somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমি কানাডা থেকে নায়লা বলছি

১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ সকাল ১০:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজ আমার একান্ত ব্যাক্তিগত না বলা কিছু কথা আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।

একটা সময় এমনটা কিন্তু ছিলোনা। একটু ফ্ল্যাশ ব্যাকে যদি যাই, তবে শুরু করতে হয় ২০১২ সালের মাঝামাঝি থেকে। তখন আমি কাজ করি ঢাকা'র এক এন.জি.ও-তে। সেই প্রতিষ্ঠানের যিনি বিগ বস্, তাঁর নাম আফরোজা সুলতানা (তাঁর সম্মানার্থে তাঁর আসল নাম উল্লেখ করলামনা)। নামী-দামী ব্যাক্তি। তাঁরা বড় মানুষ, তাই আমার মতো নিচু পদে কাজকরা মানুষ-জন তাঁদের দেখা কমই পেতো। তার ওপরে শুনলাম, তিনি নাকি আমেরিকায় পি.এইচ,ডি করছেন। আর তাঁর দুই ছেলে সেখানেই চাচার কাছে সেটেলড্। আফরোজা আপার হাজব্যাণ্ড বাংলাদেশের সরকারী বড় কর্মকর্তা। তিনি সচিব।

আমার জীবনযাত্রা ছিল বরাবরের মতোই অতি সাধারণ। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে আমি। বাসায় মা ছাড়াও আমার বছর তিনেকের ছোট এক ভাই আছে। বাবা মারা গিয়েছেন আমাদের দু'ভাই-বোনকে অনেক ছোট রেখে। বাবাহীন জীবনে আমরা আসলেই বানের জলের মতো ভেসে যেতাম যদিনা আমাদের দু:সম্পর্কের এক মামা আমাদের পরিবারটিকে তাঁর বাসায় আশ্রয় দিতেন। পৃথিবী নামক গ্রহটি যে কঠিন একটি স্থান, সেটি সেই ছোটবেলা থেকেই আমি বুঝতে শিখেছি। মানুষ চিনতে শিখেছি। কিন্তু আমার অনুজ ভাইটি বোঝিনি। তাই সে বাংলাদেশের কলুষিত ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে জেল পর্যন্ত খাটলো।

অনেক কষ্ট হয়েছে আমাদের তাকে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনতে। একদিকে আইনজীবির টাকার যোগান, আরেকদিকে পুলিশের আর জেলের ভেতরের ঘুষের টাকার যোগান দিতে দিতে আমাদের নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারটি প্রায় পথেই বসলো। ভাগ্য কিছুটা প্রসন্ন ছিল অবশ্য। কারণ তখন আমি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বেশ কয়েকটা টিউশনি করাতাম। সেই টাকা আর মায়ের স্কুলের শিক্ষকতার হাতে গোণা কয়েকটি টাকায় চলতো আমাদের তিনটা মুখ।

শুনলে আসলে গল্প বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু এই আমি-ই জানি ক্ষুধার জ্বালা কি জিনিস। আমার স্কুল কলেজের বান্ধবীরা নতুন ড্রেস কিনতো, জুতা কিনতো, পার্লারে গিয়ে সাজগোজ করতো। আর আমি? থাকতাম ফকিরের মতো। বস্ত্র পরিধানের একটা বিধান আছে বলেই হয়তোবা নূ্ন্যতম দামের হাতেগোণা কয়েকটা কাপড় পড়তাম। টাকা নেই, ভালো কিছু করার বা পাবার অধিকার কি আমার আছে?

তখন মিরপুর দশ নম্বর থেকে আজিমপুর পর্যন্ত লোকাল বাসে করেই অফিসে যেতাম। আর হরতাল থাকলে কখনো রিক্সা, কখনো বা পায়ে হেঁটে। সম্ভব হলে পুরোটা পথ পায়েই হাঁটতাম। কারণ তখন অফিস টাইমে বাসের দম আটকানো ভীড়ে আমার নারী শরীরটিকে লোভাতুর কিছু বাসযাত্রী পুরুষের হাতের স্পর্শ থেকে বাঁচানো পৃথিবীর অন্যতম কঠিন একটা কাজ বলেই মনে হতো। ভীড়ের মাঝেই অনুভব করতাম, কেউ আমার পা মাড়িয়ে দিচ্ছে। কেউবা ভীড়ের সুযোগে আমার পশ্চাৎদেশ কিংবা বুকের ওপরে হাত দেবার চেষ্টায় লিপ্ত। আর হেঁটে বা রিক্সায় গেলেও রেহাই নেই। উঠতি বয়সের ছেলে অথবা বাবা বা চাচার বয়সী কোন পুরুষের মুখে প্রায়ই শুনতাম "আপু, বুকের ওপরের ওড়নাটা একটু সরান প্লিজ!" আরও যেসব টিজিং শুনতাম, সেগুলো আপাতত: না বলাই ভালো।

বাসের ভীড়ে একবার আমার কমদামী মোবাইল ফোনটা ব্যাগের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে কে যেন নিয়ে গেল। আর একবার পুরো মাসের মাইনেটা রাস্তায় দিনের আলোতেই ছিনতাইকারীদের হাতে তুলে দিলাম। কার কাছে এসব ঘটনার বিচার চাইবো? পুলিশ? নাকি জনতা? জনতা তাকিয়ে তাকিয়ে মজা নেবে। আর বাংলাদেশের পুলিশ নামক রাক্ষসের হাতে পড়লেতো পুরো জীবনটাই বরবাদ। কাজেই মুখ বুজে সহ্যকরার ক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া আর কোন উপায় খুঁজে পেলামনা।

প্রথম প্রথম এসব ঘটনায় খুব কষ্ট পেতাম। কান্না জমে থাকতো বুকের ভেতরে। কিন্তু পরে নিজেকে বোঝাতে শেখালাম যে, নায়লা, তুমি জন্মেছো বাংলাদেশ নামের তৃতীয় বিশ্বের এমন একটি দেশে যেখানে এসব ঘটনা খুবই সাধারণ নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপার। এদেশের অসুস্থ সমাজ ব্যবস্থায় জন্মে তুমি 'বাই ডিফল্ট' পাপ করেছো এবং এভাবেই তোমাকে এই সিস্টেমের সাথে মানিয়ে চলতে শিখতে হবে। অতএব, দৈনন্দিন জীবনে এই 'মানিয়ে নিয়ে' চলা ছিল আমার জীবনের মূল লক্ষ্য।

২০১৪ সালের শুরুর দিকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আমি কানাডা'র ইমিগ্রেশনের জন্যে অ্যাপ্লাই করি এবং আমার এই ফুটা কপালে এই প্রথমবারের মতো ভাগ্যাকাশে আশার আলো দেখতে পেলাম। হ্যাঁ, আমি কানাডা'র ইমিগ্র্যান্ট ভিসা পেলাম। আমার অফিসের বিগ বস্ আফরোজা আপা তখন কি বলেছিলেন জানেন? বলেছিলেন, "নায়লা, আপনি বাংলাদেশের ভালো চাকুরি ছেড়ে কানাডা গিয়ে কি করবেন বলুনতো? ওসব দেশে কিসের নেশায় মানুষ যায়, আমি জানিনা। সব ব্রেন বাংলাদেশের বাইরে ড্রেন হয়ে যাচ্ছে।"

উত্তরে আমি শুধু মুচকি একটু হাসলাম। আপাকে জানানো হয়নি এখনো যে, আলহামদুলিল্লাহ, কানাডায় এখন আমি অনেক ভালো আছি। কেউ এখন বাসের ভীড়ে আমার পা মাড়িয়ে দেয়না। বুকে কিংবা পেছনে হাতও দেয়না। আমার মোবাইল ফোন বা টাকা এখন ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েনা। কেউ এখন আমার বুকের ওড়না টেনে খুলে নিতে চায়না। পুলিশকে এখন আমার ঘুষের টাকাও দিতে হয়না। কানাডায় আমার জীবনের মূল্য আছে, নিরাপত্তা আছে, মানসিক শান্তি আছে। বাংলাদেশের ভালো চাকুরী আমি ছেড়ে এসেছি ঠিকই, কিন্তু 'বাংলাদেশ' নামের আপাদমস্তক চরম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশটির 'সিস্টেম' থেকে আমার মুক্তি মিলেছে। কানাডায় এখন আমি আমার সব সুপ্ত স্বপ্নগুলোকে বাস্তবায়ন করার সাহস পাই, শান্তির এই দেশটিতে আমি নিশ্চিন্ত মনে ঘুমুতে যাই বাংলাদেশের সকল দু:স্বপ্নগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে।

লেখাটি ওয়েবসাইটে পড়তে হলে ক্লিক করুন

কানাডা'র ইমিগ্রেশন এবং সেটেলমেন্টের জন্যে অলাভজনক প্রথম ওয়েবসাইট: http://immigrationandsettlement.org/Home/Index

ফেসবুক গ্রুপ: Click This Link

ইউটিউব চ্যানেল: Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ সকাল ১০:৩৫
৩৩টি মন্তব্য ৩৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে “উপজাতি” নাকি “আদিবাসী”? আন্তর্জাতিক আইন ও ইতিহাসের নির্ভেজাল সত্য!​

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:২৭


সূচনা ও প্রেক্ষাপট:
লেখক পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০০১ সালে তিনি যখন সেখানে দায়িত্ব পালন করেন, তখন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে 'উপজাতীয়' (Tribal) হিসেবে ডাকা হতো। কিন্তু ২০১৫-১৬ সালের দিকে সেখানে পুনরায় পোস্টিং পাওয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

হঠাৎ কেন ঢাকায় র প্রধান?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:২২


দিল্লী দখল ঠেকাতে ঢাকায় চলে এলেন র প্রধান!

হ্যাঁ, ঠিকই শুনলেন। ক'দিন ঐ র‍্যাডিসন ব্লুতে বসে অনেকের হাতে-পায়ে ধরলেন; বললেন, "তোমরা প্লিজ দিল্লী আক্রমণ করো না। আমাদের মিসাইল, অস্ত্র সব... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী কারা

লিখেছেন কিরকুট, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬


বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী নিয়ে আলোচনা হলেই আমাদের সামনে সাধারণত পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কথা আসে। কিন্তু একটি প্রশ্ন প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয় বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেবী!

লিখেছেন করুণাধারা, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৩৩



১)
দেবী খুবই বুদ্ধিমতী এবং সুন্দরী। এক উচ্চাভিলাষী পরিবারে দেবীর জন্ম, এমনই উচ্চাভিলাষী যে তাদের একমাত্র ভাবনা কীভাবে সবাইকে ছাড়িয়ে উপরে ওঠা যায়! দেবীর যখন জন্ম হলো তখন তার ভাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

র-প্রধানের ঢাকা সফর: খবর শুনেই হাসপাতালে ভর্তি পাকিস্তানের হাইকমিশনার !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:১৭


রসিকতা বাদ দিয়ে বলি, দুটি ঘটনাই সত্যি। বাংলাদেশে RAW এর প্রধান পরাগ জৈন এসেছেন এবং পাকিস্তানের হাইকমিশনার এখন হাসপাতালে আছেন। দুটি ঘটনা আসলে পরস্পরবিচ্ছিন্ন, একটার সঙ্গে আরেকটার কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×