোন্ দিকে, কোন্ বিন্যাসে এবং কোন্ ধরনের মাধ্যমে ব্যবহার করছেন। এ থেকে হয়তো আপনি একটি অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারেন। যা পরবর্তীতে আপনি আপনার চিনত্দায় কিংবা আপনার ফ্যাশন ভাবনায় ব্যবহার করতে পারেন। এই বিশেষ ব্যবহারের েেত্র আপনাকে সতর্ক হতে হবে যেন আপনি ঐ নির্দিষ্ট বুটিক বা ঐ ডিজাইনারের ফ্যাশন চিনত্দা দ্বারা আপ্লুত হন, কিনত্দু অনুকরণের জন্য অনুপ্রেরণা না পান। প্রত্যেক ডিজাইনারেরই একটি নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী থাকা উচিত এবং যে কোন ধরনের বিষয় উপস্থাপন করতে চায় সে বিষয়ে একটা সম্যক ধারণা থাকা উচিত এবং একই সঙ্গে তার পারিপাশ্বর্িক অবস্থা এবং সংস্কৃতির অবস্থান সম্পর্কে একটি বিশেষ চেস্টা থাকা উচিত যেন সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হয়। বর্তমান সময়ে ফ্যাশনেবল পোশাকের পাশাপাশি ফ্যাশন ডিজাইনারদের চাহিদাও বাড়ছে। তাই ফ্যাশন ডিজাইনিংকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিতে আগ্রহী মানুষের সংখ্যাও ক্রমে বাড়ছে। আর এদের কথা চিনত্দা করেই বিনোদনের এবারের আয়োজনে তুলে ধরা হলো ফ্যাশন ডিজাইনার হয়ে উঠবার বিভিন্ন দিকের কথা। একজন ফ্যাশন ডিজাইনারের প্রফেশনাল ডিজাইনিং কোর্সের পাশাপাশি অনত্দত গ্র্যাজুয়েট হওয়া প্রয়োজন। তবে ইতিহাস, শিল্প-সংস্কৃতি, স্থাপত্য, পুরাকীর্তি এবং দেশীয় ও বিদেশী ঐতিহ্য সম্পর্কে বিশেষ পড়াশোনা এবং জ্ঞান থাকা বাঞ্ছনীয়। আর ডিজাইনিং কোর্সে যোগদানের যোগ্যতা হিসেবে কমপ েউচ্চ মাধ্যমিক পাশ হওয়া প্রয়োজনীয় যেহেতু কোর্সে অনত্দর্গত প্রতিটি বিষয় ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানো হয় এবং বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত প্রায় সব বই ইংরেজিতে প্রকাশিত কাজেই ইংরেজি ভাষায় দ হলে সবকিছু বুঝতে ও উপলব্ধি করতে সুবিধা হয়। রং এর উপর প্রাথমিক ধারণার পাশাপাশি অাঁকাঅাঁকি ও ডিজাইনিং এর ধারণা থাকা প্রয়োজন। সর্বোপরি ধৈর্য্য ও আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে এবং এসবের পাশাপাশি তাকে সাবলিল হতে হবে, হতে হবে স্মার্ট ও রুচিশীল। ফ্যাশন ডিজাইনিং এ ড্রয়িং খুবই প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। মনের ভেতরকার সৃষ্টিশীল চিনত্দাকে বাসত্দবে রূপদানের প্রথম ও প্রধান মাধ্যমই হচ্ছে ড্রয়িং। যার ড্রয়িং যত নিখুঁত ও সঠিক হবে তার েেত্র পরবর্তী ধাপ অর্থাৎ ডেভলপমেন্ট, টেলারিং ইত্যাদি তত সহজ ও দ্রুত হবে। তাছাড়া যার ড্রয়িং উপস্থাপন যত সুন্দর হয় তার জন্য চিনত্দা ও বিষয়ের পরিস্কার ও সহজ ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়। সৃষ্টিশীল ও সৃজনশীলতার পাশাপাশি ধৈর্য্য ও অধ্যাবসায়ের প্রয়োজন। বেসিক ফ্যাশন ডিজাইন বলতে পোশাকের প্রাথমিক অবস্থা ও রূপ এবং আকার ও ব্যবহারের উপর জোর দেয়া হয়। শ্রেণী ও প্রকার ভেদে তাদের আকার, আয়তন ও রং এর ব্যবহার, প্রয়োগ এবং সর্বোপরি প্রাথমিক অবস্থা থেকে পরিবর্তন ও সময় উপযোগী পরিবেশনের উপর বিশেষভাবে জোর দেয়া হয়। ফ্যাশন ডিজাইনিং-এ প্রাতিষ্ঠানিক শিার বিভিন্ন পর্যায়ের প্রথম ধাপ হচ্ছে রং ও এর প্রকৃতি। প্রকার, প্রয়োগ সম্পর্কে জ্ঞান লাভের পাশাপাশি এতে থাকে রং এর সমন্বয় ডমবঠধভর্টধমভ ও তুলনামূলক সহাবস্থান সম্পর্কে বাসত্দব ধারণা এবং সময় ও ঋতু ভেদে তাদের ব্যবহারিক প্রয়োগ। এর পরবর্তি ধাপ হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের পোষাকের প্রাথমিক রূপ (পোষাকের প্রকার ভেদ) এবং তার সাথে সংযুক্ত বিভিন্ন অংশের (কলার, িভ, পকেট, কাফ) আকার-প্রকার এবং তাদের ব্যবহার ও প্রয়োগের পাশাপাশি তাদের ডেভলপমেন্ট। তাছাড়া অাঁকাঅাঁকি ও ডিজাইনিং বিষয়টি তো থাকেই। যেখানে পোষাকের নতুন নতুন ডিজাইন ড্রয়িং ও প্রেজেন্টেশনের পাশাপাশি নতুন নতুন ধারণা ও বিষয়ের ওপর ভিত্তি করেও পোষাক ডিজাইন করা হয় ও তার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। তারপর টেঙ্টাইল অর্থাৎ তুলা, সুতা, কাপড় তাদের বৈশিষ্ট্য ও প্রকার ভেদ, বৈশিষ্ট্য ভেদে তাদের চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়া, কাপড়ে ব্যবহৃত রং ও তাদের বৈশিষ্ট্য, কাপড়ের উপর নকশা ও তাদের প্রকারভেদ সম্পর্কে জানানো হয়। প্যাটার্ন মেকিং ও টেইলারিং এ থাকে কাপড় পরিমাপ মত কেটে পোষাক তৈরি ও তার সাথে যুক্ত বিভিন্ন পর্যায়, প্যাটার্ন তৈরি অর্থাৎ মাপ মতো পোষাকের অনুরূপ কাগজের তৈরি প্রতিকৃতি। যা পরবর্তীতে একাধিকবার ব্যবহার করা যায়। পোষাকে ব্যবহৃত অলংকরণ অর্থাৎ বোতাম, হুক, জিপার ইত্যাদির বৈশিষ্ট্য প্রয়োগ সম্পর্কে ব্যবহারিক জ্ঞান। এছাড়া এখানে ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প সংস্কৃতির পাশাপাশি পোষাকের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে বিসত্দারিত আলোচনা করা হয়। পোষাকের 'ইতিহাস ও ঐতিহ্য' নামের এ বিষয়ে দেশীয় ঐতিহ্য ও শিল্পের ইতিহাস গবেষণা এবং পোষাকে তার প্রতিফলন ঘটানো এবং সামাজিক অবস্থা, শ্রেণীবিন্যাস ও শ্রেণীভেদে পোষাকের প্রকার ভেদ ইত্যাদি সম্পর্কেও বিসত্দারিত আলোচনা করা হয়। সর্বশেষ ও প্রয়োজনীয় বিষয়টি হচ্ছে পোষাকের বিপনন অর্থাৎ কি করে তৈরি নতুন পোষাক বা ডিজাইন বিপনন ও বাজারজাত করণের মাধ্যমে ক্রেতার হাতে পেঁৗছে দেয়া যায় সে সম্পর্কে বিসত্দারিত আলোচনা করা হয়। এ বিষয়ের আরও একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হচ্ছে পোষাকের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ও সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনা। সবশেষে বলতে হয় একজন ফ্যাশন ডিজাইনার অবশ্যই দেশীয় পোষাকের ডিজাইনিং এর সময় ফ্যাশনের চলতি ধারার সাথে তাল মিলিয়ে কাজ করে থাকেন। আমাদের দেশে ডিজাইনারদের অবশ্যই উচিত নিজস্ব শিল্প সংস্কৃতির সাথে তাল মিলিয়ে দেশীয় ঐতিহ্যের প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন ধারা চালু করা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল ফ্যাশন ধারার সাথে সংগতি রেখে নিজস্ব ঐতিহ্যকে বিদেশী পোষাকের সাথে সংমিশ্রণ ঘটিয়ে বহির্বিশ্বের সামনে তুলে ধরা। তাহলেই ডিজাইনার হিসেবে বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা সম্ভব। ভিন্ন দেশের ঐতিহ্যে প্রভাবিত না হয়ে স্বকীয়তা বজায় রেখে সামনে এগিয়ে যাবার েেত্র একজন প্রশিতি ফ্যাশন ডিজাইনারই বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




