আমার জীবনানন্দ
আপাত দৃষ্টিতে যে পৃথিবীকে বড়ই বর্ণিল বলে মনে হয় তার অন্তরালে যে ধূসরতা, মলিনতা,বিষন্নতা লুকায়িত রয়েছে তার আত্মপ্রকাশের মাধ্যমেই মানব জীবনের সত্যতা উৎসারিত হয় । দৃষ্টি ভঙ্গির ভিন্নতার কারণে একই প্রকৃতি আমাদের কাছে মনে হয় বর্ণময় ও বর্ণহীন । চিরপরিচিত পৃথিবীকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার যে সামর্থ সেই দক্ষতাকে যে কবি কবিতার অপূর্ব রূপায়ণের মাধ্যমে পাঠকচিত্তে সঞ্চারিত করতে সক্ষম তিনি আমার জীবনানন্দ । নামের মধ্যে তার জীবনের আনন্দ জড়িত থাকলেও তাঁর কবিতায় পাওয়া যায় প্রেম আর বিষাদের মিলিত স্রোতধারায় সৃষ্ট এক অন্য মানুষকে । জীবনানন্দের যে আবেগ যে অনুভূতি তা প্রেমকে নতুন রূপে উন্মোচন করে আমাদের সামনে । যেখানে প্রেম আবেগ তাড়িত, স্বপ্নাতুর , লোভনীয় কিন্তু তা স্বর্গীয় স্বাদ থেকে পৃথক ।
জীবনানন্দের প্রকৃতি, রং, রূপ, উপমা, বৈচিত্র্য সব কিছুই যখন কবিতার মধ্যে অবধারিত ভাবে প্রতীয়মান হয় তখন যেন নিজেকেই ফিরে ফিরে পাই । জীবনানন্দীয় শব্দগুলো যেন আমাদেরই শব্দ হয়ে কানে, মনে এক অপূর্ব ঝংকার তোলে । পচা শশা, কাস্তের মত চাঁদ, পাখির ডিম কিংবা শুকনো মাকড়সা যেন প্রতিদিনের আমাকে নতুন করে উপস্থাপনে সচেষ্ট হয় ।জীবন ও মৃত্যুর কবি যদি তাকে বলি তাতেও কোন বাধা নেই । মৃত্যুকে এত মোহনীয় ও কাঙ্খিত করে একমাত্র জীবনানন্দ দাশই প্রকাশ করতে পারেন । তিনি বিমূঢ় যুগের বিভ্রান্ত কবি নন , তিনি শুধু ধূসরতার কবি নন, তিনি ক্রান্তিকালের যুগ সচেতন কবি । তাঁর ধূসর পাণ্ডুলিপির কবিতাগুলো যেন আমার প্রকৃত সত্তার দীপ্ত উচ্চারণ-
‘আমি ঝরে যাব তবু জীবন অগাধ ।
আমারে রাখিবে ধরে সেইদিন পৃথিবীর পরে ।’
পরস্পর, বোধ কিংবা ক্যাম্পে কবিতার একাকিত্ব, নির্জনতা, উদাসীনতা তথাকথিত জীবনের পথে এনে দেয় নতুন চিন্তার জোয়ার । মনের অজান্তেই যেন অন্ধকারের কানে বাজে ঘাই হরিণীর ডাক, শিশিরে পেঁচার পালক ঘষার শব্দ ।
যে চেনা পৃথিবী কখনো চিনি নাই তাই চেনায় আমার জীবনান্দ । আন্দলোন তোলে শালিকের হলুদ ঠ্যাং কিংবা শিশিরে ভেজা চড়ুইয়ের বাসা । ইন্দ্রিয়কে সচেতন করে তোলে তাঁর কবিতার শব্দ । যেন রূপশালী ধান ভানা রূপসীর রূপ আর গন্ধ আচ্ছন্ন করে নিয়ে যায় কোন সুদূর গ্রামে ।নীলের আবহে সৃষ্ট এক নতুন আকাশ, জীবনের অন্তরালের শীতলতা যা কখনো স্বাভাবিক ভাবে অনুভূত হয়না, অনুভূতির অন্তরালের সেই অব্যক্ত অনুভূতিই জীবনানন্দের কবিতায় জাগ্রত । প্রকৃতির রূপ অনন্ত যৌবনা হয়ে নয় বরং যুবতির ক্ষয়িষ্ণু রূপে পরিণত হয় বারবার । পাঠকের মনকে সৃজনশীল করে তুলতে পারার ক্ষমতা তাই লাভ করেন জীবনানন্দ । বুদ্ধদেব বসুর মতই তাই বলতে ইচ্ছে হয়- ‘জীবনানন্দ প্রকৃত কবি...’ ।
আধুনিক কবিদের কবিতার কঠোরতা, আধুনিকতা, আড়ষ্টতাকে পাশকাটিয়ে একান্ত আপন জনের মত ছন্দের এক জাদুকরী মাধুর্য দিয়ে সকলকে আটকে রাখেন তিনি । যাঁর কবিতায় ভাব, আবেগ, অনুভূতি, বিষন্নতা কোন কিছুই পড়ে থাকেনা অবহেলায় । প্রেম, বিষাদ, প্রকৃতি, মন সবকিছুই কোন এক সময় এসে আশ্রয় করে তার তুলিতে । দীর্ঘ নয় বরং সামান্য আঁচড়ে তিনি এঁকেছেন মানুষের মনের সকল অনুভূতি । এই আমার জীবনানন্দ ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


